ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

৬৭ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি গ্রামীন ব্যাংকের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার, ০২:০০ পিএম
৬৭ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি গ্রামীন ব্যাংকের

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৬৭ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন করেছে। এজন্য ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এছাড়া ভ্যাটযোগ্য হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট নিবন্ধন না করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আরো একটি মামলা করেছে রাজস্ব বিভাগের ভ্যাট গোয়েন্দারা।

প্রতিষ্ঠানটির ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর তদন্ত পরিচালনা করে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতরের উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার কায়সারের নেতৃত্বে একটি দল।এ তদন্তের মাধ্যমেই গ্রামীন ব্যাংকের এ অনিয়ম ধরা পড়ে। তাদের তদন্তে দেখা যায়, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এস ০৫৬ কোডের আওতায় ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং সেবা দিয়ে আসছে। কিন্তু ভ্যাট আইন অনুযায়ী নিবন্ধন নেয়নি।

মূল্য সংযোজন কর আইন-১৯৯১ অনুযায়ী, করযোগ্য পণ্যের সরবরাহকারী বা করযোগ্য সেবা প্রদানকারীকে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিবন্ধন গ্রহণ করা বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু গ্রামীন ব্যাংক তা ভঙ্গ করেছেন। 

এনবিআরের এসআরও অনুযায়ী, টার্নওভার নির্বিশেষে নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে ব্যাংক ও নন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এছাড়া ১৯৯১ সালের ভ্যাট বিধিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন খরচের বিপরীতে উৎস করও দেয়ার কথা গ্রামীণ ব্যাংকের।

এনবিআরের এসআরও নম্বর ১৬৮/২০১৩ অনুযায়ী, রাষ্ট্রয়ত্ব, দেশীয় বা বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন দ্বারা সংজ্ঞায়িত যে কোনো ধরণের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা, যারা কমিশন, ফি বা চার্জের বিনিময়ে যে কোনো মাধ্যমে ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং সেবা দেয়, তাদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। 

আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন-১৯৯৩ অনুযায়ী, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি বা গৃহায়নের জন্য ঋণ প্রদানকারীকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক মূলতঃক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কিস্তি সুবিধায় ঋণ দিয়ে থাকে।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গ্রামীণ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম, উক্ত আইনের অন্তর্ভুক্ত। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রদত্ত এসব ঋণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন খরচের বিপরীতে চার্জ, ফি ও কমিশনের বিনিময় বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে যার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য এবং করযোগ্য সেবা দেয়ায় তাদের নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এছাড়া ভ্যাট বিধিমালা ১৯৯১ এর বিধি ১৮(ক) অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি উৎসে কর কর্তনকারী স্বত্বা এবং সে অনুযায়ী বিভিন্ন খরচের বিপরীতে উৎসে ভ্যাট কর্তনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ভ্যাট গোয়েন্দাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে হওয়া আয়ের বিপরীতে ৩৪ হাজার ৯১০ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেছে গ্রামীণ ব্যাংক । কিন্তু হিসাব মতে ওই সময়ে ৩০ কোটি ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ৬০০ টাকা তাদের ভ্যাট দেয়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অপরিশোধিত ভ্যাট বাবদ ৩০ কোটি ৩৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬৯০ টাকা উদঘাটন করা হয়। ভ্যাটযোগ্য প্রদত্ত সেবা থেকে প্রাপ্ত আয়ের বিপরীতে এই অপরিশোধিত ভ্যাটের ওপর ভ্যাট আইন অনুসারে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ শতাংশ হারে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ৯৫ হাজার ৭০৬ টাকা সুদ প্রযোজ্য হবে।

এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটি তদন্ত মেয়াদে বিভিন্ন খরচের বিপরীতে উৎসে ভ্যাট বাবদ ৮ কোটি ৫৪ লাখ ২০ হাজার ৮১৯ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেছে। কিন্তু তদন্ত মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির উৎসে কর্তন বাবদ প্রদেয় ভ্যাটের পরিমাণ ছিল ২৩ কোটি ৯৩ লাখ ১০ হাজার ৭৪ টাকা। এতে অপরিশোধিত ভ্যাট বাবদ ১৫ কোটি ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৬ টাকা উদঘাটন করা হয়। এই অপরিশোধিত ভ্যাটের ওপর ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাসিক ২ শতাংশ হারে ৭ কোটি ২৩ লাখ ২৬ হাজার ৯৭৭ টাকা সুদ প্রযোজ্য হবে।

বর্ণিত মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির সর্বমোট অপরিশোধিত ভ্যাটের পরিমাণ ৪৫ কোটি ৭৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯৪৬ টাকা এবং সুদ বাবদ ২১ কোটি ২৩ লাখ ২২ হাজার ৬৮৩ টাকাসহ সর্বমোট ৬৬ কোটি ৯৮ লাখ ৬০ হাজার ৬২৯ টাকা ভ্যাট পরিহারের তথ্য উদঘাটিত হয়। সরকারি কোষাগারে এই টাকা রাজস্ব হিসেবে আদায়যোগ্য।

ভ্যাট গোয়েন্দা সূত্রে আরো জানা যায়, উদঘাটিত পরিহারকৃত রাজস্ব আদায়ের আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে তদন্ত প্রতিবেদন ও অনিয়ম মামলা সংশ্লিষ্ট ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেট পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যাতে প্রতি মাসের সব আয় ও ক্রয়ের তথ্য অনুযায়ী প্রযোজ্য ভ্যাট পরিশোধ করে তা মনিটরিং করার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারকে। অন্যদিকে, গ্রামীণ ব্যাংককে অতিসত্ত্বর ভ্যাট নিবন্ধন দেয়ার জন্য এবং তাদের মাসিক রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়।