ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ , ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

রোহিঙ্গা শিশুদের বিপর্যস্ত জীবন

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ০২:২২ পিএম
রোহিঙ্গা শিশুদের বিপর্যস্ত জীবন


ছোট বোনকে কোলে নিয়ে বাংলাদেশের দিকে এগোচ্ছে ৭ বছরের শিশু ইয়োসা। যে বয়সে পিঠে স্কুল ব্যাগ থাকার কথা, চোখে মুখে উৎসাহ, সে বয়সে চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে নিজের আর ছোট বোনের প্রাণ বাঁচাতে বাড়ি ঘর ছেড়ে পালাতে হচ্ছে তাকে। ইয়োসার মতই বা এর চেয়ে আরও কষ্টের কাহিনী মিয়ানমার থকে পালিয়ে আসা অন্য শিশুদেরও। জীবনের তাগিদে পালিয়ে আসছে ঠিকই, কিন্তু ঝুঁকি কমেনি। অপুষ্টি, রোগ-শোকে কাতর হয়ে মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়ছে তারা। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় পার করছে দিন-রাত।

২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সহিংসতার পর থেকে বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে প্রায় পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা, যাদের দুই তৃতীয়াংশ শিশু। টেকনাফ, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেওয়া এসব রোহিঙ্গা শিশুরা সর্দি, জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তারা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছে। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবুনিয়ার নতুন আশ্রয়কেন্দ্রে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মেডিকেল ক্যাম্প করে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। প্রতিদিন এত রোগী আসছে যে তারা তাদের নামের তালিকা করার অবকাশ হচ্ছে না। অধিকাংশই পানিবাহিত রোগ, সর্দি, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় এড়াতে রোহিঙ্গা শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব দেওয়া না হলে মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।

রোহিঙ্গা শিশুদের ৮৫ ভাগই রোগাক্রান্ত। ঘরে ঘরে নানা ধরনের অসুখ। শরণার্থী শিবিরের পরিবেশ তাঁদের আরও রোগাক্রান্ত ও বিষণ্ন করে তুলছে। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক ভাবেও তারা বিপর্যস্ত।

শরণার্থী শিশু-কিশোরদের তাদের বয়স অনুযায়ী, বয়সের চাহিদা অনুযায়ী স্বাভাবিক কাজকর্ম, বিনোদন, খেলাধুলা, লেখাপড়ার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে তাদের মনের চাপ বা সংকট কমিয়ে আনা সম্ভব। এসবের জন্য সম্পদের খুব বেশি প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটা পরিবেশ তৈরি করা। আর এ জন্যই, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য এক হাজার ৩০০ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ। কক্সবাজারে এসব শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যেখানে শিশুরা পড়ালেখা করবে এবং করবে খেলাধুলাও।

ইউনিসেফ সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ১৮২টি কেন্দ্রে অন্তত ১৫ হাজার শিশুকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী এক বছরে প্রায় দুই লাখ শিশুকে শিক্ষা দেওয়া হবে বলে টার্গেট করা হয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠা করা হবে ১৫শ কেন্দ্র। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তাদের জন্য থাকবে মানসিক বিভিন্ন কাউন্সিলিং, স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ। শিশুদের কলম, রঙিন পেন্সিল, স্কুল ব্যাগসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হবে।

পরিবার পরিজনকে হারিয়ে, এক অচেনা পরিবেশে এসে পড়েছে এই রোহিঙ্গা শিশুরা। নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বজন হারানোর শোক আর এই দুইয়ে মিলে সৃষ্ট হওয়া বিষণ্ণতা থেকে তাদের মুক্ত করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

জানা গেছে, অন্তত এক হাজার ৩০০ শিশুকে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে যারা বাবা-মা বা কোনো আত্মীয়-স্বজনকে ছাড়াই বাংলাদেশে এসেছে। সাহায্য সংস্থাগুলোর ধারণা, এসব শিশুর বাবা-মার দুই জনকেই অথবা বাবাকে মিয়ানমারে মেরে ফেলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে এসব শিশু কি হবে?

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের হিসেব মতে প্রতিদিনই গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে, যার একটি বড় অংশই শিশু। এদের বেশিরভাগই চরম অপুষ্টিতে ভুগছে আর বাকীরা তীব্র খাদ্য সঙ্কটে আছে। মিয়ানমারের মংডুতে একতৃতীয়াংশ পরিবারই চরম খাদ্য সংকটে ভুগছে। এখানেই এসেও বেশিরভাগেরই একই দশা। ফলে জীবন ঝুঁকি আর মানসিক ট্রমা নিয়ে কষ্টের মাঝেই আছে এই রোহিঙ্গা শিশুরা।

বাংলা ইনসাইডার/আরএ