ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সোনালী পাটে হাসি ফিরছে কৃষকের

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ বুধবার, ০২:০১ পিএম
সোনালী পাটে হাসি ফিরছে কৃষকের

সোনালী আঁশ খ্যাত পাটে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে কৃষকের। বর্তমানে দেশে পাটের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে। বাজারে ভালো দাম আর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এর চাষাবাদ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদনও ভালো হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে পাটের আশানুরূপ দাম পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা। 

সরকারি পাটকল বন্ধ হয়ে গেলেও পাটের দামে কোন প্রভাব পড়েনি। সরকারি ২৫টি পাটকল বন্ধ থাকলেও পাটের দামে এবার মুখের হাসি আরো চওড়া হয়েছে কৃষকের। করোনা মহামারীর মধ্যে আগের যে কোন সময়ের তুলনায় পাটের বেশ ভাল দাম পাচ্ছেন কৃষক। চড়া দামেই বছরের কেনাবেচাও শুরু হয়েছে  বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৩৫০০ টাকায়। কোথাও কোথাও চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা দামেও প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এত দামে পাট বিক্রি হয়নি। ফলে এবার পাটের উৎপাদন ও দামে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পাটের বাজার ভালো থাকলে আগামীতে আবাদ আরো বাড়বে।

গ্রামীণ জনপদের কৃষকেরা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পাট ঘরে তোলার কাজে নেমেছেন। বসে নেই কৃষাণীরাও। তারাও এ কাজে কোমর বেঁধে নেমেছেন। হাটবাজারেও জমে উঠেছে পাট বেচাকেনা। ফলে লকডাউনে কার্যত অচল কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। গত কয়েক বছর ধরেই পাটের দাম ভাল যাচ্ছে। এর মধ্যে গত বছর ২০২০ সালে অস্বাভাবিক বেড়ে যায় পাটের দাম। পাটকাটা মৌসুমের শুরুতেই প্রতিমণ পাট বিক্রি হয় ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা দরে। পরে এটি ৩ হাজার ৫০০ তে ওঠে এবং মৌসুমের শেষ পর্যায়ে হাটে প্রতিমণ পাটের দাম ৫ হাজার টাকা পৌঁছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর প্রতিমণ পাটের গড় মূল্য হয়েছিল ৩৫শ’ টাকা।

পাট চাষীরা জানান, পাট চাষ করে তিন মাসের মধ্যে পাট ঘরে তোলা যায়। কম সময়ে এবং কম পরিশ্রমের ফসল পাট। প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে খরচ হয় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদন হয় ১০-১২ মণ। তবে কোন কোন অঞ্চলে প্রতি বিঘায় ১৫ মণ পর্যন্ত এ বছর পাট উৎপাদন হয়েছে। এবার বাজারে পাটের মান ভেদে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দু’একটি জেলায় প্রতিমণ পাট সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এত দামে বিক্রির কারণে পাট চাষের খরচ বাদ দিলে অভাবনীয় মুনাফা পাচ্ছেন পাট চাষীরা।

ফরিদপুরের প্রায় প্রতিটি হাটেই কম বেশি বিক্রি হয় পাট। তবে কানাইপুর, সালথা বাজার, ময়েনদিয়া ও কৃষ্ণপুর হাটে পাটের সবচেয়ে বড় আড়ৎ। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকার আসেন এখান থেকে পাট কিনতে। স্থানীয় বাজারে বর্তমানে প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩০০০ থেকে ৩২০০০ টাকা দরে। পাটের এ দামে খুশি চাষিরা।

যশোর জেলার কৃষি বিভাগ জানায়, যশোরে এবার লক্ষ্যমাত্রারও বেশি আবাদ হয়েছে পাট। চলতি মৌসুমে আট উপজেলায় পাট আবাদের ২৫ হাজার ৩০০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এবার মোট ২৬ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে পাটের চাষাবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে পাটের আবাদ হয়েছিল ২৩ হাজার ৫৬৫ হেক্টর। ফলে তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, লাভজনক হয়ে ওঠায় যশোরে পাটের চাষাবাদ ও উৎপাদন ধারাবাহিক বাড়ছে।

নওগাঁয় এ বছর পাটের আবাদ কিছুটা কম হলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় ভালো ফলন হয়েছে পাটের। বর্তমানে প্রকারভেদে প্রতি মণ পাট নওগাঁর বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯৫০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়। বাজারে পাটের ভালো দাম পাওয়ায় লাভবান হচ্ছেন চাষীরা। কৃষকরা পাটের ভালো দাম পাওয়ায় আগামীতে পাটের আবাদ আরো বাড়বে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

দিনাজপুর জেলা সদর ছাড়াও চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জ, খানসামা, কাহারোল, ফুলবাড়ী ও বিরামপুর উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে পাটের আবাদ হয়। দিনাজপুরের সবচেয়ে বড় পাটের বাজার পাকেরহাট। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার পাকেরহাট বাজারে গিয়ে পাটের দাম ও চাহিদার ঊর্ধ্বমুখী চিত্র পাওয়া যায়। পাইকাররা ভ্যান থেকে পাট কিনে স্তূপ করে রাখছেন রাস্তার পাশে। পরে ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে পাট চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীর গুদামঘরে।

জানা যায়, দেশে উৎপাদিত পাটের আঁশের প্রায় ৫১ শতাংশ পাটকলগুলোয় ব্যবহৃত হয়। ৪৪ শতাংশের মতো কাঁচা পাট বিদেশে রফতানি হয়। এবং মাত্র ৫ শতাংশের মতো ঘর-গৃহস্থালি আর কুটির শিল্পের কাজে লাগে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে পাট হতো ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। মাঝে তা ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ হেক্টরে নেমে যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক আঁশের চাহিদা বাড়ায় ২০১০-১৫ সাল নাগাদ চাষের এলাকা বেড়ে ৭ লাখ হেক্টরে পৌঁছায়। এরপর থেকে তা আরও বাড়ছে। আগে ১২ লাখ হেক্টর এলাকা থেকে যে পরিমাণ পাট পাওয়া যেত, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এখন ৭-৮ লাখ হেক্টর জমি থেকেই তার চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে।  

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাত লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়। সেখান থেকে ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার টন পাট উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ছয় লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল, সেখান থেকে ৮০ লাখ টন পাট পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছয় লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। সেখান থেকে ৮০ লাখ টন পাট উৎপাদিত হয়।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. মোঃ আইয়ুব খান জানান, দেশে পাটকল বন্ধ হলেও বিশ্বব্যাপী এ প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে রফতানি বাড়ছে। পাশাপাশি দেশেও পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। এবার পাটের সর্বোচ্চ দাম উঠেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এত দাম দীর্ঘসময়ে ছিল না। গত দুই বছর থেকে পাটের দাম খুব ভাল যাচ্ছে। এতে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। ফলে পাট আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে উৎপাদনও। সারাদেশে এ বছর পাটের উৎপাদন ৮০ লাখ বেল ছাড়িয়ে যাবে। পাটের উৎপাদনশীলতা বেশ বেড়েছে। যদিও গত বছর ঘূর্ণিঝড় আমফানে পাটের বেশ ক্ষতি হয়। এ বছর প্রথমে খরার কারণে সমস্যা হলেও পরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় পাটের উৎপাদন বেড়েছে। এছাড়া প্রতি বছরই নতুন নতুন চাষী যুক্ত হচ্ছেন পাটের সঙ্গে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এবার পাটের ভাল ফলন হয়েছে। কৃষকরা বর্তমান পাটের বাজার দর অনুযায়ী উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভাল লাভ পাচ্ছেন। পাটের দাম এ রকম থাকলে আগামী বছর কৃষকরা আরও ব্যাপকভাবে পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন বলেও মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।