ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

রমজান মুন্সির ঈদ যাত্রা

মাহাবুব মোর্শেদ রিফাত 
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২১ বৃহস্পতিবার, ০৮:৫১ এএম
রমজান মুন্সির ঈদ যাত্রা

শীতের এক কাকডাকা ভোরে ছোট্ট সুন্দর রসুলপুর গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন রমজান মুন্সি। কোন এক রমজান মাসের সকালে জন্ম নেবার কারনেই তার দাদা নাম রেখে ছিলেন রমজান। খুব ছোট থাকতে হাট থেকে রমজানের বাবা আউয়াল মুন্সি রমজানকে পটকা বাজী কিনে দিতেন। বাবার কাধে চড়ে সেই পটকা বাজী হাতে করে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই রমজান বুঝতে পারতো আজ বাদে কাল ঈদ। এরপর থেকে নিজের গ্রামের ঈদের মাঠে বন্ধুদের সাথে কোলাকুলি করতে করতে কখন যে ছোট রমজানের কৈশোর পেরুলো তা যেন বুঝতেই পারেনি রমজান। 

বাবার মৃত্যুর পরে একটা সময় সংসারের জোয়ালটা এসে পড়ে তরুণ রমজানের কাঁধে। ওই সময়টা থেকেই কেমন যেন ফিকে হতে শুরু করলো রমজানের ঈদগুলো। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোই যেন রমজানের প্রধান এবং একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ালো। ঘর আলো করে আসলো একটা ছেলে আর পরীর মতো ফুটফুটে একটা মেয়ে। ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো রমজানের ছেলে একরাম আর একমাত্র মেয়ে হেলেনা। রমজান মুন্সি পড়াশোনাটা ঠিকঠাক করতে না পারলেও ছেলেকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে বলতে গেলে ছেলে মেয়েদের মায়ের অভাব বুঝতে না দিয়েই বড় করেছেন রমজান। এভাবেই জীবন নামের রেলগাড়িটা চলতে চলতে আজ শেষ গন্তব্যের দিকে একটু একটু করে আগাচ্ছে রমজান মুন্সির। 

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে এখন বেশ ভালো একটা চাকরী করে একরাম। চাকরীর সুবাদেই যাদুর শহর ঢাকায় বসবাস তার। রমজানের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না বেশ কিছুদিন ধরেই। বাড়িতে ফোন দিয়ে বাবার অসুস্থতার কথা জেনেই একরাম ঠিক করেছিলো বাবাকে এইবার ঢাকা এনে চিকিৎসা করাবে। 

ছেলের মুখে শহরের কথা অনেক শুনেছেন রমজান মুন্সি, তবে কখনো শহরে আসা হয়ে ওঠেনি তার। অবশেষে রোগমুক্তির আশার ঢাকা শহর আসবার একটা সুযোগ আসলো রমজানের জীবনে। দুইমাস আগে রমজান যখন ঢাকা আসলো তখন বাবাকে বেশ কয়েকটা অভিজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বার ঘুরিয়ে এনেছে একরাম। কিন্তু বার্ধক্য যেকে বসা শরীর কি আর কোনো ওষুধে সারতে পারে। এবার বাবাকে নিয়ে বেশ কয়েক জায়গায় ঘুরেছে একরাম, দেখিয়েছে ইট, পাথরের এই আজব শহর। ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ নিয়ে যখন বাড়ি ফেরার সময় এলো ঠিক ওই সময়েই দেশে আবার আসলো করোনার ঢেউ। লকডাউনে বন্ধ হয়ে গেলো সারাদেশ। গ্রামের হাওয়া বাতাসে জীবন কাটানো রমজান বন্দী হলো চার দেয়ালের মাঝে। দিন যায় রমজানের হাঁসফাঁস বাড়ে। দেখতে দেখতে লকডাউন ঠেকলো রমজান মাসে। রমজান মাসে এসে মনে মনে একটু স্বস্তি আসলো রমজান মুন্সির মনে। রমজান মুন্সি একটা একটা রোজা রাখে আর দিন গোনে। কারন ঈদে তো নিশ্চিত তার বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে। এদিকে মহামারী করোনার ভয়াবহতাও বাড়তে থাকে। এক লকডাউনের মেয়াদ শেষে আবার আসে লকডাউন। রমজান মুন্সির মনে বাড়তে থাকে শঙ্কা। 

বাবা গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় আসবার পর থেকেই একরামের বাসায় অনেকটাই অঘোষিত ঈদ চলছে। জীবনের প্রথম ঢাকায় ছেলের বাসায় এসেছে রমজান মুন্সি এ নিয়ে বাসার সবাই বেশ খুশি। দিনরাত চলছে রমজান মুন্সির পছন্দের নানান পদের রান্না। সকাল বেলায় অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয় একরাম, রাতে ফেরার সময় হাতে থাকে বাবার জন্য নানান রকমের খাবার। আজ বাবার পছন্দের আঙ্গুর নিয়ে এসেছে একরাম। বাবার জন্য ব্লেন্ডারে জুস বানিয়ে এনেছে একরামের স্ত্রী নাসরিন। অনেক দিন পরে বেশ তৃপ্তি নিয়ে প্রিয় ফলের জুস খেলেন রমজান মুন্সি। চারদেয়ালে আবদ্ধ হয়ে এভাবে কাটতে লাগলো রমজান মুন্সির লকডাউন জীবন। একটা একটা রোজা শেষ হয় আর রমজান মুন্সির অপেক্ষার প্রহর যেন পার হয়। 

সকাল থেকে রমজান মুন্সির শরীরটা বেশ খারাপ। কাল মাঝ রাতে হুট করে জ্বর চলে আসলো শরীরে, এরপর থেকেই ক্রমাগত কাশি আর গলা ব্যথায় যেন বুক ভেঙে আসতে চায় রমজান মুন্সির। দিন পেরিয়ে রাত আসলো সেইসাথে শরীর যেন উল্টো পথেই হাটতে লাগলো রমজানের। একরাম রাতে অফিস থেকে ফিরে খাওয়ালো নানান ওষুধ, তবু যদি জ্বরটা কমে। ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে রমজান মুন্সি অনেকটাই শয্যাশায়ী। একরামের ঘুম আজ ভেঙেছে রমজান মুন্সির কাশির শব্দে। কেমন এক অজানা ভয় ভর করতে শুরু করলো একরামের মনে। 

ঘড়িতে সকাল ১১ টা, একরাম তার বাবাকে নিয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। অনেক মানুষ পেছনে ফেলে অবশেষে কোভিড টেস্টের জন্য স্যাম্পল দিতে পেরেছেন রমজান মুন্সি। এদিকে ঘন্টাখানেক আগে থেকে শুরু হয়েছে শ্বাসকষ্ট। বাবাকে বাড়িতে নামিয়ে একরাম ছুটলো অফিসে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে যখন একরাম  বাসায় ফিরলো ঘড়ির কাটা তখন ১০ টা ছুঁইছুঁই। থার্মোমিটারে রমজান মুন্সির জ্বর তখন ১০৩ থেকে ১০৪ এ ওঠানামা করছে। এভাবে কাটলো কয়েকটা দিন। রমজান মুন্সি অপেক্ষার দিন গুনছে, গ্রামে যে তাকে ফিরতেই হবে। বাবার কোল থেকে শুরু করে গেলো ঈদটাও রমজানের কেটেছে নিজ গ্রামের মাটির ঘ্রাণ গায়ে মেখে।

আজ একরামের শেষ কর্মদিবস, রাত পোহালেই ঈদ। হাতের কাজ শেষ করে একরাম যখন সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলো ঠিক তখনি বেজে উঠলো ফোনটা। ফোনটা বাজতে দেখেই অজানা এক শঙ্কা নাড়া দিয়ে গেলো একরামের মনে। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো নাসরিনের কান্নার সুর।

ঘড়ির কাটা ১২ টার আশেপাশে তখন, মাওয়া ফেরিঘাটের লম্বা গাড়ির সারির ফাক গলে এগিয়ে চলেছে ফ্রিজিং ভ্যানটা। লকডাউনে সবকিছু বন্ধ থাকলেও সাইরেনে সাইরেনে আকাশ কাঁপানো এই ফ্রিজিং ভ্যানগুলো দিব্বি ফেরীতে চড়ে পার হয়ে যায় উন্মত্ত পদ্মা। লকডাউনে ঘরবন্দি মানুষের কাছে জরুরী খাদ্য সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কয়েকটি ট্রাকের পাশেই যায়গা হলো ফ্রিজিং ভ্যানটির। এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকী। ফ্রিজিং ভ্যানের বদ্ধ চেম্বারের ভেতরে একজন এখনো হয়তো ক্ষন গুনছে। সেই বাবার কোল থেকে গতবারের ঈদ কোনোটাই রমজান মুন্সির রসুলপুরের ঈদ উদযাপন থেকে দূরে রাখতে পারেনি। এবারের এই ঈদ যাত্রায় হয়তো রমজান মুন্সি কৃতজ্ঞই থাকবেন মহামারীর কাছে, কারন ঘুমগাড়ীতে ভর করে ঈদের দিন খুব ভোরেই পৌঁছুবেন তার রসুলপুরে।

বিষয়: রমজান , ঈদ