ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১৩ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

প্রতিকূলতাকে জয় করেই অপরাজেয় শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ সোমবার, ১০:০৫ এএম
প্রতিকূলতাকে জয় করেই অপরাজেয় শেখ হাসিনা

বঙ্গবন্ধু তনয়া, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বয়স ৭৫ হতে চলেছে। মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ে সংকল্পবদ্ধ মহীয়সী এই নারী গোটা জাতিকে উন্নততর হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ পেয়েছে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা। হত্যার হুমকিসহ হাজারো বাধা-বিপত্তি এবং নানান প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে আজকের এই অবস্থানে আসীন তিনি।

প্রথম প্রতিকূলতা হলো ৭৫ এর ১৫ আগস্ট। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। এ সময় ভাগ্যগুণে প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পান তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।এর পর চরম এক প্রতিকূল পরিবেশ দেখতে হয় আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। 

দ্বিতীয় প্রতিকূলতা ছিল দেশে ফিরতে জিয়া কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা। গোটা পরিবার হারিয়ে যখন তিনি দেশে ফিরতে চাইছিলেন, তখন তার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। এসময় স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার জার্মান ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। পরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আতিথেয়তায় পরবাসী জীবন কাটান শেখ হাসিনা।

১৯৮১ সালের  ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন শেখ হাসিনা। জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও জিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ওই বছরেরই ১৭ মে বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং বিমানে চড়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাকে দেখার জন্য বৈরি আবহাওয়া উপেক্ষা করে তৎকালীন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত এলাকাজুড়ে নামে লাখো মানুষের ঢল।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সেদিন স্বদেশে এসেছিলেন দেশের প্রতি আকর্ষণ আর দেশবাসীর প্রতি ভালোবাসার টানে। তিনি জানতেন জাতির পিতার অধরা স্বপ্নগুলো তিনি ছাড়া আর কেউ পূরণ করবে না। লাখ লাখ লোকের সংবর্ধনায় তিনি জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,  ‘আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’

শেখ হাসিনা দেশে ফেরা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার অবর্তমানে আওয়ামী লীগ যখন আমাকে সভানেত্রী নির্বাচিত করল, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফিরে আসবই। ১৯৮১ সালে আমি যখন দেশে ফিরে আসি তখন দেশের অবস্থা কেমন ছিল? জাতির পিতার খুনিরা অবাধে ঘোরাফেরা করত। দেশে জয়বাংলা শ্লোগান দেওয়া যেত না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নিষিদ্ধ ছিল। আমি মানুষের কাছে গেছি, আমি জানতাম, আমার তো অন্য কোনো জায়গা নেই। আমার জায়গা তো বাংলাদেশের মানুষের কাছে, জনগণের কাছে। আমি সভা-সমাবেশে যেতাম, পিতৃহত্যার বিচার চাইতাম।`

এদেশের গণতন্ত্র বিকাশে এবং রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনে তার রয়েছে প্রভূত ভূমিকা। দেশে ফিরেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে মনোনিবেশ করেন শেখ হাসিনা। এসময় রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের। এর জের ধরে শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন তিনি। কমপক্ষে ১৯ বার তাকে হত্যার জন্য সশস্ত্র হামলা করা হয়।
তবুও অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের দাবিতে তিনি সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। 

এই লক্ষ্যে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয় ১৫ দলীয় জোট। এই জোট সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে শক্তিশালী আন্দোলন। ছাত্র আন্দোলন দমানোর জন্য সামরিক শাসনের পক্ষে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও গুলি বর্ষণ করতে থাকে। 

পরদিন ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে আটক করে ১৫ দিন কারাগারে রাখে সামরিক সরকার। এর পরের বছর ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং নভেম্বর মাসেও তাকে দুই বার গৃহবন্দি করা হয়। এর পর ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাকে আবারো আটক করে জান্তা সরকার এবং প্রায় ৩ মাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করে এক মাস কারাগারে রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়ে গৃহবন্দি হন। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৯০ এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে পতন হয় স্বৈরাচারের, বিজয় হয় গণতন্ত্রের।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নানামুখী ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে একটা অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সরকার গঠন করতে না পারলেও ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত হয় সরকার। 

শেখ হাসিনার জীবনে আরো একটি বড় প্রতিকূলতা হলো ২১ আগস্ট। বিএনপি সরকারের সময় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তার উপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয়। ওইদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এক জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাকে লক্ষ্য করে এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড ছোড়া হয়। লোমহর্ষক সেই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ তার দলের ২২ নেতাকর্মী নিহত হন এবং পাঁচশ’র বেশি মানুষ আহত হন। শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পান।

বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচার করতেও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৪১ দিনের মাথায় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আজীবনের জন্য বন্ধ করার লক্ষ্যে ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ জারি করে খোন্দকার মোশতাকের সরকার। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসলে মানবতাবিরোধী মোশতাকের করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল হয়। অধ্যাদেশটি বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানবতাবিরোধী এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ খুলে যায়। তারই ধারাবাহিকতায় বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডের রায় আংশিক কার্যকর হয়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও দেশি-বিদেশি প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে তাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রায় কার্যকরের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয় ও রায় হয়। তবে এখনো যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম চলমান। যুদ্ধাপরাধী পরিবারেরর সন্তানেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যপক অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে দেশে-বিদেশে বসেই।

শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাঙলার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তার নিরন্তর সংগ্রাম চলছে। এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেও শেখ হাসিনা যেভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তা দেখে সত্যিই বলতে হয় অপরাজেয় শেখ হাসিনা।