ঢাকা, শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নিতুন কুণ্ডের প্রয়াণদিবসে অটবির আজকের অবস্থান

বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ বুধবার, ০৮:৩৬ এএম
নিতুন কুণ্ডের প্রয়াণদিবসে অটবির আজকের অবস্থান

এমন নয় যে তার আগে এই দেশে অফিস-আদালতে আসবাবপত্র বিক্রি হতো না বা প্রয়োজন পড়তো না। হতো, কিন্তু তা ছিল নেহায়েত প্রয়োজনের খাতিরেই। দুই-একটি ছোট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই কাজ সারা হয়ে যেত। কিন্তু তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের  পথিকৃত যিনি বুঝিয়েছিলেন যে কেবল গৃহেই নয়, অফিস-আদালতেও রুচিসম্মত আসবাবের প্রয়োজন আছে।

বলছিলাম শিল্পী নিতুন কুণ্ডের কথা। আজ (১৫ সেপ্টেম্বর) তার ১৫তম প্রয়াণদিবস। প্রয়াণদিবসে তার জন্য জানাই মনের অন্তঃস্থল থেকে গভীর শোক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন নিতুন কুন্ডু। পুরো নাম নিত্য গোপাল কুন্ডু। শিক্ষা জীবনে পড়ার খরচ মিটিয়েছেন আঁকাআঁকির কাজ করে। ইচ্ছা ছিল নিজ বিদ্যাপীঠেই নিয়োজিত হবেন শিক্ষকতায়। স্নাতকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ায় সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছিল। তার পরও পেশাজীবনের শুরুটা হয় মার্কিন একটি সংস্থায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যোগ দেন মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগে। সে সময় বিভাগটির ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন। ‘সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী’—এই স্লোগান সম্বলিত পোস্টারটি তারই ডিজাইন করা। স্বাধীনতার পর নির্মাণ করেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভাস্কর্য। তবে এক পর্যায়ে শিল্পী থেকে হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তা। শিল্পীর সৃজনশীলতাকে কাজে লাগান আসবাব শিল্পে। এক পর্যায়ে তার হাতেই আধুনিক রূপ নেয় দেশের আসবাব শিল্প।

আশির দশকের মাঝামাঝি অটবি প্রাইভেট লিমিটেড গড়ে তোলেন নিতুন কুন্ডু। অটবি এখন দেশের আসবাব শিল্পের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড। এ শিল্পে নিতুন কুন্ডুর ব্যবসায়িক যাত্রা সত্তরের দশকের শেষভাগে। ভাস্কর হিসেবে নাম করার কারণে নানা মহলে পরিচিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পরিচয়গুলোর সূত্র ধরেই দেশের করপোরেট জগতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিদের ব্যবহার্য আসবাব বানানোর কাজও পেয়েছেন। সেখান থেকেই হয়ে উঠলেন আধুনিক আসবাব শিল্পের পথিকৃৎ।

আসবাব খাতে ফ্ল্যাটপ্যাক প্যাকেজিংয়ের মতো নতুন পদ্ধতির সূচনা নিতুন কুন্ডুর হাতেই। আসবাব নির্মাণের সনাতন পদ্ধতি হলো কাঠ কেটে একক উপাদান হিসেবে পূর্ণাঙ্গ আসবাব তৈরি করা। কিন্তু বৃহদায়তনে পৃথক উপাদান উৎপাদন ও তা সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আসবাব তৈরির পদ্ধতিটি অটবির অবদান। এতে করে আসবাব তৈরি থেকে শুরু করে পরিবহনসহ সবদিকেই ব্যয় কমে আসে। একই সঙ্গে আসে কাঠের পুনর্ব্যবহারেরও সুযোগ।

অটবির অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল তার মৃত্যুর পরও। ২০০৬ সালে ৭১ বছর বয়সে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নিতুন কুন্ডু। ২০০৮ সালে সাভারে অটবির বৃহদায়তনের আরেকটি কারখানা গড়ে ওঠে। ৬ লাখ বর্গফুটের ওপর গড়ে তোলা হয় অটবির চতুর্থ ও পঞ্চম ইউনিট। ওই দুই ইউনিটে শুরু হয় কাঠের এবং পার্টিকেল বোর্ডের আসবাব, প্লাইউড, কাঠের দরজা, ফোম ও ম্যাট্রেস তৈরি। 

শুরু থেকেই অটবির প্রমোশন বা বিপণন চিন্তাভাবনা ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ২০১২ এর দিকে বেশিরভাগ গণমাধ্যমে দেখা যেত অটবির বিজ্ঞাপন ও জয়জয়কার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছিল অটবির সগর্ব পদচারণা। এছাড়াও বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে সুরুচির পরিচয় দিয়েছিল অটবি। ২০০৬ সালে নিতুন কুণ্ডুর মৃত্যুর পর তার অটবির দায়িত্ব চলে যায় তার ছেলে অনিমেষ কুন্ডুর হাতে এবং প্রতিষ্ঠানের সিইও করা হয় সাব্বির হাসান নাসিরকে। মূলত নিতুন কুন্ডু মারা যাবার পরই দেশের শীর্ষ আসবাবপত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটি প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থা ধারণ করে। ২০০৭-০৮ সালের দিকে অটবির লেনদেনের অর্থমূল্য ছিল প্রায় ২১৮ কোটি টাকা। ধারণা করা হয়ে থাকে, পিতার মৃত্যুর পর তার ছেলে অনিমেষ কুন্ডু প্রতিষ্ঠানটিকে আগের চেয়েও বেগবান করতে খুব হিমশিম খাচ্ছিল। বিজ্ঞাপন কিংবা প্রচারণার দিকে অটবি বেশ পিছিয়ে পড়ে প্রতিযোগিতামূলক এই বাজারে। ফলে অন্যান্য প্লাইউড তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার ধরে ফেলতে খুব একটা সময় নেয় না। পণ্যে কোনো বৈচিত্র্য নেই, নিতুন কুন্ডের ট্রেডমার্ক নকশা না থাকায় ক্রেতারা আস্তে আস্তে অটবির প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করেন। ফলে অটবির বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। অনেকে ধারণা করেন মূল ব্যবসা আসবাব নির্মাণ ছেড়ে তারা বিদ্যুত উৎপাদনের ব্যবসায় মনোযোগ দেয়ার কারণে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে যায়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে বাজার ধরে ফেলছে, সেখানে অটবি অনেকটাই পিছিয়ে যায়। এমনকি বিদ্যুত প্রকল্পেও তারা খুব বেশি সুবিধে করতে পারেনি।

সামান্য কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে একটি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার এই বাজারে টিকা থাকতে হলে চাই নেতৃত্ব, নিত্যনতুন আইডিয়া এবং শ্রম। নিতুন কুন্ডুর প্রয়াণদিবসে আমরা তাই কামনা করি তার সাধের অটবি যেন দ্রুতই আবার শিখরে আরোহণ করতে পারে।