এডিটর’স মাইন্ড

বাংলা ইনসাইডার প্রেডিকশন: অনেক ব্যবধানে জিতবেন আইভী

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৩ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail বাংলা ইনসাইডার প্রেডিকশন: অনেক ব্যবধানে জিতবেন আইভী

আগামীকাল মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা। নির্বাচনের জমজমাট প্রচারণায় এখন পর্যন্ত সহ-অবস্থান এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রয়েছে। তৈমুর আলম খন্দকার এখন পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আজ আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের শুরুতে তৈমুর আলম খন্দকার যে চমক দেখিয়েছেন তা নির্বাচনী প্রচারণা যতই এগিয়েছে ততই তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে যখন আইভী বিরোধীরা গুটিয়ে গেছেন, তাদেরকে প্রচারণায় কোন পক্ষে দেখা যায়নি, তখন তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচনের দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে গেছেন। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত জামায়াত এবং হেফাজত কাকে সমর্থন দিবে এটিও এখন একটি বড় রহস্য হয়ে রয়েছে। এ সমস্ত বাস্তবতায় নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে স্পষ্ট ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে আইডির সঙ্গে তৈমুর আলম খন্দকারের। বাংলা ইনসাইডার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ করে এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে যে, নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী আবারও নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তিনি বিপুল ভোটেই নির্বাচিত হবেন।

আইভী ইতিমধ্যেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনে যেন কোনরকম কারচুপি করা না হয়, বিপক্ষ দলের এবং অন্যান্য বিরোধীদলের এজেন্টসহ কাউকে যেন ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে না দেওয়া হয়। আইভী নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম বিতর্ক হোক এটি চাচ্ছেন না। তিনি কোনোভাবেই চাইছেন না যে, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন উঠুক বা কোনরকম বিতর্ক হোক। বরং একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি মেয়র হতে চান। আর তৈমুর আলম খন্দকার মনে করছেন যে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নারায়ণগঞ্জের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে আইভী এবং তৈমুর আলম খন্দকারের একটি গোপন সমঝোতা কিনা, সেটাও দেখার বিষয়। কারণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে পরবর্তীতে নৌকার পক্ষে সমর্থন জানানো শামীম ওসমান স্পষ্টতই চাপের মুখে যেটা করেছেন সেটি সকলের কাছে পরিষ্কার। আর এই নির্বাচনে প্রথমদিকে বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে তিনি যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের কাছে বিতর্কিত হয়েছেন সেটিও অনেকে মনে করছেন। আর এ কারণেই, কেউ কেউ মনে করে যে নারায়ণগঞ্জে এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন আইভী এবং তৈমুর আলম খন্দকার উভয়েরই লাভ হবে। আইভী নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন, অন্যদিকে তৈমুর আলম খন্দকার বিএনপির প্রধান নেতা দাঁড়াবেন। এরকম একটি পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তৈমুর আলম খন্দকারও যে মেনে নিবেন, সেটা অনেকে ধারণা করছেন। ফলে এই নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জে একটি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে। বাংলা ইনসাইডার প্রক্ষেপণ করছে যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী অনেক ব্যবধানেই তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করবেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন   নাসিক   নির্বাচন   আওয়ামী লীগ   বিএনপি   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী   শামীম ওসমান   তৈমুর আলম খন্দকার  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

গ্রিনরুমে এক-এগারোর কুশীলবরা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২১ মে, ২০২২


Thumbnail গ্রিনরুমে এক-এগারোর কুশীলবরা

দেশজুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা। ভোজ্য তেল উধাও হচ্ছে বাজার থেকে। জিনিসপত্রের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে মুখর পন্ডিতরা। পি কে হালদারের কাহিনি এখন মুখরোচক আলোচনার বিষয়। সরকারি কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের ওপর বিদেশযাত্রাসংক্রান্ত এক অদ্ভুত পরিপত্র জারি করা হয়েছে। যার শিরোনামে বলা হয়েছে, বিদেশযাত্রা সীমিতকরণ আবার ভিতরে বলা হয়েছে, বিদেশযাত্রা বন্ধ। এর মাধ্যমে যেন অর্থনৈতিক সংকটকেই কবুল করা হয়েছে। ডলারের বাজার অস্থির। তেলের মতো ডলারের আকাল। সবকিছু দেখে-শুনে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বিপন্ন বিস্ময়- কী হচ্ছে দেশে? সবকিছু কি ঠিক আছে? সবকিছু জানা-বোঝার উপায় হলো গণমাধ্যম। মূলধারার গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক আর ইউটিউব দেখলে মনে হবে দেশে কোনো সরকার নেই। সরকারের পতন বোধহয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিবিড় তথ্যসন্ত্রাসে মূলধারার গণমাধ্যমও যেন উজ্জীবিত। দেশের সংবাদপত্রগুলোয় সুখবর নেই। দু-একটি গণমাধ্যম যেন জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর ঠিকাদারি নিয়েছে। ভোজ্য তেল, পিঁয়াজের মধ্যে তারা আর সীমাবদ্ধ নেই। সাবান, টুথপেস্টের মূল্যবৃদ্ধির মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আটা-ময়দার বিশ্ববাজার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে গণমাধ্যমে খবর বেরোল, বাংলাদেশের ৪৫ ভাগ গম আসে ইউক্রেন থেকে। আর যায় কই। পরদিন আটা-ময়দার দাম বাড়ল ২ টাকা। প্রতিদিন কোনো না কোনো সংবাদপত্রে বাজার নিয়ে আহাজারি, আর্তনাদ। আর টকশো শুনলে মনে হয় বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে গেল বলে! সাদামাটা চোখে মনে হতে পারে, এ সরকার বোধহয় সবকিছু ঠিকঠাকমতো চালাতে পারছে না। সরকার বোধহয় খেই হারিয়ে ফেলছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের এক পরিকল্পিত নীলনকশার বাস্তবায়ন চলছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে যে সাধারণ মানুষ যেন সরকারের প্রতি অনাস্থা জানায়। আর এ নীলনকশার বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছেন এক-এগারোর কুশীলবরা। অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ১৭ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ প্রতিদিনে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। এর শিরোনামে তিনি লিখেছেন- ‘দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা’। কিছুদিন ধরে সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী শেখ হাসিনাকে একজন দার্শনিক রাজনীতিবিদ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বিশ্বরাজনীতিতে দার্শনিক রাজনীতিবিদ খুব কমই পাওয়া যায়। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ছিলেন দার্শনিক রাজনীতিবিদ। নেতাজি সুভাষ বোস, মহাত্মা গান্ধী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, নেলসন ম্যান্ডেলা এঁরা প্রত্যেকেই দার্শনিক রাজনীতিবিদ। একটি দর্শনের জন্ম দিয়েছেন এবং সে দর্শন বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করেছেন। একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেখ হাসিনাও একটি দর্শন ঘিরে কাজ করছেন। শেখ হাসিনার দর্শন হলো ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’। অনেকেই হয়তো জানেন না, ২০১২ সালে এ দর্শনটি বিশ্বশান্তির দর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যগুলোকে রাজনীতির মেঠো বক্তৃতা ভেবে হালকাভাবে নিলে বড্ড ভুল হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি বক্তব্যেরই একটি গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য ও দর্শন আছে। গত সপ্তাহজুড়ে তিনি তাঁর বক্তব্যে ওয়ান-ইলেভেন প্রসঙ্গ আনছেন। দু-একটি গণমাধ্যমের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পত্রিকা পড়ে আমি দেশ চালাই না’। শ্রীলঙ্কায় দুর্যোগের পর এ দেশের কিছু গণমাধ্যম কয়েকজন সুশীলের বক্তব্য সামনে নিয়ে আসে। এ বক্তব্যে সুশীল পন্ডিতরা বাংলাদেশের পরিণতি শ্রীলঙ্কার মতো হবে বলে চাপা উল্লাসে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী তীব্র ভাষায় এর জবাব দেন। এ বিষয়টি তিনি আরও খোলাসা করেন মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভার সূচনা বক্তব্যে। শেখ হাসিনা কারও নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘তারাই বেশি কথা বলেন, তারাই সমালোচনা বেশি করেন যারা ইমারজেন্সি সরকারের পদলেহন করেছেন। চাটুকারি করেছেন।’ পরদিন (১৮ মে) আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এ বিষয়টি আরও বিস্তৃত পটভূমিতে তুলে ধরেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় তাঁকে দেশে আসতে না দেওয়াসহ ওই সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। অনুষ্ঠানের বক্তব্যে তিনি পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গ এনে দুই সুশীল শিরোমণির সমালোচনা করেন। শেখ হাসিনার সব বক্তব্য একত্রিত করে বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এখন বেশ জোরেশোরে চলছে। দেশের সুশীলসমাজের একটি অংশ এখন জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তৎপর হয়েছেন। কিছু সুশীল গণমাধ্যমকে সরকারের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

কদিন আগে গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় সরকারের এক ফরমুলা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। জাতীয় সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও ড. কামাল হোসেনের নাম প্রস্তাব করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নাম প্রস্তাব করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। তাঁকে আবার স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। জাতীয় সরকারে রাখার জন্য ডা. জাফরুল্লাহর প্রস্তাবে যাঁদের কথা বলা হয়েছে তাঁদের বেশ কয়েকজন ওয়ান-ইলেভেনের খেলোয়াড়। এ নাম দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের বিভ্রান্ত করার এক সচেতন চেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। জাতির পিতার ছোট কন্যা শেখ রেহানাকে জাতীয় সরকারে রাখার ন্যক্কারজনক ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে। আবার লন্ডনে পলাতক তারেক জিয়ার কন্যাকে জাতীয় সরকারের হিসসা দেওয়ার উদ্ভট প্রস্তাব আছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি বোধহয় বার্ধক্যজনিত বালখিল্য। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাঁর জাতীয় সরকারের ফরমুলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর মাধ্যমে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের মাঠে নামানোর এক পরিকল্পিত প্রয়াস রয়েছে। আরও লক্ষণীয় যে এ-জাতীয় সরকারের তত্ত্ব মাঠে হাজির করার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু ব্যক্তি সরব হয়েছেন, এঁরা এক-এগারোর সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত এবং অনির্বাচিত সরকারের সুবিধাভোগী। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে এ উচ্চারণে তাঁদের দুঃখের চেয়ে উল্লাসই যেন বেশি। রেমিট্যান্স কমেছে, এ তথ্য দিতে গিয়ে তাঁদের মুখের কোণে হালকা হাসি যেন আর গোপন থাকে না। ওয়ান-ইলেভেনে এসব ব্যক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিত যেসব গণমাধ্যম, তারা এখন সরকারের ছিদ্রান্বেষণে যেন অণুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে নেমেছে। কিছু কিছু গণমাধ্যম যেন এখন বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ওই সমালোচনা যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তাহলে তা ভয়ের কারণ বটে। কিছু কিছু পত্রিকা সে কাজটিই করছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে দেশটাকে ঝুঁকিপূর্ণ, সংকটময় দেখানোর চেষ্টা চলছে। সরকার ব্যর্থ এটি প্রমাণ করতে মরিয়া একটি মহল। শুধু মুখের কথায় বিভ্রান্ত মানুষ হয় না, এটা বোঝার জন্য তো বোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন নেই। এ কারণে সরকারের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি মহল সক্রিয়। এরা এমন কিছু কান্ড করছে যাতে সুশীল এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের বক্তব্য সত্য বলে প্রমাণিত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যাঁরা আছেন তাঁরা সরকারকে জনগণের প্রতিপক্ষ করার শপথ নিয়েছেন। এমন সব কর্মকান্ড তাঁরা করেছেন যাতে মনে হয় এ সরকার অক্ষম, অযোগ্য ও দুর্বল। বাজারের ওপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকার বিভিন্ন কারণে নানা রকম সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। কিন্তু বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণার কী দরকার ছিল? এটি সাধারণ মানুষের কাছে সুশীলদের বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। এর প্রভাব পড়েছে ডলারের বাজারে। ডলারের কেবল দাম বাড়েনি, দুষ্প্রাপ্যও হয়েছে। এ সমাজে কিছু মানুষ আছে যারা সুযোগসন্ধানী। তারা সব সময় মানুষকে জিম্মি করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে চায়। এরা ভোজ্য তেল থেকে শুরু করে ডলার সব মজুদ করে। বিদেশে অর্থ পাচার করে। পি কে হালদার এদের ভালো বিজ্ঞাপন। দেশকে অস্থির-অস্থিতিশীল করতে পারলেই এদের পোয়াবারো। এদের কারণে গণতান্ত্রিক সরকার সংকটে পড়ে। অগণতান্ত্রিক শক্তি ডালপালা মেলে। এরাও এখন মাঠে সক্রিয়। বাংলাদেশের কিছু উন্নয়ন সহযোগী আছে যারা দেশে শক্তিশালী সরকার চায় না। ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এদের অস্বস্তিতে ফেলে। রাজনীতিবিদদের চেয়ে এরা সুশীল বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পছন্দ করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন নয় বরং এ দেশের বাজার দখলই তাদের প্রধান স্বার্থ। মুখে এরা গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকারের কথা বলে কিন্তু বাস্তবে এসব বিরোধী শক্তির সঙ্গেই এ দেশগুলো গোপন সখ্য গড়ে তোলে। এসব শক্তি যখন একত্রিত হয় তখনই একটি সরকার সংকটে পড়ে। তখনই অনির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি হয়। আমরা যদি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখব, একটি সুশীল গোষ্ঠী, কিছু গণমাধ্যম, সরকারের ভিতর থাকা কিছু ষড়যন্ত্রকারী এবং আন্তর্জাতিক চক্র এক হয়েই সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। ইতিহাসের জঘন্যতম এ হত্যাকান্ডের পর সংবিধানকে বাক্সবন্দি করা হলো। ’৭৫-এর প্রেক্ষাপট একটু খতিয়ে দেখা যাক। হলিডে ও গণকণ্ঠ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। একশ্রেণির ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী দেশ গেল বলে আর্তনাদ করেছিল। মুনাফাখোর, কালোবাজারি, মজুদদাররা দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে বাজার অস্থির করে তুলেছিল। সরকারের ভিতরের মোশতাকরা অন্তর্ঘাত ঘটাচ্ছিল। আর আন্তর্জাতিক কিছু সম্প্রদায় মুজিবের হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব আর জনপ্রিয়তাকে ভয় পেয়েছিল। সব মিলিয়ে ’৭৫-এর ট্র্যাজেডি। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভা ছিল একটা আইওয়াশ। জিয়া সামনে আসার পর ’৭৫-এর ৭ নভেম্বর একটি অসাংবিধানিক উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। সে সময়ের নামকরা পন্ডিত ও সুশীলরা ধেইধেই করে নাচতে নাচতে ওই উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন। এঁদের দু-এক জনের নাম উল্লেখ করতেই হয়। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম, আকবর কবির (খুশী কবিরের পিতা), ড. মোজাফফর আহমেদ, ড. এম আর খান। সমাজের এই বিশিষ্টজনেরা সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি তেলেননি। শিশু রাসেলকে হত্যা যে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন সে প্রশ্নটি পর্যন্ত করেননি। ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়ে তাঁরা সংবিধান, গণতন্ত্র, মানবাধিকার সব ভুলে গিয়েছিলেন। সুশীলদের উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হতে ভোট চাইতে হয়নি। জনগণের কথাও চিন্তা করতে হয়নি।

জিয়ার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় দফা সংবিধান লঙ্ঘন হয় তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদের নেতৃত্বে। বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। এরশাদের ক্ষমতা দখলের আগে একই ফরমুলার নিবিড় বাস্তবায়ন। জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতি। বাজার থেকে আদা-রসুন উধাও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। মন্ত্রীর বাসা থেকে খুনের আসামি গ্রেফতার। দেশ চলছে না বলে কিছু গণমাধ্যমের নিরবচ্ছিন্ন ক্যাম্পেইন। কয়েকজন রাষ্ট্রদূতের বিরামহীন তৎপরতা। তারপর এক প্রত্যুষে উর্দি পরে টেলিভিশনের সামনে হাজির হলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সংবিধান স্থগিত হলো। মৌলিক অধিকার হরণ করা হলো। আবার মঞ্চে উদ্ভাসিত হলেন আমাদের পরম পূজনীয় সুশীলরা। এরশাদের উপদেষ্টা পরিষদ যাঁরা অলংকৃত করলেন তাঁদের কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, ড. শাফিয়া খাতুন, ড. এ মজিদ খান, এম সাইদুজ্জামান, সদ্যপ্রয়াত এ এম এ মুহিত, এ আর এস দোহা প্রমুখ। এরশাদ হটাতে নয় বছর আন্দোলন করতে হয়েছে এ দেশের মানুষকে। ২০০৭ সালের অনির্বাচিত সরকার এসেছিল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’সংক্রান্ত সাংবিধানিক ব্যবস্থার ফাঁক গলে। ২০০৭-এর সেনাসমর্থিত অনির্বাচিত সরকারের প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য দুটোই ছিল ভিন্ন প্রকৃতির এবং বড় অবয়বে। ’৯০-এর এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক ধারার সূচনা হয়। কিন্তু এ গণতন্ত্রের নাটাই ছিল অনির্বাচিত সুশীলদের হাতে। বিধান রাখা হয় যে নির্বাচনের আগে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। নির্বাচনকালীন এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে দেওয়া হয় অসীম ক্ষমতা। ১৯৯১, ’৯৬, ও ২০০১- তিন মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে দলকে চেয়েছে তাকেই ক্ষমতায় এনেছে। আপাতনিরপেক্ষ নির্বাচনের আড়ালে আসলে ক্ষমতার চাবি চলে গেছে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথাই ধরা যাক। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এ সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নির্বাচনের আগেই হেরে গেল আওয়ামী লীগ। তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচনই ছিল রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে পরিচালিত। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় ২০০১ সালে। যখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। দুর্নীতি, লুটপাট, নির্যাতন, নিপীড়ন এমন জায়গায় পৌঁছে যে মানুষ ওই সরকারকে হটাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। জনগণের এ জাগরণ সুশীলদের ভীত করেছিল। এজন্য শুরু হয় প্রচারণা। বিএনপি ভালো না। আওয়ামী লীগও খারাপ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই ব্যর্থ। এ রকম একটি প্রচারণার মাধ্যমে সুশীলদের মাঠে নামানোর মঞ্চ প্রস্তুত হয়। সুশীলদের নেতা নির্বাচন করা হয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগে। অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয় শান্তির নোবেল। চারদিক ব্যর্থতা, হাহাকার দেখিয়ে ভীতির সঞ্চার করা হয় জনমনে। তারপর মঞ্চে আবির্ভূত হন সুশীলরা। সংবিধান অনুযায়ী একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন। কিন্তু সুশীল সংবিধান বিশেষজ্ঞ ফতোয়া দিলেন ‘সব ঠিক আছে’। কিন্তু দার্শনিক শেখ হাসিনা বুঝলেন এটা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। সংবিধান লঙ্ঘন। জনগণের অধিকার হরণ। তাই আবার তিনি ডাক দিলেন। জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করে গণতন্ত্রকে মুক্ত করলেন। শেখ হাসিনা বুঝেছিলেন জনগণের ক্ষমতার চাবিটা সুশীলদের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ নামে সিন্দুকে বন্দি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হলো। তিন মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এত দীর্ঘ দিবস-রজনী ক্ষমতা থেকে দূরে থাকাটা সুশীলদের কীভাবে সহ্য হবে? তাই শুরু হয়েছে সেই পুরনো খেলা। চারদিকে হতাশার নানা বাদ্যযন্ত্র বাজানো হচ্ছে। কয়েকজন সুশীল, তাঁদের নিয়ন্ত্রিত কিছু গণমাধ্যম, কিছু মতলববাজ সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্ত, ক্ষমতার মধু খাওয়া কিছু নব্য মোশতাক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ কেউ (যারা এখনো নিজেদের প্রভু ভাবেন) আরেকটি এক-এগারোর আয়োজন করছেন। যেহেতু শেখ হাসিনা একজন দার্শনিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ সেজন্য তিনি আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি জানেন, জনগণই তাঁর শক্তি। এজন্য জনগণকে তিনি আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার আগে কলাকুশলীরা গ্রিনরুমে অপেক্ষা করেন। এক-এগারোর কুশীলবরা গ্রিনরুমে ঢুকে গেছেন। শেখ হাসিনা কি পারবেন তাঁদের মঞ্চে প্রবেশ ঠেকাতে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

এক-এগারো   কুশীলব   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

প্রধানমন্ত্রী কি ভুল বলেছেন?

প্রকাশ: ০৭:০০ পিএম, ২০ মে, ২০২২


Thumbnail প্রধানমন্ত্রী কি ভুল বলেছেন?

সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কিছু বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়িয়ে মূলধারার গণমাধ্যমেও এ নিয়ে সরগরম হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তিনটি বক্তব্যকে ঘিরে নানামুখী আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। প্রথম বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ১৮ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘‘ড. ইউনুস যেটা আমরা শুনেছি মাহফুজ আনাম, তারা আমেরিকায় চলে যায়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের যেয়ে হিলারির কাছে ইমেইল পাঠায়। যাহোক ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মি. জোয়েলিক যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার শেষ কর্মদিবসে কোন বোর্ডসভায় না, পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ করে দেয়। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এই বক্তব্যকে অসত্য বলেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ ধরনের উদ্দেশ্য নিয়ে আমি কখনো যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাইনি, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাইনি, কখনো হিলারি ক্লিনটনকে কোন ইমেইল পাঠায়নি, ওয়াশিংটনে বা বিশ্বের অন্যকোন জায়গায় বা শহরে পদ্মা সেতুর অর্থায়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোন বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈঠক বা যোগাযোগ করিনি। মাহফুজ আনাম যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেটা বলেছেন দুটোর মধ্যে কিছু ফাঁক রয়েছে। এই বক্তব্য গুলোকে একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। 

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন সেই সময় বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জুয়েলিক। যার সঙ্গে হিলারি ক্লিনটনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মাহফুজ আনাম তার ডেইলি স্টার পত্রিকায় পদ্মা সেতুর যখন প্রাজ্ঞতা যাচাই হচ্ছে সেই সময় অন্তত দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদন দুটির মধ্যে পদ্মা সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা কথা বলা হয় এবং যোগ্য ব্যক্তিদেরকে প্রাথমিক যাচাইয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে বলেও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই ডেইলি স্টারের এই প্রতিবেদন দুটি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিস আমলে না নিলেও ওয়াশিংটন অফিস ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই এ বিষয়টিকে আমলে নেয় এবং এটি তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, ৩০৬ পৃষ্ঠার সেই প্রতিবেদনে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন এবং এই প্রতিবেদন যথার্থ কিনা, এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধির সঙ্গে মাহফুজ আনামের কথোপকথনের কথাও উল্লেখ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তাহলে তাতে ভুল কি আছে?

মাহফুজ আনাম এবং মতিউর রহমান, দুজনই ড. ইউনুসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ইউনুস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর যে রাজনৈতিক সংগঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সেই সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন মাহফুজ আনাম। এছাড়াও মাহফুজ আনাম বিভিন্ন সময় সরকারের বিভিন্ন বিষয় যে ধরনের মন্তব্যগুলো করেন তা ড. ইউনুসের মন্তব্যের কাছাকাছি। অনেক সময় মাহফুজ আনাম ড. ইউনুসের অনেক বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন। কাজেই মাহফুজ আনাম যে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধে ড. ইউনুসের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে এটি নিয়ে কোনো সংশয় বা সন্দেহ থাকতে পারেনা। 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রথমে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো পদ্মা সেতু নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক তদন্ত করেছে। এই তদন্তের সঙ্গে কথিত আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসে এবং পরবর্তীতে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ হয়। ওই সময় ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো পড়লে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধের ক্ষেত্রে এই দুটি পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং হিলারি ক্লিনটন যখন তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধে আহ্বান জানান তার আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছিলেন। সেই টেলিআলাপে তিনি ড. ইউনুসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পুন:নিয়োগের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটি আইনগত বিষয়, এখানে তার কিছু করার নেই। এরপরই তিনি বিশ্বব্যাংককে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধের জন্য আহ্বান জানান। উল্লেখ্য যে, এই পুরো বিষয়টি থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায় যে ড. ইউনুস এবং মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমানরা পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধের জন্য একটি পরিকল্পিত মিশনে ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় বক্তব্য হলো, রাজনৈতিক কৌতুক এবং পরিহাস। বিশ্ব রাজনীতিতে এরকম কৌতুক এবং হাস্যরস সবসময় থাকে। রাজনীতিবিদরা এই ধরনের কৌতুক তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে রাখেন। খালেদা জিয়াকে পদ্মা সেতু নিয়ে টুস করে ফেলে দেওয়া উচিত -এই বক্তব্যটি একটি রাজনৈতিক হাস্যরস এবং ইতিহাস ঘাটলে এরকম বহু রাজনৈতিক হাস্যরসের কথা আমরা পাব। কাজেই, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দুটি অংশ। একটি হলো- তিনি সিরিয়াসলি বলেছেন, যেটি ড. ইউনুস এবং মাহফুজ আনামের ব্যাপারে, সেটি শতভাগ সত্য। দ্বিতীয়টি হলো, রসাত্মক রাজনীতিবিদদের নানা বিষয়ে কর্মীদেরকে উদ্দীপ্ত করতে হয়, উৎসাহিত করতে হয়। সেজন্য তিনি কৌতুক করেছেন। একজন রাজনীতিবিদের কি কৌতুক করার অধিকার থাকবে না?

প্রধানমন্ত্রী  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান পত্নী এবং পরিজন

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৪ মে, ২০২২


Thumbnail মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান পত্নী এবং পরিজন

১৯৯৮ সাল। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আওয়ামী লীগ। জিল্লুর রহমান একাধারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী। আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর সহধর্মিণী আইভি রহমান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা। একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য জিল্লুর রহমানের দফতরে গেছি। আমরা ক্যামেরা লাইট এসব ঠিক করছি। এ সময় আরও দু-একজন নেতা নিয়ে মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করলেন আইভি রহমান। আইভি রহমানকে বসিয়েই মন্ত্রী গেলেন ভিতরের ছোট কক্ষে। এ সময় মন্ত্রীর টেবিলে থাকা লাল ফোন বেজে উঠল। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে আমি আইভি রহমানকে বললাম ফোনটা ধরতে। আইভি রহমান ফোনটা ধরলেন না। পরে মন্ত্রী এসে দেখলেন। ফোনটা এসেছিল প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। জিল্লুর রহমান ফোন করলেন। খুব সংক্ষিপ্ত কথা বলে রেখে দিলেন। সাক্ষাৎকার শেষ করে বিদায় নিচ্ছি। তখন আইভি রহমান আমাকে বললেন, ‘শোন ওটা লাল ফোন। লাল ফোন যার নামে তিনি ছাড়া এটা ধরার এখতিয়ার কারও নেই।’ আইভি রহমানের এই কথাটার তাৎপর্য যথার্থ বুঝলাম এত বছর পর। রেলমন্ত্রীর ৯ মাসের দাম্পত্য সঙ্গীর ক্ষমতার দাপট দেখে। আওয়ামী লীগে আইভি রহমান জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। তাঁর নিজস্ব পরিচয় ছিল। কিন্তু তারপরও মন্ত্রীর লাল ফোন তিনি ধরেননি। আর রেলমন্ত্রীর পত্ন্নী ৯ মাস হলো বিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে রেল মন্ত্রণালয়কেই অস্থির করে তুলেছেন। রেলের টিটিইকে সাময়িক বরখাস্ত করার আগে অবশ্য রেলমন্ত্রীর নবপরিণীতার ক্ষমতা সম্পর্কে আমজনতা খুব একটা জানত না। বিয়ের ৯ মাসে তিনি কেবল তার স্বামীকেই আপন করে নেননি। রেল মন্ত্রণালয়কেও সংসারের একটা অংশ বানিয়ে ফেলেছেন। এখন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, মন্ত্রীপত্নীর সিন্ডিকেটের। মন্ত্রীপত্নী ঠিকাদারি, টিকিট কিংবা অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কি না সে বিতর্কে আমি যাব না। রেলমন্ত্রী এসব জানতেন কি না, সে প্রশ্নও আমি করব না। তবে রেলমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ৯ মাস। এখনো তার বোঝার অনেক বাকি।’ তার এই বক্তব্যের সহজীকরণ করলে যা দাঁড়ায়, মন্ত্রীপত্নী এখনো ‘অবুঝ বধূ’। বাংলা সাহিত্য ঘাঁটলেই অবুঝ বধূদের নানা বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং বিপত্তির কথা জানা যায়। তবে রেলমন্ত্রীর অবুঝ স্ত্রীর এই অধ্যায়টি সাহিত্য বা ইতিহাসে স্থান পাবে কি না আমরা এখনো জানি না। গণমাধ্যমে এ বিষয়টি এমনভাবে আসছে যাতে মনে হতে পারে শুধু রেলমন্ত্রীর স্ত্রীই বোধহয় ‘ক্ষমতাবান’। কিন্তু বাস্তবতা তেমনটি নয়। রেলমন্ত্রীর পত্নী আলোচনায় এসেছেন একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। কয়েক মাস ধরেই মন্ত্রণালয়ের লোকজন তার ক্ষমতার উত্তাপের আঁচ পেয়েছেন। আবার রেলমন্ত্রীর পত্নী এবং পত্নীপরিজন যেভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, সেভাবে আর কেউ দেখান না এমনটি নয়। কান পাতলেই শোনা যায় অনেক মন্ত্রীর পরিজনের ক্ষমতার দাপটের কথা। অনেক মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন মন্ত্রীদের নিকটজনরা। টিটিই শফিকুলের মতো কোনো ঘটনা ঘটে না এ জন্যই এসব গণমাধ্যমে আসে না। কিন্তু কান পাতলেই এসব ক্ষমতার দাপটের কথা শোনা যায়। একজন মন্ত্রীপুত্র অভিজাত এলাকায় আলাদা অফিস নিয়েছেন। সেখানে ঠিকাদাররা নিয়মিত যান। দেন-দরবার হয়। মন্ত্রীপুত্র সরকারি একান্ত গোপনীয় ফাইল দেখেন। মন্ত্রীপুত্রের কথা অনুযায়ী মন্ত্রী ফাইলে স্বাক্ষর করেন। একজন মন্ত্রীর স্ত্রী মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দেখভাল করেন। মন্ত্রীপত্নীর প্রতিনিধি হিসেবে আছেন মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব। এপিএস ছাড়া ওই মন্ত্রী কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। এরকম কিছু ঘটনা আমাদের চারপাশে দেখা যায়। মন্ত্রীরা যখন ক্ষমতায় তখন তার নিকটজনরা মধু খাবেন এটা স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ এটাকে মেনেই নিয়েছে। যারা মন্ত্রণালয়ের টেন্ডার বাণিজ্যে নেই তারা আছেন বিদেশ ভ্রমণ। মন্ত্রীরা যখন বিদেশ সফরে আত্মীয়-পরিজনকে নিয়ে একটু আনন্দ ভ্রমণ করেন, তখন আমলা এবং অধস্তন কর্মকর্তারা কীভাবে চুপচাপ বসে থাকবেন। সম্প্রতি নিউইয়র্কে একটি সফর তালিকায় চোখ রাখলাম। ৫৫ জনের বিশাল বহর। তালিকায় এক প্রতিমন্ত্রীর দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। ‘ব্যক্তিগত কর্মকর্তা’ জিনিসটা কী বোঝার জন্য একটু খোঁজখবর নিলাম। জানা গেল ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হলো আসলে চাকর-বাকর। কোটটা পরিয়ে দেবে। জুতাটা পায়ে গলিয়ে দেবে। গালে ময়লা লাগলে টিস্যু দিয়ে মুছে দেবে। ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের অনেক কাজ। তাই একজন প্রতিমন্ত্রী দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করবেন, এতে অবাক হওয়ার কী আছে। প্রতিমন্ত্রী যখন দুজন চাকর-বাকর (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা) নিয়ে যাচ্ছেন, তখন তার মা-বোন না গেলে বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড হবে না। এটা তো রীতিমতো গৃহবিবাদ সৃষ্টি করবে। প্রতিমন্ত্রী বুদ্ধিমান, তাই তার মা এবং বোনকেও সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী যদি তার পারিবারিক সুখ সুরক্ষায় মনোযোগী হন, তাহলে তার অধস্তন কর্মকর্তারাও তো তা অনুসরণ করবেন। না হলে, সেটা হবে অবাধ্যতা। তাই এই মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার স্ত্রী-কন্যাকে সঙ্গী করেছেন। প্রতিমন্ত্রীরা যদি চৌদ্দগোষ্টিকে সফরসঙ্গী করেন, তাহলে এমপিরা কি বিদেশে গিয়ে নিঃসঙ্গতাকে বরণ করবেন? এটা কী করে হয়? তাই সফর তালিকায় থাকা এমপি তার স্ত্রীকেও সঙ্গী করেছেন। সংসদ সদস্য মানে তো শুধু পুরুষ নন, নারীরাও এখন সংসদ সদস্য হচ্ছেন। নির্বাচন করে অথবা কোটায়। পুরুষ সদস্য যদি তার পত্নীকে সফরসঙ্গী করেন, তাহলে বিষয়টি ভারী পুরুষতান্ত্রিক হয়ে যায়। এ জন্য সফরে যাওয়া মহিলা এমপিও তার স্বামীকে বগলদাবা করে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বামীকে একা রেখে যাওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। এভাবে পারিবারিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে রাষ্ট্রের পয়সায় বিদেশ যাওয়াটা এখন এক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এক মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিমন্ত্রী বিদেশযাত্রায় পারিবারিক ব্যাপ্তি আরও বড় করেছেন। প্রতিমন্ত্রী যাচ্ছেন সুইজারল্যান্ড। অপরূপ সুন্দর দেশ। এমন দেশে একা যাওয়া রীতিমতো গর্হিত কাজ। এ জন্য প্রতিমন্ত্রী তার নিকটজনের কাউকে বাদ দেননি। প্রতিমন্ত্রীর মেয়ে, মেয়ের জামাই এমনকি প্রতিমন্ত্রীর চাচাতো ভাইও সফরসঙ্গী। প্রতিমন্ত্রীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তাও তার স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়েছেন সঙ্গী হিসেবে। মন্ত্রী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের এক রকম যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণ প্রধানমন্ত্রীর নজর এড়ায়নি। বুধবার অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী অযথা বিদেশ ভ্রমণ না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার মর্মার্থ কি আমাদের মন্ত্রী মহোদয়গণ অনুভব করবেন? যেসব মন্ত্রীর আত্মীয়-পরিজন মন্ত্রণালয়ে নেই। প্রমোদ বিহারের সঙ্গী নন, তাদেরও দুঃখিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা এলাকায় আছেন। মন্ত্রীদের এখন ক্লোন হচ্ছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন আর তাদের ভাই-ব্রাদাররা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভাইয়েরাই এলাকায় মন্ত্রী কিংবা তার চেয়েও ক্ষমতাবান। একজন মন্ত্রী ভাইদের বিশ্বাস করেন না। নিজের স্ত্রীকেই স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী করেছেন। জিতিয়ে এনেছেন। তাদের কথায় এলাকার প্রশাসন ওঠবস করে। জনগণ তটস্থ থাকে। কিছুদিন আগে সাবেক এক মন্ত্রীর ভাই গ্রেফতার হয়েছেন। মন্ত্রীর চেয়েও তিনি এলাকায় ক্ষমতাবান ছিলেন। হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন স্রেফ দুর্নীতি করে। গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে। আগে তাকে নিয়ে কেউ টুঁ শব্দ পর্যন্ত করেনি। এখন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভাইদের নানা কথা বাতাসে ভাসে। কোনো মন্ত্রীর ভাই নদী দখল করে জমির মালিক হয়েছেন। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে আবার জমি সরকারের কাছে বিক্রির পাঁয়তারা করেছেন, সে খবর আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আবার কোনো কোনো মন্ত্রীর ভাইয়েরা ভীষণ চতুর। তারা কাজ করেন নীরবে, নিভৃতে। মন্ত্রীর ভাইয়েরা যে এলাকায় অঘোষিত মন্ত্রী এমনটা কিন্তু নয়। অনেক মন্ত্রীর পত্নীও এলাকায় ব্যাপক আলোচিত। কোনো কোনো মন্ত্রীর সহধর্মিণী মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় নেমেছেন। স্বামী সামনে মন্ত্রীর চেয়েও বড় পদে যাবেন। এলাকায় নির্বাচন করবেন না। তিনিই আগামী দিনের প্রার্থী। এমন ঘোষণার কথাও কোথাও কোথাও শোনা যায়। এসব সত্য না মিথ্যা সে অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু জনগণের মধ্যে এসব নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। এ ধারণাগুলো সংক্রামক। বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেই নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারাই আজকাল বলাবলি করেন, কিছু মন্ত্রী সরকারকে লজ্জায় ফেলছেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মন্ত্রী এবং তার পত্নীপরিজনের জন্য লজ্জিত হলেও মন্ত্রীরা কি তার স্বজনদের নিয়ে লজ্জিত? আওয়ামী লীগের এই ‘সৌভাগ্যবান’ মন্ত্রীরা বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনার নাম বলে মাতম করেন। কিন্তু জাতির পিতার আদর্শ এবং জীবনাচার কতটুকু অনুসরণ করেন? জাতির পিতার সহধর্মিণী বঙ্গমাতা কী সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আজকাল ভিআইপি বিয়ের অনুষ্ঠানে কিছু কিছু মন্ত্রীর পত্নীদের দেখলে মনে হয় যেন আস্ত একটা সোনার দোকান গায়ে জড়িয়েছেন। বঙ্গমাতা কোনো দিন রাষ্ট্রীয় কাজে নাক গলাননি। তিনি ছিলেন দুঃসময়ের কাণ্ডারি। দল যখন বিপর্যস্ত, বঙ্গবন্ধু যখন কারাবন্দি তখন দলের হাল ধরেছেন। কিন্তু কোনো পদ নেননি। বঙ্গবন্ধু মহামানব। বঙ্গমাতার উচ্চতায় এখন আর কারও পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু শেখ হাসিনার জীবনাচার তো স্বজনকাতর মন্ত্রীদের অজানা থাকার কথা নয়। ’৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া তখন আণবিক শক্তি কমিশনে চাকরি করতেন। ওয়াজেদ মিয়ার চাকরি শেষ হওয়ার পর অবসরে যান। শেখ হাসিনা তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেননি। এটাই শেখ হাসিনার আদর্শ। ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়ে ড. ওয়াজেদ মিয়া কটি বিদেশ সফরে শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন? প্রধানমন্ত্রীর স্বামী হিসেবে সরকারি গাড়ি তাঁর প্রাপ্য ছিল। কিন্তু ওয়াজেদ মিয়া কোনো দিন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের গাড়ি ব্যবহার করেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তার কদিন বাদেই (২০০৯-এর মে মাসে) মৃত্যুবরণ করেন এই অসামান্য মেধাবী মানুষটি। শেখ হাসিনার পরিবারের অন্য সদস্যরাও কখনো ‘ক্ষমতাবান’ হিসেবে আবির্ভূত হননি। ক্ষমতার দাপট দেখাননি। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ অটিজম নিয়ে কাজ করেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশে^ তিনি অটিজম বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলাদেশও অটিজমকে গুরুত্ব দিয়েছে সায়মা ওয়াজেদের একান্ত পরিশ্রমের জন্যই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অটিজম সেল হয়েছে। এই সেলের দায়িত্বে এক সময় ছিলেন সুভাষ চন্দ্র সরকার। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে তিনি এই সেলের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু মন্ত্রীর সঙ্গে তার বিরোধ হয়। এক সময় মন্ত্রী তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেন। মন্ত্রীর অনুরোধে সুভাষ চন্দ্র সরকারকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। বদলির সময়ই একটি অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বক্তৃতা দিতে আসেন সায়মা ওয়াজেদ। সুভাষ চন্দ্র সরকার নিজেই আমাকে এক দিন এ ঘটনাটির বর্ণনা দিচ্ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষ করে চা পান করতে করতে সায়মা ওয়াজেদ জানেন যে সুভাষকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। এটি শুনে সায়মা দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, আমি আপনার কর্মতৎপরতা মিস করব। সুভাষ বললেন ‘আমাকে এখানে রাখার জন্য একটু বলতে পারেন কি?’ সায়মা ওয়াজেদ উত্তরে বলেছিলেন ‘দুঃখিত। এটা করতে পারব না। মা এসব একদম পছন্দ করেন না।’ প্রধানমন্ত্রীর কন্যা তাঁর সেক্টরে ভালো কাজ করা এক ব্যক্তির বদলি থামাতে তদবির করেন না। অথচ সেই প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় অনেক মন্ত্রীর পত্নী-পরিজন বদলি এবং নিয়োগ বাণিজ্যকে রীতিমতো পেশা বানিয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের স্বজনপ্রীতির সূচনাকাল ১৯৭৫। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারাই এটাকে ভোগের সুযোগ হিসেবে স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে জিয়াউর রহমানকে সৎ হিসেবে চিত্রিত করার প্রাণান্তর চেষ্টা করা হয়। জিয়ার মৃত্যুর পর ভাঙা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি দেখিয়ে এটিকে এখন রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। কিন্তু জিয়া এবং তার পরিবার কতটা সৎ ছিল, তা নিয়ে সত্যনিষ্ঠ কোনো গবেষণা নেই। এ নিয়ে বিস্তারিত লিখব হয়তো ভবিষ্যতে। কিন্তু ছোট একটি তথ্য দিতে চাই এ লেখায়। জিয়া ততদিনে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ৬ জুন ১৯৭৭ সালে জিয়া কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে লন্ডনে গেলেন। সঙ্গে তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া এবং তার দুই পুত্র। আট দিন পর জিয়া দেশে ফিরলেন একা। তার পত্নী এবং পুত্ররা মাস কাটাল লন্ডনে। রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করে। এ সময় এ নিয়ে সরকারের মধ্যে নানা কথাবার্তা হয়। কিন্তু কেউ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পেতেন। ভারতের আলোচিত সাপ্তাহিক ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এ নিয়ে একটি ছোট্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। জিয়া ‘ইন্ডিয়া টুডে’র ওই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। জিয়ার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ইন্ডিয়া টুডে নিষিদ্ধ ছিল। জিয়ার শাসনামল ছিল এক অন্ধকার সময়। অবরুদ্ধ সময়। সে সময়ের খুব কম তথ্যই মানুষ জানত। লন্ডনে প্রমোদ ভ্রমণের মতো অনেক তথ্যই বন্দি করে রাখা হতো। এরশাদের জমানায় অবরুদ্ধ তথ্যের দেয়ালে চির ধরে। এরশাদের বিনোদন বিলাস, তার বান্ধবী এবং পত্নীগণের অনেক কেচ্ছা-কাহিনি সে সময় বিদেশের গণমাধ্যমে বেরোতে থাকে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সে সময় মোশাররফ হোসেন। তিনি পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরশাদ জমানায় তার স্ত্রীর দাপট ছিল সর্বত্র। এটা অবশ্য তার সরকারি চাকুরে স্বামীর বদৌলতে নয়। এরশাদের কারণে সরকারে প্রচণ্ড ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন জিনাত। এরশাদের পতনের পর বেগম জিয়া ক্ষমতায় আসেন। বেগম জিয়ার হাতেই পরিবার এবং স্বজন তোষণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। বেগম জিয়ার ভাইবোন হয়ে ওঠেন সবচেয়ে ক্ষমতাবান। ২০০১ সালে বেগম জিয়া দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে জিয়া পরিবার এখনকার শ্রীলঙ্কার রাজাপক্ষে পরিবারের মতোই রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্বের মালিক হয়ে যান। বেগম জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে তার পুত্র তারেক রহমান হয়ে ওঠেন অঘোষিত প্রধানমন্ত্রী। বেগম জিয়ার এক ভাই হন সেনাবাহিনীর কেনাকাটা সিন্ডিকেটের প্রধান। মন্ত্রীর ছোট ভাইয়ের হাতে বিমান দেউলিয়া হয়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান টেলিকম, বিজ্ঞাপন ব্যবসার একচেটিয়া কর্তৃত্ব পান। ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন তিনি। পাঠক একটু মিলিয়ে দেখুন, এখন শ্রীলঙ্কায় যে অবস্থা ঠিক এরকম অবস্থাই বাংলাদেশে তৈরি হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। জিয়া পরিবারের কাছেই ছিল সব ক্ষমতা। আজ শ্রীলঙ্কায় যা ঘটছে বাংলাদেশে ২০০৬ সালে তা ঘটে গেছে। ক্ষমতা ভোগের এই ব্যাধি এখন আওয়ামী লীগের কোনো কোনো মন্ত্রীর মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। ভালো লক্ষণ হলো ব্যাধিটা চিহ্নিত হয়েছে। এখন এর চিকিৎসা প্রয়োজন।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

রেলমন্ত্রী   ট্রেন   ক্ষমতাবান   পত্নী   পরিজন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সম্রাট কি ফিরবেন আওয়ামী লীগে?

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ১১ মে, ২০২২


Thumbnail সম্রাট কি ফিরবেন আওয়ামী লীগে?

প্রায় দুই বছর সাত মাস কারাভোগের পর আওয়ামী যুবলীগের বহিস্কৃত নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। আজ সর্বশেষ মামলায় আদালত তাকে জামিন দিয়েছে। ফলে তার মুক্তির পথে আর কোনো বাধা রইলো না। ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ছিলেন। শুধু যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি বললে ভুল হবে, ঢাকার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকা মহানগরীতে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আলোচিত ছিলেন। অন্যান্য নেতারা যখন দুর্নীতি করেন বা দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তারা দলেও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন এবং দলের তৃণমূলের সঙ্গে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট দুঃসময়ে সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট আলোচনায় আসেন। এই সময় ঢাকা মহানগরীতে বিপর্যস্থ আওয়ামী লীগের সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। কর্মীবান্ধব হওয়ার কারণে দ্রুতই কর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়ে উঠে। নিজে বিভিন্নভাবে যে উপার্জন করেছেন, সেই উপার্জনের অর্থ বেশিরভাগই তিনি ব্যয় করেছেন সংগঠনের জন্য। কর্মীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার কারণে তিনি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন পল্টন এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সহিংসতা ঘটে। সেই সময় বিএনপি-জামায়াতের পরিকল্পনা ছিল আওয়ামী লীগ অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া। কিন্তু ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটসহ আরও কয়েকজন নেতা সেদিন সাহসিকতার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিহত করেছিল। না হলে আওয়ামী লীগের ঢাকায় অস্তিত্ব কতটুকু থাকতো সেটি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানারকম আলোচনা রয়েছে।

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন আসার পর শেখ হাসিনা গ্রেফতার হন। এই সময় ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। শেখ হাসিনার পক্ষে নেতাকর্মীদেরকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। এভাবেই আস্তে আস্তে রাজনীতিতে তিনি একটি আলাদা বলয় তৈরি করেছেন। এমনকি নেতারাও তার উপর নানা বিষয়ে নির্ভরশীল ছিলেন। এই সম্রাটের এরকম পরিণতি হবে সেই সময় কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় আসার পরই শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি ঘোষণা করেন এবং তিনি বলেন যে, দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হয় এবং এই অভিযানে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট গ্রেফতার হয়েছিলেন। এই গ্রেফতারের আগেই অবশ্য তাকে দল বহিষ্কার করেছিল। এখন সম্রাটে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এমন একটি সময় তিনি জামিনে মুক্তি পেলেন যখন আওয়ামী লীগের মধ্যে কাউন্সিল নিয়ে নানামুখী আলোচনা এবং সামনে বিরোধী দলের আন্দোলন। এছাড়াও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে টালমাটাল আন্ডারওয়ার্ল্ড। এরকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে রাজনীতিতে সম্রাটের ভূমিকা কি হবে? জামিন পেয়ে কি তিনি নিভৃত জীবন-যাপন করবেন? নাকি রাজনীতির মধ্যে আবার সক্রিয় হবেন। সক্রিয় হলে আওয়ামী লীগের ভূমিকা কি হবে? আওয়ামী লীগই বা তাকে নেবে কিনা? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে। সম্রাটের মুক্তি পাওয়ার পরই হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। 

সম্রাট   যুবলীগ   জামিন   আওয়ামী লীগ   ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

চিন্তা কী, শেখ হাসিনা আছেন না

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৭ মে, ২০২২


Thumbnail চিন্তা কী, শেখ হাসিনা আছেন না

এবার মানুষের ঈদযাত্রা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হয়েছে। মহাসড়কে চিরচেনা যানজট ছিল না। ঘরমুখো মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে নাকাল হতে হয়নি। রেলে শিডিউল বিপর্যয় ঘটেনি। নৌপথেও মানুষের কষ্টের গল্প গণমাধ্যমে শোনা যায়নি। এত বছর ধরে সরকার মহাসড়ক, রেল ও নৌপরিবহনের জন্য নিবিড় এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে, তার ফল সম্ভবত এবার ঈদে আমরা পেতে শুরু করলাম। কিন্তু এ স্বস্তির মধ্যে অস্বস্তির ছোট ছোট বুদবুদ। ঈদের দুই দিন আগে (২ মে) কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে চারজন মারা গেলেন। আহত হলেন বেশ কজন। রোজার মধ্যেই (২২ এপ্রিল) কক্সবাজারের টেকনাফে পৌর আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে পেটালেন আওয়ামী লীগের আলোচিত-সমালোচিত সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণে এক থানার নেতা আওয়ামী লীগ কর্মীদের পিটিয়েছেন। জেলায় জেলায়, থানায় থানায়, গ্রামে গ্রামে আওয়ামী লীগে বিভক্তি। এ বিভক্তি এখন আর রাজনৈতিক বিতর্কের পর্যায়ে নেই। ক্রমে সহিংস হয়ে উঠছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর নিষ্ঠুর, নির্মম হচ্ছে। ইদানীং প্রতিটি বিশেষ দিবসে দেশের কোথাও না কোথাও আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর দুই পক্ষের সহিংসতার ঘটনা উৎসবের আমেজকে খানিকটা হলেও ম্লান করে দিচ্ছে। শুধু আওয়ামী লীগ কেন, সরকারের ভিতরও অনাসৃষ্টির ভূত হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। হঠাৎ কেউ কেউ এমন কান্ড করে বসেন, যার দায় বর্তায় ১৩ বছর বয়সী আওয়ামী লীগের ওপর। এই তো কদিন আগে কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সরকারের কিছু ব্যক্তির নজিরবিহীন দাম্ভিকতায় মানুষ যখন ক্ষুব্ধ-বিরক্ত, তখন পরিস্থিতি সামাল দিলেন প্রধানমন্ত্রী। মাঠ রক্ষায় শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বর এবং জনগণের কণ্ঠস্বর একাকার হয়ে গেল। আওয়ামী লীগ এবং সরকারকে সম্ভাব্য নাগরিক সমালোচনার হাত থেকে উদ্ধার করলেন। গত এক যুগে শেখ হাসিনা একাই যেন দল এবং সরকারের ত্রাতা। তিনি আছেন বলেই আওয়ামী লীগের ক্ষতগুলো চোখে পড়ে না। তাঁর জন্যই সরকারের ব্যর্থতাগুলো কেটে যায়।

শেখ হাসিনা একাই যেন দাঁড়িয়ে আছেন মানবতা, ন্যায়বিচার, জনকল্যাণের প্রতীক হয়ে। দলে এবং সরকারে অন্যদের সেই উচ্চতায় ওঠার যোগ্যতা ও বিচক্ষণতা নেই। এটা সত্যি। কিন্তু তাঁরা ভালো কাজে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে সহযোগিতা করছেন না। উপরন্তু নিজেরা এমন সব কান্ড ঘটাচ্ছেন যার ফলে দল এবং সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছে প্রতিনিয়ত। আওয়ামী লীগ এবং সরকারের কিছু ব্যক্তির কর্মকান্ড দুষ্ট বালকের মতো। তারা যেন সব অর্জনে কাদা মাখছে। আর শেখ হাসিনা সবকিছু পরিষ্কার করছেন। সার্ফ এক্সেলের বিজ্ঞাপনের মতো সবাই চিন্তাহীন। বলছে ‘চিন্তা কী, শেখ হাসিনা আছেন না’। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে, আওয়ামী লীগ এবং সরকারের ভিতর বেশির ভাগ ব্যক্তিই যেন চিন্তাশূন্য। সামনে কী হবে, এ নিয়েও তাঁদের কোনো ভাবনা নেই। সব চিন্তার ভার তাঁরা শেখ হাসিনার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের এক মন্ত্রীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সামনে গম-আটার সংকট হতে পারে। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা। জানতে চাইলাম কী ভাবছেন? জবাব দিলেন, ভাই এসব চিন্তার বিষয় না। শেখ হাসিনা সব ম্যানেজ করবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর অবিরত চাপ দিচ্ছে। মানবাধিকার, সুশাসন, গুম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ইত্যাদি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন খোলামেলা। র‌্যাবের বর্তমান এবং সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা তারা নাকচ করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এমন কেন হলো? সামনের দিনগুলোয় কি যুক্তরাষ্ট্র আরও চাপ দেবে? আগামী নির্বাচনে কি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে? যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাংলাদেশ কীভাবে সামলাবে? এ রকম অনেক প্রশ্ন এখন রাজনীতির আড্ডায় উচ্চারিত হয়। আওয়ামী লীগ বা সরকারের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করবেন দেখবেন তিনি ভাবনাহীন। চিন্তার লেশমাত্র নেই। কেন? ওই যে শেখ হাসিনা। সেদিন একজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বেশ দাপটের সঙ্গেই বলছিলেন, ‘নেত্রী এসব ম্যাজিক দিয়ে উড়িয়ে দেবেন’। বললাম আপনিও তো আওয়ামী লীগের বড় নেতা। আপনার দায়িত্ব আছে না? তিনি চুপসে গেলেন।

বিএনপি বলেছে ঈদের পর তারা আন্দোলন করবে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি আগামী নির্বাচনে যাবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে। আগামী নির্বাচন এবার নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনের প্রায় দুই বছর বাকি। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সবারই কথা আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। আওয়ামী লীগ নেতারাও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেন আগামী নির্বাচন কঠিন হবে। ২০১৪ কিংবা ২০১৮-এর মতো হবে না। কিন্তু এ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং নির্বাচন আওয়ামী লীগ কীভাবে পাড়ি দেবে? আওয়ামী লীগের কোনো নেতার কাছেই এর উত্তর নেই। যে কোনো নেতা একান্ত আলাপে বলবেন, এসব আমাদের চিন্তার বিষয় না। নেত্রী সব ম্যানেজ করবেন।

আওয়ামী লীগে কোন্দল বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন স্থানে খুনাখুনি হচ্ছে। দলের চেন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। তৃণমূলের নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের সমালোচনা করছেন। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা কোণঠাসা। হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের দখলে চলে যাচ্ছে দল। কিছু নেতা-কর্মী যেন আওয়ামী লীগের সব অর্জন বিলীন করতে এক আত্মঘাতী খেলায় মেতেছেন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিভক্তি তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। এসব নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে আলোচনা আছে কিন্তু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই। কেন? শেখ হাসিনা আছেন না! আওয়ামী লীগের যে কোনো নেতা বলবেন, শেখ হাসিনা নিমেষেই কোন্দল, অন্তঃকলহ বন্ধ করে দেবেন। এ কথা অনস্বীকার্য, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দলে নিরঙ্কুশ জনপ্রিয়। দলের সব নেতা-কর্মী তাঁকে বিশ্বাস করেন। তাঁর ওপর আস্থা রাখেন। তাঁকে মানেন। কিন্তু তাই বলে কি সবকিছু শেখ হাসিনাকেই সামলাতে হবে? অন্যদের কোনো ভূমিকা থাকবে না, এ কী করে হয়?

এ কথা ঠিক, রাষ্ট্র এবং দলের মৌলিক নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীকেই দেখতে হয়। তিনি একাধারে সরকার ও দল প্রধান। কিন্তু তিনি যেন নীতিনির্ধারণী এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর দিকে গভীর মনোযোগ দিতে পারেন সেজন্য সরকার ও দলের কাউকে কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলো পালন করতে হবে। কেউ কোনো দায়িত্ব পালন না করে শুধু শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে থাকা কোনো শুভলক্ষণ নয়। আওয়ামী লীগের শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি আছে। প্রেসিডিয়াম আছে। আছে সম্পাদকমন্ডলী। কজন দায়িত্ব পালন করেন? একসময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মানে ছিল বিরাট ব্যাপার। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে। কিন্তু একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য এলাকায় গেলে তিনি মন্ত্রীর চেয়েও বেশি মর্যাদা পেতেন। তার চেয়ে বেশি পেতেন জনগণের ভালোবাসা। এখন প্রেসিডিয়ামের অনেক সদস্য যেন পদটাকে সান্ত্বনা পুরস্কার মনে করেন। আওয়ামী লীগের মতো দলে প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েছেন এতেই খুশিতে আটখানা। তাঁকে যে দায়িত্ব দেওয়া হলো তার মর্যাদা রক্ষার কোনো তাগিদ নেই। নেত্রী যে আস্থা তাঁর ওপর রাখলেন তারও প্রতিদান দিতে তাঁরা অক্ষম।

সরকারেও একই অবস্থা। ২০০৯ ও ২০১৯ সালে শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভা গঠনে চমক দেখান। অনেক নতুন আনকোরা দলে এবং দেশে অপরিচিত ব্যক্তিকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের সুযোগ দেন। কিন্তু কজন হলফ করে বলতে পারবেন এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। কজন দেশের জন্য, দলের জন্য নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন।

অধিকাংশ মন্ত্রী ছোটখাটো সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। হাওরের বন্যা রক্ষাবাঁধ, ধান কাটার ব্যবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত দিতে হয়। বাজারে ভোজ্য তেল উধাও হলে প্রধানমন্ত্রীকে সমাধানের পথ বাতলে দিতে হয়। মাঠে থানা নির্মাণের জনবিরোধী সিদ্ধান্তের সমাধানের পথ বাতলে দিতে হয়। তাহলে মন্ত্রীদের কাজ কী? কাজ অবশ্য আছে। ‘দুষ্টমি’ করে বিতর্ক সৃষ্টি করা। কোনো মন্ত্রী বিদেশ যান আত্মীয়স্বজন জ্ঞাতিগোষ্ঠী চৌদ্দপুরুষ নিয়ে। কোনো মন্ত্রী যেন অদৃশ্য মানব। তিন মেয়াদে মন্ত্রী থাকা এক বিরল সৌভাগ্যবান মন্ত্রীকে বছরে তিনবারও জনসমক্ষে দেখা যায় না। তিনি কী কাজ করেন তা-ও কেউ জানে না। বাংলাদেশে এখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একাই সব করবেন। জনগণের জন্য স্বস্তির এক পরিবেশ তৈরি করবেন। আর কয়েকজন অনাসৃষ্টি করবেন। সব অর্জনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবেন। সাজানো গোছানো পরিপাটি পরিবেশ ল-ভ- করে দেবেন। শেখ হাসিনা কঠোর পরিশ্রমী। মানুষের জন্য তিনি সবকিছু উৎসর্গ করেছেন। সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সব কাজ করেন। সব সময় জনগণের কথা ভাবেন বলেই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ জনকল্যাণমুখী। কিন্তু তিনি এখন একাকী, নিঃসঙ্গ। তাঁর চিন্তা, সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত দরকার। এ সহযোগিতা তাঁর ‘ম্যাজিক’কে পূর্ণতা দেয়। ধরা যাক, শেখ হাসিনার ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের একাগ্রতা এবং কঠোর পরিশ্রমের কারণে এটি এখন একটি সাফল্যের দৃষ্টান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চিন্তার বাস্তবায়নে দরকার এ রকম নিবেদিতপ্রাণ টিম। যেমনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে আমরা দেখেছি। টিম ছিল বলেই এবার ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তিন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা শুনেছেন। সেই নির্দেশনা মাঠে বাস্তবায়ন করেছেন। সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়কপথে তদারকি করেছেন। রেলপথমন্ত্রী স্টেশনে ছুটে গেছেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিখুঁত বাস্তবায়ন করেছেন। এটাই হলো টিমওয়ার্ক।

এবার ঈদযাত্রার ঘটনাটি সরকারের জন্য একটি বড় শিক্ষা। প্রধানমন্ত্রীর দর্শন সুবিন্যস্তভাবে মাঠে বাস্তবায়ন করলেই যে দেশ ভালো থাকে তা এবার প্রমাণ হয়েছে। সরকারে যেমন টিমওয়ার্ক দরকার তেমনি টিমওয়ার্ক দরকার দলেও। শেখ হাসিনা সংগঠনকে শক্তিশালী করতে, দলের আদর্শ অটুট রাখতে দিনরাত একাকার করছেন। কজন শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন? আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করলে যে কী অসাধ্য সাধন করা যায় তা দেখিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে ১ হাজার ৪০২টি ইউনিয়ন কমিটি গঠন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। দেখা যাচ্ছে, যেখানে শেখ হাসিনার চিন্তা, পরিকল্পনা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেখানেই সংগঠন পাল্টে যাচ্ছে। উদ্দীপ্ত এক আওয়ামী লীগ উদ্ভাসিত হচ্ছে। আর যেখানে শুধু তৈলমর্দন ও স্তুতি সেখানে সংগঠন হতচ্ছিরি অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছে। শুধু মুখে শেখ হাসিনার জয়ধ্বনি দিলে হবে না; কাজে শেখ হাসিনার আদর্শ, নীতি, চিন্তা বাস্তবায়ন করতে হবে। শেখ হাসিনাকে যারা কাছ থেকে চেনেন তারা জানেন, তিনি যুক্তিবাদী একজন মানুষ। যুক্তিপূর্ণ যে কোনো পরামর্শ জনগণের স্বার্থে মানতে তিনি এতটুকু দ্বিধান্বিত হন না। মুন্সীগঞ্জে বিমানবন্দর স্থাপন থেকে সরে আসা। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল। নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়ন। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করে আইন সংশোধন। ইত্যাদি অনেক কিছুই প্রধানমন্ত্রী করেছেন জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য। যুক্তিপূর্ণ ভিন্নমত তিনি গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে একটি উদাহরণ দিতে চাই।

সম্প্রতি সরকার জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করেছে। সংশোধিত আইনে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা প্রশাসনে সরকার কর্তৃক প্রশাসক নিয়োগ করার বিধান রাখা হয়। আইন পাসের পরপরই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদায়ী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বলা হয়। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগে হতাশা ও অস্থিরতা তৈরি হয়। জেলা পরিষদগুলোয় প্রশাসক হিসেবে আমলাদের বসানোর গুঞ্জন পল্লবিত হয়। মাঠ পর্যায়ে আমলাতন্ত্রের বিস্তৃতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথাও আলোচিত হতে থাকে। আবার সংশোধিত আইনে যেহেতু ‘প্রশাসক’ হিসেবে গণমান্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, ফলে এ নিয়ে শুরু হয় নজিরবিহীন দৌড়ঝাঁপ, লবিং। নির্বাচনের আগে সারা দেশে কোন্দলে জর্জরিত আওয়ামী লীগ এক নতুন সংকটের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। নতুন প্রশাসক নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে ‘বুমেরাং’ হতে পারে বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিদায়ী চেয়ারম্যানদেরই আপাতত পরামর্শক হিসেবে রাখার প্রস্তাব করেন নানক। প্রধানমন্ত্রী এ পরামর্শ গ্রহণ করেন। জেলা পর্যায়ে অনিবার্য এক কোন্দল ও হানাহানি থেকে রক্ষা পায় সরকার। শেখ হাসিনা এ রকমই। জনস্বার্থে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেন না। কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না।

শেখ হাসিনার চিন্তা ও সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দলে এবং সরকারে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের। কিন্তু তাঁর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে যদি তাঁরা স্তুতিতেই আত্মপ্রসাদ লাভ করেন তাহলে তা দেশ ও জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে না। শেখ হাসিনা আছেন না- এ চিন্তা করে মন্ত্রী এবং নেতারা যদি নিজেদের আখের গোছানোয় ব্যস্ত থাকেন তাহলে দলে সংকট বাড়বে। সরকারের অর্জনগুলোও অনাকাক্সিক্ষত কালিতে নোংরা হবে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

শেখ হাসিনা   সরকার   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন