ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

রিং আইডি কি গ্রাহকের অর্থ হাতাচ্ছে? 

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ বৃহস্পতিবার, ০২:০১ পিএম
রিং আইডি কি গ্রাহকের অর্থ হাতাচ্ছে? 

দেশে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসার ধরন যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি আর্থিক লেনদেনও বেড়েছে গতি। ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা কেনাবেচার অন্যতম মাধ্যম হলো ই-কমার্স। দিনদিন এটি বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে ই-কমার্সকে জনপ্রিয়তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আড়ালে এর অপব্যবহারেরও সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু চক্র। নানা রকম অফার দিয়ে চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকের মোটা অঙ্কের টাকা। এ রকম একটি প্ল্যাটফর্ম হলো ‘রিং আইডি’ নামে একটি  ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। 

জানা যায়, রিং আইডি নামের প্ল্যাটফর্মটি নিজেদের পরিচয় দেয় ‘কমিউনিটি বিজনেস’ বলে। প্ল্যাটফর্মটিতে নতুন সদস্য আনতে পারলে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়। এসব কর্মকাণ্ড ছাড়াও প্ল্যাটফর্মটি টাকা উপার্জনের অফারও দিয়ে থাকে। প্ল্যাটফর্মটির সিলভার ও গোল্ড সদস্য হয়ে বিজ্ঞাপন দেখে টাকা উপার্জনের সুযোগ রয়েছে ১২ হাজার ও ২২ হাজার টাকা দিয়ে। এ ছাড়া `রেফারি` হয়ে কাজ করে নতুন গ্রাহক আনলেও কমিশন পাওয়া যায়। এভাবেই প্রায় ছয় লাখ মানুষ একটা মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কোম্পানির পিরামিড আকারের অর্থ উপার্জন স্কিমে ঢুকে পড়েছেন। একাধিক সূত্রে জানা যায়, এদের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থী। 

প্ল্যাটফর্মটি একজন সদস্য বিজ্ঞাপন দেখে কিভাবে অর্থ উপার্জন করেন, সেই ব্যাখ্যা দেয়নি। এ দিকে লোভনীয় অফারটি দেখে সামলাতে পারছেন না বহু বেকার শিক্ষার্থী। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশংকা করছেন, এমএলএম স্কিমের মতো রিংআইডিও যদি উঠে যায়, তাহলে এই ক্ষতি পোষানোর রাস্তা খুঁজে পাবেন না কেউ।

কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি দম্পতি শরিফ ইসলাম ও আইরিন ইসলামের ‍উদ্যোগে প্ল্যাটফর্মটি বাজারে আসে। রিংআইডির প্রধান নির্বাহী শরিফুল এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আইরিন কর্মরত। দম্পতিটি বলছেন, `বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা` তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু অবৈধ আন্তর্জাতিক কল ব্যবসা ও সরকারের বকেয়া পরিশোধ না করায় ইতোমধ্যে এই দম্পতি একাধিক মামলায় জেল খেটেছেন।  

ইতিমধ্যে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন বিনিয়োগকারীরা । সম্ভাব্য অর্থপাচারের বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করছেন। 

কয়েকজন গ্রাহক জানান, ‘গোল্ড মেম্বারশিপ’ কেনার জন্য এক মাস আগে ২২ হাজার টাকা করে পেমেন্ট করেন তারা। অ্যাকাউন্ট থেকে টাকাও কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু তাদের আইডি এখনও অ্যাকটিভ হয়নি । এ বিষয়ে তাদের সাথে জায়গায় যোগাযোগ করেও কোন কাজ হয়নি। এভাবে মেম্বারশিপের নামে শত শত গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে রিং আইডি।

শুধু জবস মেম্বারশিপ দেওয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। মেম্বারশিপ দিয়েও নানা ভোগান্তিতে ফেলা হচ্ছে। এমন একটি সিস্টেম হলো ‘ক্যাশ আউট’। নিজের জমানো টাকা উঠাতে পারছেন না গ্রাহকরা। বিভিন্নভাবে এজেন্টের কাছে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি প্যাকেজ অফার রয়েছে। সিলভার মেম্বারশিপ ও গোল্ড মেম্বারশিপ। সিলভার মেম্বারশিপের মূল্য ১২ হাজার টাকা এবং গোল্ড মেম্বারশিপের মূল্য ২২ হাজার টাকা। পাশাপাশি আরও দুটি প্রবাসী প্যাকেজ রয়েছে। ‘প্রবাসী গোল্ড’ ২৫ হাজার টাকা এবং ‘প্রবাসী প্লাটিনাম’ ৫০ হাজার টাকা।

মেম্বারশিপ পাওয়ার পরই গ্রাহকদের আইডিতে দেয়া হয় বিভিন্ন বিজ্ঞাপন। গ্রাহক যত ওই বিজ্ঞাপন দেখেন ততই ইনকাম। এভাবে রিং আইডি কমিউনিটি জবস মেম্বারশিপের সিলভার প্যাকেজ থেকে প্রতিদিন ২৫০ টাকা এবং প্রতি মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা, গোল্ড মেম্বারশিপ থেকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা এবং প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া প্রবাসী গোল্ড মেম্বারশিপ থেকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা এবং প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা, প্রবাসী প্লাটিনাম প্যাকেজ থেকে প্রতিদিন এক হাজার টাকা এবং প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা আয়ের সুযোগ আছে বলে অফার দেয় রিং আইডি। এমন লোভনীয় অফার দেখে সেখানে বিনিয়োগ করলেও অনেক গ্রাহক  তাদের কষ্টার্জিত পুঁজি হারাচ্ছেন বলে সতর্ক করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্ল্যাটফর্মটিতে এখন এজেন্ট রয়েছে ৬০০-র বেশি। এজেন্ট রয়েছে তিন ক্যাটাগরির: সিলভার, গোল্ড ও ডায়মন্ড। প্রতিষ্ঠানটি অর্থের বিনিময়ে এসব এজেন্ট নেয়। রিংআইডি সিলভার, গোল্ড ও ডায়মন্ড ক্যাটাগরির এজেন্ট হওয়ার জন্য যথাক্রমে ১ লাখ, ২ লাখ ও ৫ লাখ টাকা নেয়। এছাড়াও রিংআইডি অ্যাপে কোম্পানিটির ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন ব্যবসাও রয়েছে। প্রতি কয়েনের মূল্য ৮৬ টাকা। এসব কয়েনকে টাকায় রূপান্তরিত করতে পারেন এবং মোবাইল আর্থিক পরিষেবার মাধ্যমে এসব টাকা ওঠাতে পারেন সদস্যরা।

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে বলেন, কখনও কখনও এই ধরনের কোম্পানির বিনিয়োগকারীরা প্রতারণার শিকার হন। আমার মনে হয় ই-কমার্স খাতে সম্প্রতি কিছুদিন ধরে যে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তা এড়ানোর জন্য সতর্কতা হিসেবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার উচিত এই কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম খতিয়ে দেখা।

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সন্দেহ, রিংআইডি বিদেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে বলে প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটিকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণে রেখেছে। তবে রিংআইডি বলেছে যে অর্থপাচারের কোনো সুযোগ নেই, কারণ এটি রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত স্থানীয় কোম্পানি।