ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

চামড়ার দাম কমে নেমেছে আবর্জনার দামে

নাজমুল হাসান সাগর
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৯:০৪ পিএম
চামড়ার দাম কমে নেমেছে আবর্জনার দামে

বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৪ কোটি বর্গফুট চামড়ার যোগান আসে কোরবানির ঈদে জবাই করা পশুর চামড়া থেকে। যা গড় হিসাবের প্রায় ৬০ শতাংশ। এসব চামড়ার ২০ শতাংশ ব্যবহার হয় জুতাসহ চামড়াজাত পণ্য তৈরীতে। চাহিদা বেশি থাকা সত্ত্বেও গত সাত বছরে ধাপে ধাপে কমেছে চামড়ার দাম। ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিলো ৮৫ থেকে ৯০ টাকা আর ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিলো ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। সেই চামড়ার দাম চলতি বছর ২০১৯ সালে এসে রাজধানী শহর ঢাকার জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ২০ টাকা। তবে সরকার নির্ধারিত এসব মূল্য উপেক্ষা করে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে চামড়া আরও কমমূল্যে কেনারও সত্যতা পাওয়া গেছে।

এক হিসেবে দেখা গেছে রাস্তা থেকে টোকানো প্লাস্টিকের বোতল পথ শিশুরা বিভিন্ন ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে প্রতি কেজি ১০ থেকে ১২ টাকা। এসব বোতল আবার কখনো ১৫ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হয়। সেক্ষেত্রে তিন কেজি প্লাস্টিকের বোতল বিক্রি করে কেনা যাবে এক বর্গফুট গরুর চামড়া আর ছাগলের চামড়া কেনা যাবে দুই বর্গফুট।

গত ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছর ২০১৯ সাল, এই সাত বছরে ধাপে ধাপে কমেছে চামড়ার দাম। ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিলো ৮৫ থেকে ৯০ টাকা আর ছাগলের চামড়ার দাম ছিলো ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ২০১৪ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিলো ৭০ থেকে ৭৫ টাকা আর ছাগলের চামড়ার দাম ছিলো ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। ২০১৫ সালে এসে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা আর ছাগলের চামড়ার দাম ছিলো ২০ থেকে ২৫ টাকা। ২০১৬ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিলো ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ছাগলের চামড়ার দাম ছিলো ১৮ থেকে ২০ টাকা। এরপর ২০১৭-১৮ সালে গরুর চামড়ার দাম ছিলো প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে শুধু ২০১৮ তে এসে ছাগলের চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা বেড়ে হয়েছিলো ২২ টাকা। তবে, ২০১৯ সালে এসে চামড়ার দরপতনে রেকর্ড গড়েছে। এবার প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা আর ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ২০ টাকা। অভিযোগ আছে সরকার নির্ধারিত এইসব চামড়ার দাম উপেক্ষা করে প্রান্তিক পর্যায়ে আরো কমদামে পশুর কাঁচা চামড়া কিনেছে ফড়িয়ারা।

কেন এই দরপতন?

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রান্তিক পর্যায়ে লাভের আশায় যারা মৌসুমি চামড়া ব্যবসা করেন তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে বিক্রেতারা চামড়ার সঠিকমূল্য পাচ্ছেন না। আবার যারা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী তাদের সাথে আড়ৎদারদের সমন্বয় না থাকার কারণে এই প্রান্তিক ব্যবসায়ীরাও লাভে চামড়া বিক্রি করতে না পাড়ায় সব থেকে কম দাম পাচ্ছেন বিক্রেতারা। আরো বিশদভাবে বলতে গেলে, যেদিন মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া কেনেন প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা সেদিনই বিক্রি করতে না পারলে হতাশ হয়ে পড়েন এবং পুঁজি হারানোর শঙ্কায় পড়ে যান। অথচ এই চামড়া যদি তারা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে সর্বচ্চ ১৫ দিন রাখতে পারেন তাহলেই লোকসানের মুখে পড়তে হবে না তাদের। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলেই বাজারের পুঁজি নেই এমন অজুহাতে মধ্যসত্ত্বভোগীরা তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কম দামে চামড়া কিনতে পারবেন না।

আবার কিছু সুত্র বলছে, কেন চামড়ার দাম এত কম সেটা অনেক জটিল সমীকরণ। মৌসুমি ব্যবসা হওয়ার কারণে এই চামড়ার ব্যবসাটা নিয়ন্ত্রণ হয় গুটিকয়েক মানুষের ইচ্ছের উপর। সরকারিভাবে জোরালো কোন তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় চামড়া ব্যবসায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিণ্ডিকেট আর এই সিন্ডিকেটের ইচ্ছার উপরেই নির্ভর করে চামড়ার দাম বাড়বে না কমবে।

এদিকে চামড়ার দাম এত কম হওয়ার কারণ হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কম বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ট্যানারী ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন।  

বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও লোক মুখে আলোচনা হচ্ছে চামড়াজাত পণ্যের দাম এত বেশি হলেও চামড়ার দাম এত কম কেন? এ বিষয়ে গত বছর একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এক সাক্ষাতকারে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার ও লেদার সামগ্রী প্রস্তুতকারক সমিতির তৎকালীন সভাপতি "কাঁচামালের সঙ্গে তৈরি হওয়া পণ্যের দাম মেলানো যাবে না। বিশেষ করে চামড়ার মতো কাঁচামাল অনেক হাত ঘুরে আমাদের কাছে আসে। এখন যে চামড়াটা আপনি তিনশো টাকায় বিক্রি হয়েছে বলছেন, সেটা কিন্তু আমাদের কাছে তখন সেটা দর অনেক বেড়ে যায়। আমরা সরকারি রেট অনুযায়ীই কিনছি।"

এর সঙ্গে সেটাকে প্রসেস করার, কারখানার, শ্রমিক খরচ যোগ হবে বলে তিনি বলছেন।

``এরপর সেই প্রসেসড চামড়াটা আরেকজন কিনে নিয়ে দেশী বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডারমতো সেটা দিয়ে জুতা, স্যান্ডেল বা ব্যাগ তৈরি করবে। তার কাছ থেকে সেসব ব্রান্ড এসব পণ্য কিনে নিয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করে। কারণ আন্তর্জাতিকভাবেই মনে করা হয়, কয়েকগুণ বেশি দাম না ধরা হলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন না।`` তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ``একজোড়া জুতা বিদেশে রপ্তানি করা হয় হয়তো ১৪ বা ১৬ ডলারে, কিন্তু সেটাই হয়তো বায়ার তার দোকানে বিক্রি করছে ৮০ বা একশো ডলারে।``

সেখানেও তাদের অনেক খরচ রয়েছে বলে তিনি বলছেন। বিজ্ঞাপন, দোকানের খরচ, কর্মী ব্যয় এবং অনেক সময় জুতা বা পণ্য অবিক্রীত থেকে যায়, এসব খরচও সেখানে যোগ হয়।

তৈরি পোশাকসহ এ ধরনের সব ব্যবসাতেই এ ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হয় বলে তিনি বলছেন।

বাংলা ইনসাইডার