এডিটর’স মাইন্ড

রাষ্ট্রদ্রোহী

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০২ জুলাই, ২০২২


Thumbnail

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ২৮ জুন, মঙ্গলবার এক ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছেন। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে ডিভিশন বেঞ্চ পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে হাই কোর্ট বেঞ্চ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে একটি কমিশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।  দুই মাসের মধ্যে কমিশনকে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। এ বিষয়ে আগামী ২৮ আগস্ট শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। হাই কোর্ট বেঞ্চ পদ্মা সেতুকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এ ধরনের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করে তাদের জাতীয় শত্রু বলে মন্তব্য করেন হাই কোর্ট। বাংলাদেশে এই প্রথম একটি ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচনের জন্য সর্বোচ্চ আদালত সরাসরি নির্দেশনা দিলেন। এ নির্দেশনার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিলেন আদালত। জাতীয় শত্রু মানে দেশের শত্রু। যারা দেশের বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহীর সর্বোচ্চ সাজা হওয়া উচিত। আদালতের এ নির্দেশনার এক দিন পর বুধবার ইউনূস সেন্টার থেকে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠানো হয়। এ বিবৃতিতে ড. ইউনূস তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ড. ইউনূসের মতো একজন গুণীজনের বিবৃতি অসংলগ্ন, অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ২০১১ সালে পদত্যাগ করতে বলায় গ্রামীণ ব্যাংকের মৌলিক আইনি মর্যাদা রক্ষার্থে তিনি হাই কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছিলেন। এর সঙ্গে চাকরি ধরে রাখার কোনো সম্পর্ক নেই। ওমা! এ কী কথা! রিট পিটিশনটাই হলো ড. ইউনূসকে পুনর্বহালের নির্দেশনা চেয়ে। অথচ এখন তিনি বলছেন, এর সঙ্গে চাকরি ধরে রাখার সম্পর্ক নেই। পুরো বিবৃতি এ রকম জগাখিচুড়িতে ভরপুর। হাই কোর্ট কমিশন গঠনের নির্দেশনার পরপরই এ বিবৃতি দেওয়া হলো। এর কারণ সুস্পষ্ট। আগেভাগে তিনি দায়মুক্তির চেষ্টা করলেন। তার মানে গ-গোল তো কিছু আছে। না হলে এত দিন কোনো প্রতিবাদ নেই, আদালত কমিশন গঠন করতে বলার পর কেন এ বিবৃতি? কমিশন গঠনের আগেই তিনি বলছেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রকারী নই’। বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জন অনেক ত্যাগের বিনিময়ে। অনেক কষ্টের। আর প্রতিটি অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নানা ষড়যন্ত্র। কখনো দেশে, কখনো বিদেশে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র আবার প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্জনকে বানচাল করার সব চেষ্টা করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে খুনি মোশতাক চক্র ষড়যন্ত্র করেছিল। যুদ্ধের মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন প্রস্তাব নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেছিল। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ এটা টের পেয়ে মোশতাককে পররাষ্ট্র দফতর থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল বাঙালির অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য। এ হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল আওয়ামী লীগের ভিতরেই। ২০০৭ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি বানচালের জন্য ষড়যন্ত্র হয়েছিল। সেই ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা ছিল আমাদের সুশীলসমাজের একটি অংশ। লোভী ও চতুর সুশীলদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন কিছু কাপুরুষ রাজনীতিবিদ। পদ্মা সেতু নিয়েও ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এ ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিল সুশীল শিরোমণি ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেশের স্বনামধন্য কিছু ব্যক্তি। এসব ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশকে থামিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিনাশ। সব ষড়যন্ত্রই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, আমরা একটি ষড়যন্ত্রেরও স্বরূপ উন্মোচন করতে পারিনি কিংবা আগ্রহ দেখাইনি। একটি ষড়যন্ত্র আরেকটি ষড়যন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কার কী ভূমিকা তা নিয়ে একটি কমিশন গঠনের দাবি উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের পর। বঙ্গবন্ধু সে সময় দেশ গড়ার কাজেই মনোযোগী ছিলেন। এজন্য কমিশন গঠনে আগ্রহী হননি। জাতির পিতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন। দালাল আইন করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ-দেশি দোসরদের বিচার শুরু করেছিলেন। এ বিচার অব্যাহত থাকলে মুখোশধারী স্বাধীনতাবিরোধীদের চিহ্নিত করা যেত। তাদের আওয়ামী লীগ এবং সরকার থেকে আলাদা করা যেত। কিন্তু সে প্রক্রিয়া নস্যাৎ করে দেয় ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট। ’৭৫-পরবর্তী আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে নিরন্তর কাজ করেন। জনমত গড়ে তোলেন। মানবাধিকারের জন্য আন্দোলন করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু হয়। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করেন। আত্মস্বীকৃত বেশ কয়েকজন খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের তদন্ত হয়নি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন নেতা কয়েক বছর ধরে এ ব্যাপারে একটি ‘তদন্ত কমিশন’ গঠনের দাবি করছেন। গত বছর জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের তদন্তে একটি ‘জাতীয় কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা জাতির পিতার হত্যার বিচার করেছি, কিন্তু এই নীলনকশার তদন্ত করতে পারিনি।’ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জাতীয় শোক দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আগস্ট ষড়যন্ত্রের নানা বিষয় উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘এত বড় দল, এত নেতা কেউ এগিয়ে এলো না। একটা প্রতিবাদ মিছিল করতে পারল না কেন?’ আগস্ট ট্র্যাজেডি নিয়ে ভাবলেই অনেক প্রশ্ন মাথায় কিলবিল করে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার সব সদস্য কেন ভেড়ার পালের মতো সুড়সুড় করে বঙ্গভবনে খুনি মোশতাকের আজ্ঞাবহ ভৃত্য হলো? তিন বাহিনীর প্রধানরা কেন পুতুলের মতো নীরব-নিথর থাকলেন? জিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে বদলির আদেশ বাতিলে কে বা কারা বঙ্গবন্ধুকে প্ররোচিত করেছিল? ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন। আগস্ট ট্র্যাজেডির সময় যারা চারপাশে ছিলেন তাদের অনেকেই চলে গেছেন। আর কিছুদিন পর সত্য অন্বেষণে সাক্ষীও পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগ সরকার কেন আগস্ট ষড়যন্ত্রের মূল উদ্ঘাটনের জন্য একটি কমিশন এখনো করল না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না। ওয়ান-ইলেভেন ছিল বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্রের চেনা কুশীলবরা এখন কেউ বিদেশে, কেউ দেশে বহাল। এ বিষয়ে ১-১১-এর বিরাজনীতিকরণের নীলনকশা বাস্তবায়ন হয়নি শেখ হাসিনার সাহস এবং দৃঢ়তার জন্য। কিন্তু গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন হয়নি আজও। ড. ইউনূস ওয়ান-ইলেভেনের আগেই কেন নোবেল পুরস্কার পেলেন? তা-ও আবার শান্তিতে! যৌথভাবে (গ্রামীণ ব্যাংক ড. ইউনূস) নোবেল পুরস্কার কীভাবে এক ব্যক্তির অর্জন হিসেবে প্রচার হলো সে-ও এক প্রশ্ন। ড. ইউনূসের নোবেল জয়ের পরপরই রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা। সেই রাজনৈতিক দলে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের যোগদান! নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত। জনগণকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দেওয়া। দুটি প্রথম সারির দৈনিকে (একটি বাংলা, একটি ইংরেজি) বিরামহীনভাবে রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন। তারপর ড. ফখরুদ্দীনের মতো এলিট আমলাকে সিংহাসনে বসানো। সবকিছু নিখুঁত নীলনকশার পরিপাটি বাস্তবায়ন। এরপর ড. কামাল হোসেনের সাংবিধানিক ফতোয়া দিয়ে অবৈধ অনির্বাচিত সরকারকে বৈধতা দেওয়া। দুই সম্পাদকের বিরামহীনভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তোষণ। একজন স্বনামে কলাম লিখলেন, ‘দুই নেত্রীকে সরে যেতেই হবে’। অন্যজন গোয়েন্দা সংস্থার চিরকুট যাচাই-বাছাই না করেই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের পটভূমি তৈরি করলেন। সব যেন এক সুতোয় মালা গাঁথার মতো। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে ১-১১-এর ঘটনার তদন্ত কমিশন গঠিত হওয়া প্রয়োজন ছিল; কিন্তু হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত না হওয়ার জন্যই খুনি মোশতাক জাতির পিতাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। ঠিক তেমনি, ১-১১-এর কুশীলবদের ব্যাপারে তদন্ত না হওয়ার কারণেই এরা পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র করার সাহস পেয়েছিল। ১৯৭১, ১৯৭৫, ২০০৭ এবং ২০১১-এর ষড়যন্ত্র একসূত্রে গাঁথা। এসব ষড়যন্ত্র আসলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। আবার ’৭১ ও ’৭৫-এর ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা যেমন ছিল এক ও অভিন্ন। তেমনি ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরাই পদ্মা সেতু না হওয়ার ষড়যন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ’৭১ ও ’৭৫-এর ষড়যন্ত্রকারীরা যুদ্ধাপরাধী, খুনি। আর ২০০৭ ও ২০১১-এর ষড়যন্ত্রকারীরা হলো গণতন্ত্রবিরোধী, রাষ্ট্রদ্রোহী।

পদ্মা সেতুতে ড. ইউনূস কেন বাধা দিয়েছিলেন? কেনই বা তাঁর সঙ্গে ১-১১-এর কুশীলবরা যোগ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণে ষড়যন্ত্র নিয়ে যতবার কথা বলেছেন ততবার ড. ইউনূস প্রসঙ্গ এসেছে। ড. ইউনূস ছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চাকরির একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকে। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নির্ধারিত বয়স অতিক্রান্ত হয়েছিল বহু আগেই। বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে অবসরে পাঠায়। ড. ইউনূস বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যান। সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সঠিক। এরপর ড. ইউনূস শুরু করেন দেনদরবার-তদবির। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও টেলিফোন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। প্রচ্ছন্ন ধমকও দেন। কিন্তু হিলারি-ইউনূস কেউই সম্ভবত বুঝতে পারেননি শেখ হাসিনা অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি শেখের বেটি। এসব চাপের কাছে নতিস্বীকার তিনি কখনই করবেন না। এর পরই অন্য চাপ। সে চাপটি হলো পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ। মহাজনী ব্যবসায় বেড়ে ওঠা ড. ইউনূস জানতেন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হলে অন্য দাতারাও সরে যাবে। আমার মনে হয়, ড. ইউনূস বুঝতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলে আর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ফিরতে পারবেন না। এজন্য তিনি শেখ হাসিনা সরকারকেই সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে নেমেছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ হারিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ দখলের মাধ্যমে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। ঘটাতে চেয়েছিলেন আরেকটি ১-১১। পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ ছিল আসলে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র। ২০১২ সালের ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণচুক্তি বাতিল করে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দেড় বছর আগে। এ সময় যদি আমরা ‘মাইনাস ফরমুলার প্রবক্তা’ দুটি সংবাদপত্রে চোখ রাখি, দেখব দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে নানা গল্পকাহিনি। ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. শাহদীন মালিকসহ আরও কতিপয় সুশীল পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি প্রমাণে কলমযোদ্ধা হয়ে গেলেন! পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক সরে আসা নিয়ে সে সময় কে কী বলেছেন তা ইতোমধ্যে দেশের গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। সে প্রসঙ্গ এখানে আর উল্লেখ করতে চাই না; কিন্তু এই সংঘবদ্ধ সাঁড়াশি আক্রমণের লক্ষ্য ছিল একটাই- সরকারকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ। এ সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারবে না- এটি প্রমাণের চেষ্টা। সুশীলরা ক্ষমতায় আসে রাজনৈতিক শক্তির ঘাড়ে চড়ে। ২০০৭ সালে সুশীলরা বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল। ইয়াজউদ্দীনকে দিয়ে একের পর এক এমন সব সিদ্ধান্ত সে সময় বিএনপি নিয়েছিল, যাতে ন্যূনতম সুষ্ঠু নির্বাচনের পথও রুদ্ধ হয়েছিল। ২০১২ সালেও সুশীলরা আরেকটি ‘অনির্বাচিত’ অধ্যায় শুরুর নীলনকশা করেছিল বিএনপিকে মাথায় রেখে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ সময় মাঠে নামলেন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে। বক্তৃতায় বলতে শুরু করলেন, এ সরকারের আমলে পদ্মা সেতু হবে না। পদ্মা সেতু জোড়াতালি দিয়ে হচ্ছে। এমন অবাস্তব, হাস্যকর কথা বলে তিনি সুশীলদের ক্রীড়নকে পরিণত হলেন।

২০১৩ সালের সব সিটি করপোরেশনে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস যখন তুঙ্গে ঠিই তখনই বেগম জিয়া জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেন। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সার্টিফিকেট আর বেগম জিয়ার নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা- দুইয়ে মিলে সুশীলদের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত। ওয়ান-ইলেভেনের আগে দুই সুশীল সম্পাদক যা করেছিলেন, ঠিই একই ভূমিকায় আবার মাঠে নামলেন। কিন্তু তাঁরা বোধহয় কার্ল মার্কসের অমর বাণীটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। মার্কস বলেছিলেন- ‘ইতিহাসে একই ঘটনার একই রকম পুনরাবৃত্তি হয় না।’ ২০১৪ সালের নির্বাচন হলো। ২০০৭-এর মতো আরেকটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা দখল করতে পারল না। ফলে ‘পদ্মা সেতু’ ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটানোর চক্রান্ত ভেস্তে গেল। এ ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেল শুধু একজন মানুষের জন্য। তাঁর নাম শেখ হাসিনা। ওয়ান-ইলেভেনের মতো এ সময়ও আওয়ামী লীগের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা যাবে না।’ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তি বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে ঋণচুক্তি আবার চালুর জন্য ওয়াশিংটনে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার সুবিধা হলো, তিনি ভবিষ্যৎটা খুব ভালো দেখতে পান। তিনি জানতেন কারা পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন। কেন করছেন। ২০১২ সালের ৪ জুলাই সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মতামত উপেক্ষা করে তিনি জাতীয় সংসদে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ৮ জুলাই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ৯ জুলাই এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। এরপর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অবিশ্বাস্য যুদ্ধ। এ কারণেই ২৯ জুন বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ সেতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, আমাদের সৃজনশীলতা, আমাদের সাহসিকতা, সহনশীলতা, আমাদের প্রত্যয়। শেষ পর্যন্ত অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর মুখ দেখেছি।’ সুশীলদের বিরুদ্ধে এটি ছিল শেখ হাসিনার দ্বিতীয় বিজয়। এ সুশীলরাই ২০০৭ সালে শেখ হাসিনাকে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ বানানোর এক কুৎসিত নোংরা খেলায় মেতেছিলেন। একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। ঠিক পাঁচ বছর পর ওই একই চক্র ‘পদ্মা সেতু’ নাটক করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য বঙ্গবন্ধু পরিবারকে দুর্নীতির কালিমা দিতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনাকে আবার রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু ১-১১-এর সময় শেখ হাসিনা যেমন করে সততার আলোয় সব অসত্যের অন্ধকার দূর করেছিলেন, তেমনি ২০১২ সালেও তিনি হিমালয়ের মতো সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রমাণ করেছিলেন তিনিই সত্য।

এ দেশে কিছু মানুষ আছে যারা সারাক্ষণ অন্যের অনিষ্ট চায়। নিজেদের হাজারো পাপ, কিন্তু তারা ব্যস্ত অন্যের খুঁত খোঁজায়। জনগণের মঙ্গল, কল্যাণ, ভালো- সবকিছু তাদের খুব অপ্রিয়। এ গোষ্ঠী দেশে গণতন্ত্র চায় না। উন্নয়ন দেখলেই দুর্নীতি খোঁজে। বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হয়ে মাথা তুলে দাঁড়ালে তারা হাহাকার করে। বিদেশি প্রভুদের নির্দেশই তাদের জন্য অমর বাণী। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সামনে এ দেশের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। পদ্মা সেতু প্রমাণ করে দিয়েছে তারা সত্য বলেন না। তারা দেশের মঙ্গল চান না। উন্নয়ন চান না। আমরা আশা করি শিগগিরই কমিশন গঠিত হবে। পদ্মা সেতু উন্মোচনের মতো ভদ্রলোকের মুখোশ পরা রাষ্ট্রদ্রোহীদের চেহারা উন্মোচিত হবে। সেদিন না হয় আমরা আরেকটা উৎসব করব।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

রাষ্ট্রদ্রোহী   পদ্মা সেতু   ড. ইউনূস  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল আছে থাকবে, তবে...

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৬ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল আছে থাকবে, তবে...

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বড় গুণ তিনি স্পষ্ট কথা বলেন। তিনি যা বিশ্বাস করেন তা অকপটে বলেন। বুধবার এক অনুষ্ঠানেও তিনি স্পষ্ট কিছু উচ্চারণ করলেন। শেখ হাসিনা বললেন, ‘আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র জোরদার করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ষড়যন্ত্র করেছে। আবার ইলেকশন যতই সামনে আসছে, আবারও...’। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেই তিনি টিকে আছেন। এতটা পথ পাড়ি দিয়েছেন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করেছে। কখনো স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, কখনো আন্তর্জাতিক মহল, কখনো বা আওয়ামী লীগেরই প্রভাবশালী একটি অংশ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানা চক্রান্তের ফাঁদ পেতেছিল। নানা কারণে এসব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চূড়ান্তভাবে সফল হয়নি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব ষড়যন্ত্র শেখ হাসিনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। জনপ্রিয় করেছে।

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো। তিনি কারও কাছে কিছু প্রত্যাশা করেন না। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট তাঁকে এক অদ্ভুত বাস্তবতা শিক্ষা দিয়েছে। একজন মানুষ যখন ‘প্রত্যাশা’মুক্ত হন, তখন তিনি নির্ভার থাকেন। কোনো হতাশা কাজ করে না। বিশ্বাসঘাতকতা বিমর্ষ করে না। অবহেলা আহত করে না। ধরা যাক, আপনি কাউকে কিছু টাকা দিলেন। আপনি যদি তাকে এটা ধার দেন তাহলে টাকা ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা থাকবে। আপনি অপেক্ষায় থাকবেন। বিলম্বে কিংবা টাকা ফেরত না পেলে দুঃখিত হবেন। হতাশ হবেন। কখনো বা ক্ষুব্ধ হবেন। কিন্তু যদি আপনি টাকাটা একেবারে দিয়ে দেন, সে ক্ষেত্রে ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা থেকে আপনি মুক্ত। কোনো প্রতারণা, হতাশা আপনাকে আক্রান্ত করবে না। একজন বন্ধুর উপকার করলেন। এটা কোনো কিছুর বিনিময়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে যদি করেন তাহলে আপনার সমস্যা হতে পারে। আপনি অপেক্ষা করবেন প্রতিদানের। একসময় আপনি সংকটে পড়লেন। তখন আপনার বন্ধুর কথা মনে পড়বে। আপনি ভাবলেন, এবার বন্ধু ঋণ শোধরাবে। প্রতিদান দেবে। কিন্তু ওই বন্ধুটি এগিয়ে এলো না আপনার বিপদে। বিপদের জন্য আপনি যত না কষ্ট পাবেন তার চেয়ে বেশি দুঃখ পাবেন বন্ধুর আচরণে। ‘প্রত্যাশা’ এক মারাত্মক ব্যাধি। প্রত্যাশার বিপরীতে যখন প্রত্যাখ্যান এবং বিশ্বাসঘাতকতা আসে তখন মানুষ কষ্ট পায়। তার কর্মশক্তি কমে যায়। জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলে। শেখ হাসিনা ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর সম্ভবত ‘প্রত্যাশা’ শব্দটি তাঁর হৃদয় থেকে উপড়ে ফেলেছেন। তিনি কাউকে মন্ত্রী বানালেন কিংবা সচিব। ব্যস। ওই মন্ত্রী কিংবা সচিব বিনিময়ে শেখ হাসিনার জন্য কিছু করবেন এমন আশা তিনি কখনো করেন না। বরং শেখ হাসিনা ’৭৫ থেকে শিখেছেন, যাকে তিনি পাদপ্রদীপে নিয়ে এলেন সে-ই হতে পারে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক। অন্যদের কথা বাদ দিলাম। আওয়ামী লীগ নেতাদের (যাদের তিনি সামনে এনেছেন) কাছ থেকেও কোনো কিছু আশা করেন না শেখ হাসিনা। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার আকাঙ্ক্ষাহীন একজন মানুষ হন ভারহীন, ঝরঝরে, লক্ষ্যে অবিচল। আপন বলয়ে তিনি অবিরাম কাজ করে যান। বিনিময়ে কী পাব এ চিন্তা থেকে একজন মানুষ যখন নিজেকে আলাদা করতে পারেন তখন তিনি অসম্ভবকে জয় করতে পারেন। শেখ হাসিনা তেমনি একজন মানুষ। ভয় বিশেষত মৃত্যুভয় মানুষকে সংকুচিত করে। দ্বিধান্বিত করে। মানুষকে ভীতু করে। ভীতু মানুষ যে-কোনো কাজ করার আগে সাতপাঁচ ভাবে। কিন্তু একজন মানুষ যখন মৃত্যুভয়কে জয় করতে পারেন তখন তিনি অজেয়-অপরাজেয় হয়ে ওঠেন। যেমন জাতির পিতা। তিনি তাঁর ভাষণেই বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে দুইবার নয়।’ মৃত্যুকে তুচ্ছ করেছিলেন এজন্যই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। ’৭৫-এর আগস্ট শেখ হাসিনার কাছ থেকে তাঁর বাবা-মা এবং নিকটজনকেই কেড়ে নেয়নি। তাঁকে ভয়শূন্য একজন মানুষে রূপান্তর করেছে। ফলে মৃত্যুভয়হীন শেখ হাসিনা অনন্য সাহসী নির্ভীক। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন তিনি অবলীলায়। সাহসের হিমালয় হয়ে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়ান। একজন মানুষ যখন স্পষ্টবাদী হন। বৈষয়িক প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা মুক্ত থাকেন এবং সাহসী হন তখন তিনি পরিণত হন দুর্দান্ত ক্ষমতাবান এক অজেয় মহামানবে। সেই মানুষটির মধ্যে যদি মানুষের মঙ্গল কামনা, কল্যাণ এবং ভালো করার আকাক্সক্ষা থাকে তখন তাকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। সে কারণেই শেখ হাসিনা অপ্রতিরোধ্য। এ সমাজ হলো মানবতার সঙ্গে দানবের লড়াইয়ের ক্ষেত্র। এ বিশ্ব হলো শুভাশুভের যুদ্ধের মাঠ। ভালোর সঙ্গে মন্দের চিরন্তন সংঘাতই হলো পৃথিবীর ইতিহাস। যখন আপনি মানবতার পক্ষে থাকবেন, শুভকাজের ব্রত হবেন, ভালোকে আলিঙ্গন করবেন তখন ‘দানব’ আপনাকে আঘাত করবে। আপনাকে পরাজিত করতে চাইবে। আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। এটাই নিয়ম। তাই শেখ হাসিনার মঙ্গলচিন্তার প্রতিপক্ষ থাকবে না তা তো হতে পারবে না। শেখ হাসিনা যত ভালো করবেন দানবরা তত ক্ষুব্ধ হবে। শেখ হাসিনা মানুষের যত কল্যাণ করবেন দানবরা তত হিংস্র হবে। শেখ হাসিনা যত তাঁর লক্ষ্যে সফল হবেন দানবরা তত ভয়ংকর হবে। এটাই স্বাভাবিক। এ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়েই সমাজ, রাষ্ট্র এবং দেশ এগিয়ে যায়। শেখ হাসিনার জীবন ও রাজনীতি সেই একই গতিপথে প্রবাহিত।

’৭৫-এর পর থেকেই দানবরা ষড়যন্ত্র করেছে। ষড়যন্ত্রের রূপ-রং বদলেছে সময়ের সঙ্গে। ষড়যন্ত্র ভয়ংকর হয়েছে দিনে দিনে। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা যখন আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়েছেন তখন তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। সে ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য ছিল তিনি যেন দেশে না আসেন। তাঁকে ভয় দেখানো হয়েছিল। লোভ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেই পিতার রক্তে রঞ্জিত দেশে এসেছিলেন। ’৮১ সালে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময়ই তাঁকে হত্যা করা হতে পারত। তাঁকে গ্রেফতার করে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখারও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা তো এত দিনে মৃত্যুভয়কে জয় করেছেন। তাঁর সাহস আর উত্তাল জনস্রোতে ভেসে যায় ষড়যন্ত্র।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরও তাঁকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এবার খোদ আওয়ামী লীগে। শেখ হাসিনা যখন আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেন তখন সেখানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা যেমন ছিলেন তেমনি ছিল খুনি মোশতাকের পদলেহী ভীরু ও পথভ্রষ্ট কাপুরুষরাও। তারাই বরং শক্তিশালী ছিল। দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর পদে পদে শেখ হাসিনাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। অপমানিত করা হয়েছে। ‘চাচা’রা শেখ হাসিনার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিলেন। অন্য কেউ হলে রাজনীতি ছেড়ে দিতেন। একবার ভাবুন তো আপনার পিতার খুনির সঙ্গে বসে আপনি কি কথা বলতে পারবেন? এক অখ্যাত তরুণ আইনজীবীকে বঙ্গবন্ধু নতুন পরিচয় দিলেন। বঙ্গবন্ধুর উদারতায় তিনি পেলেন ‘আন্তর্জাতিক’ খ্যাতি। আর সেই চাচাই শুরু করলেন ষড়যন্ত্র। ভাগ্যিস ‘প্রত্যাশা’ নামক আবেগটি শেখ হাসিনা উপড়ে ফেলেছিলেন। না হলে নব্য মোশতাকদের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি পাগল হয়ে যেতেন। দলের ভিতর ষড়যন্ত্রকারীদের কোণঠাসা করেই শেখ হাসিনাকে এগোতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের পথে। একটা সময় ‘দানব’রা বুঝল, শেখ হাসিনাকে দমানো এত সহজ না। তখন ষড়যন্ত্র আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। একটা দল আবার আরেকটা ’৭৫ ঘটাতে চাইল। শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দেওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। একের পর এক হত্যাচেষ্টা হয়েছে। বারবার শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন অলৌকিকভাবে। সৃষ্টিকর্তা চাইলে যে সবকিছুই করতে পারেন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার বেঁচে যাওয়া। এ অলৌকিক এক ঘটনা।

এর আগে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ করতে চান। এ লক্ষ্যে তিনি যে একচুল ছাড় দেবেন না তা পরিষ্কার হয়ে যায় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে তাঁর দেশ পরিচালনায়। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হলে তো বাংলাদেশ স্বনির্ভর হবে। আত্মমর্যাদাশীল হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তখন বিদেশি প্রভুদের কী হবে? তারা তো এ দেশের ওপর খবরদারি করতে পারবে না। এ দেশের গ্যাস পানির দামে নিয়ে যেতে পারবে না। সেন্ট মার্টিনে সামরিক খাঁটি করতে পারবে না। এবার শুরু হলো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। তত দিনে বাংলাদেশে যাদের লোলুপ চোখ তারা বুঝে গেছে, শেখ হাসিনা দেশের স্বার্থ জীবন থাকতে বিকিয়ে দেবেন না। চাপ দিয়ে তাঁকে ‘একান্ত অনুগত’ করা যাবে না। ক্ষমতার মোহে তিনি নতজানু হবেন না। ব্যস, আবার সেই নাটক শুরু হলো। ২০০১-এর নির্বাচনে হলো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনা হটাও মিশনে যুক্ত হলেন এ দেশের সুশীল, আমলা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী মহল। বিএনপিকে কেবল জেতানোই হলো না। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে তাদের যা খুশি তা করার লাইসেন্স দেওয়া হলো। জিয়া পরিবার দুর্নীতির উৎসবে মাতল। সবাই মিলে ‘ওলটপালট করে দেমা লুটেপুটে খাই’। সংগীত গাইতে গাইতে দুর্নীতির উৎসব শুরু করল। অন্যদিকে বিএনপির ক্ষমতার অংশীদার জামায়াত শুরু করল ইসলামী বিপ্লবের নীলনকশার বাস্তবায়ন। বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমান মঞ্চে আবির্ভূত হলেন। সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা ঘটিয়ে জঙ্গিরা জানিয়ে দিল ‘বাংলা হবে আফগান’। শেখ হাসিনার সম্বল তখন কেবল জনগণ। খেটে খাওয়া মানুষ। শ্রমিক, কৃষক। তাদের সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাস প্রতিবাদের গর্জনে রূপান্তরিত হলো। এবারও ষড়যন্ত্রকারীরা প্রমাদ গুনল। নির্বাচন হলে শেখ হাসিনার বিজয় অনিবার্য। তাই বিএনপিকে ক্ষমতার ‘হাড্ডি’ দেখিয়ে উত্তেজিত করল সুশীল ও তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুরা। মান্নান-জলিলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের মাধ্যমে সুশীলদের হাতে দেশের চাবি তুলে দেওয়ার মঞ্চ প্রস্তুত হলো। অবশেষে সুশীলরা বর সেজে বঙ্গভবনে শোভিত হলেন। পশ্চিমারা তাদের ‘আপন’ মানুষদের ক্ষমতায় বসাতে সক্ষম হলো। এবার বাংলাদেশকে ‘খোবলা’ বানানো যাবে। কিন্তু ওই যে শেখের বেটি। ভীষণ অবাধ্য। যা মনে হয় সেটাই হাটবাজারে প্রকাশ্যে বলেন। সাধারণ মানুষও তাঁকে বিশ্বাস করে। এ তো ভারি জ্বালা। আবার শুরু হলো সুশীল গবেষণা। এবার আবিষ্কার হলো ‘মাইনাস ফরমুলা’। এত দিন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রগুলো ছিল ভিন্ন রকমের। কখনো বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ষড়যন্ত্র করেছে, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ’৭১-এর ঘাতক-দালালরা। আওয়ামী লীগের ‘চাচা’রা ষড়যন্ত্র করেছেন, সঙ্গে হাত মিলিয়েছে পশ্চিমা প্রভুরা। কিন্তু ২০০৭ সালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল সর্বব্যাপী এবং সম্মিলিত। সব প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে হটাতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এমনকি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ’৭৫-এর আগস্টের চেয়েও ঘৃণ্য নোংরা ও কুৎসিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। শেখ হাসিনার পাশে ছিল সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা এবং নিজের সাহস, দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় শেখ হাসিনা এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজিত করেছিলেন। এক-এগারো শেখ হাসিনার রাজনৈতিক চিন্তা-দর্শনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। তিনি বুঝতে পারেন, জনগণ সঙ্গে থাকলে কোনো অপশক্তি তাঁকে পরাস্ত করতে পারবে না। মূলত ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়ক থেকে একজন দার্শনিক রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত হতে থাকেন। এ রূপান্তর প্রক্রিয়া এখনো চলছে। জনগণ ছাড়া আর সবকিছু এখন তাঁর কাছে অপ্রয়োজনীয়। এজন্য তিনি মন্ত্রীদের শোকেসের পুতুল হিসেবে রেখেছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছেও তাঁর কোনো প্রত্যাশা নেই। শেখ হাসিনা জনগণের আকাক্সক্ষা অনুধাবনের চেষ্টা করেন। সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নই তাঁর রাজনীতি। এখানে পন্ডিতরা কী ভাবলেন, গণমাধ্যম কী সমালোচনা করল এসব মূল্যহীন। এ দেশের জনগণ এ মুহূর্তে শেখ হাসিনা ছাড়া কাউকে সম্ভবত বিশ্বাসও করে না।

প্রয়াত ড. হুমায়ুন আজাদ জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাকের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর। ওই সাক্ষাৎকারে জ্ঞানতাপস বলেছিলেন, ‘...আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ রিকশাওয়ালা, বস্তিবাসী শেখ মুজিবুর রহমানের সময় একটু বেশি সোজাভাবে দাঁড়াত। একটু বেশি শক্তিশালীবোধ করত। তারপরে যে তারা খুব খারাপ আর্থিক অবস্থায় পড়ে গেছে বা তার সময়ে যে খুব ভালো আর্থিক অবস্থায় ছিল তা না। তবে এটা আমি খুব স্পষ্টভাবে বুঝি যে, এখন বিপুলসংখ্যক মানুষ অনেকটা অসহায়বোধ করে। আগে এমন অসহায়বোধ করত না। সমাজের যত বেশিসংখ্যক মানুষ বুঝতে পারে যে, সমাজের তারাও গুরুত্বপূর্ণ, তারাও সমাজের জন্য অপরিহার্য ততই ভালো। গান্ধী বা জিন্নাহ জনগণের নেতা ছিলেন, জনগণের অংশ ছিলেন না। কিন্তু মুজিবের সময় জনগণ এমন বোধ করতে থাকে যে, শেখ মুজিব তাদেরই অংশ।’ শেখ হাসিনাও জনগণের মধ্যে সেই বোধ আবার ফিরিয়ে এনেছেন। এ দেশের জনগণ মনে করে শেখ হাসিনা তাদেরই অংশ। এ কারণেই তিনি শক্তিশালী। প্রচ- ক্ষমতাবান। কারণ জনগণের শক্তির চেয়ে কোনো বড় শক্তি নেই। এ কারণেই সমাজের উঁচুতলার সফেদ পরিপাটি মানুষ তাঁকে পছন্দ করে না। তাঁকে উৎখাত করতে চায়। ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। যারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায় তাদের আমরা চিনি। শেখ হাসিনাও চেনেন। এজন্যই তিনি জনগণের কাছে বার্তাটা পৌঁছে দিলেন। কারণ তিনি জানেন, সংকটে এই বস্তিবাসী, রিকশাওয়ালা, জেলে, কৃষক, শ্রমিকরাই মানবপ্রাচীর হয়ে তাঁকে রক্ষা করবেন।

শেখ হাসিনা ’৭৫ দেখেছেন, ’৮১ দেখেছেন, ’৯১ দেখেছেন। ২০০১ এবং ২০০৭ সালে খাদের কিনারা থেকে তিনি ফিরে এসেছেন। শেখ হাসিনা জানেন সংকটে এই আমলারা রং বদল করবেন। অথবা অসহায় আত্মসমর্পণ করবেন। যেমন ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন আমলারা করেছিলেন। শেখ হাসিনা জানেন সংকটে আওয়ামী লীগ ভেঙে পড়ে। ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়তে পারে না। প্রতি সংকটেই কিছু নব্য মোশতাকের জন্ম হয়। শেখ হাসিনা জানেন যাদের তিনি বিত্তবৈভবের সুযোগ করে দিয়েছেন, তাদের অনেকেই তাঁকে চিনবে না। এজন্যই তাঁর প্রকৃত যোদ্ধাদের কাছেই তিনি ষড়যন্ত্রের বার্তা দিলেন। কারণ জনগণ জানে শেখ হাসিনা তাদের। যেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধু। জনগণই সব সংকটের মেঘ সরিয়ে দেয় সব সময়। এই যে এখন অর্থনৈতিক সংকটের মেঘ কেটে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের উদ্যোগেই। রেমিট্যান্স যোদ্ধা ২.১ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে এক মাসে। শ্রমিকরা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৫ শতাংশ। কৃষক ফসল উৎপাদন করছে নিবিষ্টভাবে। অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে যে ষড়যন্ত্রের মহড়া শুরু হয়েছিল, তা ক্রমে খেই হারিয়ে ফেলেছে। তবে সামনে আরও ষড়যন্ত্র হবে। জনগণই রুখে দেবে সেই ষড়যন্ত্র। কারণ তারা জানে শেখ হাসিনা না থাকলে তারা আবার অধিকারহীন হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা না থাকলে তারা ক্ষমতাহীন হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা আর বাংলাদেশ এখন সমার্থক। শেখ হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

শেখ হাসিনা   ষড়যন্ত্র   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

অলি আতঙ্কে বিএনপি

প্রকাশ: ০৯:০০ পিএম, ০৫ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail অলি আতঙ্কে বিএনপি

প্রতিবার নির্বাচনের আগে বিএনপি বিশ্বাসঘাতকদের আতঙ্কে থাকে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির মধ্যে এই আতঙ্ক প্রবল হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রথমে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন অধ্যাপক ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছিলো। সেই সময় বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে আহ্বায়ক করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিকল্পধারাকে বাদ দিয়েই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিলো, এ নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলো। সে নিয়ে বিএনপিতে এখন তীব্র সমালোচনা। বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রকাশ্যে বলেছেন, ড. কামাল হোসেনকে ইমাম মেনে বিএনপি মহা ভুল করেছিলো। এবারও বিএনপি নির্বাচনের আগে জোট গঠন করে করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ২২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিএনপি বৈঠক করেছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, যেভাবেই জোট হোক না কেন নেতৃত্ব থাকবে বিএনপির হাতে। তবে এই জোট নিয়ে বিএনপির মধ্যে এখন নানা রকম সংশয়, সন্দেহ এবং অবিশ্বাস দানা বেঁধে উঠেছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই জোট হলো আন্দোলনের জোট। কিন্তু বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন যে, এই আন্দোলনের জোটই একসাথে নির্বাচন করবে এবং নির্বাচনের পরে জাতীয় সরকার গঠন করবে করা হবে এই জোটের নেতৃত্বে। এরই প্রেক্ষিতেই অনেকে সন্দেহ করছেন যে, আরেকটি নির্বাচনে বিএনপিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন জোট হচ্ছে কিনা। নতুন জোটে যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে সেই রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তত একজন নেতাকে নিয়ে বিএনপির মধ্যে সন্দেহ, সংশয় ক্রমশ দানা বেঁধে ওঠছে। তিনি হলেন এলডিপির কর্নেল অলি আহমেদ।

কর্নেল অলি আহমেদ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা। জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালে বিএনপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ছিলেন, খালেদা জিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তারেক জিয়ার কারণে বিএনপিতে তিনি শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেননি। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি মন্ত্রীত্ব বঞ্চিত হন, এরপর আস্তে আস্তে তিনি বিএনপি থেকে তিরোহিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি এলডিপি নামে ক্ষুদ্র একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। কিন্তু বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তার প্রভাব রয়েছে অপরিসীম। যেমন- অধ্যাপক ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বিএনপির অনেক নেতারাই গোপনে শ্রদ্ধা করেন, তার সাথে যোগাযোগ রাখেন এবং তাকে নেতা হিসেবে মানেন। ঠিক তেমনি কর্নেল অলিরও বিএনপিতে বিপুল প্রভাব বলয় রয়েছে। বিশেষ করে যারা তারেক জিয়াবিরোধী হিসেবে পরিচিত তাদের সঙ্গে কর্নেল অলি আহমেদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির সাথে কর্নেল অলি আহমেদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে। সেই বৈঠকে কর্নেল অলি জানিয়ে দিয়েছেন যে, জোট যদি গঠন হয় সেই জোটের নেতা হবেন তিনি। কারণ তিনি সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতা। বিএনপির মধ্যে এই বক্তব্যের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে। কর্নেল অলির ভূমিকা নিয়ে বিএনপিতে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে তারেক জিয়া কর্নেল অলিকে পছন্দ করেন না এবং তারেক জিয়ার কারণে কর্নেল অলিকে বিএনপি ছাড়তে হয়েছিলো, এটা সকলেই জানেন। গতবারও যখন বিএনপির নেতৃত্বে জোট গঠিত হয়েছিলো তখন তারেক জিয়া কর্নেল অলিকে ২০ দলীয় জোটে নেয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার আগ্রহের কারণেই শেষ পর্যন্ত কর্নেল অলি জোটে ঠাই পান। কিন্তু এবার যখন তিনি জোটের নেতৃত্ব দাবি করেছেন, তখন বিএনপি নেতারা নড়েচড়ে বসেছেন। ইতোমধ্যে লন্ডনে বার্তা পাঠানো হয়েছে, বিএনপি এখন সবসময় বিশ্বাসঘাতক আতঙ্কে থাকে, বিএনপির নেতারা মনে করে যে নির্বাচনের আগে বিএনপিতে কোনো এজেন্ট ঢুকে দল ভাঙ্গাবে বা বিএনপিকে নির্বাচনমুখি করবে। সেরকম একটি আতঙ্ক থেকেই কর্নেল অলিকে সন্দেহ করা হচ্ছে। কর্নেল অলি যেভাবে কথা বলছেন তাতে বিএনপি ভাঙ্গার কোনো চক্রান্ত তিনি করছেন কিনা বা বিএনপিকে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা তার আছে কিনা।

একাধিক সূত্র বলছে যে, বিএনপি এখন যে জোট গঠন করবে সেই জোটে অলিকে রাখবে না। কিন্তু অলিকে যদি নাও রাখে তাহলে বিএনপির একটি ভালো অংশ কর্নেল অলি আহমেদের নেতৃত্বে চলে যাবে। বিশেষ করে বিএনপিতে যারা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দ আছেন তারা কর্নেল অলির সঙ্গে যোগ দেবেন বলে অনেকের ধারণা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপিকে অখণ্ড রাখা যেমন একটি চ্যালেঞ্জ তেমনি বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখাও একটি বড় সমস্যা বলে মনে করেন বিএনপি নেতারা। এই বাস্তবতায় সামনের দিনগুলোতে বিএনপিতে কর্নেল অলি কি তাণ্ডব করেন সেটি দেখার বিষয়।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

হরতাল নিয়ে বিএনপিকে পশ্চিমা দেশের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ০৪ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail হরতাল নিয়ে বিএনপিকে পশ্চিমা দেশের হুঁশিয়ারি

আজ বিএনপি ভোলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয় যে, জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের পরিবর্তে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতাল ডাকা হয়েছে। কিন্তু একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বিএনপির এই হরতাল ডাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো খুবই নেতিবাচক ভাবে নিয়েছে এবং কূটনীতিকরা বিএনপি মহাসচিবসহ বিএনপির নেতৃবৃন্দকে টেলিফোন করে এ ব্যাপারে তাদের উৎকণ্ঠা এবং আপত্তির কথা জানিয়েছে। বিদেশি কূটনীতিকদের খুশি করতেই শেষ পর্যন্ত হরতাল থেকে সরে এসেছে বিএনপি। একটি সূত্র বাংলা ইনসাইডারকে নিশ্চিত করেছে যে, ভোলায় এই হরতালের পরপরই ঢাকায় একটা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকার পরিকল্পনা নিয়েছিলো বিএনপি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ দাতা দেশগুলোর কঠোর হুঁশিয়ারির প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরে এসেছে। ফলে বিএনপি সামনের দিনগুলোতে নতুন করে হরতাল অবরোধসহ জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুরের কর্মসূচিতে যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, লোডশেডিংসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেছিলো। সেই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ভোলায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পুলিশের ওপর মারমুখী আচরণ শুরু করে বিএনপি নেতারা। একপর্যায়ে সেখানে সহিংসতায় বিএনপির একজন মারা যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোলার ছাত্রদলের সভাপতি নুরে আলম মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুবরণের পরপরই গতকাল বিএনপি বিভিন্ন কর্মসূচী ঘোষণা করে, তার মধ্যে ছিলো ভোলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। তবে রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে যে, ভোলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হলেও সেই হরতাল শুরু থেকেই ব্যর্থ হচ্ছিল, জনগণ হরতাল কর্মসূচিতে তেমন সাড়া দেয়নি। এটি বিএনপির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পরবর্তী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটি নেতাকর্মীদের জন্য হতাশা সৃষ্টি করতে পারে, এটি বিবেচনা করে হরতাল কর্মসূচি কাটছাঁট করেছে বলে বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে।

কিন্তু একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, কাল হরতাল ডাকার পরপরই অন্তত দুটি দেশের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকরা বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং বিএনপিকে হরতালের ব্যাপারে তাদের আপত্তির কথা বলে। মার্কিন দূতাবাস সবসময় হরতাল এবং অন্যান্য সহিংস কর্মসূচির বিরুদ্ধে। আগেও তারা হরতালের বিকল্প খোঁজার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে যখন বিএনপি সারাদেশে অবরোধ দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও শুরু করেছিল তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটি বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি এবং অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে কূটনীতিকদের সঙ্গে দেনদরবার করছেন, তারা দফায় দফায় কূটনৈতিক পাড়ায় বৈঠক করছেন। বিএনপির মূল লক্ষ্য হলো তাদের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি এবং অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবির সঙ্গে যেন কূটনীতিকরা একমত পোষণ করেন। আর এ কারণে জনগণের চেয়ে কূটনীতিকদের ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বিএনপি নেতৃবৃন্দ। আর সে কারণেই বিএনপিকে কূটনীতিকরা বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিচ্ছে এবং তাদেরকে কিছু নির্দেশনাও দিচ্ছে। আর এই সমস্ত নির্দেশনা অনুসরণ করেই বিএনপি কাজ করছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ কারণে বিএনপি যেকোনো কর্মসূচি বা যেকোনো পদক্ষেপের জন্য কূটনৈতিক পাড়ার দিকে তাকিয়ে থাকছে। এর মাধ্যমে বিএনপি আগামী দিনে সরকারের বিরুদ্ধে যে বড় ধরনের আন্দোলন করতে পারবে না, সেটি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কি স্থগিত হচ্ছে?

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ০৩ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কি স্থগিত হচ্ছে?

আওয়ামী লীগের নতুন মাথাব্যথার নাম ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের তান্ডব বিভিন্ন এলাকায় যেন থামছেই না। শোকের মাস আগস্ট শুরু হয়েছে। শোকের মাসে আওয়ামী লীগ সব সময় সংযত এবং সংহত হয়, জাতির পিতাকে স্মরণ করে। এই মাসে আওয়ামী লীগ শোক এবং বিনম্রতা ছাড়া কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করে না। কিন্তু এই শোকের মাসের প্রথম দিনেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির নিয়ে তান্ডব হলো। শোকের মাসের আবহ নষ্ট করে দিলো চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ। কমিটি নিয়ে বিতর্কে তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু বন্ধ করে দিল এবং নানা রকম অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিলো। এরকম পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য বিব্রতকর। আওয়ামী লীগ যেখানে শোকের মাসে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সংযত থাকতে বলে, সেখানে তাদের সহযোগী সংগঠনই এরকম কাণ্ডটা কেন করলো তা নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বিব্রত। 

শুধু তা-ই নয় শোকের মাসের ঠিক আগে আগে ছাত্রলীগের কমিটিতে গণহারে পদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ৩১ জুলাই রাতে কমপক্ষে ৪০০ জনকে বিভিন্ন পদে নতুন করে ছাত্রলীগের কমিটিতে নেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য চিঠি দিয়ে পদ প্রাপ্তদের জানিয়ে দিয়েছেন। এসব পদায়নের সংগঠনের ভেতর থেকেই বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মোট যে পদ দেওয়ার কথা, তার চেয়ে বেশি পদ কিভাবে দেওয়া হলো, কার অনুমতিতে দেওয়া হলো এই নিয়ে দলের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের তান্ডবের অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রলীগের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছাত্রলীগ নিয়ে সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই ঘটনাগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলে আলোচনা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীদের আদর্শিক নেতা প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতা। ছাত্রলীগের হাত ধরেই জাতির পিতা রাজনীতিতে এসেছিলেন। ছাত্রলীগের মাধ্যমেই জাতির পিতা বিকশিত হয়েছিলেন। এ কারণেই ছাত্রলীগের প্রতি আওয়ামী লীগ সভাপতির আলাদা একটা দরদ এবং মমত্ববোধ রয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের ব্যাপারে কঠোর হয়েছেন। এর আগেও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করেছিলেন। একবার তিনি রাগ করে ছাত্রলীগের আদর্শিক সভাপতির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। কিছুদিন আগেও ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। 

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের বেপরোয়াপনা যেন বেড়েই চলেছে। এটি আওয়ামী লীগকে বিব্রত করছে। বিশেষ করে যে সময় বিরোধী দল আন্দোলনের চেষ্টা করছে, যখন দেশের অর্থনৈতিক সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে, সেই সময়ে ছাত্রলীগের এই বাড়াবাড়ির আওয়ামী লীগের জন্য বিব্রতকর বটে। একারণেই আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা মনে করছেন যে, আওয়ামী লীগ সভাপতি হয়তো কঠোর অবস্থানে যেতে পারেন। তিনি হয়তো আবার ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত করতে পারেন। তবে এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করছেন যে, ছাত্রলীগের যে বাড়াবাড়ি এবং কমিটি নিয়ে যে অনাকাঙ্খিত ঘটনাবলি এগুলো আওয়ামী লীগ সভাপতির নজরে আছে এবং তিনি তার বিবেচনায় যেটি উপযুক্ত সিদ্ধান্ত, সেটি নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন। 


ছাত্রলীগ   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

জনশুমারি: সংখ্যালঘু নিপীড়নের দলিল

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ৩১ জুলাই, ২০২২


Thumbnail জনশুমারি: সংখ্যালঘু নিপীড়নের দলিল

গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের একটি তথ্য আতঙ্কিত করেছে। জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশের জনসংখ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীর হার কমেছে। সদ্য সম্পন্ন জনশুমারি অনুযায়ী, হিন্দু ধর্মাবলম্বীর হার জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এই ভূখণ্ডে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল প্রায় ২২ শতাংশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে পরিচালিত প্রথম জনশুমারিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এর পর থেকে দেশের জনসংখ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীর হার ক্রমেই কমছে। শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী নয়; বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের আনুপাতিক হারও কমেছে। এটা স্পষ্ট- বাংলাদেশ ক্রমে মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুর হার কমে যাওয়া নিয়ে জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পের পক্ষ থেকে দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ করছে। দ্বিতীয়ত, হিন্দু দম্পতিরা তুলনামূলক কম সন্তান জন্ম দেন। প্রথম কারণটি সহজেই অনুমেয়। '৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর থেকে সংখ্যালঘু নিপীড়ন এই দেশে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণতি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ পেয়েছিলাম, তা নষ্ট হয় জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে। '৭৫-এ শুধু জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়নি; মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও হত্যা করা হয়। সংবিধান থেকে উপড়ে ফেলা হয় ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রকাশ্যে বলা হতে থাকে- তোমরা ভারতে চলে যাও। কখনও অর্পিত সম্পত্তি আইনের মারপ্যাঁচে, কখনও সন্ত্রাস চালিয়ে চলতে থাকে দেশকে সংখ্যালঘুশূন্য করার ঘৃণ্য মিশন। নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নিয়মিতভাবে দেশত্যাগ করছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকরা। এটি রাষ্ট্রের জন্য নিশ্চয় লজ্জার বিষয়।

আমরা জানি, রাজনৈতিকভাবে বিএনপি মনে করে, সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগের 'ভোটব্যাংক'। দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী যত কমবে, তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ ততই সুগম হবে- এই বিশ্বাস বিএনপির বেশিরভাগ নেতাকর্মীর। জাতীয় পার্টি সংখ্যালঘু নিপীড়ন করে মূলত সম্পদের লোভে। হিন্দু সম্প্রদায়ের জায়গাজমি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দখল করেছে ক্ষমতায় থাকা জাতীয় পার্টির প্রভাবশালীরা। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে যুক্ত করার মাধ্যমে কার্যত হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে দেন এইচএম এরশাদ। '৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করছে ১৮ বছরের বেশি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সময়েও ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিপীড়ন বন্ধ হয়নি; বরং নিপীড়নের নতুন ধরন তৈরি হয়েছে। নির্যাতনের নতুন মাত্রা পেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এ দমন-পীড়নে বৈধতা দেওয়ার এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আশা করেছিল, এবার তাদের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত হবে। ওই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগও নেয়। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করার আন্তরিক চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিপুল ভোটে বিজয়ী হয় এবং ফল ঘোষণা শেষ হতে না হতেই সারাদেশে দল দুটির নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর। ২০০১ সালের ১ থেকে ১০ অক্টোবর নারকীয়তা নেমে আসে সংখ্যালঘুদের ওপর। এই ১০ দিনে সংখ্যালঘুদের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে '৭১-কেও হার মানিয়েছিল। এর জের ধরে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বী অনেকে দেশ ত্যাগ করে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর থেকে টানা ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ। দলটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করে বলে দাবি করে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা বলে। কিন্তু গত ১৩ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার পরও কি আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে পেরেছে? এই সময়ে আওয়ামী লীগ '৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার মহামূল্যবান সুযোগও পেয়েছিল। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় এই সুযোগ করে দেয়। ওদিকে সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল আওয়ামী লীগের। তারপরও বর্তমান সরকার রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করতে পারেনি। এটা ঠিক, '৭৫-এর পর থেকে এ দেশে ধর্মান্ধ, মৌলবাদীরা সংঘবদ্ধ হয়েছে; বিত্তবান ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ এরা বাসা বেঁধেছে। তাই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল করা আওয়ামী লীগের জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই সময়ে কি সংখ্যালঘুরা তাদের হূত মর্যাদা ফিরে পেয়েছে? তাদের ভয় কেটেছে? বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন আরও বেড়েছে। নড়াইলের বর্বরতা এর সর্বশেষ উদাহরণ।

এখন সংখ্যালঘু নির্যাতন যেন আরও পরিকল্পিতভাবে ঘটছে। বস্তুত নড়াইল, নাসিরনগর, কুমিল্লা, পীরগঞ্জের ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা। প্রথমে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তির নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। তাপরপর সেই অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট করা হয়। ব্যস, সবাই যেন ওঁৎ পেতে থাকে। পোস্ট দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় তাণ্ডব, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন তামাশা দেখে। তাণ্ডব শেষ হয়ে যাওয়ার পর কর্তাব্যক্তিরা আসেন; মেকি সান্ত্বনা আর আশ্বাস দিয়ে দায়িত্ব এড়ান। এর পর সবাই ঘটনাটি ভুলে যান। কিন্তু যাঁরা সর্বস্ব হারান; যাঁদের ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়; তাঁরা গভীর বেদনা নিয়ে উপলব্ধি করেন- এই রাষ্ট্র তাঁর না।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, গত কয়েক বছর ধরে যারা সংখ্যালঘু নির্যাতন, নিপীড়নে যুক্ত তারা ক্ষমতাসীন দলের সদস্য অথবা ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকে। এ জন্য তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক; তারা সংখ্যালঘুদের অধিকার দেয়- নির্যাতিত মানুষের হৃদয় থেকে এই বিশ্বাস ক্রমেই উবে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির কারণ- গত এক দশকে আওয়ামী লীগে ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বিএনপি-জামায়াত ও সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার বহু ব্যক্তি এখন আওয়ামী লীগের নানা পদে। বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নও পাচ্ছে তারা। আস্তে আস্তে তাই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাই হারিয়ে ফেলেছে।

জনশুমারি প্রতিবেদনটি আসলে সংখ্যালঘু নিপীড়নেরই পরিসংখ্যানিক দলিল। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য এটি অশনিসংকেত। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের একটা বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল- ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। 'বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান/ আমরা সবাই বাঙালি'- এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার'- এই বাণীর বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চেয়েছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু এবারের জনশুমারি জানিয়ে দিল- ওই আকাঙ্ক্ষা থেকে শুধু দূরেই না, বরং বিপরীত পথে হাঁটছি আমরা।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
সূত্র: সমকাল।

সংখ্যালঘু   নিপীড়ন   জনশুমারি  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন