ঢাকা, শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ২৪ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

করোনা বনাম অর্থনৈতিক সংকট: কোনটা ভয়ঙ্কর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০২১ সোমবার, ০৯:৫৯ পিএম
করোনা বনাম অর্থনৈতিক সংকট: কোনটা ভয়ঙ্কর

১২ এপ্রিল প্রথম দফা লকডাউন শেষ হবার আগেই দ্বিতীয় দফা লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ কর্তৃক জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে দ্বিতীয় দফার লকডাউনে আরো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, এই সময়ে লকডাউন হবে অত্যন্ত কঠোর। আর তাই প্রথম দফার লকডাউনের তোয়াক্কা না করে মানুষ যেন বানের পানির মত রাস্তাঘাটে ভিড় জমাচ্ছে। বাসগুলোতে ঠাই নাই। ফেরিঘাট, লঞ্চঘাটে উপচে পড়া মানুষের ভিড়। স্বাস্থ্যবিধির কোন বালাই নেই। ব্যাংকগুলোতে হুড়োহুড়ি। মনে হচ্ছে যেন লটারি টিকিট বিক্রি হচ্ছে। আর বাজার হাট দেখে কে বিশ্বাস করবে বাংলাদেশে এখন লকডাউন চলছে। এই পরিস্থিতি ১২ এপ্রিলের। আগামীকাল নিশ্চিতভাবে এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি হবে। কিন্তু মানুষের মধ্যে কোনো আনন্দ, উৎসব এবং আগ্রহ নেই। দুদিন পর পহেলা বৈশাখ এবং রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু অন্য সময় পহেলা বৈশাখ ঘিরে যেমন একটা উৎসবের আমেজ থাকে পুরো জাতির মধ্যে এবার সেই উৎসবের আমেজ নেই। মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয় এবং হতাশার চিহ্ন। মানুষ কি করোনার কারণে আক্রান্ত?

একাধিক মানুষের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, করোনা নিয়ে মানুষ মোটেও বিচলিত নয়। বরং মানুষ যে ইতস্তত, ছুটাছুটি করছে পাগলের মতো সেখানে তাদের স্বাস্থ্যবিধির কোন বালাই নেই, অনেকের মুখে মাস্ক নেই। মাস্ক থাকলেও সেটি যথাযথভাবে পরা নেই, মানুষ ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে ছুটে চলেছে। তাহলে কিসের আতঙ্ক মানুষের মধ্যে। অর্থনৈতিক সংকটেই মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, তারা মনে করছে যে করোনা নয় অর্থনৈতিক সংকটই তাদেরকে মেরে ফেলবে। রিকশাচালক থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প আয়ের চাকুরে, সবাই আতঙ্কিত। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার এই লকডাউনে তাদের আয়ের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। কে তাদের পাশে দাঁড়াবে? সাধারণ মানুষদের অধিকাংশই মনে করেন, করোনা হলে মানুষ বাঁচতে পারে। চিকিৎসা হলে সুস্থ হবে। অনেক সময় চিকিৎসা ছাড়াও সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট থেকে তারা পরিত্রাণ পাবে কিভাবে? এই প্রশ্ন যেন হতাশার বলিরেখা এঁকেছে প্রায় প্রতিটি মানুষের চোখে মুখে। শুধু নিম্ন আয় বা মধ্যবিত্ত মানুষের নয়, উচ্চবিত্ত বড় বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ দিশেহারা। কিভাবে চলবে তাদের এই রমজান, কিভাবে কাটবে ঈদের সময় এবং কিভাবে মেটাবে সংসারের যাবতীয় খরচ।

বাংলাদেশ গত বছর ৮ই মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। সেই সময়ে করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছিল। প্রথম দফায় যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল তখন মানুষ ঘর থেকে বের হয়নি। সে সময় মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অনেক ভালো। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ছোঁয়া প্রায় সব মানুষের গায়েই লেগেছিল। আর সে কারণে মানুষের মধ্যে কিছু সঞ্চয় ছিল। তাছাড়া কেউ তখনো চিন্তা করেনি যে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য অর্থনৈতিক সংগ্রাম করতে হবে তাদের। আর এ কারণেই সেই সময়ে সাধারণ ছুটি নিয়ে মানুষের মধ্যে তেমন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যখন শুরু হলো সেহ দ্বিতীয় ঢেউয়ে ৫ এপ্রিল যে লকডাউন দেওয়া হয়েছিল কার্যত সেই লকডাউন অকার্যকর হয়েছে। মানুষ লকডাউন বা এ ধরনের বিধি-নিষেধ মানেনি। সরকার একের পর এক শিথিল করেছে লকডাউন ব্যবস্থাপনা। প্রথম দফায় লকডাউনের সময় দোকানপাট, শপিংমল ইত্যাদি বন্ধ ছিল। পরে একরকম চাপে পড়েই দোকানপাট খুলে দেওয়া হয়েছিল। গণপরিবহনও চালু করতে হয়েছিল সরকারকে। এখন দ্বিতীয় দফার লকডাউনে সরকার কতটা সফল হতে পারবে সেটাই দেখার বিষয়। যদিও সরকার মনে করছে যে করোনা মোকাবেলার জন্য লকডাউনের বিকল্প নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ লকডাউনকে করোনা মোকাবেলার সমাধান হিসেবে মানছেন না। বরং তারা মনে করছেন যে, এখন তাদের যে জীবন-জীবিকার কষ্ট, সেই কষ্ট ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। সেটি করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। আর এ কারণেই অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন, করোনা নিয়ে নয়।

আজ যখন একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক লোক মারা গেছে, প্রতিদিন যখন প্রায় ৭ হাজারের উপর আক্রান্ত হচ্ছে তখনও মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে কোনো ভীতি নেই। যখন হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়ছে করোনা রোগী, আইসিইউতে বেড খালি নেই তখনও মানুষ বিকারহীন। বরং মানুষ চিন্তিত আগামীকাল তার কিভাবে চলবে, তার বাড়ি ভাড়া কিভাবে হবে, কীভাবে তিনি বাজার-সদাই করবেন, চিকিৎসা ব্যয়ই বা কিভাবে মেটাবেন। অর্থনৈতিক সংকটই যেন করোনাকে ম্লান করে দিয়েছে বাংলাদেশে।