এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনা এবং সৈয়দ আশরাফের একটি গল্প

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৮ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

গল্পটা বলেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মন্ত্রিপাড়ায় এক বিকালে আমরা কজন দেখা করতে গেলাম আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকের বাসায়। প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, হুইপ মির্জা আজম, যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এবং আমি। একটা বিষয়ে তাঁর মতামত জানার জন্যই ওই বৈঠকের আয়োজনটা করেছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। সৈয়দ আশরাফকে সে সময় পাওয়া আর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া একই ব্যাপার। এমনকি আমরা যখন তাঁর বাসভবনের গেট দিয়ে ঢুকছিলাম তখনো নিশ্চিত ছিলাম না শেষ পর্যন্ত সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে দেখা হবে কি না। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা তখন তিনি। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। কিন্তু সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। মন্ত্রণালয়ে যান কালেভদ্রে। হঠাৎ হঠাৎ নেতা-কর্মীদের সাক্ষাৎ দেন। গণমাধ্যমে কথা বলেন কদাচিৎ। যখন কথা বলেন তখন মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেন। আমরা যে সময় গিয়েছি তখন পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে সরকারের। তাঁর বাসভবনে ঢুকতেই আমাদের বলা হলো দোতলায় যেতে। লুঙ্গি আর একটা ফতুয়া পরা একবারে সাদামাটা একজন মানুষ আমাদের স্বাগত জানালেন। পুরো ঘর এলোমেলো। কিছু বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে। একটা টেলিভিশন পরিত্যক্তের মতো অনাদরে পড়ে আছে। ঘরটাতে রাজত্ব করছে সিগারেটের ধোঁয়া আর ছাই। আমরা কথা বলছি। সৈয়দ আশরাফ শুনছেন। দু-একবার তাঁর মতও দিচ্ছেন ছোট করে। একসময় জিজ্ঞেস করলাম ‘আচ্ছা! আপনার কী মনে হয়- পদ্মা সেতু শেষ পর্যন্ত হবে?’ সৈয়দ আশরাফ হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আপনার সন্দেহ আছে? শেখ হাসিনা যখন আছেন তখন পদ্মা সেতু হবেই। এটা জাতির প্রতি শেখ হাসিনার কমিটমেন্ট।’ মিতভাষী সৈয়দ আশরাফ এরপর বললেন, একটা গল্প কই শোনেন। এরপর কিশোরগঞ্জের ভাষায় যে গল্পটা বললেন তা এ রকম- ‘গরিবের এক ছেলে প্রচণ্ড মেধাবী। এর-ওর বই নিয়ে লেখাপড়া করে। পাড়ায় লোকজন বলে, হ, টুকটাক পড়লে ভালো, স্বাক্ষরটা তো করতে পারব। এরপর ছেলেটা স্কুলে গেল। লোকজন বলা শুরু করল, স্কুলে গেছে ঠিকই কিন্তু পাস করবে না। ছেলেটা একের পর এক ক্লাসে প্রথম হয়ে পাস করল। এবার সে ম্যাট্রিক দেবে। গ্রামের লোকজন বলল, স্কুল আর ম্যাট্রিক কি এক হলো! ও ম্যাট্রিক পাস করুক আমি নাম পাল্টায় ফেলব। ওমা! ওই ছেলে ম্যাট্রিকেও দারুণ রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হলো। এবার প্রতিবেশীরা বলা শুরু করল, ম্যাট্রিকই শেষ কলেজ পাস করা কি এত সোজা। কলেজে ফেল করবে নির্ঘাত। কিন্তু ছেলেটা ইন্টারমিডিয়েটেও (এইচএসসি) দারুণ রেজাল্ট করল। এবার সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। এবার ঈর্ষান্বিত প্রতিবেশীর সংখ্যা আরও বাড়ল। তারা বলল, গরিবের পোলার ঘোড়ারোগ। কই একটা পিয়নের চাকরি নেবে, না বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শখ পোলার! ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হলো, ভালোমতো পাস করল। এবার প্রতিবেশীরা যেন রীতিমতো ক্ষুব্ধ ছেলেটির ওপর। তারা যেন অভিশাপের ভঙ্গিতে বলল, পাস করছে ঠিকই কিন্তু চাকরি পাবে না। ছেলেটা আবার প্রতিবেশীদের অভিশাপে ছাই দিয়ে ভালো একটা চাকরিও পেল। হতাশ প্রতিপক্ষরা এবার সান্ত্বনা খুঁজতে ঘোষণা করল, চাকরি পাইছে ঠিক আছে, বেতন পাবে না।’

একনাগাড়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গল্পটা এ পর্যন্ত বলে একটু থামলেন। একটা সিগারেট আবার ধরালেন। তারপর বললেন, ‘শেখ হাসিনার জীবনটা ওই পোলার মতো, বুঝছেন।’ সেদিন এই অসম্ভব প্রজ্ঞাবান মানুষটির গল্পের পুরো তাৎপর্য বুঝিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারি।

শেখ হাসিনা টানা প্রধানমন্ত্রিত্বের ১৩ বছর পূর্ণ করলেন ৬ জানুয়ারি। ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তৃতীয় মেয়াদে তাঁর তিন বছর পূর্ণ হলো। ১৩ বছরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন। শেখ হাসিনা এবং উন্নয়ন এখন সমার্থক। বাংলাদেশ যে কীভাবে বদলে গেছে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড়, গবেষণা। কিন্তু এ দেশেরই কিছু মানুষের যেন কত হতাশা এ নিয়ে। বাংলাদেশের সব অর্জন, সব উন্নয়ন নিয়ে কিছু মানুষ যদি, কিন্তু, কবে লাগিয়ে দেন সারাক্ষণ। সৈয়দ আশরাফের সেই ছেলেটির গল্পের মতো। শেখ হাসিনা যখন ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললেন তখন মুখ টিপে হাসা মানুষের সংখ্যা কি কম ছিল। একজন বিশাল পণ্ডিত কলাম লিখলেন, ‘শিক্ষার মান উন্নত না করে ডিজিটাল বাংলাদেশ অবান্তর।’ কিন্তু আজ অনেক গৃহকর্মীও বিকাশে তার মায়ের কাছে মাসের শুরুতে টাকা পাঠান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় গড়ে উঠেছে বিরাট এক আর্থ-কর্মসংস্থানে মুখর জনগোষ্ঠী। শেখ হাসিনা যখন ২০০৮ সালে ঘোষণা করেছিলেন তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন। তখন তা বিশ্বাস করার মতো পণ্ডিত কজন ছিলেন। যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলো তখন বলা হলো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, কিন্তু এদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া অসম্ভব। আন্তর্জাতিক চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ইত্যাদি কত বাধা আসবে তার ফিরিস্তি শুনলাম। কিন্তু হাসিনা আদালতের রায় কার্যকরে এতটুকু পিছপা হলেন না। ২০১৩ সাল থেকেই শুনলাম শেখ হাসিনা শেষ। আর ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। পাঁচ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের পর তো আওয়ামী লীগেই মাতম উঠেছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন, শেখ হাসিনা কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটা মানছেন না। বিএনপি চেয়ারপারসন যখন ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তির চরম প্রকাশ ঘটিয়ে ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিলেন, তখন অনেকে বলেছেন, ম্যাডাম আবার আসছেন। রাতের অন্ধকারে কতজন সে সময় বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তার হিসাব কে নিয়েছিল। এখন মন্ত্রী হয়ে নাদুসনুদুস হওয়া অনেককে বলতে শুনেছি, ‘আমাদের অবস্থা বিএনপির চেয়েও ভয়াবহ হবে।’ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির চেয়েও খারাপ হবে। সাত দিনও সরকার টিকবে না। শেখ হাসিনা নির্বাচন করলেন। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন বর্জন করল। চরম দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাম দলগুলোও নির্বাচন বর্জনের পথে হাঁটল। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি সমর্থন জানিয়েও ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারত। ওই নির্বাচন বর্জন করে তারা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের প্রতিই সমর্থন জানিয়েছিল। জাতীয় পার্টিও আংশিক রঙিন চলচ্চিত্রের মতো ২০১৪-এর নির্বাচন আংশিক বর্জন করেছিল। আওয়ামী লীগে যারা মনোনয়ন পেলেন তাদেরও মুখ ভার। একজন মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তির মন খারাপ দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী ভাই! মনোনয়ন পেলেন তা-ও মন খারাপ কেন? উত্তর দিলেন, ভাই ডাবল খরচ এজন্য? একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মানে? উত্তরে বললেন, এই যে কদিন পর আবার নির্বাচন করতে হবে। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী যে যেভাবে পারলেন প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। কেউ টাকা দিয়ে, কেউ ভয় দেখিয়ে। বিনা ভোটে এমপি হলেন ১৫৩ জন। বিনা ভোটে এবং নির্বাচনে জয়ী সবাই আরেকটি নির্বাচনের অপেক্ষায়। ২০১৪-এর নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে পিঠা উৎসবের আয়োজন করলেন। সেখানে কয়েকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, নতুন নির্বাচন কবে হচ্ছে। শেখ হাসিনা উত্তর দিলেন কেবল তো একটা নির্বাচন হলো। এত তাড়াহুড়া কেন? সবাই বলল, নির্বাচন হয়েছে, সরকারও গঠন হয়েছে, তবে এ সরকার টিকবে না। ছয় মাস, বড়জোর এক বছর। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা প্রায় জ্যোতিষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। কিন্তু সরকার ঠিকই পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করল। ২০১৮-তে নতুন নির্বাচন। কেউ কেউ বলাবলি করল এবার আওয়ামী লীগ শেষ। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

ভোটবিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর কেউ কেউ। কী আশ্চর্য, ওই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলো তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসনে। অভিযোগ উঠল, ৩০ ডিসেম্বরে ভোট হয়নি, মহাজালিয়াতি হয়েছে। রাতের বেলা ভোট কাটা হয়েছে। বেশ ভালো কথা, কিন্তু প্রমাণ কই? কেউ প্রমাণ দিতে পারে না। কিছু মানুষ বলতেই থাকে। ২০১৯-এর ৭ জানুয়ারি গঠিত হলো মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভায় তোফায়েল আহমেদ নেই, আমীর হোসেন আমু নেই এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে শেখ হাসিনার সব থেকে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠা বেগম মতিয়া চৌধুরীও নেই। এরা কী করবেন? চারদিকে শুনলাম নানা কথাবার্তা। এবার শেষ। কিন্তু শেখ হাসিনা একাই সব সামলে এগিয়ে নিচ্ছেন দেশকে। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ শুরু হলো গোটা বিশ্বে, বাংলাদেশেও। এবার শুরু হলো করোনা নিয়ে শঙ্কার বাক্যবাণ। বাংলাদেশ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে, অর্থনীতি ধ্বংস হবে ইত্যাদি কত কথা। আঁতকে উঠলাম আমরা সবাই। এখন দেখছি করোনায় লণ্ডভণ্ড ইউরোপ, আমেরিকা। সে তুলনায় ভালো আছি আমরা। করোনায় আবার পুরো বিশ্বের অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড। বাংলাদেশ তার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে। সব দেখেশুনে সৈয়দ আশরাফের গল্পের ভাবার্থ অনুধাবন শুরু করলাম নতুন করে। শেখ হাসিনা গল্পের সেই মানুষটির মতো। একের পর এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছেন আর সমালোচকরা তাঁর পরবর্তী ব্যর্থতার ভবিষ্যদ্বাণী করছেন।

পদ্মা সেতুর কথাই ধরা যাক। যখন শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিলেন তখন কেউ কেউ ভ্রু কোঁচকাল। এত টাকা কে দেবে? বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা অর্থায়নে এগিয়ে এলো। একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়াল, সঙ্গে অন্য দাতারাও। অনেকের উল্লাস চাপা থাকেনি সে সময়। টকশো আর বিবৃতিতে তারা কত কথা যে বললেন, যেগুলো এখন শুনলে নিশ্চিত তারা লজ্জা পাবেন। এরপর শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করবেন। কিছু কিছু মানুষ সে সময় মনে করল শেখ হাসিনা কী যে বলেন! সত্যি সত্যি নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু হয়ে গেল। এখন কী বলবেন তারা? সেতু হয়েছে ঠিকই এখানে যান চলাচল করবে না- এ-জাতীয় কিছু! আমাদের কতিপয় বুদ্ধিজীবী যদি এ ধরনের মন্তব্যও করেন আমি অবাক হব না।

এ সবই হলো প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বলা গল্পের খণ্ডরূপ। কিন্তু পুরো গল্পটার অদ্ভুত মিল পাওয়া যায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের মূল অধ্যায়ে। শেখ হাসিনা যখন ’৭৫-এর রক্তাক্ত স্মৃতি বুকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এলেন, তখন অনেকে বলেছেন, রাজনীতিতে আসছেন, কিছু কিন্তু করতে পারবেন বলে মনে হয় না। শেখ হাসিনা যখন বিধ্বস্ত, পথহারা আওয়ামী লীগকে দাঁড় করালেন, তখনো অনেক সমালোচক বললেন, দলের নেতা ঠিক আছে কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো দিন ক্ষমতায় যেতে পারবেন না, প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। শত্রু ও সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে ’৯৬ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আনলেন। তখনো সমালোচনা। ঠিক আছে, ক্ষমতায় এসেছেন, কিন্তু দেশ চালাতে পারবেন না। দেশ যখন ঠিকমতো চালালেন তখন বলা হলো, আপস, আপস। আওয়ামী লীগ কি সেই আওয়ামী লীগ আছে? যুদ্ধাপরাধীরা সংসদে বসে। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেন। এখন বুদ্ধিজীবীদের মুখে অন্য হতাশা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে। অর্থনীতিই হলো আসল কথা। সেদিকে তো অগ্রগতি নেই। শেখ হাসিনা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেন। মানুষের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে গেল। গড় প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বের সেরা দেশগুলোর তালিকায় স্থান পেল বাংলাদেশ। তার পরও কিছু মানুষের মুখে কালো মেঘের ঘনঘটা। তারা খুশি নন। যে অর্থনীতিবিদরা আগে গড় মাথাপিছু আয়, জিডিপি ইত্যাদি পরিসংখ্যান দিয়ে বলতেন লক্ষণ ভালো না। বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। তারাই এবার বললেন এসব তথ্য-উপাত্ত ফালতু। এসব দিয়ে অর্থনীতির আসল চেহারা বোঝা যাবে না। এবার আওয়াজ উঠল বৈষম্য। ৫০ বছরে দেশ এগিয়েছে ঠিকই, তবে বৈষম্য বেড়েছে। ভালো কথা। শেখ হাসিনা যখন গৃহহীনদের ঘর দিলেন তখন কি বৈষম্য কমল না? আশ্রয়ণ, কমিউনিটি ক্লিনিক, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতার মতো উদ্যোগগুলো কি বৈষম্য কমাতে নেওয়া হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। শেখ হাসিনা যা করবেন তার সমালোচনা করার জন্য কিছু মানুষ যেন সারাক্ষণ বসে থাকে। শেখ হাসিনা কাজ দিয়েই এসব সমালোচনার জবাব দিচ্ছেন।

আমার কাছে শেখ হাসিনাকে আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউর মতো মনে হয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সিঙ্গাপুরকে পাল্টে দিয়েছিলেন লি কুয়ান ইউ। সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন, কঠোর। তাঁর একটা বক্তৃতা শুনছিলাম। তিনি বলেছিলেন ‘এটা কোনো খেলা নয়। এটা আমার-আপনার জীবন-মরণ। আমি আমার গোটা জীবন উৎসর্গ করেছি সিঙ্গাপুর বিনির্মাণে। যত দিন বেঁচে আছি, এটা কেউ নষ্ট করতে পারবে না।’ জীবনসায়াহ্নে লি কুয়ানের একটি বক্তৃতা শুনে চমকে উঠি। শেখ হাসিনার প্রতিচ্ছবি দেখি ওই কথাগুলোর মধ্যে। লি কুয়ান বলছিলেন ‘আমি অসুস্থ হয়ে যদি বিছানায় পড়ে থাকি, তখনো যদি জানি ভুল কিছু হচ্ছে, আমি জেগে উঠব।’ লি কুয়ান ২৫ বছরে সিঙ্গাপুরকে পাল্টে দিয়েছেন। শেখ হাসিনাও ১৭ বছরে বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন। পার্থক্য হলো, লি কুয়ান ছোট একটি দেশের ভাগ্য বদলেছেন কঠোর হাতে। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল একটি দেশের ভাগ্য শেখ হাসিনা বদলেছেন প্রবল প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

শেখ হাসিনা   আওয়ামী লীগ   সৈয়দ আশরাফ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগে কজন আইভী আছেন

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২২ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে। ১৬ জানুয়ারির এ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট উৎসবে ফিরল দেশ। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার পর্যন্ত বললেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন বর্তমান কমিশনের অধীনে সেরা নির্বাচন। এ নির্বাচনে ১৭ দিন ধরে উৎসবমুখর প্রচারণা চলেছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নোংরা, কুৎসিত অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেনি। কেউ কারও পোস্টার ছেঁড়েনি। নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো মিছিলে প্রতিপক্ষের হামলা হয়নি। প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের কোনো গুরুতর অভিযোগ ওঠেনি। ফলে ভোটের দিন ভোটাররা লাইন ধরে ভোট দিয়েছেন। ইভিএমে অনভ্যস্ততাসহ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি এ ভোটের উৎসবকে এতটুকু ম্লান করেনি। যে কোনো বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন একটি মডেল নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এ নির্বাচন প্রমাণ করেছে কমিশন, প্রশাসন, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল চাইলে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন। ওই নির্বাচনের পর ভোটাররা নির্বাচনবিমুখ হয়ে পড়েন। অনেক সরকারদলীয় প্রার্থীর বিনা ভোটে বিজয়ের খায়েশ চাপে। তারা টাকা দিয়ে, অথবা প্রভাব খাটিয়ে প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেন। বিনা ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের এক সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেখা যায় বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী, বিএনপি-জামায়াত এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও মনোনয়ন পান। মনোনয়ন বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এমপিরা তাদের ‘মাই ম্যান’দের প্রার্থী করাতে সবকিছু উজাড় করে দেন। যেখানে এমপির একান্ত অনুগতরা ‘নৌকা’ প্রতীক পাননি, সেখানে বিদ্রোহী হিসেবে তাদের প্রার্থী করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ক্রমে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা কোণঠাসা হতে শুরু করেন। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে গিয়ে দেখা যায়, আওয়ামী লীগই ব্যাকফুটে। একদিকে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের হতচ্ছিরি অবস্থা। এ রকম এক পরিস্থিতির মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অনেক কিছু প্রমাণ করতে হয়েছে। এ নির্বাচনকে আমি বলতে চাই নমুনা জরিপ। আওয়ামী লীগের প্রতি কতটা জনসমর্থন আছে তা ছোট্ট করে পরীক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে এক ব্যক্তি বা দলের প্রতি জনগণের অরুচি হয় কি না তা পরখ করে দেখার নির্বাচন ছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যেই বিএনপি মহাসচিব এক বক্তৃতায় বললেন, ‘আওয়ামী লীগের জনসমর্থন এখন শূন্যে।’ ওই জনসভাতেই বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইকবাল মাহমুদ টুকু বললেন, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনবিস্ফোরণ এখন সময়ের ব্যাপার।’ বিএনপি নেতার বক্তব্য যদি ন্যূনতম সত্য হয়, তাহলে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে তো আওয়ামী লীগের মহাভরাডুবি হওয়ার কথা ছিল। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ পালাবার পথ পাবে না।’ এ রকম কথামালার মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন জমিয়ে ফেলেন তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করেন। শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ নির্বাচন বিএনপির জন্যও ছিল এক বড় পরীক্ষা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকেই অবশ্য বিএনপি এ নিয়ে নিরীক্ষা চালাচ্ছে- দলীয় পরিচয় ব্যবহার না করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করা। এ কৌশলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি আংশিক সফল। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা ছিলেন জলের মতো। যে পাত্রে গেছেন সে পাত্রের আকার ধারণ করেছেন। কোথাও তারা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন, কোথাও জামায়াত বা অন্য দলকে। আর যেসব এলাকায় তাদের শক্তি সংহত (যেমন বগুড়া) সেখানে তারা কোমর কষে লড়েছেন। কত ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপি করা ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীরা বিজয়ী হলেন, তা মুখ্য বিষয় নয়। এ নির্বাচনের আবহে বিএনপির তৃণমূল নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে। কর্মীরা একটু হলেও গা-ঝাড়া দিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ হয়েই সম্ভবত বিএনপি তৈমূর আলম খন্দকারকে বলির পাঁঠা বানায় নারায়ণগঞ্জে। অথবা তৈমূর আলম খন্দকার তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন জুয়ার বোর্ডে রাখেন। লক্ষণীয়, ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলের আগে তৈমূর আলম খন্দকারকে পদ থেকে শুধু অব্যাহতি দেওয়া হয়। তৈমূর যদি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেন তাহলে তো শুরুতেই তাঁকে বহিষ্কার করা উচিত ছিল। কিন্তু বিএনপি দীর্ঘদিনের ত্যাগী এক নেতাকে নিয়ে নোংরা রাজনীতি করেছে। বিএনপি অপেক্ষা করেছে নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত। এ নির্বাচনে যদি নাটকীয়ভাবে তৈমূর আলম খন্দকার জয়ী হতেন তাহলে কি বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করত? অসম্ভব। বিএনপি নেতারা তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিতেন। বিএনপি নেতারা তখন কী বলতেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিএনপি নেতারা বলতেন, এ সরকার যে কত অজনপ্রিয় তা নারায়ণগঞ্জে প্রমাণিত হলো। তাঁরা বলতেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরাজিত হয়, সরকারের এখনই পদত্যাগ করা উচিত, ইত্যাদি। তৈমূর আলম খন্দকার শুধু প্রতীক ছাড়া বিএনপির প্রার্থীই ছিলেন। গোটা দল তাঁর পেছনে ছিল। তৈমূর আলম রাজনীতির হিসাব কষেই নির্বাচন করেছিলেন। তিনি জানতেন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত। একাংশের ভোট আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী পাবেন না। তৈমূর জানতেন, ২০০৩ সাল থেকেই কখনো পৌরসভায়, কখনো সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে আইভী। নারায়ণগঞ্জের মতো জায়গায় ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকা একজনকে অনেক ভোটার ভোট দেবেন না। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে জনগণের একঘেয়েমি আসে। সবাইকে খুশি করা সম্ভব হয় না। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঝোঁকে। এ দুই হিসাব মিলিয়ে তৈমূর নির্বাচনের মাঠে নেমেছিলেন। তিনিও হয়তো বাংলাদেশের সুশীল সমাজের মতো মনে করেছিলেন, এ নির্বাচনও কলঙ্কিত হবে। জয়ী হতে আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে ব্যবহার করবে। হাতি প্রতীকের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হবে। প্রচারণায় মাঠে অন্যদের নামতেই দেওয়া হবে না। ফলে জয় অথবা কারচুপির অভিযোগে কলঙ্কিত নির্বাচন- এ দুই গন্তব্যই তৈমূরের রাজনৈতিক অধ্যায়কে আরও উজ্জ্বল করবে। এ রকম হিসাব-নিকাশ নির্বাচনের আগে অনেকের মুখেই শুনেছি। এ নির্বাচনে তৈমূর আলম খন্দকারের হারাবার কিছু নেই। কিন্তু তিনি কি জানতেন, ১৬ জানুয়ারির পর সব হারাবেন?

আওয়ামী লীগের জন্য এ নির্বাচন ছিল এক জটিল সমীকরণ। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা, একই সঙ্গে জয়- দুটো অর্জন একসঙ্গে করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নামায় আওয়ামী লীগ। যদি আইভী পরাজিত হতেন তাহলে দেশে কথার বন্যা বয়ে যেত। আওয়ামী লীগের এখন ন্যূনতম জনপ্রিয়তা নেই এ কথা এখন ফিসফিস করে অনেকেই বলেন। এ নির্বাচনের পর এ ধরনের কথাবার্তা বলা হতো ঢাকঢোল পিটিয়ে। আওয়ামী লীগে অনৈক্য-বিভক্তি নিয়ে এখন প্রকাশ্যেই কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে হারাতে আওয়ামী লীগই যথেষ্ট। আইভী পরাজিত হলে এ বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হতো। আইভী হারলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের পদত্যাগের দাবি বেগবান করার চেষ্টা হতো। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীও জানতেন, এ নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং। বিতর্কমুক্ত নির্বাচন করে নৌকাকে বিজয়ী করতে হবে। এজন্য তিনি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেন দলের ত্যাগী, দুঃসময়ের কান্ডারি দুই নেতার হাতে। জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম। এঁরা দুজন দলের জন্য উৎসর্গীকৃত দুই প্রাণ। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের কঠিন সময়ে এঁরাই দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। দলের স্বার্থের প্রশ্নে এঁরা আপস করেননি কখনো। জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম আরও কয়েকজন নেতাকে যুক্ত করেন। আবদুর রহমান, বাহাউদ্দিন নাছিম, এস এম কামাল নির্বাচনী টিমে যুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বের যুগের সূচনা করেন। নানক-আজমরা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা। তাঁরা চাইলে শুরুতেই নির্বাচনের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারতেন। তাঁরা যদি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কর্মীদের নির্দেশ দিতেন, অন্য কোনো প্রার্থীকে প্রচারণার জন্য মাঠে নামতে দেওয়া হবে না- তাহলে এ প্রশাসন, এ নির্বাচন কমিশন কি কিছু করতে পারত? না। নানক-আজম টিম যদি সিদ্ধান্ত নিত, যে কোনো প্রকারে নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে জয়ী করতেই হবে- তাহলে কি নারায়ণগঞ্জ ভোটের উৎসবে রঙিন হতো? যে কোনো দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের সদিচ্ছা এবং আকাঙ্খার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। ক্ষমতাসীন দল যদি না চায় তাহলে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চান এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর আকাঙ্খার বাস্তবায়নে কাজ করছে জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় টিম। এ টিম প্রশাসনকে প্রভাবিত করা ও ভোট কারচুপির কৌশল আবিষ্কারের চেয়ে ভালো নির্বাচন করে জয়ে আগ্রহী ছিল। সেভাবেই তাঁরা পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। এ টিম জানত আইভীর জয়ের প্রধান এবং একমাত্র বাধা হলো আওয়ামী লীগের অন্তঃকলহ। এ কারণে তাঁরা আওয়ামী লীগের কোন্দল মেটাতে কাজ করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে, কঠোর হাতে। নারায়ণগঞ্জ ছাত্রলীগের কমিটি বাতিলের মধ্য দিয়ে তাঁরা প্রথম বার্তা দেন। এরপর শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলন। আইভীবিরোধীদের নৌকার পক্ষে প্রচারণা। নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগকে বাহ্যিকভাবে হলেও এক সুতোয় গেঁথেছে পাঁচজনের কেন্দ্রীয় টিম। আমি মনে করি এটাই তাঁদের সবচেয়ে বড় সফলতা। 
আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর জন্য এ নির্বাচন ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জের। ২০০৩ সালে এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচন করেন। তখন ক্ষমতায় বিএনপি-জামায়াত জোট। সে নির্বাচনে জয়ী হওয়া যতটা কঠিন ছিল, তার চেয়েও কঠিন ছিল এবারের নির্বাচনে জয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ২০১১ ও ২০১৬ সালের দুটি নির্বাচনেই তিনি বিজয়ী হন। যে দেশে মানুষ একটি টিভির চ্যানেল বেশিক্ষণ দেখে না। রিমোট কন্ট্রোলে চাপ দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে চ্যানেল পাল্টায়। যে দেশে জনপ্রতিনিধির চেহারা, পোশাক এমনকি তার আত্মীয়স্বজনের স্ফীতি নিয়ে জনগবেষণা হয়। সে দেশে একজন নারীর তৃতীয়বারের মতো মেয়র হওয়াটা এত সহজ নয়। কিন্তু আইভী নারায়ণগঞ্জে তাঁর একটা আলাদা ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কটা তিনি আলগা হতে দেননি। নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করেন তিনি লড়াকু, সাহসী, সৎ। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে তিনি দৃশ্যমান কিছু উন্নতি করেছেন। জনগণ তাঁকে বিশ্বাস করে। একদিকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা টিম নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রকাশ্য কোন্দল বন্ধ করেছে, অন্যদিকে আইভীর ইমেজ- এ দুইয়ে মিলে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিজয় সহজ হয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে লাভ হয়েছে অন্য জায়গায়। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন জয়ের ফরমুলা আওয়ামী লীগ পেয়ে গেছে। শেখ হাসিনার ইমেজ, উন্নয়ন, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং আইভীর মতো যোগ্য প্রার্থী- এ চার স্তম্ভকে এক বিন্দুতে মেলাতে পারলেই আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিততে পারে। আগামী নির্বাচনে জয়ের জন্য হুদার মতো নির্বাচন কমিশন দরকার নেই। আমলারা নির্বাচন জিতিয়ে দেবে এ ভরসায় তাদের অন্যায় আবদার মানার প্রয়োজন নেই। ডিসিরা পক্ষে থাকলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া যাবে এমন উদ্ভট চিন্তার প্রয়োজন নেই। ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী সংগঠন এবং যোগ্য প্রার্থী আওয়ামী লীগের জন্য আগামী নির্বাচন সহজ করে দিতে পারে। বিশেষ করে গত ১৩ বছর আওয়ামী লীগ যে উন্নয়ন করেছে তা বিস্ময়কর। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। এ বছরই পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হবে। এসবই হবে আওয়ামী লীগের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। আওয়ামী লীগ হয়তো তার অনৈক্য এবং বিভক্তিও কাটিয়ে তুলতে পারবে। কারণ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর প্রতি প্রতিটি কর্মীই আস্থাশীল। কিন্তু আইভীর মতো যোগ্য প্রার্থী কজন আছেন? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভুল প্রার্থীর মাশুল দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। ফরিদপুরের মতো আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকায় নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। অযোগ্য প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক দেওয়ার পরিণাম কী ভয়াবহ হতে পারে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। এখন যারা আওয়ামী লীগের এমপি আছেন, তাদের কজন জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন? কজন দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন? এ প্রশ্নের মুখোমুখী আওয়ামী লীগকে হতেই হবে। আওয়ামী লীগের দুই ডজনের বেশি এমপি আছেন যাঁরা গত দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, অথচ ভোট কী তা জানেন না। এঁরা বিনা ভোটে হ্যাটট্রিক এমপি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এক জেলায় এমপি হয়েছেন সাবেক এক আমলা। তিনি এলাকায় যান না। জনগণের সঙ্গে কথা বলেন না। যে দু-চার জনের সঙ্গে বলেন, সেখানে তাঁকে স্যার না বললে ক্ষুব্ধ হন। এ রকম উদাহরণ অনেক। এমপিদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্যসহ অভিযোগের স্তূপ। সেদিন সংসদে এক এমপি বললেন, পিয়ন নাকি এমপিদের পাত্তা দেয় না! এমপি যদি তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে সম্মান আদায় করতে না পারেন তাহলে তাঁকে কি ত্রাণের ঢেউটিনের মতো সম্মান বণ্টন করা হবে! কজন এমপি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন জনগণের সঙ্গে তাঁর মধুর সম্পর্ক। জনগণের জন্য তিনি সবকিছু করতে প্রস্তুত। যেসব জনপ্রতিনিধি সংসদ সদস্য পদ টাকা বানানোর মেশিন মনে করেন তাঁরা আবার মনোনয়ন পেলে কারচুপির পথই খুঁজবেন। তাঁরা কোন মুখে ভোট চাইতে যাবেন? এজন্য তাঁরা আবার বিনা ভোটে এমপি হতে চাইবেন। অথবা প্রশাসন দিয়ে ভোট কারচুপি করাতে মরিয়া হবেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে কি আওয়ামী লীগে যোগ্য প্রার্থী নেই? আইভীর মতো সৎ, জনবান্ধব নেতা কি আওয়ামী লীগে কমে গেছে? অবশ্যই না। অনেক আইভী আওয়ামী লীগে আছেন। অনেক জনবান্ধব, জনপ্রিয় ব্যক্তি আওয়ামী লীগে আছেন। পদ-পদবি ছাড়াও জনগণ যাঁদের সম্মান করে, তাঁদের খুঁজে বের করাই আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর যাঁরা মনে করেন ২০১৪ কিংবা ২০১৮-এর মতো আবার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এমপি হবেন তাঁদের হাতে এলাকা, দেশ এবং আওয়ামী লীগ কোনোটাই নিরাপদ নয়। তাঁরা সম্ভবত কার্ল মার্কসের সেই অমর উক্তি জানেন না। মার্কস বলেছিলেন, ‘ইতিহাসে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি একইভাবে হয় না।’

 
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

আওয়ামী লীগ   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন: চমকের অপেক্ষা

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৫ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে কি কোনো চমক হবে? আজ নির্বাচনী প্রচারণা ছিল না কিন্তু তারপরও তৈমুর আলম খন্দকার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন যে, তিনি নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোটে বিজয়ী হবেন এবং মরে গেলেও মাঠ ছাড়বো না। তার এই বক্তব্যের আগেই গতকাল নারায়ণগঞ্জের কিছু ভোটার তাকে চমকে দেন। তিনি যখন জনসংযোগ করছিলেন তখন কয়েক'শ মানুষ হঠাৎ করেই তার সঙ্গে যুক্ত হন। এই সমস্ত ঘটনাগুলো নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে চমকের আভাস দিচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কোনো চমক হবেনা, নির্বাচনে অনিবার্যভাবেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী বিজয়ী হবে। চমক হোক না হোক, নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন জাতি প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে গত কিছুদিন ধরে মানুষের মধ্যে নির্বাচন সম্পর্কে যে অনীহা, অনাস্থা তৈরি হয়েছে সেই অনীহা, অনাস্থা দূর করার ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে অনেকে বিশ্বাস করে। নানা কারণে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের ব্যাপারে ভোটাররা এবং সাধারণ জনগণ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

প্রথমত, এই নির্বাচনে দুই পক্ষই সমান্তরালভাবে প্রচারণা করেছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আইভী এবং বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার দুজনেই প্রায় সমানে-সমানে প্রচারণা করেছেন। অনেক সময় দেখা যায় যে, নির্বাচনী প্রচারণার মাঝপথেই অভিযোগ ওঠে যে বিএনপিকে নির্বাচনী প্রচারণা করতে দেওয়া হচ্ছে না বা বিরোধীদলের পোস্টার লাগাতে দেওয়া হচ্ছে না, বিরোধী দলের কর্মীদেরকে বাদ দেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি এবার নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে এ ধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি। বরং এই নির্বাচনের প্রচারণার শেষদিন পর্যন্ত দুই পক্ষই সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনী প্রচারণা করেছেন।

দ্বিতীয়ত, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে কাদা ছোড়াছুড়ি কম হয়েছে। একবার মাত্র তৈমুর আলম খন্দকার আইভীকে গডমাদার বলে সম্বোধন করেছিলেন এর কিন্তু পরবর্তীতে তিনি এই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণার দিকে আর এগিয়ে যাননি।

তৃতীয়ত, নারায়ণগঞ্জে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মোটামুটি নিরপেক্ষ ভূমিকাই পালন করতে দেখা গেছে প্রচারণার সময়।

চতুর্থত, অন্যান্য নির্বাচনে যেটা দেখা যায় যে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়ান, ভোটের দু'এক ঘণ্টা পরেই তারা নানা রকম অভিযোগ এনে ভোট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। কিন্তু তৈমুর আলম খন্দকার বলেছেন যে, মরে গেলেও তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন না। অবশ্য এর আগে আরেকবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি নির্বাচনের দিন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। তবে এবার তিনি সেটি করবেন না বলে জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন।

ফলে শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ভোট উৎসবে সাধারণ মানুষ ফিরবে, এটাই সকলে প্রত্যাশা করে। সাধারণ মানুষ যদি ভোট দেয় তাহলে সেটিই হবে বাংলাদেশের নির্বাচনে একটা বড় চমক। ২০১৮ সালের পর থেকে নির্বাচন সম্পর্কে যে অনাস্থা এবং অনীহা সেটা দূর করার ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ একটা বড় ভূমিকা পালন করবে বলে অনেকে প্রত্যাশা করেন। পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জবাসী তাদের মেয়র বাছাই করবে। এর ফলে নির্বাচন নিয়ে যে সংকট এবং নেতিবাচক কথাবার্তা, সেটিও অনেকাংশে দূর হবে বলে অনেক মহল আশা করে। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে চমক হোক বা নাই হোক, নির্বাচনের পরে যেন সকল পক্ষ এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সেটি হবে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভোটাররা সেই প্রত্যাশাই করেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন   নাসিক   নির্বাচন   আওয়ামী লীগ   বিএনপি   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী   শামীম ওসমান   তৈমুর আলম খন্দকার  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচন কমিশনে নতুন হুদা-আজিজ যেন না আসে

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৫ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

ঘটনাটি লিখেছেন ড. আকবর আলি খান। তাঁর ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ শিরোনামে গ্রন্থের একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ‘নির্বাচন পরিচালনা : আমার ভোট আমি দেব’। এ প্রবন্ধে আকবর আলি খান লিখেছেন, ‘উনিশ শ ষাটের দশকে তদানীন্তন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত ছিল। তার নির্বাচনী এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক ব্যক্তি বাস করতেন। তাদের কাছে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই তারা কোনোমতেই ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ভোট দেবেন না। অন্যদিকে সব সংখ্যালঘু ভোট তার বিপক্ষে চলে গেলে তার নির্বাচনে পাস করার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ হয়ে যায়। চৌধুরীর চেলারা তাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে ভোটারদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। চৌধুরী এ পরামর্শ গ্রহণ করেননি। তিনি সরাসরি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় যান এবং সেখানে তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের ব্যবস্থা নেন। গ্রামের বৈঠকে তিনি প্রথমেই তার নিজের এলাকায় রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ এবং স্বাস্থ্য খাতে যেসব কাজ করেছেন সেগুলো তুলে ধরেন এবং প্রশ্ন করেন যে তিনি কি সত্যি কথা বলেছেন? সবাই এক সুরে বলে উঠলেন- চৌধুরী সাহেব যা বলেছেন তা ঠিক। এরপর তিনি প্রশ্ন করলেন, এত কাজ করার পর জনসাধারণের পক্ষে তাকে ভোট দেওয়া ঠিক হবে কি হবে না। সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন- তাকেই নির্বাচনে ভোট দেওয়া উচিত। এরপর চৌধুরী সাহেব বললেন, জনগণের স্বীকৃতিতে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এবং তিনি মনে করেন যে তিনি ভোট পেয়ে গেছেন। তিনি তখন তাদের পরামর্শ দেন, আপনাদের কষ্ট করে কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই। আমি আপনাদের ভোট পেয়ে গেছি। আর সঙ্গের চামুণ্ডাদের বলে দিলেন এ অঞ্চলের কোনো ভোটার যেন কষ্ট করে কেন্দ্রে না যায় তা নিশ্চিত করতে। সংখ্যালঘু ভোটাররা তার ইঙ্গিত বুঝতে পারেন এবং ভয়ে কেউ কেন্দ্রে হাজির হননি। বিপুল ভোটে ফজলুল কাদের চৌধুরী নির্বাচিত হন।’ (পৃষ্ঠা : ৩১৭, অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি)

ফ কা চৌধুরী ষাটের দশকে যে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের’ ফরমুলা আবিষ্কার করেছিলেন, নূরুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন গত প্রায় পাঁচ বছরে তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার এমন কোনো পথ নেই যা তাঁর নেতৃত্বে কমিশন পরীক্ষা করেনি। কারচুপি, ভোটাধিকার হরণের যত ফরমুলা আছে সবই প্রয়োগ হয়েছে হুদা কমিশনের আমলে বিভিন্ন নির্বাচনে। এখন নির্বাচন, ভোটের ফলাফল নিয়ে মানুষের আগ্রহ নেই। নির্বাচন কমিশনের কোনো কথা মানুষ এখন বিশ্বাস করে না। এ রকম ব্যর্থ ও অযোগ্য নির্বাচন কমিশন বিদায় নিচ্ছে এটাই হলো জাতির সব থেকে স্বস্তি। (ভাগ্যিস প্রধান নির্বাচন কমিশনারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কোনো বিধান নেই।)

বিদায়ের আগে বর্তমান নির্বাচন কমিশন শেষ বড় নির্বাচনের তদারকি করছে নারায়ণগঞ্জে। আগামীকাল (১৬ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ভোটে যখন মানুষের তীব্র অরুচি, ভোট দেওয়ার ফ কা ফরমুলা যখন আবার জাঁকিয়ে বসেছে তখন হুদা কমিশনের জন্য নারায়ণগঞ্জে সিটি নির্বাচন এক বিরাট সুযোগ। নিরুত্তাপ হওয়ার হাত থেকে এ নির্বাচন রক্ষা করেছেন বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি প্রার্থী হওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জে ভোটের উত্তাপ তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান আর আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর দীর্ঘদিনের বিরোধ এ নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। নির্বাচন কমিশন যদি অন্তত এ নির্বাচনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াত, সংবিধান ও আইনে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করত তাহলে একটা সুখস্মৃতি নিয়ে তারা বিদায় নিতে পারত। যাওয়ার আগে তাদের ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও দায়িত্বহীনতার বিপরীতে একটা ভালো নির্বাচনের উদাহরণ থাকত। কিন্তু নির্বাচন জমে উঠতেই কমিশন দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। নির্বাচন সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জে ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠেছে। সংসদ সদস্য হওয়ার পরও শামীম ওসমানের নৌকার পক্ষে প্রচারণার ঘোষণা আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যা বলেছেন তা রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার মতো। তিনি বলেছেন, ‘শামীম ওসমান আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, কিন্তু শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেননি।’ অবুঝ সিইসিকে কে বোঝাবে আচরণবিধি লঙ্ঘনই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব অভিযোগ ও বিতর্কের মুখেই কাল নির্বাচন।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা স্টালিন ভোট সম্পর্কে এক মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘জনগণ যারা ভোট দেয়, তারা কিছুই নির্ধারণ করে না, যারা ভোট গণনা করে তারাই সবকিছু নির্ধারণ করে।’ একনায়ক স্টালিনের কথার প্রতিধ্বনি দেখা যায় হুদা কমিশন পরিচালিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয়। জনগণ ভোট দিল কি দিল না, কাকে দিল এসব আজকাল আর ব্যাপার নয়। ভোটের শেষে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি রিটার্নিং অফিসাররা যা বলেন তা-ই আসল। কেন্দ্র জনশূন্য থাকার পরও রিটার্নিং অফিসাররা দেখাচ্ছেন ৭০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। এটাই এখন ভোট। নির্বাচনের আগেই ক্ষমতাবান প্রার্থী ঘোষণা করছেন তার বাইরে কাউকে ভোট দিতে চাইলে কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই। অনেক স্থানে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট না দিলে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হবে। ইদানীং এসব কথা লুকিয়ে, গোপনে কেউ বলে না। প্রকাশ্যে বলে। এসব বলার পরও নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। বরং যে কোনো বাজে নির্বাচনের পরও দাঁত কেলিয়ে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে’ বলাটা নির্বাচন কমিশনের এক রোগে পরিণত হয়েছে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন এসব সমালোচনা মোটেও গায়ে মাখে না। কে কী বলল না বলল তা নির্বাচন কমিশনের কিছুই যায় আসে না। বিশ্বে এই প্রথম একটি নির্বাচন কমিশন যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দল আছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা আর নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার গত পাঁচ বছর একে অন্যের সমালোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। নূরুল হুদা যেন আওয়ামী লীগকে জেতাতে মরিয়া। আর তালুকদার বিএনপির ভাষায় কথা বলতে ব্যাকুল। মাহবুব তালুকদারকে অবশ্য আমার নির্বাচন কমিশনার মনে হয় না। তাঁকে আমার বিরোধী দলের নেতা মনে হয়। একটি সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তি এত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অনৈতিক হন কীভাবে তা আমার এক বড় প্রশ্ন। প্রতিটি নির্বাচনের পরই তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। নির্বাচন নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। সুষ্ঠু নির্বাচন না করার ব্যর্থতা তাঁরও। তিনি যদি দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তাহলে পদত্যাগ করেন না কেন? গাড়ি, বাড়ি, বেতন, পিয়ন-চাপরাশি নিয়ে তিনি শুধু সমালোচনা করেন। এটা কি নৈতিক?

এ নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা এখন ধ্বংসস্তূপ। হুদা কমিশনের রাজত্বে বাংলাদেশের নির্বাচনগুলোকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, ভোট ছাড়া নির্বাচন। একে বলা যেতে পারে ফজলুল কাদের চৌধুরী ফরমুলার নির্বাচন। এ পদ্ধতিতে ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার হয় না। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভোটারদের ‘মনের ভাব’ বুঝে ফেলেন। সে অনুযায়ী ভোট হয়ে যায়। এ ভোটে কোনো রক্তারক্তি নেই, খুনোখুনি নেই। নির্বাচন কর্তারাই নির্ধারণ করেন ভোটের ফলাফল। হুদা কমিশন আবিষ্কৃত দ্বিতীয় ধরনের ভোট আরও নিরাপদ। এখানে একাধিক প্রার্থী ফরম কিনছেন। কিন্তু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন দেখা যায় একজন ছাড়া আর কোনো প্রার্থী নেই। অন্য প্রার্থীদের ‘ম্যানেজ’ করা হয়। ভোটের আগেই নির্বাচন কমিশন ওই একক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে। এটা অত্যন্ত আধুনিক ও ঝুঁকিহীন ভোটব্যবস্থা। এ ভোটে অর্থ খরচ কম, ভোট নিয়ে প্রচারণার জন্য শব্দদূষণের ঝুঁকি নেই। লোকজনের অযথা পরিশ্রমের দরকার নেই। হুদা কমিশন উদ্ভাবিত তৃতীয় ধরনের ভোটব্যবস্থা একটু সহিংস, ঝুঁকিপূর্ণ। একে ভোট না বলে যুদ্ধ বলা ভালো। এখানে মোটা দাগে দুটি পক্ষ থাকে। এরা নির্বাচনী প্রচারণা, জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনায় খুব একটা আগ্রহী থাকে না। চর দখলের মতো এরা এদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এলাকা দখলে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর চড়াও হয়। বেশ কিছু নিরীহ মানুষের প্রাণও যায়। তাতে কী, ভোটের অধিকারের জন্য রক্তদানের নজির তো এ দেশের পুরনো ইতিহাস। দুই পক্ষের খুনোখুনি-মারামারিতে যে পক্ষ জয়ী হয় কেন্দ্র তার। তিনিই ভোটে বিজয়ী। এ সহিংসতার সময় নির্বাচন কর্মকর্তারা খানিকটা বিশ্রামে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে যে কোনো একটা পক্ষকে সমর্থন দেয়। জনগণ ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। যুদ্ধ শেষে বিজয়ীকে কমিশন নির্বাচিত ঘোষণা করে।

নির্বাচন কমিশনের এ বেহাল দশার মধ্যেই শেষ হচ্ছে তার মেয়াদ। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান কমিশন বিদায় নেবে। হুদা কমিশনের বিদায়ের দিন দেশে ভোটমুক্তির উৎসবের দিন হতে পারে। এ কমিশন যেন মানুষের ভোটাধিকার বোতলবন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু হুদা কমিশন বিদায় নিলেই কি মানুষ দলবেঁধে, লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট উৎসব করবে? বর্তমান কমিশন চলে গেলেই কি জনগণের ভোটের অনীহা কেটে যাবে? আমি তা মনে করি না। হুদা কমিশনের পর আবার যদি একই ধরনের একটা নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় তাহলে হয়তো আমাদের ভোটব্যবস্থা আরও অন্ধকারে চলে যাবে। তা যদি হয় তাহলে গণতন্ত্র সংকটে পড়বে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে সংলাপ শুরু করেছেন। ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে এ সংলাপ শেষ হবে। কিন্তু এ সংলাপ নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিএনপিসহ দেশের বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এ সংলাপে যায়নি। আমি মনে করি বিএনপির এটি আরেকটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে সব দলের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ভোট ব্যবস্থার এই হালের জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও কম দায়ী নয়। যে কোনো প্রকারে ক্ষমতায় থাকার জন্য অথবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা নির্বাচনব্যবস্থা কলুষিত করেছে। জনগণের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। বিএনপি আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন করে ভোটে জয়ী হতে চেয়েছিল। এরশাদ অনুগতদের নির্বাচন কমিশনে বসিয়ে নির্বাচন কমিশনকে তামাশায় পরিণত করেছিলেন। বর্তমান সরকারও রকিব-হুদাদের কমিশনে বসিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছে। এবার আরেকটা হুদা কমিশন হলে তা হবে গোটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশে বহু যোগ্য ব্যক্তি আছেন। সরকারকে এখন সবার আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়ে একটা নির্বাচন কমিশন গঠন করতেই হবে। নূরুল হুদার মতো নির্বাচন কমিশন যদি আওয়ামী লীগ সরকার আবার গঠন করে তাহলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আওয়ামী লীগই। এ দেশে গণতন্ত্র এবং ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে ত্যাগ স্বীকার করা দল আওয়ামী লীগ। এবার নির্বাচন কমিশন গঠন তাই আওয়ামী লীগের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। তবে একটি কথা মনে রাখা দরকার, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব নয়। বিরোধী দলেরও দায়িত্ব। বিরোধী দল যদি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, ভোটে উদ্বুদ্ধ করতে পারে তাহলে ক্ষমতাসীনরা কারচুপি করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনও যা খুশি করতে পারে না। এ নারায়ণগঞ্জেই ২০০৩ সালের পৌরসভা নির্বাচন তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তখনো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হয়নি। পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। সে সময় নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গণগ্রেফতার করা হলো। নির্বাচনী প্রচারে গেলেই বাধা, হামলা। নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের দেড় শতাধিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু আইভী দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে নির্বাচনের মাঠে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আইভী বিজয়ী হন। চট্টগ্রামে প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরী, ঢাকায় প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ মাটি কামড়ে থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করেই জিতেছিলেন। ইদানীং বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হতে ‘জনগণ’ নয় ক্ষমতাসীন দলের ওপর নির্ভর করে। তারা মনে করে সরকার আদর-আপ্যায়ন করে তাদের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেবে। কিন্তু নির্বাচনে কেউ তো কাউকে জামাই আদর করবে না। নির্বাচনে কীভাবে জয়ী হতে হয় সে শিক্ষা পাওয়া যায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি থেকে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু তাঁর নির্বাচনের বিবরণ দিয়েছেন এভাবে- ‘ঢাকা থেকে পুলিশের প্রধানও গোপালগঞ্জে হাজির হয়ে পরিষ্কারভাবে তার কর্মচারীদের হুকুম দিলেন মুসলিম লীগকে সমর্থন করতে। ফরিদপুর জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট জনাব আলতাফ গওহর সরকারের পক্ষে কাজ করতে রাজি না হওয়ায় সরকার তাকে বদলি করে আরেকজন কর্মচারী আনলেন। তিনি আমার এলাকায় গিয়ে নিজেই বক্তৃতা করতে শুরু করলেন এবং ইলেকশনের তিন দিন আগে সেন্টারগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে জামান সাহেবের সুবিধা হতে পারে। আমার পক্ষে জনসাধারণ, ছাত্র ও যুবকরা কাজ করতে শুরু করল নিঃস্বার্থভাবে। নির্বাচনের চার দিন আগে শহীদ সাহেব সরকারি দলের ওইসব অপকীর্তির খবর পেয়ে হাজির হয়ে দুটো সভা করলেন। আর নির্বাচনের একদিন আগে মওলানা সাহেব হাজির হয়ে একটা সভা করলেন। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে খন্দকার শামসুল হক মোক্তার সাহেব, রহমত জান, শহীদুল ইসলাম ও ইমদাদকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে ফরিদপুর জেলে আটক করা হলো। একটা ইউনিয়নের প্রায় ৪০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে আরও প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট দেওয়া হয়। শামসুল হক মোক্তার সাহেবকে জনসাধারণ ভালোবাসত। তাঁর কর্মীরা খুব নামকরা ছিল। আরও অনেককে গ্রেফতার করার ষড়যন্ত্র আমার কানে এলে তাদের আমি শহরে আসতে নিষেধ করে দিলাম। আমার নির্বাচনী এলাকা ছাড়া আশপাশের দুই এলাকাতে আমাকে যেতে হয়েছিল- যেমন যশোরের আবদুল হাকিম সাহেবের নির্বাচনী এলাকায়, ইনি পরে স্পিকার হন; এবং আবদুল খালেকের এলাকায়, ইনি পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন।

নির্বাচনে দেখা গেল ওয়াহিদুজ্জামান সাহেব প্রায় ১০ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন। জনসাধারণ আমাকে শুধু ভোটই দেয়নি, প্রায় পাঁচ হাজার টাকা নজরানা হিসেবে দিয়েছিল নির্বাচনে খরচ চালানোর জন্য। আমার ধারণা হয়েছিল, মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবনও দিতে পারে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী-শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা : ১৫৬-৫৭)।

রাজনীতি এবং নির্বাচনের মূল কথা এটাই, জনগণকে ভালোবাসতে হবে। জনগণের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এখন রাজনীতিতে তা কতটা আছে? রাজনীতিবিদরা জনগণের ওপর আস্থা কতটা রাখেন। জনগণের ওপর আস্থা থাকলে কেউ নির্বাচনে নয়ছয়ের কথা ভাবে না। হুদা কমিশনের মতো দৈত্যও রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসে না। জনগণের ওপর আস্থাহীন রাজনীতি নির্বাচন কমিশনে হুদাদেরই খুঁজবে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

নির্বাচন কমিশন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

বাংলা ইনসাইডার প্রেডিকশন: অনেক ব্যবধানে জিতবেন আইভী

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৩ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

আগামীকাল মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা। নির্বাচনের জমজমাট প্রচারণায় এখন পর্যন্ত সহ-অবস্থান এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রয়েছে। তৈমুর আলম খন্দকার এখন পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আজ আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের শুরুতে তৈমুর আলম খন্দকার যে চমক দেখিয়েছেন তা নির্বাচনী প্রচারণা যতই এগিয়েছে ততই তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে যখন আইভী বিরোধীরা গুটিয়ে গেছেন, তাদেরকে প্রচারণায় কোন পক্ষে দেখা যায়নি, তখন তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচনের দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে গেছেন। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত জামায়াত এবং হেফাজত কাকে সমর্থন দিবে এটিও এখন একটি বড় রহস্য হয়ে রয়েছে। এ সমস্ত বাস্তবতায় নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে স্পষ্ট ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে আইডির সঙ্গে তৈমুর আলম খন্দকারের। বাংলা ইনসাইডার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ করে এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে যে, নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী আবারও নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তিনি বিপুল ভোটেই নির্বাচিত হবেন।

আইভী ইতিমধ্যেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনে যেন কোনরকম কারচুপি করা না হয়, বিপক্ষ দলের এবং অন্যান্য বিরোধীদলের এজেন্টসহ কাউকে যেন ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে না দেওয়া হয়। আইভী নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম বিতর্ক হোক এটি চাচ্ছেন না। তিনি কোনোভাবেই চাইছেন না যে, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন উঠুক বা কোনরকম বিতর্ক হোক। বরং একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি মেয়র হতে চান। আর তৈমুর আলম খন্দকার মনে করছেন যে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নারায়ণগঞ্জের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে আইভী এবং তৈমুর আলম খন্দকারের একটি গোপন সমঝোতা কিনা, সেটাও দেখার বিষয়। কারণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে পরবর্তীতে নৌকার পক্ষে সমর্থন জানানো শামীম ওসমান স্পষ্টতই চাপের মুখে যেটা করেছেন সেটি সকলের কাছে পরিষ্কার। আর এই নির্বাচনে প্রথমদিকে বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে তিনি যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের কাছে বিতর্কিত হয়েছেন সেটিও অনেকে মনে করছেন। আর এ কারণেই, কেউ কেউ মনে করে যে নারায়ণগঞ্জে এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন আইভী এবং তৈমুর আলম খন্দকার উভয়েরই লাভ হবে। আইভী নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন, অন্যদিকে তৈমুর আলম খন্দকার বিএনপির প্রধান নেতা দাঁড়াবেন। এরকম একটি পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তৈমুর আলম খন্দকারও যে মেনে নিবেন, সেটা অনেকে ধারণা করছেন। ফলে এই নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জে একটি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে। বাংলা ইনসাইডার প্রক্ষেপণ করছে যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী অনেক ব্যবধানেই তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করবেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন   নাসিক   নির্বাচন   আওয়ামী লীগ   বিএনপি   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী   শামীম ওসমান   তৈমুর আলম খন্দকার  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শামীম ওসমান কি পারবেন আইভীকে হারাতে?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ০৮ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন আসলে কার বিরুদ্ধে কার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে? রাজনৈতিক অঙ্গনে এই প্রশ্ন ক্রমশ বড় হয়ে উঠেছে। এটি কি সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে তৈমুর আলম খন্দকারের প্রতিদ্বন্দ্বীতা নাকি সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে শামীম ওসমানের লড়াই? এই প্রশ্নটি এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় যত এগুচ্ছে, ততোই দেখা যাচ্ছে যে, শামীম ওসমান এবং ওসমান পরিবারের সদস্যরা তৈমুর আলম খন্দকারের পক্ষে কাজ করছে। যদিও তৈমুর আলম খন্দকারের সঙ্গে ওসমান পরিবারের বিরোধ দীর্ঘদিনের। কিন্তু আইভীকে ঠেকানোর জন্য সেই বিরোধ যেন এখন বন্ধ হয়ে গেছে। বরং আইভীকে ঠেকাতে শত্রু-শত্রু এখন বন্ধু হয়ে গেছে। গত কয়েক দিনে ওসমান পরিবার সমর্থিত বিভিন্ন ব্যক্তিদের তৎপরতার পর প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্বাচন আসলে তৈমুরের বিরুদ্ধে আইভীর নির্বাচন নয়, বরং এই নির্বাচন আসলে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে আইভীর নির্বাচন। আর সে কারণেই এই নির্বাচনে শামীম ওসমান না থেকেও আছেন। শামীম ওসমানপন্থি বা ওসমান পরিবারের সদস্যদের মনে করছেন যে, এই নির্বাচন তাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই। কারণ এই নির্বাচনে যদি শেষ পর্যন্ত যদি আইভী বিজয়ী হন তাহলে তা নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের আধিপত্যের উপর একটি চরম আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। আর সে কারণেই ওসমান পরিবার এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বন করছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবর দেখা গেছে যে, শামীম ওসমান পরিবারের যারা ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচন করছেন তারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তৈমুর আলম খন্দকারকে সমর্থন করেছেন। সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে ওসমান পরিবার তো নেই, এমনকি শামীম ওসমানের সমর্থক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত বা শামীম ওসমানের প্রভাব বলয়ে যারা নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি করেন তারা কেউই এই নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কোনো রকম কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করছে না। নির্বাচনের মাঠে আইভী একাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে তৈমুর আলম খন্দকার এই নির্বাচনে বেশকিছু বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বিএনপির পুরো সমর্থন পাচ্ছেন এবং বিএনপি নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবেই কাজ করছে। যদিও তৈমুর আলম খন্দকারকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে কিন্তু বিএনপির যে সমস্ত নেতা এখন তৈমুর আলম খন্দকারের পক্ষে কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা এই নির্বাচন মনিটরিং করছেন, তৈমুর আলম খন্দকারকে নানারকম পরামর্শ দিচ্ছেন এবং প্রতিনিয়ত নির্বাচন সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, গত কয়েকদিনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একটি অংশ তৈমুর আলম খন্দকারকে সমর্থন দিচ্ছে। ফলে সেলিনা হায়াৎ আইভী খণ্ডিত আওয়ামী লীগ নিয়ে নির্বাচন করেছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শামীম ওসমানকে নিষ্ক্রিয় করা এবং তিনি যেন আইভীর বিরুদ্ধে কোনো কাজ না করে, সেটিকে নিশ্চিত করার জন্য হেভিওয়েট নেতাদের নামানো হয়েছে। জাহাঙ্গীর কবীর নানক, মির্জা আজমের মত জনপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এখন নারায়ণগঞ্জে যাচ্ছেন, তবে নির্বাচনী প্রচারণা নয়, তারা মূলত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আইভীর বিরুদ্ধে যেন আওয়ামী লীগের কোনো অংশ কাজ না করে সেটাই এখন নানক-আজমের প্রধান লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী আসলে তৈমুর আলম খন্দকার নন, শামীম ওসমানই। প্রশ্ন উঠেছে, শামীম ওসমান কি পারবেন আইভীকে হারাতে? আইভীকে হারানোর পর তার রাজনীতি যে ঝুঁকিতে পড়বে সেই ঝুঁকি তিনি কীভাবে সামলাবেন? নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনের উত্তাপ ছাপিয়ে এটি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ   নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন   নাসিক   নির্বাচন   আওয়ামী লীগ   বিএনপি   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী   শামীম ওসমান   তৈমুর আলম খন্দকার  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন