ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৪ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিপণনের ভবিষ্যৎ

অর্থনীতি ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০১৮ শুক্রবার, ০২:০২ পিএম
বিপণনের ভবিষ্যৎ

একটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি স্বর্ণাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে সার্ভিসিং সেন্টারের দিকে চলে গেল। গাড়িটি ঠিক সময়ে ফিরে এসে আগামীকাল সকালে তাকে এয়ারপোর্টেও পৌঁছে দেবে। বাসায় ফেরার সময় ‘ইভ’ স্বর্ণাকে মনে করিয়ে দিলো তার কাপড় ধোঁয়ার ডিটারজেন্ট শেষ হয়ে গেছে। কোন ব্র্যান্ডের ডিটারজেন্ট কিনতে হবে সেটার পরামর্শও সে দিলো। ইভ একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ডিভাইস। এটা তার ব্যবহারকারীর প্রতিমাসের প্রয়োজনীয় সবকিছুর তালিকা সংরক্ষণ করে। 

স্বর্ণা নিশ্চিন্ত মনেই ইভকে বিশ্বাস করে, কারণ সে জানে ইভ তার জন্য সবচেয়ে কম দামে ডিসকাউন্ট সুবিধাসহ ভালো ব্র্যান্ডের পণ্যটিই পছন্দ করবে। স্বর্ণা এও জানে যে ইভ আগামীকালের ফ্লাইটের জন্য বুকিং দিয়ে রেখেছে। ভ্রমনকালীন দিনগুলোর জন্য অনলাইনে সবচেয়ে সুলভ মূল্যে পছন্দনীয় সব খাবারের লোকেশনও সেট করে রেখেছে সে। শুধু তাই নয় সঠিক ইনস্যুরেন্স পলিসি ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতেও স্বর্নাকে সাহায্য করে এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডিভাইসটি। তার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিনত হয়েছে ইভ।

সায়েন্স ফিকশনের কাল্পনিক কোনো যন্ত্র বলে মনে হচ্ছে ইভকে? মজার ব্যাপার হলো,আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ইভের মতো কোনো সফটওয়্যার কিংবা ডিভাইস হয়তো আপনার হাতেও চলে আসবে। তাছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যারের ব্যবহার তো বর্তমানেও রয়েছে। অ্যামাজন, বাইদু, গুগলের মত বড় বড় টেক জায়ান্টরা মার্কেটিংয়ের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। প্রায় ২৫ মিলিয়ন মানুষ অ্যামাজনের ইকো স্মার্ট স্পিকার সিস্টেম ব্যবহার করছে। এ্যালেক্সার মতো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট (এআই) সফটওয়্যার গ্রাহকদের কল্পনাতীত সব সার্ভিস দিচ্ছে।

পণ্য ও সেবাদানকারী কোম্পানীগুলো সবসময়ই স্বল্প মুলধনের বিনিময়ে সর্বোচ্চ ভোক্তাসন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়। তাদের জিজ্ঞাসা একটাই, গ্রাহকের আর কী প্রয়োজন থাকতে পারে?

এআই প্ল্যাটফর্ম মানুষের মনের অজান্তের ইচ্ছা, পছন্দ কিংবা রুচির বিষয়গুলো কোম্পানির সামনে নিয়ে আসতে পারবে। যে কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে এআই প্ল্যাটফর্ম এর তথ্য ব্যবহার  করতে পারবে, তারাই মার্কেটে রাজত্ব করবে। ভবিষ্যতে ব্র‍্যান্ডগুলোর এসব এআই প্ল্যাটফর্ম থেকেই ক্রেতা সংগ্রহ করতে হবে, এবং এর মাধ্যমেই  তাদের চাহিদা মেটাতে হবে। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ তাদের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই জানিয়েছে।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট বর্তমানে ৪০০ মিলিয়ন ডিভাইসে ব্যবহার হচ্ছে। আগামী এক দশকের মধ্যেই হয়তো অ্যাপলের সিরি, স্যামসং এর ভিভ, মাইক্রোসফটের  কর্টানা, টেনসেন্টের জিওয়েই অথবা এদের মত অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের পছন্দ, শখ ও চাহিদা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবে। একটি ত্রুটিপূর্ণ মোবাইল ট্যারিফ প্ল্যান কিংবা খারাপ মানের ইনস্যুরেন্স পলিসির কারণে গ্রাহকের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। সে কারণে গ্রাহকরাও অসংখ্য পণ্য ও সেবার ভেতর থেকে কম খরচে সবচেয়ে ভালো পণ্য বেছে নেবার জন্য কোনো সফটওয়্যারের সাহায্য পেতে চাইবে। 

টেকনোলজি মার্কেটিংয়ের জগতকে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। মিডিয়া ব্যাপকভাবে মানুষের চাহিদাকে প্রলোভিত করছে। ১৯৫০ এর দশকে সুপারস্টোর প্রথা চালু হবার পর মার্কেটিংয়ের জন্য ব্যানার, বিলবোর্ড ও বিজ্ঞাপনের চল শুরু হয়েছিল। ঠিক তেমনি ভবিষ্যতে মার্কেটিংয়ের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হবে বলে মনে করছে গুগল, অ্যামাজন, ইউনিলিভারের মত জায়ান্ট কোম্পানিগুলো।

প্রযুক্তিবিদরা বলছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যারগুলো গ্রাহকের বাসার ইন্টারফেস সিস্টেম, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস, কমিউনিকেশন সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। বড় বড় মার্কেট, শপিং মল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা হাসপাতালও এসব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হবে। যত বেশি গ্রাহক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ততবেশি সঠিক অনুমান করতে সক্ষম হবে এবং সয়ংক্রিয়ভাবে এই ক্ষমতা বাড়তে থাকবে। এমনটাই মনে করছেন তথ্য প্রযুক্তিবিদ এবং বিপণন বিশারদগণ।

বর্তমানে ব্র‍্যান্ডগুলো তাদের গুণগত মান বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তুলে ধরে ভোক্তার বিশ্বাস অর্জন করতে চেষ্টা করে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞাপনের ওপর আস্থা না রেখে ভোক্তারা এ আই প্লাটফর্মকেই হয়তো বেছে নেবে। কারণ এই সফটওয়্যারগুলো গ্রাহকের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে গাণিতিকভাবে সবচেয়ে সুলভ এবং মানসম্পন্ন পণ্যটিই নির্বাচন করে। আর কোম্পানীগুলোও গ্রাহকের তথ্য জানার জন্য এসব প্ল্যাটফর্মকেই গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।  কারন এটিই গ্রাহকের কাছে পৌছানোর সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। কোম্পানির বিক্রি ও লভ্যাংশ নির্ভর করে ভোক্তাসন্তুষ্টির ওপর। আর ভোক্তাদের পছন্দ, রুচি ও চাহিদার তথ্য এআই প্ল্যাটফর্ম ছাড়া আর কোথায় এত নিখুঁতভাবে পাওয়া যাবে?

ব্র‍্যান্ড যা করে তা হলো, একটা ভালো ইমেজ তৈরি করে ফেলে যার কারণে মানুষ খুব বেশি বাছবিচার না করে ওই পণ্যটিই বারবার ব্যবহার করতে থাকে। এমনকি ওই পণ্যের পরিবর্তে অন্য কোন পণ্য ব্যবহার করার ইচ্ছা জাগলেও কয়েকশ পণ্যের মাঝে মান, উপকরন, দাম এসব যাচাই করার জন্য সময় নষ্ট করতে চায় না। এক্ষেত্রে এআই অ্যাসিস্ট্যান্টই পারে গ্রাহকের সুনির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী হাজার হাজার পণ্যের মাঝে সঠিক পণ্যটি খুজে বের করে দিতে।

যদি এমন হয় যে, ভোক্তার কাছেই সকল পণ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য আছে, তবে সে ব্র‍্যান্ডের পেছনে না দৌড়ে ভালো পণ্যের দিকেই যাবে। তার মানে এই নয় যে ব্র‍্যান্ড হারিয়ে যাবে। ব্র‍্যান্ডগুলো গ্রাহকের পরিবর্তনশীল পছন্দ, কৌতুহল, ইচ্ছা ও চাহিদার তথ্য এআই প্ল্যাটফর্ম থেকেই জেনে নিতে পারবে, যার মাধ্যমে সঠিক সময়ে সঠিক পণ্য বাজারে ছেড়ে প্রতিযোগীতায় এগিয়ে থাকতে পারবে।

গবেষকরা বলছেন, ব্র‍্যান্ড এবং ভোক্তার মধ্যে সেতু বন্ধন করবে এআই প্ল্যাটফর্ম। এতে গ্রাহকও সর্বোচ্চ সুবিধাটি পাবে, সাথে সাথে কোম্পানীগুলোও একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে পারবে।

এআই প্ল্যাটফর্মের সার্বজনীনতা নিয়েও গবেষনা করেছেন কয়েকজন বিপণনবিদ। তাদের মতে এআই প্ল্যাটফর্ম তখনই সার্বজনীন হবে যখন ব্যবহারকারীরা একে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা শুরু করবে। তবে এর বিনিময়ে ব্যবহারকারীদের দিতে হবে নির্ভুল তথ্য। এসব প্ল্যাটফর্মকে পেইড ও আনপেইড দুধরনের বিজ্ঞাপনকেই সমান সুযোগ দিতে হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

এতে করে ব্র‍্যান্ড ও ননব্রান্ড সবাই তাদের পণ্য ক্রেতার সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাবে এবং এআই অ্যাসিস্ট্যান্টও তার স্বচ্ছতার প্রমান দিতে পারবে। একইসঙ্গে গ্রাহকও সর্বোচ্চমানের পণ্যটি ব্যবহার করতে পারবে।

সূত্রঃ হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি