ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

এক টাকাও ঋণ আদায় করতে পারেনি ১০ ব্যাংক

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ মঙ্গলবার, ০২:০০ পিএম
এক টাকাও ঋণ আদায় করতে পারেনি ১০ ব্যাংক

অতিমারী করোনায় অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং খাতের ঋণ আদায়। তবে ঋণ আদায় না হলেও ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে ব্যাংকগুলোতে। এদের মধ্যে পাঁচ ব্যাংক নিয়মিত ঋণ থেকে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি। একই সঙ্গে খেলাপী ঋণের এক টাকাও আদায় করতে পারেনি  আরো পাঁচ ব্যাংক। এ ছাড়া ২১টি ব্যাংক  নিয়মিত এবং খেলাপি ঋণ থেকে এক শতাংশেরও কম আদায় করেছে। এই চিত্র এ বছরের মার্চ মাস থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের। ঋণ আদায় সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটা খুব অস্বাভাবিক ঘটনা। এবং একই সঙ্গে উদ্বেগেরও। এভাবে ঋণ আদায় বন্ধ হয়ে গেলে তা ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসংকেত হবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। 

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, তিন মাসে এক টাকাও আদায় হয়নি। এটা অস্বাভাবিক ঘটনা। যত সমস্যা থাকুক পুরোপুরি ঋণ আদায় কখনো বন্ধ থাকার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বসা উচিত। কেন এমন হলো জানা দরকার। সমস্যা শনাক্ত করে তা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, ব্যাংকিং খাতে জুন পর্যন্ত ঋণস্থিতি ১০ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এ সময় ৯৫ হাজার ২৪৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণস্থিতি। এর মধ্যে তিন মাসে ব্যাংকগুলো আদায় করতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ১৭৯৫ কোটি টাকা। যা পুরো খেলাপি ঋণের ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। 

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত খেলাপি গ্রাহকদের থেকে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি এমন ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদেশি সিটিব্যাংক এনএ, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংক, উরি ব্যাংক এবং দেশি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এ ছাড়া নিয়মিত ঋণ থেকে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক। তবে কমিউনিটি ব্যাংক নামমাত্র টাকা আদায় করেছে বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৬৫৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুনে ব্যাংকটির আদায় হয়েছে মাত্র দুই কোটি ৫৯ লাখ টাকা। যা খেলাপি ঋণের ০.৪ শতাংশ। আরও খারাপ অবস্থা বেসিক ব্যাংকের। ব্যাংকটির বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৮১ কোটি টাকা। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত খেলাপি থেকে ব্যাংকিটি আদায় মাত্র ০.২ শতাংশ। যা টাকার পরিমাণে ১২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া উল্লিখিত সময়ে খেলাপি গ্রাহক থেকে ১ শতাংশের বেশি আদায় করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোও। 

খেলাপি গ্রাহক থেকে এক শতাংশের নিচে আদায় করছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি আদায় করেছে মাত্র ০.৫ শতাংশ, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ০.১ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংক ০.৪ শতাংশ, মিডল্যান্ড ব্যাংক ০.৯ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংক ০.৩ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ০.৭ শতাংশ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক (গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) ০.৮ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংক ০.৪ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংক ০.৩ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ০.৬ শতাংশ, সাউথইস্ট ব্যাংক ০.৮ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ০.৪ শতাংশ। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও খেলাপি ঋণ থেকে আদায়ের অবস্থাও একই রকম। আলোচ্য সময়ে খেলাপিদের থেকে মাত্র ৩ লাখ টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংক আল-ফালাহ। ব্যাংকটির ঋণ আদায়ের হার ০.১ শতাংশ। পাশাপাশি হাবিব ব্যাংকের আদায়ের হার ০.৩ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি নিয়মিত ঋণ আদায়ের গতি শ্লথ হওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করার সংস্কৃতি চালু হওয়ায় যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। নিয়মিত ঋণ আদায় কমে যাওয়ার এটাই বড় প্রমাণ। নিয়মিত ঋণ আদায় কমে গেলে এসব ঋণ আবার খেলাপি হয়ে যাবে। 

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর হাতে মনিটরিং করতে হবে। ঋণ আদায়ের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথ পরিপালনে বাধ্য করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। অন্যথায় খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে যাবে। এরই মধ্যে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়বে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। আর মাঝারিরা উঠতে না পারলে বড় উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে না। সব মিলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় এড়ানো যাবে না। পরিস্থিতি উন্নতি করতে, ব্যাংকারদের ঋণ আদায়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। বিশেষ করে ভালো গ্রাহকদের পুরস্কার বা বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। এটি দেখে মন্দ গ্রাহকও ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসবেন।

উল্লেখ্য, ব্যাংক খাতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৭৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৯ হাজার ১৬৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা (অভ্যন্তরীণ+অফশোর ইউনিট)। যা মোট ঋণ বিতরণের ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত মার্চে খেলাপি ছিল ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসে ৩ হাজার ৭৯ কোটি এবং ছয় মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা।