ঢাকা, রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তাহাদের ঈদ

আনিকা রাশিদ এমিন
প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২১ শুক্রবার, ০২:০৬ পিএম
তাহাদের ঈদ

উহ ! এত্ত জোড়ে কেউ ছুঁড়ে মারে নাকি ? কী নির্মম ! বড্ড লাগলো যে আমার । 

হঠাৎ জোরে শব্দ হওয়ায় রিমিমণির মা ছুটে এলেন ঘরে ৷ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে তার মেয়ে কে বললেন ,  "কীরে রিমি ?  চুলে তো জীবনে তেল দিতে দেখিনা । ওমন জটা চুলে চিরুনী চালালে ব্যথা তো পাবিই । তোর বাবা নতুন আনলো চিরুনীটা । আছাড় মেরে ভেঙে ফেললি ?"  

মায়ের বকা খেয়ে এখন কেমন আড়চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে । ও কী মনে করে? এখন আমাকে কাছে ডাকলেই আমি যাবো ? আমি চিরুনী হতে পারি কিন্ত ওর হাতের পুতুল নই নিশ্চয়ই ।  
 
রিমির জীবনের অন্যতম সমস্যা । গেস্টদের সামনে যাওয়ার কথা থাকলে কোনো ভাবেই তার চুলের কোনো ব্যবস্থা করতে পারে না । ঘন্টা দুয়েক পার হলো তবু সে আঁচড়িয়েই যাচ্ছে ।   কলিং বেলের শব্দ । আমাকে তাড়াতাড়ি ড্রেসিং টেবিলের উপরে ফেলে চুলটাকে খোলা রেখেই চলে গেল দরজা খুলতে । 

আমি দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছি কারা এলেন ।  

জানালা খোলা রেখে গিয়েছে রিমি । বাইরে ঝড় হচ্ছে । দমকা এক বাতাস এসে আবার আমায় ফেলে দিল । শব্দ হলো । ছুটে এলো রিমি আর সাথে আরেকটা নতুন মেয়ে । কে এই মেয়ে ? রিমি আমায় তুলে নিল ফ্লোর থেকে ৷ হাত বুলিয়ে দেখলো আমার দুটো স্টিক খুলে পরছে । নতুন মেয়ে বললো নষ্ট হয়ে গেলে চিরুনীটা ডাস্টবিনে ফেলে দিতে ৷ এটা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ধুলোবালিতে পড়ে থাকলে তো আমার এলার্জি হয় । কিন্ত রিমি আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুক্ষণ চেষ্টা করলো আঠা দিয়ে আমাকে ঠিক করার । তবে পারলো না । তারপর একটান দিয়ে ঐ দুটো দুর্বল স্টিককে খুলে ফেলে আমাকে আবার টেবিলের উপর রাখলো । যাওয়ার সময় জানালা আটকিয়ে দিতে ভুললো না সে এবার ।  

বাইরে সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে । সকালে মিষ্টি রোদে রিমির চুলগুলোর একপাশ বেশ চিক চিক করে উঠলো । ভালো করে তাকাতেই দেখলাম , ওর মা ওর চুলে তেল দিয়ে দিচ্ছে ।  দেখে শান্তি পেলাম ।  এখন থেকে ওর চুলে ডুব দিলে আমাকে ব্যথা পেতে হবে না , রিমিকেও না । হঠাৎ দরজা খুলে নতুন মেয়ে ঘরে ঢুকে রিমিকে জানালো , রোজা উনত্রিশটা হতে পারে আবার ত্রিশটাও হতে পারে।   আজ সন্ধ্যায় চাঁদ উঠলে নিশ্চিত হওয়া যাবে । এরপর সে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে  জানালো সে নাকি বাড়িতে তার চিরুনী ভুলে রেখে এসেছে । এখন কী উপায় ? এটা শুনেই আমার মনের মধ্যে একটা আনন্দ কাজ করলো ।  আমি যে কতটা দরকারি তা এখন সবাই বুঝবে । রিমি আমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে নতুন মেয়েকে বললো , "চিন্তা করোনা । আমারটা তুমি নাও ৷"

আমি তো নিজেকে পরিপাটি করে রাখলাম নতুন মেয়ের হাতে উঠবো তাই । ওমা! একি? ওভাবে নাক শিটকাচ্ছে কেন ও ? আমার গায়ে নাকি রিমির চুলের ময়লা লেগে আছে । আমাকে হাতে নিয়েই আবার ছিটকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল ।  উফ! এই মেয়েও দেখি নির্মম । এভাবে কেউ অন্যের জিনিস আছাড় মারে ? রিমি ছুটে এলো আমার কাছে । স্পষ্ট দেখলাম রিমির চোখের কোণে জলের ফোঁটা । বুঝতে বাকী রইলো না এইবারের ব্যথা কেবল আমি না রিমির মনও পেয়েছে । অপমান বোধ করেছে সে । আমাকে তুলে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো আর কোনো স্টিক খুলে যাচ্ছে কিনা এই ধাক্কায়। এইবার রিমি মসৃন এক কাপড় দিয়ে আমার শরীর থেকে ধুলো গুলো মুছে দিল।  আলতো করে ফুঁ দিল।  সে যেন ভুলেই গিয়েছে, আমার শরীর কাটে না, কেবল ভাঙে। মনে পড়লো আমার পুরোনো দিনের কথা।  আমার অনেক বান্ধবী ছিল।  

আমরা একই সেল্ফে থাকতাম রোদেলা আপুর কসমেটিকস এর দোকানে। আপু খুব যত্ন নিতেন আমাদের। যেন কাস্টমাররা আমাদের এক দেখাতেই পছন্দ করে নেন৷ প্রতিদিন ড্রাই ব্রাশ দিয়ে মুছে দিতেন আমাদের । একদিন দোকানের গ্লাস দিয়ে দেখলাম, দুই বেণী করা কিশোরি একটা মেয়ে দৌড়ে দোকানে ঢুকে আমার পাশের চিরুনীটাকে হাতে নিল। জিদ করলো সে ওটাই নিবে।  রোদেলা আপু বুঝালেন, ওইটা বুকড হয়ে গিয়েছে। অগত্যা উপায় না পেয়ে একই ডিজাইন, কালার আলাদা এই আমাকেই তার বেছে নেয়া লাগলো৷ তখন থেকেই রিমির সাথে আমার বনিবনাটা ঠিক মতো হয়ে উঠছিল না। কিন্ত আজকে তার আলতো ছোঁয়ার মাঝে কেমন যত্নের সুবাস পেলাম।   

বেশ কিছুক্ষন ধরে কিসের যেন শোরগোল শুনতে পাচ্ছি। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখলাম কতগুলো ছেলেমেয়ে দৌড়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে। রিমিও দৌড়ে ছাদে গেল নতুন মেয়ের সাথে। 

বুঝতে বাকী নেই। ঈদের চাঁদ দেখতে গিয়েছে।  বুকের ভিতর টা খট করে উঠলো।  এই প্রথম আমার সঙ্গীদের ছাড়াই ঈদ করছি। নতুন এক পরিবারের সাথে। ভয় লাগছে। উত্তেজনাও কাজ করছে। রিমির যা রাগ। কিছু একটা হলেই আমার উপর দিয়েই ঝড় বয়ে যায়। সেদিন দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে পরীক্ষায় খারাপ নাম্বার পাওয়ার রাগটাও সে আমার উপরেই ঝেড়েছিল। মুখ থুবড়ে পরেছিলাম ঘরের টাইলসের উপর।  

সকাল সকাল রিমি গোসল সেরে নিল। একটু পরেই রিমি তার ভাইবোনদের সাথে সালামি নিতে যাবে৷ ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে বসলো।  ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে৷ নরম হাত দিয়ে রিমি আমায় তুলে নিল। আমার স্টিক গুলো ওর চুলে বসাতেই টের পেলাম চুলগুলো বেশ ঝরঝরে আজ। সুন্দর  সুবাস ছড়াচ্ছে৷ আজ সে নিশ্চই তেল দিয়ে তারপর শ্যাম্পু করে চুল ধুয়েছে। খুব অল্প সময়েই আজ রিমি চুলে একটা চমৎকার খোপা করে ফেললো। নতুন মেয়ে এসে ডাকতেই রিমি বললো,  "আসছি আপু।" আজ রিমির মনটা ভালো। চুল বাঁধতে তার সমস্যা হয় নি। পরম যত্নে আমার শরীর থেকে তার অল্প কয়েকটি চুল একেক করে ছাড়ালো। তারপর আমায় টেবিলে রেখে সে বের হলে গেল বাইরে।  

এমন খুশির একটা দিনেও ঘরে একা আমি।  ঘরটাও অন্ধকার। জানালাটাও লাগানো। আমার খুব অস্বস্তি লাগছে। এমন সময় হঠাৎ দেখি,  দরজাটা ঠাস করে খুলে রিমি দ্রুত আমায় তার ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে নিল। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমায়? ফেলে দেবে নাতো? পকেটটা ছোট হওয়ায় আমার মাথার কিছুটা অংশ বের হয়ে থাকলো। মুহুর্তের মধ্যেই দেখি রোদে ঝলমলে এক হাস্যোজ্জ্বল দিন। আমার মাথার উপর স্নেহের হাত রেখে রিমি আনমনে বলে উঠলো,   "ওকে সাথেই রাখা লাগবে সব সময়। পাছে চুল এলোমেলো হয়ে গেলে ওকে ছাড়া আমি যে  নিরূপায় হয়ে যাবো।" কথাটা শুনে নিজেকে অর্থবহ কেউ মনে হলো। এখন আমি আর কোনো   নিছক ব্যবহারের জিনিস নই যাকে চাইলেই ছুড়ে ফেলা যায়। রিমির দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও বটে।

এতক্ষণ পরে এখন মনে হচ্ছে সত্যিই আজ ঈদ৷

বিষয়: ঈদ