ঢাকা, শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তৃতীয় দিনেই লকডাউনের শেকলভাঙা গান

আহনাফ তাহমিদ
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২১ রবিবার, ১২:০১ পিএম
তৃতীয় দিনেই লকডাউনের শেকলভাঙা গান

সারাদেশে ২৩ তারিখ থেকে চলছে কঠোর সর্বাত্মক লকডাউন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, এই লকডাউন নিয়ে কোনো গুজব চলবে না। তারচেয়েও বড় কথা, আগের যেসব লকডাউন চলেছিল, সেগুলোর চেয়েও এই লকডাউন অত্যন্ত কঠোরভাবে পরিচালিত হবে।

প্রথমদিকে আমরা কী দেখলাম? লকডাউন কয়েকদিনের জন্য উঠিয়ে দেয়া হলে ফেরিঘাট, লঞ্চ, বাস টার্মিনাল, রেল ইত্যাদি যোগাযোগ হাবগুলোর দ্বারা মানুষকে বাড়ি চলে যাবার একটি সুযোগ করে দেয়া হলো। মানুষও কই মাছের ঝাঁকের মতো বাড়ির পানে ছুটতে শুরু করলো। ঈদ গেলো ২১ তারিখ। ঠিক এর দুইদিন পরই, অর্থাৎ ২৩ তারিখ থেকেই কঠোর লকডাউন শুরু। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, লকডাউনের প্রথম দুইদিন যেন ভূত দেখেছে মানুষ গোটা শহরজুড়ে। চার চাকার যানবাহন তো দূরের কথা, দুই চাকার যানবাহনের দেখাও মিলেছে হাতেগোণা দুই-একটি। আর রিকশার টুংটাং বেলের শব্দে মানুষের মনে একটু স্বস্তি নেমে আসলেও তাদের ভাড়া চাইবার বহর দেখে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য হয়েছে অনেকের। সেটি অবশ্য অন্য হিসেব। এমন বিধিনিষেধের মধ্যে মানুষ বিপাকে পড়ে গেলে রিকশাওয়ালাদের এমন রাজার আসনে বসে যাওয়া আজকের কোনো ঘটনা নয়।

এবার আসা যাক, এই লকডাউন নিয়ে আসলে আমরা কী দেখতে পেলাম? প্রথম দুইদিন উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে সরকারের বেঁধে দেয়া লকডাউন মানুষ বেছে নিয়েছে? আদতে এমন কিছুই আসলে হয়নি। ঈদের পরের দুইদিন রাস্তাঘাট ফাঁকা ছিল, কারণ মানুষ ঈদ করতে যত দ্রুত সম্ভব গ্রামের দিকে ছুটেছে। ফলে যানবাহনগুলোর স্থানে দেখা গিয়েছে অরাজকতা এবং যে যেভাবে পেরেছে যাবার কারণে, সংক্রমণের সম্ভাবনা আরও অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেয়েছে।

গতকাল ছুটি শেষ হবার পর দেখা গিয়েছে লকডাউনের মিথ্যে বৈরি ভাঙতে শুরু করেছে। মানুষকে পেটের তাগিদে ঘরে ফিরতে হবে, চাকরি বাঁচাতে হবে। আধপেটা খেলে হলেও মানুষ এখন চায় কর্মস্থলে যেন নিজের চাকরিটা বজায় থাকে। পরিবারের মুখে তো তাদেরকে ভাত তুলে দিতে হবে। তাই গতকাল যেমন করেই হোক বৃষ্টি মাথায় করে হলেও তাদেরকে ঢাকার দিকে আসতে দেখা গিয়েছে। তবে এখানেও তাদেরকে যে কোনো রকমের সমস্যা পোহাতে হয়নি, তা একেবারেই নয়। প্রবেশ করার পয়েন্টে এসে দেখাতে হয়েছে নগরে ফেরার কারণ। কেউ যদি সঠিক কারণ দর্শাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া নগরে কোনো মোটরবাইকও ঢুকতে দেয়া হয়নি। এমতাবস্থায়, রিকশা ছাড়া মানুষের চলাচলের আর কোনো গত্যন্তর থাকে না। সেখানেও দেখা গিয়েছে নানা সমস্যা। সদরঘাট থেকে রিকশাভাড়া ১৫০০ টাকা চাওয়া হয়েছে, এমন খবরও আমরা দেখতে পেয়েছি।

সত্য কথা বলতে, বাংলাদেশে এমন কঠোর লকডাউন আসলে আদৌ সম্ভব কিনা, সেদিকে এবার বোধহয় দৃষ্টি দেয়া উচিত সরকারের ওপরের মহলের। তারচেয়েও বড় কথা, আমাদের এখন লকডাউনেরও বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে।

এমন নয় যে কোনোকিছুই খোলা নেই। খোলা আছে, কিন্তু তা দৃশ্যমান চক্ষুর কিছুটা আড়ালেই রয়ে গিয়েছে। কর্মস্থলে যাবার জন্য মানুষের সবচেয়ে বেশি দরকার যানবাহন। অন্তত বাস পেলেও মানুষ খুশি। কিন্তু এখন কোনো কিছুই রাস্তায় দেখা যাচ্ছে না। সবেধন নীলমণি রিকশা ছাড়া যাতায়াতের আর কোনো উপায় নেই। সেখানেও চাওয়া হচ্ছে ব্যাপক ভাড়া, যা সাধারণ সকলের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্যে দেখেছিলাম, মানুষের যখন পেটে টান পড়ে, তখন সে আর কোনো বাঁধা মানতে চায় না। আমাদের দেশের লকডাউনেরও হয়েছে যেন ঠিক একই অবস্থা। মানুষ পেটে পাথর বেঁধে আছে, আর ঠিক এমন সময়েই একের পর এক লকডাউনে তাদের অবস্থা জর্জরিত। কর্মস্থলে না গেলে বেতন আসবে না, বেতন না এলে ঘরে চাল আসবে না, ঘরে চাল না এলে পরিবারের মুখে ভাত তুলে দেয়া যাবে না। এসব হিসেব কষতে কষতে কখন যে মানুষের মৃত্যুভয় চলে যায়, তা এই করোনাকালে একদম বোঝা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খবর যেমন আসছে যে লকডাউন স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে, আবার একইসাথে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে শোনা যাচ্ছে স্বজন হারাবার আহাজারি।

শেকলভাঙার দীপ্ত শপথ এই দেশের মানুষের এটা কিন্তু প্রথম নয়। এর আগেও অনেক বার, অনেক ইস্যুতে হয়েছে। কিন্তু জীবন ও জীবিকার সাথে যখন মানুষের টিকে থাকা জড়িত, তখন সেখানে অন্যকিছু বলে মনকে মানানো মুশকিল। বইয়ের ভাষায় বলতেই হচ্ছে, মানুষ এখন অতিকায় হস্তী হয়ে একদিন বাঁচতে চায় না, বরং তেলাপোকার মতো বেঁচে থাকার মাঝেই সার্থকতা খুঁজে মন মানাতে চায়।

বিষয়: লকডাউন