ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

হরেক রকম ইন্টারভিউ

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি
প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সোমবার, ০৮:০৫ এএম
হরেক রকম ইন্টারভিউ

২০১৮ সালের মার্চ মাসে বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের তরুণ সমাজের দক্ষতার ওপর একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে। Bangladesh Skills for Tomorrow’s Jobs: Preparing Youths for A Fast Changing Economy শিরোনামে প্রকাশিত এই সমীক্ষার ১৫ নং পৃষ্ঠার তথ্যমতে, উচ্চশিক্ষা শেষে বাংলাদেশের ১০.৮% পুরুষ, ১৫% নারী এবং গড়ে ১২.১% নারী-পুরুষ বেকারদের কাতারে সামিল হয়। আরেক পৃষ্ঠায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ। পরবর্তীতে প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষ তরুণ-তরুণী চাকরি পাবার বয়সে পৌঁছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৮% প্রথম বছর কোনো চাকরি না পেয়ে বেকার জীবনযাপন করে। সেন্টারি পর পলিসি ডায়লগ এই ধারাবাহিকতায় প্রকাশ করে যে ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এভাবে প্রতিবছর ২০ লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী চাকরির বয়সে পৌঁছালেও তাদের মধ্যে ১৩ লক্ষ চাকরিপ্রার্থী নতুন চাকরি পাচ্ছে, আর বাকিরা বেকার থাকছে। (সূত্র: দি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস- ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। চলতি বছর এপ্রিল মাসে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) প্রকাশিত ডাটাবেসে বাংলাদেশে ২০১৮ সালে কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যা ৬ কোটি ৮৩ লক্ষ ৭১ হাজার ৭৯০ জন ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারিভাবে দেশের কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের হার ৪.২% বলে দাবি করা হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষক মো. ইকবাল হোসেনের বরাতে লিখেছে যে, বিগত ৮ বছরে বাংলাদেশে গড়ে ৬.৫% হারে জিডিপি বৃদ্ধি পেলেও দেশের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় অপরিবর্তিত। তার মতে, আগামী ৭ বছরে সরকার প্রতিবছর ৩৭ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করলেও বাস্তবে দেশে ও প্রবাসে কাজ পাচ্ছে ১৮ থেকে ২০ লক্ষ চাকরি প্রত্যাশী।

এমনি এক বাস্তবতায় আবার বিপরীত দিকে দেখা যায়, বাংলাদেশে দাপটের সঙ্গে কাজ করছে ভারত ও চায়নাসহ বিভিন্ন দেশের কর্মীরা। তারা নিজ দেশে ঠিক কি পরিমাণ টাকা পাঠাচ্ছে, তা নিয়ে সঠিক তথ্যের অভাব এবং নানাবিধ বিতর্ক রয়েছে। সুতরাং সবার উচিৎ হতাশ না হয়ে নিজ যোগ্যতা প্রমাণের মধ্যে দিয়ে চাকরিজীবনে প্রবেশ করা। চাকরি পেতে হলে একটি ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকারে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন পদ্ধতিতে এসব ইন্টারভিউ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. প্রাথমিক ইন্টারভিউ

অনেক প্রার্থীর মধ্য থেকে কিছু প্রার্থীকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থিত করা বা পরবর্তী যেকোনো লিখিত বা অন্যান্য পরীক্ষায় নির্বাচিত করার জন্য প্রাথমিক ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে প্রাথমিক ইন্টারভিউ নেওয়া হয়।

২. প্যানেল ইন্টারভিউ

একজন চাকরিপ্রার্থীকে যখন তিন বা ততোধিক কর্কমর্তা জিজ্ঞাসাবাদ বা যাচাই করেন তখন তাকে প্যানেল ইন্টারভিউ বলা হয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধরনের ইন্টারভিউ হয়। যেখানে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিদের মতামত একজন প্রার্থীর সত্যিকারের যোগ্যতা তুলে ধরে ও পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা হ্রাস করে।

৩। টেলিফোন ইন্টারভিউ

মূলত প্রার্থীদের সম্পর্কে ধারণা পেতে মানব সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে এই টেলিদফোনে খোঁজখবর নেওয়া হয় এবং জীবন বৃত্তান্ত এবং আবেদনপত্রে কোনো তথ্য ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করা হয়। এই টেলিফোন ইন্টারভিউ পরবর্তীতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করে।

৪। মুখোমুখি ইন্টারভিউ

সাধারণত একজন বা দুজন কর্মকর্তা সরাসরি যখন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে ও যোগ্যতা নিরূপণ করেন তখন তা মুখোমুখি ইন্টারভিউ বলে ধরা হয়। ব্যক্তিগত কোম্পানি একক মালিকাধীন কোম্পানি এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে মুখোমুখি ইন্টারভিউ একটি প্রাত্যহিক বিষয়।

৫। লাঞ্চ বা ডীনার ইন্টারভিউ

পশ্চিমা বিশ্বে দাওয়াত দিয়ে লাঞ্চ বা ডিনার গ্রহণের সময় প্রার্থীর আচার আচরণ, প্রত্যাশা, যোগ্যতা ইত্যাদি যাচাইয়ের পদ্ধতি লাঞ্চ বা ডিনার ইন্টারভিউ। স্ব স্ব ক্ষেত্রে যারা সফল, তাদের ক্ষেত্রে চুক্তির পূর্বে এ ধরনের লাঞ্চ বা ডিনারের সময় ইন্টারভিউ হয়ে যায়। বিনোদন জগতে শিল্পী ও কলাকুশলী নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটি বহুল প্রচলিত ইন্টারভিউ পদ্ধতি।

৬। উপস্থাপনামূলক ইন্টারভিউ

পৃথিবীজুড়ে এমন অনেক কাজ রয়েছে যেখানে পুথিগত বিদ্যা বা সার্টিফিকেটের চেয়ে সৃজনশীলতা, মননশীলতা, উপস্থাপনা কৌশল, যোগাযোগের দক্ষতা, অতীতের রেকর্ড প্রভৃতির মূল্য অনেক বেশি। যেমন একজন ভাস্কর, রেডিও জকি, প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতা বা ক্রীড়াক্ষেত্রের কোচ নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতের রেকর্ড, বর্তমান অবস্থান, নতুন কর্মক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে বা একটি লক্ষ্য অর্জনে তিনি কিভাবে কাজ করবেন এবং বিনিময়ে তিনি কি প্রত্যাশা করেন, সেটাই মূখ্য। এসব ক্ষেত্রে প্রার্থীকে একটি উপস্থাপনা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয় যা মূলত এক ধরনের ইন্টারভিউ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচ নির্বাচন এবং আইসিটি ক্ষেত্রে সরকার প্রদত্ত স্টার্টআপ ফান্ড প্রত্যাশীদের এ ধরনের উপস্থাপনা প্রদান করতে হয়।

৭. গ্রুপ ইন্টারভিউ

কোনো কোনো কাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে দলগতভাবে কাজ করার পারদর্শিতা বিশেষ গুরুরত্বপূর্ণ। যেমন- সামরিক বাহিনীর চাকরি, মার্কেটিং বা সেলস বিভাগের চাকরি, দলগত গবেষণা বা মাঠ পর্যায়ের চাকরি ইত্যাদির ক্ষেত্রে একসঙ্গে কয়েকজন প্রার্থীকে ডাকা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা বা নির্দিষ্ট কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অনেকক্ষেত্রে বিশেষত সামরিকক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে পারস্পরিক আচরণ, সহযোগিতার মনোভাব, স্বার্থহীনতা প্রভৃতির ভিত্তিতে প্রার্থী যাচাই করা হয়।

৮. ওয়াক ইন ইন্টারভিউ

পত্রিকার পাতা খুললেই বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির ওয়াক ইন ইন্টারভিউ’র বিজ্ঞাপন দেখা যায়। একটি প্রতিষ্ঠানে যখন অতি দ্রুত সময়ে বেশি সংখ্যক কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হয় তখন ওয়াক ইন ইন্টারভিউ’র আয়োজন করে থাকে। একজন প্রার্থী কোনো পূর্ব অনূমতি বা এপয়েনমেন্ট ছাড়াই এধরনের ইন্টারভিউ’র মাধ্যমে নিয়োগ কর্তার সাক্ষাৎ পেতে পারে এবং যোগ্যতা প্রমাণ সাপেক্ষে তাৎক্ষণিক নিয়োগ পেতে পারে।

৯. অনলাইন ইন্টারভিউ

প্রথম অবস্থায় গরেষণা ও জরিপ পরিচারনার জন্য অনলাইন ইন্টারভিউ নেয়া হলেও বর্তমানে চাকরির জন্য বিশেষত: বিদেশ চাকরির জন্য এটি ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় একটি  নির্দিষ্ট সময়ে নেট বা মেইলে কিছু প্রশ্নের উত্তর জমা নেওয়া হয়। এছাড়া তাৎক্ষণিক প্রশ্ন ও উত্তরে প্রচলন রযেছে। অনলাইন ইন্টারভিউর পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই টেলিফোন বা ভিডিও ইন্টারভিউ নেওয়া হয়।

১০) ভিডিও ইন্টারভিউ

ইন্টারনেটের বিস্তৃতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার ফলে ভিডিও ইন্টারভিউ দ্রুত প্রসার ঘটেছে। এ ধরনের ইন্টারভিউর ফলে প্রার্থীর অবয়ব, শারীরিক ভাষা, কন্ঠস্বর, উপস্থাপনার কৌশল প্রভৃতি একই সঙ্গে যাচাই করা যায়। দুই বা ততোধিক স্থান থেকে এমনকি বিভিন্ন দেশ থেকে একই সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা যায় বিধায় এ ধরনের ইন্টারভিউ খুবই ফলপ্রসু।

১১. চাকরি মেলা ইন্টারভিউ

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্য সংস্থা, সেবা প্রতিষ্ঠান বা এনজিও শিক্ষা জীবনের শেষ পর্বে থাকা শিক্ষার্থী এবং সদ্য পাশ করা শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরি মেলা বা জব ফেয়ার আয়োজন কবে থাকে ইন্টারভিউ শেষে উপযুক্ত প্রার্থী পেতে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। মেধাবী শিক্ষার্থী অন্বেষণ বা ট্যালেন্ট হান্টিং এর জন্য এ ধরনের ইন্টারভিউ খুবই উপযুক্ত।

প্রতিটি ইন্টারভিউ মানুষের জীবনে নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা যোগ করে, যা পরবর্তীতে কোনো না কোনোভাবে ফলপ্রসু হয়। তাই চাকরি প্রার্থীর উচিৎ সুযোগ পেলেই ইন্টারভিউতে অংশ নেওয়া। তবে প্রস্তুতি নিয়ে ইন্টারভিউ দেওয়াটা খুব জরুরি, এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং চাকরি না পেলেও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়।

পাদটিকা

ইন্টারভিউর জন্য কিছু সাধারণ (common) প্রস্ততি যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিশেষ ধরনের ইন্টারভিউ জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন প্রস্ততি যা আগামীতে প্রকাশ করা হবে।

 

লেখক: কলামিস্ট ও লেখক। সেনাবাহিনী ও কর্পোরেট জগতে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। বিদেশে স্কুল পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন এক দশক।

ইমেইল- directoradmin2007@gmail.com

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ