এডিটর’স মাইন্ড

মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান পত্নী এবং পরিজন

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৪ মে, ২০২২


Thumbnail মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাবান পত্নী এবং পরিজন

১৯৯৮ সাল। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আওয়ামী লীগ। জিল্লুর রহমান একাধারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী। আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর সহধর্মিণী আইভি রহমান আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা। একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য জিল্লুর রহমানের দফতরে গেছি। আমরা ক্যামেরা লাইট এসব ঠিক করছি। এ সময় আরও দু-একজন নেতা নিয়ে মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করলেন আইভি রহমান। আইভি রহমানকে বসিয়েই মন্ত্রী গেলেন ভিতরের ছোট কক্ষে। এ সময় মন্ত্রীর টেবিলে থাকা লাল ফোন বেজে উঠল। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে আমি আইভি রহমানকে বললাম ফোনটা ধরতে। আইভি রহমান ফোনটা ধরলেন না। পরে মন্ত্রী এসে দেখলেন। ফোনটা এসেছিল প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে। জিল্লুর রহমান ফোন করলেন। খুব সংক্ষিপ্ত কথা বলে রেখে দিলেন। সাক্ষাৎকার শেষ করে বিদায় নিচ্ছি। তখন আইভি রহমান আমাকে বললেন, ‘শোন ওটা লাল ফোন। লাল ফোন যার নামে তিনি ছাড়া এটা ধরার এখতিয়ার কারও নেই।’ আইভি রহমানের এই কথাটার তাৎপর্য যথার্থ বুঝলাম এত বছর পর। রেলমন্ত্রীর ৯ মাসের দাম্পত্য সঙ্গীর ক্ষমতার দাপট দেখে। আওয়ামী লীগে আইভি রহমান জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। তাঁর নিজস্ব পরিচয় ছিল। কিন্তু তারপরও মন্ত্রীর লাল ফোন তিনি ধরেননি। আর রেলমন্ত্রীর পত্ন্নী ৯ মাস হলো বিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে রেল মন্ত্রণালয়কেই অস্থির করে তুলেছেন। রেলের টিটিইকে সাময়িক বরখাস্ত করার আগে অবশ্য রেলমন্ত্রীর নবপরিণীতার ক্ষমতা সম্পর্কে আমজনতা খুব একটা জানত না। বিয়ের ৯ মাসে তিনি কেবল তার স্বামীকেই আপন করে নেননি। রেল মন্ত্রণালয়কেও সংসারের একটা অংশ বানিয়ে ফেলেছেন। এখন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, মন্ত্রীপত্নীর সিন্ডিকেটের। মন্ত্রীপত্নী ঠিকাদারি, টিকিট কিংবা অন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কি না সে বিতর্কে আমি যাব না। রেলমন্ত্রী এসব জানতেন কি না, সে প্রশ্নও আমি করব না। তবে রেলমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ৯ মাস। এখনো তার বোঝার অনেক বাকি।’ তার এই বক্তব্যের সহজীকরণ করলে যা দাঁড়ায়, মন্ত্রীপত্নী এখনো ‘অবুঝ বধূ’। বাংলা সাহিত্য ঘাঁটলেই অবুঝ বধূদের নানা বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং বিপত্তির কথা জানা যায়। তবে রেলমন্ত্রীর অবুঝ স্ত্রীর এই অধ্যায়টি সাহিত্য বা ইতিহাসে স্থান পাবে কি না আমরা এখনো জানি না। গণমাধ্যমে এ বিষয়টি এমনভাবে আসছে যাতে মনে হতে পারে শুধু রেলমন্ত্রীর স্ত্রীই বোধহয় ‘ক্ষমতাবান’। কিন্তু বাস্তবতা তেমনটি নয়। রেলমন্ত্রীর পত্নী আলোচনায় এসেছেন একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। কয়েক মাস ধরেই মন্ত্রণালয়ের লোকজন তার ক্ষমতার উত্তাপের আঁচ পেয়েছেন। আবার রেলমন্ত্রীর পত্নী এবং পত্নীপরিজন যেভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, সেভাবে আর কেউ দেখান না এমনটি নয়। কান পাতলেই শোনা যায় অনেক মন্ত্রীর পরিজনের ক্ষমতার দাপটের কথা। অনেক মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন মন্ত্রীদের নিকটজনরা। টিটিই শফিকুলের মতো কোনো ঘটনা ঘটে না এ জন্যই এসব গণমাধ্যমে আসে না। কিন্তু কান পাতলেই এসব ক্ষমতার দাপটের কথা শোনা যায়। একজন মন্ত্রীপুত্র অভিজাত এলাকায় আলাদা অফিস নিয়েছেন। সেখানে ঠিকাদাররা নিয়মিত যান। দেন-দরবার হয়। মন্ত্রীপুত্র সরকারি একান্ত গোপনীয় ফাইল দেখেন। মন্ত্রীপুত্রের কথা অনুযায়ী মন্ত্রী ফাইলে স্বাক্ষর করেন। একজন মন্ত্রীর স্ত্রী মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দেখভাল করেন। মন্ত্রীপত্নীর প্রতিনিধি হিসেবে আছেন মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব। এপিএস ছাড়া ওই মন্ত্রী কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। এরকম কিছু ঘটনা আমাদের চারপাশে দেখা যায়। মন্ত্রীরা যখন ক্ষমতায় তখন তার নিকটজনরা মধু খাবেন এটা স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ এটাকে মেনেই নিয়েছে। যারা মন্ত্রণালয়ের টেন্ডার বাণিজ্যে নেই তারা আছেন বিদেশ ভ্রমণ। মন্ত্রীরা যখন বিদেশ সফরে আত্মীয়-পরিজনকে নিয়ে একটু আনন্দ ভ্রমণ করেন, তখন আমলা এবং অধস্তন কর্মকর্তারা কীভাবে চুপচাপ বসে থাকবেন। সম্প্রতি নিউইয়র্কে একটি সফর তালিকায় চোখ রাখলাম। ৫৫ জনের বিশাল বহর। তালিকায় এক প্রতিমন্ত্রীর দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। ‘ব্যক্তিগত কর্মকর্তা’ জিনিসটা কী বোঝার জন্য একটু খোঁজখবর নিলাম। জানা গেল ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হলো আসলে চাকর-বাকর। কোটটা পরিয়ে দেবে। জুতাটা পায়ে গলিয়ে দেবে। গালে ময়লা লাগলে টিস্যু দিয়ে মুছে দেবে। ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের অনেক কাজ। তাই একজন প্রতিমন্ত্রী দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করবেন, এতে অবাক হওয়ার কী আছে। প্রতিমন্ত্রী যখন দুজন চাকর-বাকর (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা) নিয়ে যাচ্ছেন, তখন তার মা-বোন না গেলে বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড হবে না। এটা তো রীতিমতো গৃহবিবাদ সৃষ্টি করবে। প্রতিমন্ত্রী বুদ্ধিমান, তাই তার মা এবং বোনকেও সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী যদি তার পারিবারিক সুখ সুরক্ষায় মনোযোগী হন, তাহলে তার অধস্তন কর্মকর্তারাও তো তা অনুসরণ করবেন। না হলে, সেটা হবে অবাধ্যতা। তাই এই মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার স্ত্রী-কন্যাকে সঙ্গী করেছেন। প্রতিমন্ত্রীরা যদি চৌদ্দগোষ্টিকে সফরসঙ্গী করেন, তাহলে এমপিরা কি বিদেশে গিয়ে নিঃসঙ্গতাকে বরণ করবেন? এটা কী করে হয়? তাই সফর তালিকায় থাকা এমপি তার স্ত্রীকেও সঙ্গী করেছেন। সংসদ সদস্য মানে তো শুধু পুরুষ নন, নারীরাও এখন সংসদ সদস্য হচ্ছেন। নির্বাচন করে অথবা কোটায়। পুরুষ সদস্য যদি তার পত্নীকে সফরসঙ্গী করেন, তাহলে বিষয়টি ভারী পুরুষতান্ত্রিক হয়ে যায়। এ জন্য সফরে যাওয়া মহিলা এমপিও তার স্বামীকে বগলদাবা করে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বামীকে একা রেখে যাওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। এভাবে পারিবারিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে রাষ্ট্রের পয়সায় বিদেশ যাওয়াটা এখন এক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এক মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিমন্ত্রী বিদেশযাত্রায় পারিবারিক ব্যাপ্তি আরও বড় করেছেন। প্রতিমন্ত্রী যাচ্ছেন সুইজারল্যান্ড। অপরূপ সুন্দর দেশ। এমন দেশে একা যাওয়া রীতিমতো গর্হিত কাজ। এ জন্য প্রতিমন্ত্রী তার নিকটজনের কাউকে বাদ দেননি। প্রতিমন্ত্রীর মেয়ে, মেয়ের জামাই এমনকি প্রতিমন্ত্রীর চাচাতো ভাইও সফরসঙ্গী। প্রতিমন্ত্রীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তাও তার স্ত্রী এবং সন্তানদের নিয়েছেন সঙ্গী হিসেবে। মন্ত্রী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের এক রকম যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণ প্রধানমন্ত্রীর নজর এড়ায়নি। বুধবার অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী অযথা বিদেশ ভ্রমণ না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার মর্মার্থ কি আমাদের মন্ত্রী মহোদয়গণ অনুভব করবেন? যেসব মন্ত্রীর আত্মীয়-পরিজন মন্ত্রণালয়ে নেই। প্রমোদ বিহারের সঙ্গী নন, তাদেরও দুঃখিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা এলাকায় আছেন। মন্ত্রীদের এখন ক্লোন হচ্ছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন আর তাদের ভাই-ব্রাদাররা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভাইয়েরাই এলাকায় মন্ত্রী কিংবা তার চেয়েও ক্ষমতাবান। একজন মন্ত্রী ভাইদের বিশ্বাস করেন না। নিজের স্ত্রীকেই স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী করেছেন। জিতিয়ে এনেছেন। তাদের কথায় এলাকার প্রশাসন ওঠবস করে। জনগণ তটস্থ থাকে। কিছুদিন আগে সাবেক এক মন্ত্রীর ভাই গ্রেফতার হয়েছেন। মন্ত্রীর চেয়েও তিনি এলাকায় ক্ষমতাবান ছিলেন। হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন স্রেফ দুর্নীতি করে। গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে। আগে তাকে নিয়ে কেউ টুঁ শব্দ পর্যন্ত করেনি। এখন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভাইদের নানা কথা বাতাসে ভাসে। কোনো মন্ত্রীর ভাই নদী দখল করে জমির মালিক হয়েছেন। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে আবার জমি সরকারের কাছে বিক্রির পাঁয়তারা করেছেন, সে খবর আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আবার কোনো কোনো মন্ত্রীর ভাইয়েরা ভীষণ চতুর। তারা কাজ করেন নীরবে, নিভৃতে। মন্ত্রীর ভাইয়েরা যে এলাকায় অঘোষিত মন্ত্রী এমনটা কিন্তু নয়। অনেক মন্ত্রীর পত্নীও এলাকায় ব্যাপক আলোচিত। কোনো কোনো মন্ত্রীর সহধর্মিণী মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় নেমেছেন। স্বামী সামনে মন্ত্রীর চেয়েও বড় পদে যাবেন। এলাকায় নির্বাচন করবেন না। তিনিই আগামী দিনের প্রার্থী। এমন ঘোষণার কথাও কোথাও কোথাও শোনা যায়। এসব সত্য না মিথ্যা সে অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু জনগণের মধ্যে এসব নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। এ ধারণাগুলো সংক্রামক। বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেই নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারাই আজকাল বলাবলি করেন, কিছু মন্ত্রী সরকারকে লজ্জায় ফেলছেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মন্ত্রী এবং তার পত্নীপরিজনের জন্য লজ্জিত হলেও মন্ত্রীরা কি তার স্বজনদের নিয়ে লজ্জিত? আওয়ামী লীগের এই ‘সৌভাগ্যবান’ মন্ত্রীরা বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনার নাম বলে মাতম করেন। কিন্তু জাতির পিতার আদর্শ এবং জীবনাচার কতটুকু অনুসরণ করেন? জাতির পিতার সহধর্মিণী বঙ্গমাতা কী সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আজকাল ভিআইপি বিয়ের অনুষ্ঠানে কিছু কিছু মন্ত্রীর পত্নীদের দেখলে মনে হয় যেন আস্ত একটা সোনার দোকান গায়ে জড়িয়েছেন। বঙ্গমাতা কোনো দিন রাষ্ট্রীয় কাজে নাক গলাননি। তিনি ছিলেন দুঃসময়ের কাণ্ডারি। দল যখন বিপর্যস্ত, বঙ্গবন্ধু যখন কারাবন্দি তখন দলের হাল ধরেছেন। কিন্তু কোনো পদ নেননি। বঙ্গবন্ধু মহামানব। বঙ্গমাতার উচ্চতায় এখন আর কারও পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু শেখ হাসিনার জীবনাচার তো স্বজনকাতর মন্ত্রীদের অজানা থাকার কথা নয়। ’৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া তখন আণবিক শক্তি কমিশনে চাকরি করতেন। ওয়াজেদ মিয়ার চাকরি শেষ হওয়ার পর অবসরে যান। শেখ হাসিনা তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেননি। এটাই শেখ হাসিনার আদর্শ। ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়ে ড. ওয়াজেদ মিয়া কটি বিদেশ সফরে শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন? প্রধানমন্ত্রীর স্বামী হিসেবে সরকারি গাড়ি তাঁর প্রাপ্য ছিল। কিন্তু ওয়াজেদ মিয়া কোনো দিন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের গাড়ি ব্যবহার করেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তার কদিন বাদেই (২০০৯-এর মে মাসে) মৃত্যুবরণ করেন এই অসামান্য মেধাবী মানুষটি। শেখ হাসিনার পরিবারের অন্য সদস্যরাও কখনো ‘ক্ষমতাবান’ হিসেবে আবির্ভূত হননি। ক্ষমতার দাপট দেখাননি। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ অটিজম নিয়ে কাজ করেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশে^ তিনি অটিজম বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলাদেশও অটিজমকে গুরুত্ব দিয়েছে সায়মা ওয়াজেদের একান্ত পরিশ্রমের জন্যই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অটিজম সেল হয়েছে। এই সেলের দায়িত্বে এক সময় ছিলেন সুভাষ চন্দ্র সরকার। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে তিনি এই সেলের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু মন্ত্রীর সঙ্গে তার বিরোধ হয়। এক সময় মন্ত্রী তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেন। মন্ত্রীর অনুরোধে সুভাষ চন্দ্র সরকারকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। বদলির সময়ই একটি অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বক্তৃতা দিতে আসেন সায়মা ওয়াজেদ। সুভাষ চন্দ্র সরকার নিজেই আমাকে এক দিন এ ঘটনাটির বর্ণনা দিচ্ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষ করে চা পান করতে করতে সায়মা ওয়াজেদ জানেন যে সুভাষকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। এটি শুনে সায়মা দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, আমি আপনার কর্মতৎপরতা মিস করব। সুভাষ বললেন ‘আমাকে এখানে রাখার জন্য একটু বলতে পারেন কি?’ সায়মা ওয়াজেদ উত্তরে বলেছিলেন ‘দুঃখিত। এটা করতে পারব না। মা এসব একদম পছন্দ করেন না।’ প্রধানমন্ত্রীর কন্যা তাঁর সেক্টরে ভালো কাজ করা এক ব্যক্তির বদলি থামাতে তদবির করেন না। অথচ সেই প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় অনেক মন্ত্রীর পত্নী-পরিজন বদলি এবং নিয়োগ বাণিজ্যকে রীতিমতো পেশা বানিয়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের স্বজনপ্রীতির সূচনাকাল ১৯৭৫। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারাই এটাকে ভোগের সুযোগ হিসেবে স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে জিয়াউর রহমানকে সৎ হিসেবে চিত্রিত করার প্রাণান্তর চেষ্টা করা হয়। জিয়ার মৃত্যুর পর ভাঙা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি দেখিয়ে এটিকে এখন রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। কিন্তু জিয়া এবং তার পরিবার কতটা সৎ ছিল, তা নিয়ে সত্যনিষ্ঠ কোনো গবেষণা নেই। এ নিয়ে বিস্তারিত লিখব হয়তো ভবিষ্যতে। কিন্তু ছোট একটি তথ্য দিতে চাই এ লেখায়। জিয়া ততদিনে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ৬ জুন ১৯৭৭ সালে জিয়া কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে লন্ডনে গেলেন। সঙ্গে তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া এবং তার দুই পুত্র। আট দিন পর জিয়া দেশে ফিরলেন একা। তার পত্নী এবং পুত্ররা মাস কাটাল লন্ডনে। রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করে। এ সময় এ নিয়ে সরকারের মধ্যে নানা কথাবার্তা হয়। কিন্তু কেউ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পেতেন। ভারতের আলোচিত সাপ্তাহিক ‘ইন্ডিয়া টুডে’ এ নিয়ে একটি ছোট্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। জিয়া ‘ইন্ডিয়া টুডে’র ওই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। জিয়ার জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ইন্ডিয়া টুডে নিষিদ্ধ ছিল। জিয়ার শাসনামল ছিল এক অন্ধকার সময়। অবরুদ্ধ সময়। সে সময়ের খুব কম তথ্যই মানুষ জানত। লন্ডনে প্রমোদ ভ্রমণের মতো অনেক তথ্যই বন্দি করে রাখা হতো। এরশাদের জমানায় অবরুদ্ধ তথ্যের দেয়ালে চির ধরে। এরশাদের বিনোদন বিলাস, তার বান্ধবী এবং পত্নীগণের অনেক কেচ্ছা-কাহিনি সে সময় বিদেশের গণমাধ্যমে বেরোতে থাকে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সে সময় মোশাররফ হোসেন। তিনি পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরশাদ জমানায় তার স্ত্রীর দাপট ছিল সর্বত্র। এটা অবশ্য তার সরকারি চাকুরে স্বামীর বদৌলতে নয়। এরশাদের কারণে সরকারে প্রচণ্ড ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন জিনাত। এরশাদের পতনের পর বেগম জিয়া ক্ষমতায় আসেন। বেগম জিয়ার হাতেই পরিবার এবং স্বজন তোষণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। বেগম জিয়ার ভাইবোন হয়ে ওঠেন সবচেয়ে ক্ষমতাবান। ২০০১ সালে বেগম জিয়া দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে জিয়া পরিবার এখনকার শ্রীলঙ্কার রাজাপক্ষে পরিবারের মতোই রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্বের মালিক হয়ে যান। বেগম জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে তার পুত্র তারেক রহমান হয়ে ওঠেন অঘোষিত প্রধানমন্ত্রী। বেগম জিয়ার এক ভাই হন সেনাবাহিনীর কেনাকাটা সিন্ডিকেটের প্রধান। মন্ত্রীর ছোট ভাইয়ের হাতে বিমান দেউলিয়া হয়। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান টেলিকম, বিজ্ঞাপন ব্যবসার একচেটিয়া কর্তৃত্ব পান। ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন তিনি। পাঠক একটু মিলিয়ে দেখুন, এখন শ্রীলঙ্কায় যে অবস্থা ঠিক এরকম অবস্থাই বাংলাদেশে তৈরি হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। জিয়া পরিবারের কাছেই ছিল সব ক্ষমতা। আজ শ্রীলঙ্কায় যা ঘটছে বাংলাদেশে ২০০৬ সালে তা ঘটে গেছে। ক্ষমতা ভোগের এই ব্যাধি এখন আওয়ামী লীগের কোনো কোনো মন্ত্রীর মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। ভালো লক্ষণ হলো ব্যাধিটা চিহ্নিত হয়েছে। এখন এর চিকিৎসা প্রয়োজন।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

রেলমন্ত্রী   ট্রেন   ক্ষমতাবান   পত্নী   পরিজন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

পদ্মা সেতু: ক্যারিয়ার বদলে দিলো এক আমলার

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail

আজ আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলো। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। খন্দকার আনোয়ার পদ্মা সেতুর কারণেই তার ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পদ্মা সেতু নিয়ে ঘটনাপ্রবাহের আগে তিনি অনেকটাই আলোচিত এবং উপেক্ষিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ব্যাচের কর্মকর্তা খন্দকার আনোয়ার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই ব্যাচের সবচেয়ে আলোচিত আমলা ছিলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যখন শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা। এ কারণে নজরুল ইসলাম খান অনেক বিপদসংকুল পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন, অনেক কঠিন সময় পার করেছেন। এমনকি তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার তাকে তার প্রাপ্য গাড়িটিও দেননি। এরকম কষ্ট, নির্যাতন এবং পদোন্নতি বঞ্চিত থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এন আই খান প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত একান্ত সচিব, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই ব্যাচের সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, এই ব্যাচকে বলা হতো টিকচিহ্ন ব্যাচ। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যখন প্রথম উপজেলা ব্যবস্থা চালু করেন তখন উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য তড়িঘড়ি করে একটি বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করা, যে বিসিএস ব্যাচটি টিকমার্ক দিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তখন কথা ছিলো যে, শুধুমাত্র তারা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই ব্যাচের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয় এবং এই রিটে তারা বিজয়ী হয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে যুক্ত হয় ৮৩ এর এই ব্যাচটি। এই ব্যাচের অনেক মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে অনেকেই এই ব্যাচ থেকে নানাভাবে আলোচিত হন। আবার এই ব্যাচ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতি বা বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অবসরেও গিয়েছিলেন। এসব আলোচনা-সমালোচনা বিতর্কের উর্ধ্বে ছিলেন খন্দকার আনোয়ার। তিনি নিভৃতে কাজ করতেন। কিন্তু যখন পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং তৎকালীন যোগাযোগ সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, ঠিক সেই সময়ে খন্দকার আনোয়ারকে দেওয়া হয় সেতু বিভাগের দায়িত্বে।

খন্দকার আনোয়ার একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেকেই তাকে কোনো ঘরোনার নয়, কর্ম পাগল একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতো। কিন্তু সেতু মন্ত্রণালয়ের পান তিনি পদ্মা সেতু নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় মধ্যে। এরকম পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়টি পার করেন। মূলত তার বিচক্ষণতা, কর্ম তৎপরতা এবং সততার কারণে পদ্মা সেতু নিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন সেই আস্থার প্রতিদান তিনি খুব ভালমতোই দেন। আর এই এটিই তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। পদ্মা সেতুর সাফল্যের কারণেই সেতু বিভাগ থেকে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন, যদিও আমলাতান্ত্রিক হিসাব-নিকাশে তার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার কথা ছিল না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর আরও আস্থাভাজন হন। এজন্য তিনি দুদফা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পরিচিত। তার সততা, যোগ্যতাই তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যেটি সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতুর কারণে।

পদ্মা সেতু   মন্ত্রিপরিষদ সচিব   খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

আজ বাংলাদেশের গৌরবের দিন। অহংকারের দিন। বাংলাদেশ যত দিন বেঁচে থাকবে তত দিন ২৫ জুনকে স্মরণ করবে। আত্মমর্যাদা ও সাহসের উন্মোচনের দিন হিসেবে উদ্যাপন করবে। পদ্মা সেতু যতটা না সামষ্টিক অর্জন, তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তাঁর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোবল, জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক পদ্মা সেতু। একজন নেতা কী অসাধ্য সাধন করতে পারেন তার বড় বিজ্ঞাপন পদ্মা সেতু। প্রশ্ন উঠতেই পারে, পদ্মা সেতু কি শেখ হাসিনার সেরা অর্জন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন-দর্শন ও রাজনীতি খানিকটা হলেও বিশ্লেষণ করতে হবে।

দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে আওয়ামী লীগের মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা শেখ হাসিনা। ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ৭৩ বছরে পা রাখল। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের আয়ুষ্কালে শেখ হাসিনাই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪১ বছর। আওয়ামী লীগের মতো একটি সংগঠনের শুধু প্রধান নেতা হিসেবে নয়, সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবেও শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠিত। আওয়ামী লীগে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। এটি যে কোনো রাজনীতিবিদের জন্য অনন্য অর্জন। টানা ৪১ বছর দলের নেতা-কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় থাকা কঠিন কাজ। সে কঠিন কাজটিই তিনি করেছেন অবলীলায়। এজন্যও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অমরত্ব পাবেন।

তবে আওয়ামী লীগ বা দেশের রাজনীতিতে তাঁর অপরিহার্য হয়ে ওঠার গল্পটা খুব সোজাসাপটা ছিল না। দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। সামরিক শাসনের শৃঙ্খলে গণতন্ত্র বন্দি। বুটের তলায় পিষ্ট মানুষের অধিকার। আওয়ামী লীগ বিভক্ত, ক্ষতবিক্ষত। দেশে ফিরেই শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের ডাক দিলেন। মানুষের মুক্তির কথা বললেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তুললেন গণজাগরণ। শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে না আসতেন তাহলে বাংলাদেশ হয়তো আরেকটি পাকিস্তান হতো। অথবা ব্যর্থ, পরাজিত এক রাষ্ট্র হিসেবে ধুঁকতে থাকত। দেশে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা শেখ হাসিনার আরেকটি বড় অর্জন। অং সান সু চি পারেননি। ব্যর্থ হয়েছেন বেনজির ভুট্টো। মিয়ানমারে সু চি সামরিক জান্তার সঙ্গে সমঝোতা করে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই বলি দিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছেন। শেষ পর্যন্ত উর্দিতন্ত্রের কবর দিয়েছেন চিরতরে। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রধান নেতা হিসেবেও শেখ হাসিনা অবলীলায় ইতিহাসে অমরত্ব পাবেন।

গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখার জন্য একটি কার্যকর শক্তিশালী বিরোধী দল জরুরি। ১৯৮৬ ও ’৯১ সালের সংসদে আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দল। শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধী দলের নেতা। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিল এজন্যই গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কেবল সরকারের সমালোচনা করেনি। বিকল্প পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে সফল বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে বিরোধী দলের কাজ কী। বিরোধী দলকে কীভাবে রাজনীতি করতে হয়। এজন্য এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবেন শেখ হাসিনা। দলে-বাইরে নানা প্রতিকূলতা পার হয়ে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এ সময় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও এমন কিছু পদক্ষেপ নেন, যার যে কোনো একটির জন্যই তিনি অমরত্ব পেতে পারেন। গঙ্গার পানিচুক্তি ছিল ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যের প্রথম পালক। পার্বত্য শান্তির মতো একটি উদ্যোগ অন্য কোনো দেশের সরকারপ্রধান গ্রহণ করলে সেজন্য নিশ্চিত নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতেন। কিন্তু পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়েও শেখ হাসিনা ওই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা ছাড়া কিছুই পাননি। তবে পার্বত্য শান্তিচুক্তির জন্যও শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ’৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অবয়ব দিতে শুরু করেন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ ইত্যাদি প্রতিটি উদ্যোগ মানবিক বাংলাদেশ গঠনের একটি করে স্তম্ভ। এ উদ্যোগগুলোর জন্য শেখ হাসিনা চিরকাল বেঁচে থাকবেন। দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে। শেখ হাসিনার মতো বাংলাদেশে আর কেউ কি এত দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি নিয়েছিল? এ অর্জনগুলো খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ সবই হলো আর্থসামাজিক উন্নয়ন। অনেক সময় আর্থসামাজিক উন্নয়ন অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। সে বছর বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় সংখ্যালঘু ও বিরুদ্ধমতের ওপর তান্ডব। ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা-সন্ত্রাসের এক ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ সময় বাংলাদেশ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাহসী এক লড়াকু যোদ্ধাকে দেখে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যেভাবে নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে শেখ হাসিনা অটল, দৃঢ়চিত্তে দলের হাল ধরেছেন, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সেটিও তাঁর বড় এক অর্জন। ২০০১-এর মাস্টারপ্ল্যান ছিল আওয়ামী লীগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। অলৌকিকভাবে সেদিন বেঁচে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েও হাল ছাড়েননি শেখ হাসিনা। বরং জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হয়েছেন। এ সাহস আর অকুতোভয় চরিত্রের কারণেই শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। সেদিন যদি তিনি ভয় পেয়ে গুটিয়ে যেতেন তাহলে আজকের বাংলাদেশ আমরা পেতাম না। দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস খুব কম মানুষের থাকে। তার চেয়েও কম মানুষ এ লড়াইয়ে জয়ী হয়। শেখ হাসিনা সে রকমই এক বিরল বিজয়ী যোদ্ধা। ওয়ান-ইলেভেনের সময়টা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। সে পরীক্ষায় জয়ী হয়েছেন মাত্র একজন রাজনীতিবিদ। তাঁর নাম শেখ হাসিনা। এক-এগারো ছিল বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের সবচেয়ে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি নীলনকশা। সেনাবাহিনীর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সুশীল রাজত্ব কায়েম হয়েছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনীতির দৈন্যের করুণ চেহারাটা সে সময় উন্মোচিত হলো। কেউ পালিয়ে গেলেন, কেউ আপস করলেন, কেউ দিগ্ভ্রান্ত, হতবিহ্বল। রুখে দাঁড়ালেন একজন। শেখ হাসিনা। সেদিন যদি নির্বাচনের দাবিতে, দ্রুত জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তিনি সোচ্চার না হতেন, তাহলে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হতো অধিকারহীন এক করপোরেট দাসতন্ত্র। এ সময় শেখ হাসিনার ওপর নেমে এসেছিল অত্যাচারের স্টিম রোলার। একের পর এক বানোয়াট মামলা, নির্যাতনে এতটুকু টলাতে পারেনি সাহসী এই রাষ্ট্রনায়ককে। এ সময় দেশের মানুষ দেখেছে ক্লান্তিহীন লড়াকু এক নেতাকে। একাই যুদ্ধ করে হারিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সুদের। ফিরিয়ে এনেছেন গণতন্ত্র।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বর্তমান টানা ১৩ বছরের শাসনামল নিয়েই চর্চা বেশি হয়। অতীতে তাঁর সংগ্রাম, অসম্ভবের বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু ১৯৮১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ শেখ হাসিনাকে করেছে অনন্য, অসাধারণ, তুলনাহীন। সোনা যেমন পুড়েই খাঁটি হয়, শেখ হাসিনাও ঘাত-প্রতিঘাতেই আজকে রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিশ্বনেতা হয়েছেন। এ ১৩ বছরে ১০০ কারণে শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ১০০ কারণে আগামী ১০০ বছরেও বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মতো একজন নেতা পাবে না। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতির কলঙ্ক মোচন। বিডিআর বিদ্রোহ দমন। কোন অর্জনকে খাটো করবেন? সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান। ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দান। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ। প্রায় সব সূচকে ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলা। টানা প্রবৃদ্ধি। কোন অর্থনৈতিক অর্জনকে আপনি উপেক্ষা করবেন?

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে অনন্য, অসাধারণ এক অর্জন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, একটিও কম? কবে বাংলাদেশ একসঙ্গে এতগুলো স্বপ্ন পূরণের পথে হেঁটেছে।

পদ্মা সেতু ব্যতিক্রম এবং আলাদা মর্যাদায় অন্য কারণে। কেবল একটি নান্দনিক আধুনিক অবকাঠামোর জন্য নয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে অপমানের প্রতিশোধ। আমাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। পদ্মা সেতু সব সময় আমার আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ মনে হয়। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা যেমন প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় যুদ্ধ করে একটা দেশ স্বাধীন করেছে; তেমনি দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রামরত একটা দেশ বিশ্বের অন্যতম চিত্তাকর্ষ এক সেতু বানিয়ে ফেলল নিজের টাকায়। এর পেছনে শক্তিটা কী? শক্তিটা হলো সাহস। এ সাহস তাকে দিয়েছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সবকিছু জয়ের অদম্য স্পৃহা।

শেখ হাসিনার জীবনের গল্পটা সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মাঝেমধ্যে তা রূপকথার চেয়েও বিস্ময়কর। একজন মানুষ যদি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, লক্ষ্য অবিচল থাকে, চিন্তা পরিচ্ছন্ন হয় তাহলে যে তিনি বিজয়ী হবেন শেখ হাসিনাই তার প্রমাণ। ’৭৫-এ মানুষটি সব হারিয়েছেন। বাবা, মা, ভাই সবাইকে। এ রকম একজন মানুষের তো উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কথা। অথবা হতাশার গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেখ হাসিনা দেখালেন সব হারিয়েও সব পাওয়া যায়। মনোবল, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করলে অসম্ভব শব্দটাকে সহজেই পরাজিত করা যায়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জাতির পিতাকে পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ দেশে আর কেউ কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে পারবে না।

’৭৫-এর পর কজন ভেবেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আবার তাঁর মর্যাদার আসনে বসবেন। কেউ কি ভেবেছিল বাংলাদেশ আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে হাঁটবে? ’৮১ সালে যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলেন অসহায়, রিক্ত, সিক্ত অবস্থায় তখন কজন ভেবেছিল তিনি হয়ে উঠবেন বাঙালির কান্ডারি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে পাবে মর্যাদার আসন। ’৯১ সালের নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ হেরে গেল, তখন শেখ হাসিনার রাজনীতির যবনিকা দেখেছিলেন বেশির ভাগ পন্ডিত। ২০০১-এ আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতারাই ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব ভেবেছিলেন। ২০০৭ সালে তো নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চেয়েছিলেন হেভিওয়েট নেতারা। কিন্তু শেখ হাসিনা হাল ছাড়েননি। লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি এতটুকু। তিনি আস্থা রেখেছিলেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ওপর, কোটি মানুষের ওপর। তাদের নিয়ে লড়াই করে গেছেন সব হারানো মানুষটি। লড়াই করেছেন অসত্যের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই তিনি হেঁটেছেন। নতুন পথ বানাতে চাননি। জাতির পিতার ছায়ায় থেকেই নিজেকে বিস্তৃত করেছেন। শেখ হাসিনার গল্পটা তাই সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প। শুধু শেখ হাসিনার গল্প নয়, বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর গল্পটাও যেন একই চিত্রনাট্যের অনুপম বাস্তবায়ন। এক অসম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ পায় এক স্বাধীন রাষ্ট্র। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল এক স্বনির্ভর, আত্মমর্যাদার দেশ। কিন্তু ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন সব হারায়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন স্বাধীনতা, চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তি। নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেন অর্থনৈতিক মুক্তির পতাকা ওড়াল। ’৭৫-এ সব হারানো বাংলাদেশ ২০২২-এ এসে সব পেল। পদ্মা সেতুর গল্পটাও একই রকম। বিপুল আড়ম্বরে এ সেতু নির্মাণের যাত্রা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির অভিযোগ সব স্বপ্ন লন্ডভন্ড করে দেয়। সব হারায় পদ্মা সেতু প্রকল্প। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কিন্তু শেখ হাসিনার আসল অর্জন হলো তাঁর রাজনীতি, সাহস ও সততা। এ কারণেই লক্ষ্য অর্জনে পাহাড়সম বাধা তিনি পার হয়ে যান অবলীলায়। সব হারিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটাই তাঁর সব পাওয়া। রাজনীতির এ দৃঢ় আদর্শের জন্য শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। বেঁচে থাকবেন হাজার বছর।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
Email : poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

পদ্মা সেতু উদ্বোধন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ফখরুল ৫০০, রিজভী ২০০ টাকা

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৩ Jun, ২০২২


Thumbnail

বন্যা নিয়ে বিএনপি'র আহাজারির কমতি নেই। প্রতিদিন বিএনপি সরকারের সমালোচনায় মুখর। সরকার ত্রাণ তৎপরতা ঠিকমতো করতে পারছে না, বন্যার চেয়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নিয়ে সরকার ব্যস্ত এমন সমালোচনা বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিনিয়তই করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের জন্য বিএনপি কি করছে? সম্প্রতি বিএনপির নেতারা নিজস্ব উদ্যোগে দূর্গত মানুষকে সহায়তার জন্য অর্থ আহরণ করা শুরু করেছে। দলের নেতাকর্মীদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দলীয় প্রধান কার্যালয়ে যে যেটুকু পারে সেটুকু টাকা যেন জমা দেয়। আর টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত গত তিনদিনে বিএনপি'র কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে টাকা উঠেছে ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা মাত্র। আর এই ত্রাণ তহবিলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিয়েছেন ৫০০ টাকা আর বিএনপি'র সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দিয়েছেন ২০০ টাকা। স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই কোনো টাকা জমা দেননি। সবচেয়ে বেশি ৩০০০ টাকা জমা দিয়েছেন একজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা। বিএনপির নেতারা বলছেন যে, তারা আরও অপেক্ষা করবেন এবং আগামী দুইদিন পর এই টাকা দিয়ে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করবেন। 

তবে বিএনপির এই ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা দিয়ে দুর্গত মানুষের জন্য কি ত্রাণ সহায়তা করা হবে, সে নিয়ে বিএনপির মধ্যেই নানারকম কৌতুক শুরু হয়েছে। বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এ টাকা দিয়ে সবার জন্য ১ বোতল করে পানিও দেওয়া সম্ভব না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন যে, সরকার অপ্রতুল ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে এবং দুর্গত মানুষদের জন্য তেমন ত্রাণ দিচ্ছে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি'র পক্ষ থেকে তেমন কোনো ত্রাণ তৎপরতা চোখে পড়েনি। স্থানীয় পর্যায়ে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপি নেতাদেরকে ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেও সেই আহ্বানে এখনও সাড়া দেয়নি বিএনপি নেতারা।

বিএনপিতে ধর্নাঢ্য-বিত্তবান ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। বিএনপি নেতাদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একজন ধর্নাঢ্য শিল্পপতি। আব্দুল আউয়াল মিন্টুও বিত্তশালী একজন ব্যক্তি। এছাড়াও বিএনপিতে বহু ব্যবসায়ী এবং ধনী লোক আছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসও একটি ব্যাংকের মালিক এবং পরিবহন ব্যবসায় রয়েছেন। অথচ এত ধনী ব্যক্তি থাকার পরও বিএনপি নিজস্ব উদ্যোগে তহবিল গঠন করতে পারছে না কেন, এটি বিএনপি'র জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিএনপি'র একজন কর্মী বলেছেন যে, দলের মহাসচিব যদি ৫০০ টাকা দেন তাহলে অন্য কর্মীরা কি করবেন? আর এর প্রেক্ষিতেই নতুন করে বিএনপি'র মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বন্যা শুরুর এক সপ্তাহ হলেও এখন পর্যন্ত বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে ত্রাণ তৎপড়তার জন্য সিলেট অঞ্চলে যেতে দেখা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যে, বন্যা নিয়ে কি বিএনপি রাজনীতি করতে চায় নাকি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়? 


ফখরুল   রিজভী   বিএনপি   বন্যা   ত্রাণ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২২ Jun, ২০২২


Thumbnail ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হচ্ছে আগামী ২৫ জুন। ওই দিন সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেতুর উদ্বোধন করবেন এই সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ প্রধানমন্ত্রী গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এই সংবাদ সম্মেলনে দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়, তবে বাকি সময়টা ছিল পদ্মা সেতু নিয়ে নানারকম আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী খোলামেলাভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রধানমন্ত্রী এই সময় পদ্মা সেতু নিয়ে বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরে আসে, তখন বিভিন্ন বিশিষ্টজনেরা যেসব মন্তব্য করেছিল, সেই সমস্ত মন্তব্যগুলো প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন সংবাদ সম্মেলনে। তিনি কয়েকজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরোধীতার কথাও উল্লেখ করেন তার সংবাদ সম্মেলনে। এই সমস্ত ব্যক্তিদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো যে, যারা সেই সময় পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করেছিলেন এবং পদ্মা সেতু হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা কি আগামী ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদের কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রথমে নাম ছিল বেগম খালেদা জিয়ার। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, এই সরকার পদ্মা সেতু কাজ শুরু করছে, কিন্তু এই সরকার তা শেষ করতে পারবে না। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর নির্মাণের ক্রটির কথাও উল্লেখ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাই তার পক্ষে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব না বলে তার পারিবারিক সূত্র বলেছে। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, বেগম খালেদা জিয়া এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পান নাই। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়াকে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে যদি আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে বেগম খালেদা জিয়া যে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী হিসেবে যাকে চিহ্নিত করেছেন তিনি হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে কি কি করেছিলেন তার বিবরণও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, একজন ব্যক্তির একটি পদ আঁকড়ে রাখার জন্য দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকার জন্যই তিনি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাধা দিয়েছিলেন বলে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন কিনা এ সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্য কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি যাবেন না। তবে এ ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। 

ড. আকবর আলি খান: পদ্মা সেতু নিজ অর্থে করার সমালোচক হিসেবে ড. আকবর আলী খানের একটি বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী আজ সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছেন। ড. আকবর আলি খানের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অসুস্থ এবং পদ্মা সেতু পর্যন্ত যাওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা তার নেই। এজন্য তিনি পদ্মা সেতুতে যাবেন না। যদিও তার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া এবং নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এটির ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যযয়ের কথাও বলেছিলেন। তবে জানা গেছে যে, ড. দেবপ্রিয় পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। সেতু বিভাগ সূত্র জানা গেছে যে, তাকে ইতোমধ্যে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। 

শাহদীন মালিক: শাহদীন মালিকও পদ্মা সেতুর সমালোচনা করেছিলেন। সেখানে তিনি সুশাসনের অভাবের কথা বলেছিলেন এবং বিশ্বব্যাংককে সরে যাওয়াটাকে দুর্ভাগ্যজনক বলেছিলেন। শাহদীন মালিকেও পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শাহদীন মালিকের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছেন তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন না। 

অর্থাৎ যারা যারা পদ্মা সেতু হবে না, নিজে অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা সম্ভব নয় বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা কেউই আসলে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। তবে এটি কি লজ্জায়, না হতাশায় সেটি অবশ্য জানা যায়নি।

ভিলেন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   প্রধানমন্ত্রী   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচন কমিশনের মেরুদন্ড ভেঙে গেল কুমিল্লায়

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৮ Jun, ২০২২


Thumbnail

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ছিল নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রথম পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় শোচনীয়ভাবে ফেল করল কমিশন। শুধু ফেল করেনি, নতুন ইসির কোমর ভেঙে গেছে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত সামান্য ভোটে জয়ী হয়েছেন। দুবারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু পরাজিত হয়েছেন চারশোর কম ভোটে। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আরেক প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সারও প্রায় ৩০ হাজার ভোট পেয়েছেন। বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার কারণেই যে সাক্কু পরাজিত হয়েছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেভাবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন তা ছিল অপ্রয়োজনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত। কুমিল্লা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী বর্ষীয়ান নেতা আ ক ম বাহাউদ্দিন তাঁর নিজের লোককে জেতাতে অনেক কিছু করেছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। বিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছেন সমালোচনার অস্ত্র। কুমিল্লার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জেতেনি, জিতেছে একজন এমপির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা। কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিল দীর্ঘদিন প্রকাশ্য বিভক্তি। আফজল খান আর বাহাউদ্দিন বিরোধ বহুবার আওয়ামী লীগের বড় ক্ষতি করেছে। প্রথম সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ছিলেন আফজল খান। এ সময় আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহী এক গ্রুপ মনিরুল হক সাক্কুকে প্রায় প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছিলেন। আফজলকে হারানোর জন্যই তারা কাছে টেনে নিয়েছিলেন বিএনপির সাক্কুকে। দ্বিতীয় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছিলেন আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা। দলীয় বিরোধে ধরাশায়ী হন নৌকার প্রার্থী। অর্থাৎ প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে আওয়ামী লীগ নয়, নিজের প্রতিপত্তি ও প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন ১৪ জন। আফজল খানের মৃত্যুর পর বাহাউদ্দিনের প্রভাব বাড়ে কুমিল্লায় এবং আওয়ামী লীগে। এবার মনোনয়ন পান বাহাউদ্দিনের আপন লোক আরফানুল হক রিফাত। রিফাত মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই সাক্কুকে ছুড়ে ফেলে দেন বাহাউদ্দিন। ‘মাইম্যান’কে জেতাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত এমপির আপন লোক জিতেছেন বটে, কিন্তু তাতে আওয়ামী লীগের ক্ষতিই হয়েছে। একটি গুরুত্বহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন জিততে গিয়ে আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য দূরে থাকলেও আওয়ামী লীগ হয়তো জিতত। আর আওয়ামী লীগ হারলেও দেশের রাজনীতির জন্য কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না।

হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল বিতর্কের মধ্য দিয়ে। এবারই প্রথম আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। কিন্তু দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। রাষ্ট্রপতির সংলাপে যায়নি বিএনপি। সার্চ কমিটিতেও নাম জমা দেয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘এ নির্বাচন কমিশন সরকারের অনুগত এবং আজ্ঞাবহ হবে।’ দলটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আবার রাজনীতির মাঠে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া বয়কট করে। তাই এক রকম হট সিটেই বসেছিল আউয়াল কমিশন। বাংলাদেশে প্রায় সব নির্বাচন কমিশনেরই ‘বাচাল’ রোগ ছিল। নানা রকম অপ্রাসঙ্গিক, বিতর্কিত ও অনভিপ্রেত কথাবার্তা বলে প্রথমেই নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষের আস্থায় চির ধরায়। নতুন নির্বাচন কমিশনারও একই পথে হাঁটলেন। শুরুতেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মতো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে লড়াই করার পরামর্শ দিলেন। এর পর থেকে তাঁর কথা বলেই চলেছেন। বিএনপির আস্থা অর্জনই তাঁর অতিকথনের প্রধান কারণ- এটা বুঝতে কারও কোনো কষ্ট হচ্ছে না। নিজেকে বিশুদ্ধ নিরপেক্ষ প্রমাণের জন্য ‘এবার রাতে ভোট হবে না’ বলেও জাতিকে গ্যারান্টি দিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কাছে মানুষ কথা নয়, কাজ দেখতে চায়। কাজ দিয়েই একটি কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ হলো বিভিন্ন পর্যায়ের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন এবং সম্পন্ন করা। হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বে এ কমিশনের প্রথম পরীক্ষা ছিল কুসিক নির্বাচন। নতুন সিইসিও তাঁর প্রথম পরীক্ষায় নিজেকে যোগ্য ও পক্ষপাতহীন করার যুদ্ধে নামলেন। এ নির্বাচনে বিএনপি কাগজে ছিল না, বাস্তবে ছিল। কিছুদিন ধরে বিএনপি স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর কৌশল নিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। ধানের শীষ শেলফে তুলে রেখে মগ, ঘড়ি, বদনা ইত্যাদি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন তাঁরা। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনেও বিএনপি প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। কুমিল্লায় অবশ্য বিএনপির প্রার্থী একজন নন, দুজন। সাবেক মেয়র সাক্কু ছাড়াও বিএনপির আরেক নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সারও শেষ পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন। কাজেই মুখে বিএনপি যতই বলুক এ সরকারের অধীনে তারা নির্বাচনে যাবে না, বাস্তবে ছদ্মবেশে নির্বাচনের মাঠে ভালোভাবেই আছে।

কুসিক নির্বাচনের সময়ও বিএনপি মহাসচিব নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই কথা বলেছেন। জিতলে জনপ্রিয়, হারলে আমরা তো নির্বাচনই করিনি বলা বিএনপির নতুন নির্বাচনী কৌশল এখন আর গোপন নয়। নির্বাচন থেকে তারা দূরে- এটা প্রমাণের জন্য এখন দলটি বহিষ্কার নাটক মঞ্চস্থ করে। নারায়ণগঞ্জে তৈমুর আলম খন্দকারকে প্রথমে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরাজয়ের পর তাঁকে লাল কার্ড দেখিয়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কুমিল্লায়ও সাক্কুকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়। বাদ যাননি কায়সারও। প্রকাশ্যে বহিষ্কার করলেও বিএনপি নেতা-কর্মীরা বিভক্ত হয়ে তাঁদের দুই প্রার্থীর জন্যই কাজ করেছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রথম পরীক্ষায় নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রথম মনোযোগ ছিল বিএনপির আস্থা অর্জন। হাবিবুল আউয়াল যত না নির্মোহ এবং নিরপেক্ষভাবে কুমিল্লা নির্বাচন করতে চেয়েছেন তার চেয়ে বেশি বিএনপিকে খুশি করার চেষ্টা করেছেন। একজন ব্যক্তি যখন তাঁর দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করেন তখনই বিপত্তি বাধে। নির্বাচনের প্রচারণার এক পর্যায়ে সিইসি কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিনকে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। ওই আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বিএনপির (স্বতন্ত্র) প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। স্থানীয় সরকার নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না। এ নিয়ম ভালো না খারাপ তা নিয়ে দীর্ঘ তাত্ত্বিক বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ গত ১৩ বছরে সব নির্বাচনে এ নিয়মটি মেনে আসছে। এমনকি চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা দূরে ছিলেন। হাবিবুল আউয়াল হয়তো ভেবেছিলেন একটা চিঠি দিলেই কুমিল্লার এই আলোচিত নেতা ঢাকায় চলে আসবেন। অতি উৎসাহী নতুন সিইসি কেন এভাবে চিঠি দিয়ে একজন সংসদ সদস্যকে এলাকা ত্যাগ করতে বললেন সেও এক প্রশ্ন। অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তরটা ভাবা যায় সহজেই। এটা ছিল কাজী হাবিবুল আউয়ালের ট্রাম্পকার্ড। আ ক ম বাহাউদ্দিন যদি এটা মানতেন তাহলে নতুন নির্বাচন কমিশনের মেরুদন্ড শক্ত হতো। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে কাজী হাবিবুল আউয়ালের ইমেজ বাড়ত। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নয়, নিজেকে গ্রহণযোগ্য করতেই বাহারকে এলাকা ত্যাগের নোটিস পাঠিয়েছিল ইসি। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্ভবত আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মঘাতী ইতিহাস জানতেন না। আওয়ামী লীগের এ রকম নেতার সংখ্যা কম নয়, যাঁরা দলের প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে দলের ক্ষতি করেন। যাঁরা কোন্দল করে দলকে দুর্বল করেন। ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য দলের অর্জন ম্লান করেন। এ কুমিল্লায়ই আওয়ামী লীগের রাজনীতি সম্পর্কে চমৎকার এক মন্তব্য করেছিলেন প্রয়াত বিএনপি নেতা কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বাহার আর আফজল থাকলে বিএনপির জেতার জন্য কর্মী লাগে না।’

বিএনপি বা অন্য দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে যত না কুৎসা ছড়িয়েছে, সমালোচনা করেছে তার চেয়ে বেশি করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা একে অন্যের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন, আওয়ামী লীগের শত্রুর দরকার নেই। নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশের জন্য যথেষ্ট। বিভিন্ন সময় এটা প্রমাণিত হয়েছে। খুনি মোশতাক এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা শুধু নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবে জাতির পিতার হত্যা ষড়যন্ত্রে ন্যক্কারজনকভাবে লিপ্ত হয়েছিল। আবদুর রাজ্জাক নিজের আমিত্ব জাহির করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ভেঙেছিলেন। ড. কামাল দেশ কিংবা আওয়ামী লীগের স্বার্থ চিন্তা করেননি। তাঁর ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। ১৯৯১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের বড় কারণ ছিল অন্তঃকলহ। সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হারাতে গিয়ে এক নেতা তো নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগকেই হারিয়ে দিয়েছিলেন প্রায়। চাঁদপুরে আওয়ামী লীগ বিতর্কিত হচ্ছে নিজেদের কোন্দলে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ‘মাইম্যান’কে জেতাতে এমপি-নেতারা আওয়ামী লীগকেই ক্ষতবিক্ষত করেছেন। কুমিল্লায় আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়েছে দুই নেতার বিরোধে। স্থানীয় এমপি বড় মাত্রার ঝুঁকি নিয়েছেন। কুমিল্লার অধিপতি হতে গিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে সমস্যায় ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনের চিঠি পেয়ে তিনি যদি এলাকা ত্যাগ করতেন তাহলে তাঁর এবং আওয়ামী লীগের ইমেজ বাড়ত। এতে হয়তো আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভোটও বাড়ত। সাধারণ মানুষ মনে করত আওয়ামী লীগ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু বাহাউদ্দিন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন কমিশনকে থোড়াই কেয়ার করে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই। বাহাউদ্দিন যখন কমিশনকে বুড়ো আঙুল দেখালেন তখন কমিশনও ভয় পেয়ে পিছু হটল। বলল, তিনি না গেলে আমাদের কী করার আছে। বাঃ, তাহলে কেন এত হম্বিতম্বি? কেন এভাবে চিঠি দেওয়া? এ ঘটনা প্রমাণ করল কমিশন তার ক্ষমতা প্রয়োগে অক্ষম, অযোগ্য।

আমাদের বিবেচনায় কুমিল্লা সিটি নির্বাচন লেজেগোবরে হয়ে যায় এখানেই। বাহাউদ্দিন এলাকায় থেকে তাঁর কর্মীদের বার্তা দিলেন ‘যে কোনো মূল্যে আমি আমার প্রার্থীকে জেতাতে চাই।’ বাস্তবে হলোও তাই। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর ভোট গণনায় দেখা গেল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। তারপর মারমুখী সরকারি সমর্থকদের ঝটিকা তান্ডব। অবশেষে ৩৪৩ ভোটে জয়ী ঘোষণা করা হলো আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে। নির্বাচন ঘিরে সারা দিনের সব অর্জন বালুর বাঁধের মতো ভেঙে গেল। কুমিল্লায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিজয়টা কি খুব জরুরি ছিল?

এ নির্বাচনটি হচ্ছে এমন একসময় যখন বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানামুখী মেরুকরণ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রতিনিয়ত নসিহত দিচ্ছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস বারবার বলছেন, ‘বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চাই।’ কুমিল্লা নির্বাচনের আগে তিনি ছুটে গেছেন নির্বাচন কমিশনে। মুরব্বির আগমনে যেন কমিশন ধন্য হয়েছে। সেখানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনে যেন জনমতের প্রতিফলন ঘটে। জনগণের পছন্দের ব্যক্তি যেন নির্বাচিত হয়।’ শুধু যুক্তরাষ্ট্র কেন, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এখন থেকেই খোলামেলা কথাবার্তা বলছে। এসব বলছে কারণ বিএনপি বিরামহীনভাবে তাদের কাছে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিএনপি বর্তমান সরকার এবং এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে দাবি করছে। কুমিল্লার নির্বাচন বিএনপির এ দাবিকে কি নতুন প্রাণশক্তি দিল না? এ নির্বাচনের আকস্মিক ফলাফলের পর আওয়ামী লীগের কারও মুখে হাসি নেই। তারা বলছেন, ক্ষতি হয়ে গেল। আওয়ামী লীগের এক নেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত হারলে ভালো হতো? অমনি ওই নেতা বললেন, এসব না করলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী জিততেন। নির্বাচন এবং ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ না করেও যে জয়ী হওয়া যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন ছিল তার প্রমাণ। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন একটি অনবদ্য নির্বাচনী কৌশলের মাধ্যমে। ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে একটি নির্বাচন পরিচালনা টিম পাঠানো হয়েছিল। যে টিম নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের কোন্দল বন্ধ করেছিল কঠোরভাবে। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগই যে অপ্রতিরোধ্য তা প্রমাণ করেছিল। ওই নেতার কথায় নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের সঙ্গে কুমিল্লা নির্বাচন মেলালাম। শুধু নারায়ণগঞ্জ কেন, বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে টিম করে দিয়েছে। সে টিম কাজ করেছে। কুমিল্লায় কেন্দ্রীয় টিম কোথায়? কয়েক জায়গায় ফোন করে জানলাম আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো টিম করেনি। কারণ কী? বাহাউদ্দিন চাননি। তিনি নিজেই সব দায়িত্ব নিয়ে কুমিল্লা দখলের নীলনকশা করেছিলেন। তাঁর অভিলাষ তিনি বাস্তবায়ন করেছেন আওয়ামী লীগের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে। এই নেতাই কিছুদিন আগে কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সঙ্গে প্রায় তর্ক জুড়ে দিয়েছিলেন। আঞ্চলিকতাকে উসকে দিয়ে কুমিল্লাবাসীর কাছে হিরো সাজার চেষ্টা ছিল তাঁর ওই অযাচিত বিতর্কে। প্রধানমন্ত্রী সেদিন চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। কেউ কেউ বাহারকে বাহবা দিয়েছেন। অথচ বাহাউদ্দিনের মতো একজন প্রবীণ নেতা একবারের জন্যও ভাবেননি শেখ হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কিছুই থাকে না। কুমিল্লা নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেও ছোট করা হয়েছে। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অনেকেই বলছেন, যে নির্বাচন কমিশন একজন সংসদ সদস্যকেই সামাল দিতে পারে না সে কমিশন জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ সংসদ সদস্যকে সামলাবে কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর কী দেবেন ব্যক্তিস্বার্থে দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অর্বাচীন নেতারা?

এ কুমিল্লায়ই রাজনীতি করতেন খুনি মোশতাক, খুনি তাহের উদ্দিন ঠাকুর। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে এ কুমিল্লায়ই ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল খুনি মোশতাক। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের জয় নিয়ে কোনো সংশয় নেই কারও, কিন্তু কুমিল্লা-৯ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খুনি মোশতাকের ভরাডুবি হলো। ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশীদ নামে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে তিনি হারছিলেন। এ সময় হেলিকপ্টারে করে ব্যালট ঢাকায় নিয়ে আসা হলো। খুনি মোশতাককে বিজয়ী ঘোষণা করা হলো। ব্যক্তিস্বার্থে দলকে ব্যবহারের পরিণতি কখনো শুভ হয় না। নিজের স্বার্থে যারা দলকে ব্যবহার করে তারা দলের জন্য ক্ষতিকর।

কুসিক নির্বাচন   নির্বাচন কমিশন   নির্বাচন  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন