ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কৃষি কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ রবিবার, ০২:০২ পিএম
কৃষি কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি

দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার অধিকাংশই কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ৩-৪ গুণ বেড়েছে ধান উৎপাদন। পাশাপাশি অন্যান্য শস্য, ফল, সবজি, মাছ ও মাংস উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত দুই দশকে চালের দাম জ্যামিতিক হারে বাড়লেও উৎপাদকের কাছে পৌঁছেনি এর সুফল। এতে করে ভোক্তামূল্যে কৃষকের অংশ ৬৫ থেকে নেমে এসেছে ৪১ শতাংশে। ফলে চালের বাড়তি দামের সুফল ধান ব্যবসায়ী, চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের মতো মধ্যস্বত্বভোগীদের পেটে চলে যাচ্ছে। এতে অবস্থান নাজুক হয়েছে কৃষকের আর চালকল মালিকদের অবস্থান  হয়েছে দোর্দণ্ড। এমতাবস্থায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণে কৃষিমূল্য কমিশন গঠন করা উচিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ফুড প্রাইস ইনডেক্স (এফপিআই) শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা মহামারীতে সৃষ্ট সংকটের কারণে চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদন ও সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় গত সাত বছরের মধ্যে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এফএও প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১২০ দশমিক ৭ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দেশীয় বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশের অভ্যন্তরে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য অর্থনীতির যৌক্তিক কারণ রয়েছে। সেই কারণগুলো হলো, খাদ্যের উৎপাদন হ্রাস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করা।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অতীতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল পেঁয়াজ ও তরমুজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। তাছাড়া চালের মূল্য হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া রয়েছে মৌসুমে সবজির মূল্য, যেমন টমেটোর মূল্য ফেব্রুয়ারি ও মার্চে উত্তরবঙ্গে ৩ টাকা কেজিতে উৎপাদনকারীরা বিক্রি করতে পারেন না; অথচ ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে ২০ টাকা কেজিতে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হঠাৎ করে উৎপাদন বাড়ানো যায় না কৃষিপণ্যের। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো সময়সাপেক্ষ বিষয়। কৃষকরা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় পরের বছর পেঁয়াজ উৎপাদন করলে দেখা যায়, যখন বাংলাদেশে কৃষক উৎপাদিত পেঁয়াজ বাজারজাত করেন তখন ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে সরকার। এতে দেশীয় বাজারে পেঁয়াজের মূল্য কমে যায় এবং কৃষকরা পেঁয়াজের ভালো মূল্য পান না। ফলে পরের বছর পেঁয়াজ উৎপাদনে আগ্রহী হন না তারা। এতে দেশে চাহিদার পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয় না এবং আমরা নির্ভরশীল থেকেই যাই ভারতের ওপর। তাই দেশে পেঁয়াজ বাজারে ওঠার সময় ভারত থেকে আমদানি বন্ধ রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে।

বিশ্লেষকেরা আরো বলেন, খাদ্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে মাল্টি ন্যাশনাল গ্রোসারি চেইন কোম্পানিগুলো, যেমন ওয়ালমার্ট, আলডি, কারফোরকে বাংলাদেশে কাজ করার জন্য নিয়ে আসতে হবে। এসব মাল্টিন্যাশনাল গ্রোসারি চেইন কোম্পানি ইউএসএ, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারলে যে সুবিধাগুলো হবে তা হলো: (১) ন্যায্যমূল্যে তারা খাদ্য/কৃষিপণ্য বিক্রি করবে; (২) ফরমালিন ও কেমিক্যালমুক্ত স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য সরবরাহ করবে; (৩) হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে ভেজাল, কেমিক্যাল ও ফরমালিনযুক্ত খাবার খাওয়ার কারণে জনস্বাস্থ্য ব্যাপক হুমকির সম্মুখীন। ফলে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধিতে মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে এবং সরকারের স্বাস্থ্য খাতে খরচ বহুগুণে বেড়ে গেছে।

কৃষকের যৌক্তিক মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে। মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা যাতে ধান মজুদ বা সংরক্ষণ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপণন অধিদপ্তরকেও শক্তিশালী করতে হবে। বাজার থেকে ধান না কেনার কারণে ধানের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য চালকল মালিকদের কাছেই তুলে দেয়া হচ্ছে। ধানের এত বড় বাজার এককভাবে চালকল মালিকদের কাছে রাখা মোটেও যৌক্তিক নয়। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ পরিবহন ও বাজারজাতের প্রতিটি স্তরে নজরদারি বাড়াতে হবে। ভোক্তামূল্যে কৃষকের যৌক্তিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এগ্রিকালচারাল প্রাইস কমিশন দ্রুত গঠন করা প্রয়োজন। প্রত্যাশা থাকবে, কৃষি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।