এডিটর’স মাইন্ড

এখনই সময়

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৯ অক্টোবর, ২০২২


Thumbnail

হঠাৎ আপনার মনে হতে পারে, আপনি এখন কোন সময়ে? টাইম মেশিন কি আপনাকে ২০০৩ সালে নিয়ে গেল? কিংবা ২০০৫ অথবা ২০০৬ সালে? লাগামহীন লোডশেডিং। ডলার সংকট। জ্বালানি সংকটে শিল্পকারখানা মুখ থুবড়ে পড়ছে। পণ্যবাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির দুর্নীতির তান্ডব। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশাহারা মানুষ। এরকম একটি পরিস্থিতি পার করে এসেছি আমরা দেড় যুগ আগে। এরপর এক ঘুরে দাঁড়ানোর বাংলাদেশের গল্প। শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের এগিয়ে চলা সারা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকথাকেও হার মানিয়েছে। উন্নয়ন মানে শুধু সেতু, কালভার্ট, রাস্তাঘাট আর বড় বড় অট্টালিকা নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে বহুমাত্রিক। গ্রাম থেকে শহর। সর্বত্র বদলে যাওয়া বাংলাদেশের চিত্র। বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উন্নয়নের কী বিপুল বৈচিত্র্য। আশ্রয়ণ। কমিউনিটি ক্লিনিক। কৃষিবিপ্লব। ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের জাগরণ। গ্রামগঞ্জে তারুণ্যের স্বাবলম্বী হওয়ার উৎসব। নানা খামারে শিক্ষিত তরুণদের সৃষ্টিসুখের উল্লাস। কর্মসংস্থানে নারীজাগরণের সাফল্য। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। উন্নয়নের কী অপূর্ব মূর্ছনা। রংধনুর সাত রঙের মতো বৈচিত্র্যময় গত এক যুগের উন্নয়ন। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি। সব ক্ষেত্রে এমন ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন বিশ্বের খুব কম দেশেই হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নগুলো একটি আরেকটির পরিপূরক এবং সহায়ক। তথ্যপ্রযুক্তি কৃষিকে দিয়েছে শক্তি। যোগাযোগ রপ্তানি বাণিজ্যে গতি বাড়িয়েছে। এভাবেই উন্নয়নের গন্তব্য প্রতিটি শাখা-প্রশাখা বিকশিত হয়েছে গত এক দশকে। এসব উন্নয়নের গন্তব্য হলো বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণ। সেই স্বপ্নযাত্রার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ উদযাপন করে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। দারিদ্র্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ঘটে বাংলাদেশের। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটে প্রিয় মাতৃভূমির। ’৭১-এর তলাবিহীন ঝুড়ি ঠিক ৫০ বছর পর বিশ্বে সাফল্যের রোল মডেলে পরিণত হয়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ব্যর্থতা, অনুজ্জ্বল, করুণার পাত্র বাংলাদেশ মাত্র এক যুগে বিশ্বে দ্রুত অগ্রসরমান দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এ দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখা শেখে। ‘অসম্ভব’কে হাতের মুঠোয় আনা রপ্ত করে। আর এ অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার রূপকার একজনই- শেখ হাসিনা। এ অর্জন এসেছে একজন মানুষের চিন্তা, দর্শন, নীতিনিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার কারণেই। তিনি হলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু বাঙালি জাতির ইতিহাস হলো ট্র্যাজেডিপূর্ণ। একটি অর্জনের তৃপ্তি উপভোগ করার আগেই আরেকটি ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয় বাঙালি জাতি। এ জাতি যখনই একটু ভালো থাকে, তখনই সর্বনাশের ঝড় সব লন্ডভন্ড করে দেয়। আবার সেই অশুভ মেঘের ঘনঘটা। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিক পরিস্থিতি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। কিন্তু এর পাশাপাশি কিছু অর্বাচীন আবর্জনার ব্যর্থতাও কম দায়ী নয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে সুবিধাবাদী চাটুকার চক্র ক্ষমতার কেন্দ্রে ভিড়তে থাকে। আস্তে আস্তে অযোগ্য, অর্বাচীনরা দন্ডমুন্ডের কর্তা বনে যান। জীবনে আন্দোলন করেননি। দলের জন্য ন্যূনতম অবদান নেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শচর্চার বালাই নেই- এমন কিছু ব্যক্তি আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো মন্ত্রী, উপদেষ্টা, এমপি হয়ে গেছেন। এরা এসব উন্নয়নের অর্থ বোঝেন না। এরা আওয়ামী লীগের ত্যাগের ইতিহাস জানেন না। এরা শুধু জানেন নিজের আখের গোছাতে। এদের কারণে ১৩ বছরের সব অর্জন এখন ম্লান হতে বসেছে। এদের প্রধান কাজ হলো দুর্নীতি, লুটপাট এবং জনগণকে খেপিয়ে তোলা। এই যেমন রবিবার (২৩ অক্টোবর) একটি অনুষ্ঠানে হাজির হন এ দেশের অন্যতম ভাগ্যবান ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘শিল্পে জ্বালানি সংকট সমাধান শীর্ষক’ আলোচনা অনুষ্ঠানে ভুক্তভোগী শিল্পোদ্যোক্তারা তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, কিছুটা আশার বাণী শোনার আশায়। এ সংকটে সরকার পাশে আছে এরকম কিছু উপদেষ্টা বলবেন, এ প্রত্যাশায়। কোথায় আশ্বাস, কোথায় পাশে থাকার অঙ্গীকার - উপদেষ্টা জানিয়ে দিলেন, ‘বিদ্যুৎ ব্যবহারে আমাদের সাশ্রয়ী হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। প্রয়োজনে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। আমাদের রিজার্ভ অনেক কমে গেছে। আমাদের হাতে টাকা নেই। সামনে কী হবে এখনই বলা যাচ্ছে না।’ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলতে পারেন! তৌফিক-ই-ইলাহী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তাঁকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতকে আজকে এ ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যতম দায়ী ব্যক্তি হলেন তিনি। তাঁর প্রতিটি পরিকল্পনা এবং চিন্তাভাবনার মধ্যে ব্যক্তিস্বার্থ বা লালসা আছে কি না সে প্রসঙ্গে আমি যাব না। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে কিছু মৌলিক প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। ক্যাপাসিটি চার্জ বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভাড়া বাবদ এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার দায় জনগণ কেন নেবে? আবার এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনেকটিরই উৎপাদন সক্ষমতা পর্যন্ত নেই। ওপেক, ওপেক প্লাস দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাস কেনার বড় ও স্থায়ী সরবরাহ চুক্তি নেই কেন? মোট আমদানির ৫০ শতাংশ স্পট মার্কেট থেকে কেনার কমিশন-বান্ধব সিদ্ধান্তটি কার স্বার্থে? কাতার ও ওমানের মতো দেশ বড় গ্যাস সরবরাহ চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তখন সরকার তা গ্রহণ করেনি। অথচ এখন ওই দুটি দেশ থেকে গ্যাস পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে আবেদন করেছে। কিন্তু ইতোমধ্যে তারা ইউরোপে গ্যাস বিক্রি শুরু করেছে। এর দায় কার?

অবশ্য জ্বালানি উপদেষ্টার বক্তব্যের পরদিনই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘জ্বালানি উপদেষ্টার বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত। এরকম কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি।’ তাতে কী? বাংলাদেশ এখন সব সম্ভবের দেশ। এই উপদেষ্টাই জুনে বলেছিলেন, ‘সামনে লোডশেডিং করতে হবে।’ ১৯ জুলাই সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং শুরু করে। অবশ্য এর কয়েক দিন আগেই ঢাকার বাইরে লোডশেডিং শুরু হয়। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বললেন, লোডশেডিং হবে দিনে। এক ঘণ্টা। এখন ঢাকা শহরেই পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বললেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে লোডশেডিং কমে আসবে। অক্টোবরে বললেন, শীতের আগে বিদ্যুৎ সংকট কমার সম্ভাবনা নেই। আল্লাহ ভরসা। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে প্রকাশ্য দিবালোকে বাবার কোলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল শিশু নওরীন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সে সময় বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন।’ এখন আমাদের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন প্রকৃতির ওপর!

জ্বালানি উপদেষ্টা এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী দুজনই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একজন যখন আরেকজনের বক্তব্য এভাবে খন্ডন করেন, তখন সরকারের অস্থিরতা এবং সমন্বয়হীনতার প্রকাশ ঘটে। এরকম ঘটনা এটাই প্রথম না, কিছুদিন ধরে মন্ত্রীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বেড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত নিয়ে একটা মন্তব্য করলেন। ব্যস, দু-তিন জন মন্ত্রী পাল্টা বক্তব্য দিলেন। এক মন্ত্রী তো বলেই ফেললেন, ‘তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের কেউ নন।’ এমনকি বিএনপির চট্টগ্রামে জনসভায় কত লোক এ নিয়ে দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলেন। পরে একজন ‘থুক্কু’ বলে উল্টো সুরে কথাও বললেন। মন্ত্রীরা নিজ মন্ত্রণালয়ের চেয়ে অন্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারেও আগ্রহী। যেমন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বুধবার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন, ‘দেশের বাজারে সরকার জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়নি। নিজ থেকে দাম বেড়েছে।’ কী অদ্ভুত ব্যাখ্যা। গাছ যেমন আপনাআপনি বড় হয়। কলি থেকে যেমন ফুল হয়, ফল হয়। তেমনি দ্রব্যমূল্য এক জীব। যার দাম আপনি আপনি বেড়ে যায়। বাজার তদারকি কি তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ? এভাবেই চলছে মন্ত্রিসভা। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী দুটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথমটি, প্রতি মেয়াদে মন্ত্রিসভায় বড় চমক। দ্বিতীয়টি, সরকার ও দলকে আলাদা রাখার চেষ্টা। আওয়ামী লীগের নতুনদের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট সুযোগ। প্রথম দফায় (২০০৯-২০১৩) বেগম মতিয়া চৌধুরী, প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত পরে ওবায়দুল কাদের এবং জাহাঙ্গীর কবির নানক (প্রতিমন্ত্রী) ছাড়া কোনো হেভিওয়েট নেতা মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। তা ছাড়া তখন আওয়ামী লীগের হাতে ছিল প্রচুর সময়। জনগণ নতুনদের সময় নিয়ে পরখ করতে চেয়েছে। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সংকটে প্রধানমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুর মতো জাতীয় নেতাদের ডেকে নেন। সে সময় নানা মান-অভিমানে কেউ মন্ত্রিসভায় যোগ দেননি। কিন্তু ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার একটি রাজনৈতিক ইমেজ দেন। একটি প্রাজ্ঞ মন্ত্রিসভা ৫ জানুয়ারির ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নির্বাচন পাড়ি দিতে শেখ হাসিনাকে কিছুটা হলেও সাহায্য করেন। অভিমান ভেঙে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন যোগ দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ২০১৪-এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তাঁর ‘এ’ টিমকে সামনে নিয়ে আসেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় আমার বিবেচনায় এটি ছিল অন্যতম সেরা মন্ত্রিসভা। ২০১৮-এর নির্বাচনের পর বর্তমান মন্ত্রিসভার অবয়ব দেখে অনেকে থমকে গিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনের মাধ্যমেই আসলে আওয়ামী লীগের অর্জন বিনাশের ষড়যন্ত্র শুরু করেন একশ্রেণির আমলা। ২০১৮-এর পর যাঁরা মন্ত্রী হয়েছেন তাঁদের মধ্যে দু-এক জন ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবাই অনুজ্জ্বল। সংকট মোকাবিলায় নিষ্ক্রিয়। দায়িত্ব নিতে অপারগ। আমি মনে করি, আমলারা তাদের কর্তৃত্ব পুরোপুরি কুক্ষিগত করতেই এরকম একটি মন্ত্রিসভা গঠনে প্রধানমন্ত্রীকে রাজি করিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এ মন্ত্রিসভার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক নিরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এ পরীক্ষায় অধিকাংশই অনুত্তীর্ণ। ভূমিমন্ত্রী যেমন প্রমাণ করেছেন দক্ষতা, যোগ্যতা ও মেধা নিয়ে একটি মন্ত্রণালয়কে নিষ্কলুষ, দুর্নীতিমুক্ত করা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেমন পরিমিত, মার্জিত শব্দচয়নের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই কম। এ মন্ত্রিসভার এক বেদনাদায়ক রূপ হলো, বেশির ভাগ মন্ত্রীর রাজনীতির শিকড় নেই। উড়ে এসে জুড়ে বসা মন্ত্রীদের কর্কশ কণ্ঠ ক্রমে কান ঝালাপালা করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কাঁপানো, জাকসুর সাবেক ভিপি, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীমের কপালে জুটেছে সিকি মন্ত্রিত্ব। আমার বিবেচনায়, এখন যে মন্ত্রিসভা সেটা আওয়ামী লীগের ‘সি’ টিমও না। এদের প্রায় অর্ধেক পাড়ার আওয়ামী লীগের নেতাও ছিলেন না। কর্মীদের সঙ্গে সংশ্রবহীন কিছু ব্যবসায়ী এবং শিশুতোষ ইচড়ে পাকা অর্বাচীন মন্ত্রিত্বকে যেন একটা প্রহসনে পরিণত করেছে। প্রধানমন্ত্রী একটি মহৎ এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে এই ঝুঁকিপূর্ণ নিরীক্ষা করেছেন। কিন্তু মন্ত্রিত্ব কোনো চাকরি না। এটি কোনো লটারির টিকিটও না। মন্ত্রিত্ব একটি দায়িত্ব। দেশসেবার এক কঠিনতম পরীক্ষা। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মন্ত্রিত্ব কোনো উদ্যাপনের বিষয় নয়। প্রতি মুহূর্তে জনগণের সামনে নিজেকে পরীক্ষায় অবতীর্ণ করা।’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি হলো এক চরম বাস্তবতা। জনগণ, সংসদ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিনিয়ত একজন মন্ত্রীকে পরীক্ষা দিতে হয়। আর এ পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে সরে যেতে হয়। অথবা সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৭৫-এর জঘন্যতম হত্যাকান্ডের পর থেকে মন্ত্রিত্ব হয়ে ওঠে কোটিপতি ক্লাবে যোগ দেওয়ার সুযোগ। টাকা বানানোর মেশিন। জবাবদিহি না থাকার কারণে ব্যর্থতার দায়ে মন্ত্রীরা যেমন নিজেরা সরে যান না। তেমনি তাদেরও সরিয়ে দেওয়ার নজির বিরল হয়ে উঠছে। ব্যর্থদের সরিয়ে যোগ্যদের সামনে আনলে জনগণ আশ্বস্ত হয়। সরকারি কর্মচারীরা কাজে গতি পায়। এটাই বাস্তবতা। ভারতে নরেন্দ্র মোদি কভিড বিপর্যয় কাটাতে মন্ত্রিসভায় বড় বদল করেছেন। সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। ব্রিটেনে দুই মাসে দুজন প্রধানমন্ত্রী হলেন। কিন্তু বাংলাদেশে একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে, মন্ত্রির ব্যর্থতা স্বীকার করা মানেই সরকার ব্যর্থ প্রমাণ হওয়া। বিরোধী দলের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরকম অসংখ্য ঝাড়ফুঁক তত্ত্ব বাতিল করেছেন। এতে তাঁর ইমেজ বেড়েছে। আওয়ামী লীগে প্রবীণ, পরিণত, নবীন মিলিয়ে এরকম এক শ নিবেদিতপ্রাণ আছেন, যাঁরা মন্ত্রী হলে ‘অর্জন ধ্বংসের’ এ তৎপরতা বন্ধ করতে পারেন। তাঁদের কাজ একটাই- শেখ হাসিনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। শেখ হাসিনার দেওয়া দায়িত্ব জীবন বাজি রেখে সম্পন্ন করবেন। এমন নেতার অভাব নেই। আওয়ামী লীগে, ১৪ দলে। এমন অনেক নেতা আছেন যাঁরা মন্ত্রী হলে জনগণ হাততালি দেবে। উচ্ছ্বাস করবে। আশায় বুক বাঁধবে। এখন এক সংকটকাল। এ সংকটকালে অর্বাচীন, আবর্জনাদের হাত থেকে সরকারকে মুক্ত করতে হবে। দেশকে রক্ষা করতে হবে। যেসব অযোগ্য মুখে বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনা বলে ফেনা তোলে আর কাজ করে উল্টো, সেসব চাটুকারকে চিহ্নিত করে বিদায় করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য করে ফুলে-ফেঁপে উঠে যারা মন্ত্রণালয়কে আরেকটি ব্যবসা কেন্দ্র বানিয়েছে, তাদের প্রতিহত করার এখনই সময়। দুষ্ট, দুর্বৃত্ত, চাটুকারদের সংখ্যা কম। হাতে গোনা। কিন্তু প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় এরা সংঘবদ্ধ। এরাই সরকারপ্রধানের চারপাশে ঘুরঘুর করে। এরা সুযোগ বুঝে পালাবে।

’৭৫-এর যে পরিবারগুলো সর্বস্ব হারিয়েছে, যে তরুণ-কিশোররা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জন্য যৌবন উৎসর্গ করেছেন, ১৯৮২ থেকে ’৯০ পর্যন্ত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যাঁরা রাজপথে লড়াই করেছেন, মেধা-মননের চর্চা করেছেন, ১৯৯১ থেকে যাঁরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন জীবন বাজি রেখে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের দানবীয় তান্ডবে যাঁরা বুক পেতে রুখে দাঁড়িয়েছেন, এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যাঁরা দল ও নেতার আদর্শের প্রশ্নে অটল ছিলেন, যাঁরা জনগণকে ভালোবাসেন, জনগণের জন্যই যাঁদের ধ্যানজ্ঞান এমন ত্যাগী, আদর্শবান নেতার সংখ্যা আওয়ামী লীগে অনেক। এঁরা নিভৃতে কাঁদেন। দেয়ালে মাথা কুটে হাহাকার করেন। এঁরা অপেক্ষায় আছেন। এখনো এই ত্যাগী-পরীক্ষিত কর্মীরা আশা করেন শেখ হাসিনা এসব আগাছা বিদায় করবেন। অর্বাচীনদের সরিয়ে দেবেন। যোগ্যদের সামনে আনার এখনই সময়। এখন আসল খেলা। মাঠে ‘এ’ টিম নামাতেই হবে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com


লোডশেডিং   ডলার সঙ্কট   জ্বালানি   যুদ্ধ   নির্বাচন   মন্দা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কার অপেক্ষায় বঙ্গভবন

প্রকাশ: ১০:০১ এএম, ২১ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

২১ এপ্রিল, ১৯৭৭। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বঙ্গভবনে তার বেডরুমে গভীর নিদ্রায়। হঠাৎ বুটের শব্দ। চিৎকার চেঁচামেচি। নিদ্রা ভঙ্গ হলো রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের। ঘুম ভাঙতেই প্রচণ্ড শব্দ। কিছু সৈনিক তার বেডরুমের দরজা ভেঙে ফেলল। রাষ্ট্রপতি তখনো বিছানা থেকে পুরোপুরি উঠতে পারেননি। স্টেনগান তাক করে রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে ধরলেন সশস্ত্র সামরিক ব্যক্তিরা। নেতৃত্বে জিয়াউর রহমান। বিচারপতি সায়েম ভয়ে কাঁপছেন। বয়োবৃদ্ধ মানুষ। এরকম পরিস্থিতি ছিল তার চিন্তারও বাইরে। জিয়ার হাতে একটি কাগজ। ধমকের সুরে বললেন, ‘সাইন হেয়ার।’ রাষ্ট্রপতি একটু বিব্রত। ভয়ার্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কী এটা। জিয়া বললেন, ‘ইউ আর সিক। অসুস্থতার কারণে আপনি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে রিজাইন করছেন।’ বিচারপতি সায়েম একটু ধাতস্থ হলেন। কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বললেন, ‘আমি তো গত সপ্তাহেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছি। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।’ এবার জিয়া তার বুকে স্টেনগান তাক করলেন। কঠোর স্বরে বললেন ‘সাইন’। আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম দেখলেন উপায় নেই। জীবন অথবা রাষ্ট্রপতির পদ যে কোনো একটি তাকে ত্যাগ করতেই হবে। কম্পিত হাতে তিনি কাগজ এবং কলম তুলে নিলেন। স্বাক্ষর করলেন। কাগজটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন জিয়া। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন বিচারপতি সায়েমকে। এর মাত্র কয়েক মিনিট পর সেনাপ্রধান, সামরিক একনায়ক জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করলেন। মধ্যরাতে জিয়ার বঙ্গভবন দখলের বিবরণ উঠে এসেছে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নিজের লেখা গ্রন্থে। ‘অ্যাট বঙ্গভবন : লাস্ট ফেস’ শীর্ষক এ গ্রন্থটি এখন বাজারে পাওয়া যায় না। এর এক বাংলা অনুবাদ আছে বটে। কিন্তু সেটি সেন্সর করা। বাংলা অনুবাদে জিয়ার বঙ্গভবন দখলের কাহিনি নেই। মূল ইংরেজি বইটি বিএনপি ’৯১ সালে ক্ষমতায় এসে নিষিদ্ধ করে। বঙ্গভবন ঘিরে স্বাধীনতার পর যত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ভাগ্য খুব সুখকর নয়। বেশির ভাগ রাষ্ট্রপতি তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। দুজন রাষ্ট্রপতি সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশে যারা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন তাদের দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ধরনের রাষ্ট্রপতি যারা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থার আওতায়। তারা ছিলেন প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। এদের মধ্যে তিনজন সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। যদিও তিনটি ভোটই ছিল বিতর্কিত এবং প্রহসনমূলক। অন্য এক ধরনের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন যারা সংসদীয় গণতন্ত্রের অধীনে। অনেকটা অলঙ্কারিক। এখন বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রের অভিভাবক তিনি। দেশের এ সর্বোচ্চ পদটি নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ চলতি বছর একজন রাষ্ট্রপতিকে বরণ করবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। কার অপেক্ষায় বঙ্গভবন?

এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমরা খুব শিগগিরই পাব। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রপতি পদের অতীত ইতিহাস তিক্ততায় ভরা। নানাভাবে গণতন্ত্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হয়েছে বঙ্গভবনে। তাই বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা নির্বাচন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। ‘মুজিবনগর সরকারে’ রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে। তাজউদ্দীন আহমদ কৌশলগত কারণেই বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর জাতির পিতা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ১০ জানুয়ারি। কালবিলম্ব না করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেন। রাষ্ট্রপতি পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বঙ্গবন্ধু। ১২ জানুয়ারি নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। প্রায় দুই বছর রাষ্ট্রপতি ছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরী। এরপর ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতি হন মোহাম্মদ উল্লাহ। ’৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে মোহাম্মদ উল্লাহ মন্ত্রী হন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর মোহাম্মদ উল্লাহ খুনি মোশতাকের অধীনে উপ-রাষ্ট্রপতি হন। রাষ্ট্রপতি পদকে হাস্যকর বা খেলো করার ক্ষেত্রে যাদের নাম উল্লেখযোগ্য এদের মধ্যে নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ উল্লাহ অন্যতম। এক সময় তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামানত হারান। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকার পর একজন ব্যক্তি কীভাবে মন্ত্রী, উপ-রাষ্ট্রপতি হন? এসব ব্যক্তিত্বহীন, লোভী বঙ্গভবনে প্রবেশ করলে তা রাজনীতি এবং দেশের জন্য বিপদের কারণ হয়।

১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারির পর দেশে নতুন সরকারব্যবস্থা চালু হয়। সব রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা হয়। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু মাত্র ২০২ দিনের মাথায় দেশের প্রতিষ্ঠাতা পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। বিজয়ের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যার কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয় বাংলাদেশে। খুনি মোশতাকের রাষ্ট্রপতি অধ্যায়কে সর্বোচ্চ আদালত অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়েছেন। কাজেই খুনি মোশতাকের ৮৩ দিনের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকে আমি স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়। মোশতাকের পর ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সায়েম। তার পরিণতির কথা দিয়েই এ লেখা শুরু করেছিলাম। অস্ত্রের মুখে সায়েমকে হটিয়ে সেনাপ্রধান জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। আমার বিবেচনায় এটি ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতা। কারণ সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় তার রাষ্ট্রপতি হওয়াটা ছিল গুরুতর সাংবিধানিক অপরাধ। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, যে অস্ত্রের জোরে জিয়া ক্ষমতায় বসেছিলেন সেই অস্ত্রই তার করুণ পরিণতি ডেকে আনে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়া নির্মমভাবে নিহত হন। উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য তিনি অযোগ্য ছিলেন। বিচারপতি সাত্তারকে নির্বাচনে যোগ্য করতে সংবিধানে সংশোধনী করা হয়। ১৯৮১-এর ১৫ নভেম্বর সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ড. কামাল হোসেনকে পরাজিত করে বিচারপতি সাত্তার নির্বাচনে জয়ী হন। কিন্তু বিচারপতি সাত্তার ও বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যাপক ভোট কারচুপি এবং জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। আবার আক্রান্ত হয় বঙ্গভবন। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে সামরিক ক্যু সংঘটিত হয় বাংলাদেশে। গদিচ্যুত হন বিচারপতি সাত্তার। ক্ষমতা দখল করে এরশাদ পুতুল রাষ্ট্রপতি বানান। বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। কিন্তু আসল ক্ষমতার মালিক ছিলেন এরশাদ। এরশাদ তার অবৈধ স্বৈরশাসনের প্রতিটি ধাপে জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন। ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন এরশাদ। রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রায় সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন এ সামরিক একনায়ক। যদিও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং অবৈধ ক্ষমতার দখলদার হিসেবে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন প্রায় ৯ বছর। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে এক স্বল্পমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এটি ছিল স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের ফসল। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন। ’৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। প্রধান দুই দল একমত হয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থার রক্তাক্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রচণ্ডভাবে সংকুচিত হয়। বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদকেই মর্যাদাহীন করে ফেলে। এ সম্পর্কে প্রয়াত ড. আকবর আলি খান তার ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনা জালে রাজনীতি’ গ্রন্থে ‘বঙ্গভবনে বাঁটকু : নির্বাহী বিভাগ কি ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রে’র পথে চলছে?’ শিরোনামে প্রবন্ধে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে এর খানিকটা পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি :

‘‘১৯৯১ সালের শেষদিকে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসে অর্থনৈতিক পরামর্শক (Economic Minister) পদ থেকে বদলি হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে যোগ দিই। অর্থ বিভাগে যোগ দেওয়ার দুই-তিন দিন পর অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি কোনো একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন এবং তাঁকে অপসারণ করে তাঁর জায়গায় জ্যেষ্ঠতম উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করে ফাইল পেশ করতে পরামর্শ দেন। আমি অফিসে ফিরে আসি এবং সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সন্তুষ্ট হই যে, মন্ত্রীর অভিযোগসমূহের অনেকাংশেরই সত্যতা রয়েছে। আমি যুগ্ম সচিবকে অবিলম্বে মন্ত্রীর নির্দেশ অনুসারে ফাইল প্রস্তুত করতে অনুরোধ করি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফাইল আমার টেবিলে চলে আসে। নথিতে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য একটি সারসংক্ষেপ পেশ করা হয়। স্মরণ করা যেতে পারে যে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পরিবর্তন-সংক্রান্ত ফাইল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করতে হতো। কিন্তু এরশাদের পতনের পর সংবিধান সংশোধন করে মন্ত্রিসভা শাসিত সরকার সাংবিধানিকভাবে চালু করা হয়। সংবিধান সংশোধন হলেও তখনো কার্যবিধিমালা সংশোধিত হয়নি। সংবিধান সংশোধনের আগের কার্যবিধিমালায় নির্দেশ ছিল যে, ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমতি লাগবে। যেহেতু তখনো সংবিধান ও কার্যবিধিমালার মধ্যে অসঙ্গতি ছিল, সেহেতু এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমতির প্রয়োজন আছে কি না, সে সম্পর্কে ক্যাবিনেট ডিভিশনের নির্দেশনা চাওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ক্যাবিনেট বিভাগ জানায় যে, যতদিন পর্যন্ত কার্যবিধিমালা সংশোধিত না হবে ততদিন পর্যন্ত এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিতে হবে। যুগ্ম সচিব আমাকে নথি দেখালেন। আমি সন্তুষ্ট হয়ে রাষ্ট্রপতির জন্য তৈরি করা সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দিই।

পরের দিন মন্ত্রী অফিসে আসার পর তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আমাকে খবর দিলেন যে, আমি যেন মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে অবিলম্বে দেখা করি। আমি মন্ত্রীর কক্ষে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থমন্ত্রী আমাকে প্রশ্ন করলেন, আমি কেন রাষ্ট্রপতির জন্য সারসংক্ষেপ পেশ করলাম? দেশে যে মন্ত্রিসভা শাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেটা সম্পর্কে কি আমি অবগত নই? সেই প্রসঙ্গেই তিনি ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন যে, আমি কি মনে করি বঙ্গভবনে উপবিষ্ট বাঁটুক সত্যি সত্যিই দেশ পরিচালনা করছেন? আইন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এ কাজ করা হয়েছে বলার পর তাঁর রাগ গিয়ে পড়ল আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর। তিনি আইন সচিবকে টেলিফোনে গালিগালাজ করলেন এবং আমাকে বললেন যে, নথি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো যাবে না। আমি বললাম, আপনি লিখে দেন যে প্রধানমন্ত্রীর জন্য সারসংক্ষেপ পেশ করা হোক। তিনি লিখে দিলেন এবং তদনুসারে আবার নথি তাঁর কাছে ফিরে গেল এবং তাঁর ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে ব্যবস্থা গৃহীত হলো।

বিভাগীয় কাজের সমাধান ঠিকই হলো, কিন্তু আমার মনে একটা বড় খটকা জেগে উঠল। তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্ক ভালো ছিল না। তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি খর্বাকৃতির ছিলেন। কিন্তু বাঁটকু শব্দটি ব্যবহার করে অর্থমন্ত্রী শুধু খর্বাকৃতিকেই পরিহাস করেননি, এর ভিতর অর্থমন্ত্রীর রাজনৈতিক দর্শনও নিহিত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মন্ত্রিসভা শাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গৌণ। মন্ত্রিসভার সদস্যরা যদি দৈত্যের মতো ক্ষমতাবান হন তাহলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেহাত বাঁটকুর মতো।’’ (গ্রন্থ : অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি; পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৬)।

আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৭১ সালে স্থানীয় পর্যায়ের রাজাকার ছিলেন। এর মাধ্যমে বিএনপি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে গুরুত্বহীন করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আবদুর রহমান বিশ্বাস তার মেয়াদ পূর্ণ করেন। তিনিই বাংলাদেশে প্রথম মেয়াদ পূর্ণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা রাষ্ট্রপতি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনা সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করার চেষ্টা করেন। সংসদে চালু করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকেও মর্যাদাবান করেন শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রের অভিভাবক পদে নির্বাচন করেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে। দেশের প্রথম ব্যক্তিকে শেখ হাসিনা নিরপেক্ষ রাখতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে। শেখ হাসিনাই রাষ্ট্রপতিকে সম্মান জানানোর রেওয়াজ চালু করেন। বিদেশ সফর করে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। তাকে বিভিন্ন পরিস্থিতি অবহিত করার জন্য বঙ্গভবনে যাওয়ার রীতি চালু করেন শেখ হাসিনা। বাঁটকু রাষ্ট্রপতিকে তিনি ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ করেন। ক্ষমতা বড় কথা নয়, রাষ্ট্রপতির সম্মান তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। সংবিধানের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক পদের স্বীকৃতি প্রদানের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে রীতিমতো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে তিনি সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের একটি কারণ বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের বিতর্কিত ভূমিকা। তথাকথিত দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ পদে আনলে কী হয়, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন তার বড় উদাহরণ। ২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচনে বিপুল জয় পায় বিএনপি। বিএনপি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেয় দলের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। কিন্তু বিএনপি রাষ্ট্রপতি চায় একজন ‘বাঁটকু’। একজন গ্রহণযোগ্য, সত্যিকারের অভিভাবক রাষ্ট্রপতি বিএনপি মেনে নেয়নি। দায়িত্ব নিয়েই অধ্যাপক চৌধুরী অনেক ‘লম্বা’ হয়ে গিয়েছিলেন। এ জন্যই তাকে ছেঁটে ফেলার উদ্যোগ নেয় ক্ষমতাসীন বিএনপি। অবস্থা বেগতিক দেখে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০২ সালের ২১ জুন নিজেই সরে দাঁড়ান। তার পদত্যাগের পর আরেকজন ‘বাঁটকু’ ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য খুঁজে বের করতে বিএনপি সময় নেয় ৭৭ দিন। ততদিন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির আবিষ্কৃত নতুন ‘বাঁটকু’ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ। বিএনপি নেতারা যাকে ‘ইয়েস উদ্দিন’ বলে টিপ্পনী কাটতেন। তিনিও সংকটকালে ব্যক্তিত্বহীন, ভাঁড়ে পরিণত হয়েছিলেন। আজ্ঞাবহ হতে গিয়ে পুরো দেশকেই সংকটের গভীরে ঠেলে দিয়েছিলেন ‘ইয়েস উদ্দিন’। দুই বছর অনির্বাচিত সরকার বাংলাদেশের বুকের ওপর যে চেপে বসেছিল তার প্রধান কারণ ড. ইয়াজ উদ্দিনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব। বিএনপির সবচেয়ে ক্ষতি করেছিল দ্বিতীয় বাঁটকু এ রাষ্ট্রপতি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বারের মতো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। এবার শেখ হাসিনা বেছে নেন দলের অভিভাবক, রাজনীতিতে বিচ্যুতিহীন আদর্শবাদী নেতা জিল্লুর রহমানকে। এক-এগারোর সংকটেই অবশ্য জিল্লুর রহমান তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতার কল্যাণে জাতির একজন অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন। সবার আস্থা, বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়েছিল গোটা দেশ। একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই রাষ্ট্র নামক পরিবারের প্রধান। তার মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেয় আবদুল হামিদকে। তৃণমূল থেকে বেড়ে ওঠা অন্তঃপ্রাণ এক রাজনীতিবিদ। সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলেন। সহজ সরল কথায় বঙ্গভবনের সুউচ্চ দেয়াল উপড়ে তিনি জনতার স্রোতে মিশে যেতে পারেন। আদর্শবান কিন্তু একেবারে সাদামাটা একজন মানুষ। দুই মেয়াদে প্রায় ১০ বছর তাঁর বঙ্গভবনে বসবাস এখন সমাপ্তির পথে।

স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতিদের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করলাম শঙ্কা থেকে। বঙ্গভবনে ভুল মানুষ যখনই প্রবেশ করেছে তখনই গণতন্ত্র হুমকিতে পড়েছে। অগণতান্ত্রিক শাসকরা একান্ত অনুগতদের বঙ্গভবনে ঢুকিয়ে সর্বোচ্চ পদকে হেয় করেছে। আমরা যেমন মোহাম্মদ উল্লাহর মতো লাজ-লজ্জাহীন রাষ্ট্রপতি চাই না, তেমনি অস্ত্র হাতে কেউ কেউ বঙ্গভবন দখল করে দেশপ্রেমের বাদ্য বাজাক তা-ও প্রত্যাখ্যান করি। আমরা যেমন নাম-পরিচয়হীন কোনো ‘বাঁটকু’ রাষ্ট্রপতি হোক চাই না, তেমনি আবার কোনো সুশীল ছদ্মবেশী সাবেক আমলা অতি নিরপেক্ষতার শক্তিতে ‘বঙ্গভবন’ বিতর্কিত করুক সেটিও চাই না। রাষ্ট্রপতি এ রাষ্ট্রের প্রথম নাগরিক। একজন রাজনীতিবিদ। আদর্শবান ব্যক্তি, যার সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক থাকবে। জনগণ যাকে আপন মানুষ ভাববে। তেমন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের আছে। বঙ্গভবনের টিকিট তাকে দিলেই ‘গণতন্ত্র’ সুরক্ষিত হবে। ভুল মানুষের হাতে বঙ্গভবনের চাবি গেলে আবার ‘গণতন্ত্র’ নির্বাসনে যাবে। সামনে কঠিন সময়। বঙ্গভবনের বাসিন্দা নির্বাচন এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগ কেন কখন কীভাবে হারে

প্রকাশ: ১০:০১ এএম, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

এক-এগারোর ১৬তম বার্ষিকীর দিন রাজনীতির মাঠ ছিল সরগরম। বিএনপি করেছে গণ-অবস্থান কর্মসূচি আর আওয়ামী লীগ থেকেছে সতর্ক পাহারায়। কর্মদিবসে এসব কর্মসূচিতে ব্যাপক জনভোগান্তি হয়েছে বটে। কিন্তু তারপরও জনমনে একটা স্বস্তি ছিল লক্ষণীয়। সাধারণ মানুষ শান্তি চায়। নিজেদের কাজকর্ম ঠিকঠাক মতো করতে চায়। যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি তাই জনমনে আতঙ্ক ছড়ায়। বিএনপির মধ্যে ইদানীং তারিখ বিভ্রাট বা বিভ্রান্তি প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিদায়ী বছরের ২৪ ডিসেম্বর বিএনপি গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। ওই দিন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের তারিখ নির্ধারিত ছিল বহু আগেই। এরপর বিএনপি নেতাদের ভুল ভাঙে। গণমিছিলের নতুন তারিখ দেয় ৩০ ডিসেম্বর। বুধবার (১১ জানুয়ারি) বিএনপি পালন করল গণ-অবস্থান কর্মসূচি। এবার অবশ্য শুধু বিএনপি নয়, নানা দল, নানা জোট বিএনপির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছে। বিএনপি অবশ্য ঢাকার বাইরে তাদের ১০ সাংগঠনিক বিভাগেও কর্মসূচি পালন করে। কেন্দ্রীয় নেতারা কর্মসূচি সফল করতে ওইসব বিভাগীয় শহরে যান। এক-এগারো বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে দিনটি আলোচিত। এক-এগারো একদিকে যেমন বিএনপির একতরফা প্রহসনের নির্বাচন প্রচেষ্টাকে বানচাল করেছিল, তেমনি ছিল রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানোর মিশন। বিএনপির একান্ত অনুগত বিশ্বস্ত কতিপয় ব্যক্তি সেদিন বিএনপিকে আসলে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। জেনারেল মইন আহমেদ ছিলেন বেগম জিয়ার একান্ত অনুগত সামরিক কর্মকর্তা। সাতজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে তাকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। বেগম জিয়ার প্রত্যাশা ছিল দুঃসময়ে তিনি পাশে থাকবেন। . ফখরুদ্দীন আহমদকে বেগম জিয়াই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। জেনারেল আমিন কিংবা ব্রিগেডিয়ার বারী সবাই ছিলেন বিএনপিপন্থি। আওয়ামী লীগবিরোধী। অনেকেই মনে করেন, এক-এগারো ছিল বিএনপির সৃষ্টি। গণঅভ্যুত্থানের হাত থেকে বাঁচতেই বিএনপি সেদিন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল। কিন্তু আমি তেমনটি মনে করি না। আমার মতে, এক-এগারো ছিল বিরাজনীতিকরণের চক্রান্তের অংশ। সুশীল সমাজকে বিনা নির্বাচনে ক্ষমতায় রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন প্রকল্প। সংস্কারের নামে রাজনীতিকে কলঙ্কিত করা। রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের চরিত্র হনন করাই ছিল এক-এগারোর অন্যতম উদ্দেশ্য। এক-এগারো সরকারের তথাকথিত রাজনৈতিক সংস্কারের মূল লক্ষ্যই ছিল রাজনীতিমুক্ত বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক-এগারোর লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। . ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেরিতে হলেও নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল। এক-এগারোর পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনিই প্রথম সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। দ্রুত নির্বাচনের দাবি করেন। রাজনীতিবিদদের ঢালাও গ্রেফতারের প্রতিবাদে সোচ্চার হন। জন্য তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছিল। তাঁর দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল অনির্বাচিত সরকার। সব শেষে তাঁকে কারান্তরিন করে মাইনাস ফর্মুলা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় শেখ হাসিনা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য করেন। শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে নিজেই এক-এগারোর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের। কাউন্সিলের আগে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে বসেছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, কারান্তরিন সময়ের অভিজ্ঞতা। সেনা কর্মকর্তারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে দুই নেত্রীর কাছে যান। শেখ হাসিনার কাছে এসেছিলেন জেনারেল আমিন। এসেই তিনি উত্তেজনা দেখান। রাজনীতিবিদদের গালাগালি করেন। শেখ হাসিনা শান্ত। সবকিছু শোনেন। তারপর তিনি জানান, দেশের জন্য তাঁর পরিকল্পনার কথা। ভিশন-২০২১, রূপকল্প-২০৪১ এর পরিকল্পনা। অন্যদিকে বেগম জিয়ার কাছে যান ব্রিগেডিয়ার বারী। খালেদা ছিলেন উত্তেজিত। প্রচণ্ড গালাগালি করেন সেনা কর্মকর্তাদের। ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে কী করবেন তারও বিস্তারিত বিবরণ দেন। ব্যস। দুই নেত্রীর দুই পথের শুরু হয় এখান থেকেই। এক-এগারো সবচেয়ে ক্ষতি করেছে বিএনপির। ১৬ বছরেও সেই ক্ষত সারাতে পারেনি দলটি। সেই বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষাক্ত ছোবলকে আবার আলিঙ্গন করতে চায়। বেহুলার বাসর ঘরে ছিদ্র দিয়ে যেভাবে সাপ প্রবেশ করেছিল, ঠিক তেমনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক পদ্ধতির মধ্যে ছিল অদ্ভুত ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়েই একটি অনির্বাচিত সরকারের অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে সাংবিধানিক বিধান ছিল, তাতে এর মেয়াদ ৯০ দিন। কিন্তু ৯০ দিনের মধ্যে যদি ওই সরকার নির্বাচন করতে না পারে তাহলে কী হবে, সেই ব্যাখ্যা ছিল না। কারণেই . কামাল হোসেন সর্বোচ্চ আদালতে বলেছিলেন, নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারে। এতে সংবিধান লঙ্ঘন হয় না। ৯০ দিনের কথা বলে . ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। জেনারেল মইন এবং . ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ই রাজনীতিবিদদের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিরোধী একটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই বলেছিল, আর না তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরে অবশ্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়। এক-এগারো তাই গণতন্ত্রের সর্বনাশের দিন। বিএনপি ওইদিন গণঅনাস্থা কর্মসূচি পালন করল। এটি কি কাকতালীয় নাকি ইঙ্গিতবাহী। বিএনপি কি ১০ দফা কিংবা রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচির মাধ্যমে আবার একটি এক-এগারো আনতে চায়? বিএনপি একটি সুশীল সরকার কায়েম করতে চায়? বিএনপি কি গণতন্ত্রের সর্বনাশ চায়? আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য বিরোধী আন্দোলনে মোটেও বিচলিত নন। সরকার অর্থ পাচার, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে সংকট, ডলার সমস্যা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ইত্যাদি নিয়ে কিছুটা হলেও চাপে আছে। সরকারের কার্যক্রমেও সেই চাপ বোঝা যায়। সেই তুলনায় বিরোধী আন্দোলনে সরকার বেশ ফুরফুরে, চাপমুক্ত। এর কারণ একাধিক। প্রথমত, বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলনে এখন পর্যন্ত জনসম্পৃক্তি ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, আন্দোলন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারেনি। বিএনপি বাধ্য ছেলের মতো সরকারের অনুমতি নিয়েই কর্মসূচি পালন করেছে। তৃতীয়ত, বিরোধী আন্দোলন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ভিতরের কোন্দল ভুলে ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। নেতা-কর্মীরা কাজ পাচ্ছে। আক্রান্ত হলেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়। সংগঠিত হয়। নিজেদের বিরোধ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়। জন্য প্রধানমন্ত্রী বিরোধী আন্দোলনকে স্বাগত জানান। তবে আন্দোলন দিয়ে তো সরকার হটানো যাবে না, এটা শেখ হাসিনার মতো পোড় খাওয়া, আন্দোলনে বেড়ে ওঠা রাজনীতিবিদ ছাড়া আর কে ভালো জানেন। জন্যই ১০ জানুয়ারি জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে ধাক্কা দিল আর আওয়ামী লীগ পড়ে গেল এত সহজ নয়।আন্দোলনের ধাক্কায় আওয়ামী লীগের পতন কখনো হয়নি। স্বাধীনতার পর জাসদ বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। গণবাহিনী সন্ত্রাসের তাণ্ডব চালিয়েছে। কিন্তু জাসদ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে পারেনি।৯৬ সালে আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের প্রথম সরকার হিসেবে মেয়াদ পূর্ণ করে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে জ্বালাও-পোড়াও করে আওয়ামী লীগকে গদিচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। সে তুলনায় আন্দোলন কিছুই না। তাই রাজনীতির ইতিহাস বলে আন্দোলনে সরকারের পতন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ হেরে যায় ষড়যন্ত্রের কাছে। চক্রান্ত আওয়ামী লীগকে পরাস্ত করে।৫৪-তে ষড়যন্ত্র করেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।৭৫- ষড়যন্ত্র শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশকেই গভীর সংকটে দাঁড় করিয়েছিল।৯১-এর নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগকে হারানোর নীলনকশার নিপুণ বাস্তবায়ন। ২০০১ সালের ষড়যন্ত্রও আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে। গত জানুয়ারি ছিল তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের চার বছর পূর্তি। উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘ বছরের শেষে অথবা সামনের বছরের শুরুতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এখন থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী, ক্ষমতালোভী, জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী আর পরগাছা গোষ্ঠীর সরব তৎপরতা শুরু হয়েছে। এদের লক্ষ্য ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে পেছনের দরজা দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা।রণকৌশলের প্রধান কাজ আসল শত্রুকে চিহ্নিত করা। প্রধানমন্ত্রী সেই কাজটা করেছেন। আন্দোলন যে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য একটি আবরণ এটা তিনি ভালো করেই জানেন। ক্ষমতাচ্যুত করার আসল কাজ হচ্ছে পর্দার আড়ালে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কখনো বাস্তবায়িত হয়?

যখন আওয়ামী লীগ অতি আত্মবিশ্বাসী হয়, ভিতরের বিশ্বাসঘাতকরা প্রতিপক্ষের সঙ্গে গোপনে হাত মেলায়। যখন আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের যোদ্ধারা দূরে সরে যায়, অবহেলায়, যখন দলের ত্যাগী পরীক্ষিতরা কোণঠাসা হয়, যখন চাটুকারদের আলখেল্লায় সত্য গোপন হয়, সুবিধাবাদীরা যখন ক্ষমতার কেন্দ্রের চারপাশ ঘিরে রয়, বিশ্বাসঘাতকরা যখন বিশ্বস্ততার মুখোশ লাগায়, আওয়ামী লীগ যখন অচেনা মানুষের প্রেমে হাবুডুবু খায়, ঠিক তখনই আওয়ামী লীগ হেরে যায়।৭৫-এর আগে তাজউদ্দীন আহমদরা নির্বাসিত হয়েছিলেন। খুনি মোশতাকের মতো চাটুকার এবং সুবিধাবাদীরা বঙ্গবন্ধুর চারপাশে সারাক্ষণ ঘুর ঘুর করত। মেরুদণ্ডহীন নেতারা প্রতিবাদহীন ছিলেন।৯১-এর নির্বাচনে জয়ের আগেই আওয়ামী লীগ জিতেছিল। অতি আত্মবিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা মন্ত্রিসভার দফতর ভাগবাটোয়ারা করায় ব্যস্ত ছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিশ্বস্ততার মুখোশ পরা বিশ্বাসঘাতক বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের প্রেমে পড়েছিল আওয়ামী লীগ। মেরুদণ্ডহীন কতিপয় আমলার ওপর নির্ভর করেছিল। ভুল মানুষকে পক্ষের লোক ভেবে ভুল করেছিল। এখন পরিস্থিতি কী? আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের বোদ্ধারা কি ক্ষমতার কেন্দ্রে আছেন? নাকি এক-এগারোর সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়েছেন। নিজেদের পরীক্ষিত এবং বিশ্বস্ত আমলাদের বাদ দিয়ে যাদের সামনে আনা হচ্ছে তারা কি কঠিন সময়ে বিশ্বস্ত থাকবেন? নাকি সময় হলে মুখোশটা খুলে ফেলে আসল রূপ দেখাবেন? প্রশাসনে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যারা নানাভাবে পুরস্কৃত হচ্ছেন, আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগ হয়েছেন, তারা কি বৈরী পরিবেশে পাশে থাকবেন? ’৭৫- মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন এইচ টি ইমাম। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পর তিনি খুনি মোশতাকের অবৈধ মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন। এইচ টি ইমাম বিশ্বাসঘাতক নাকি মেরুদণ্ডহীন তা বিচার করবে ইতিহাস। কঠিন সময়ে নীতির প্রশ্নে অটল থাকতে পারেননি আরেক আমলা . ফরাসউদ্দিন আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর (রাষ্ট্রপতি) একান্ত সচিব ছিলেন। ১৪ আগস্ট গণভবনে জাতির পিতার শেষ অনুষ্ঠান ছিল . ফরাসউদ্দিনের বিদায় অনুষ্ঠান। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতির পিতা। অনুষ্ঠান শেষ করে তোফায়েল আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরে ফিরে যান। পরদিন তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল।৭৫-এর ১৫ আগস্ট ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এরপর ফরাসউদ্দিন কী করেছিলেন? তিনি খুনি মোশতাকের কাছ থেকে অনাপত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। আমলারা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মতো অস্ত্র তুলে নেবেন না। প্রতিরোধ যুদ্ধ করতে জীবন-যৌবন সব কিছু বিসর্জন দেবেন না। ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাবে।৭৫-এর পর কজন আমলা চাকরি ছেড়েছেন? কজন আমলা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে খুনি মোশতাক সরকারের অধীনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন? আদর্শবান রাজনীতিবিদরাই প্রতিরোধযুদ্ধ করেন। জীবনের সব আনন্দ বিসর্জন দেন। আদর্শের বেদিতে যৌবন বলিদান করেন। এরকম কজন নেতা আছেন এখন আওয়ামী লীগে? আওয়ামী লীগ সরকার তৃতীয় মেয়াদে অনেকটাই আমলানির্ভর। আমলানির্ভরতা কি ষড়যন্ত্রের সুড়ঙ্গের পথ তৈরি করছে না?

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নিরপেক্ষ মানুষের সন্ধানে মেতেছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল। এম সাঈদকে করা হয়েছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ২০০১-এর নির্বাচনেবিশ্বস্ত বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রে পরাজিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। এখন আবার আওয়ামী লীগের মধ্যে নিরপেক্ষ ব্যক্তি খোঁজার ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগে গায়ে ধুলোবালি লাগা মানুষেরা অনাহুত। নিরপেক্ষরা বিচক্ষণ, মেধাবী। তাদেরই যোগ্য মনে করা হচ্ছে। স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট নেতা। কিন্তু স্মার্ট মানুষ খুঁজতে গিয়ে তার আদর্শ পরীক্ষা হচ্ছে কি? তার ঠিকুজি পরখ না করলে ভবিষ্যতে আবার ধাক্কা খেতে হবে আওয়ামী লীগকে। চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তিনজন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন অরাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। আর জিল্লুর রহমান এবং বর্তমান আবদুল হামিদ হলেন তৃণমূল থেকে বেড়ে ওঠা রাজনীতিবিদ। দুজন প্রমাণ করেছেন রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি বিশ্বাস এবং আনুগত্যই বড় সততা। সামনে আওয়ামী লীগকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি কি একজন রাজনীতিবিদ হবেন নাকি সাবেক আমলা? ষড়যন্ত্রের জয়-পরাজয় সিদ্ধান্তের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি করে। কমিটিতে চমক ছিল। আবদুল জলিল সাধারণ সম্পাদক হন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রয়াত মুকুল বোস। সাংগঠনিক সম্পাদক হন মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো সম্ভাবনাময় নেতারা। কিন্তু এক-এগারোর সময় তুখোড়, সম্ভাবনাময়রা কী করেছেন সবাই জানেন। রাজনীতিবিদরা যদি নেতৃত্বের প্রতি অকুণ্ঠ অনুগত না থাকেন, আদর্শে অবিচল না হন তাহলে কী হয় এক-এগারো তা শিখিয়েছে। মেধাবী হলেই আদর্শবান নেতা হওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের এবার কমিটিতে যেটুকু চমক তা ওইমেধাবীদের কয়েকজনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিয়ে আসা। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া মেধাবীরা সংকটে কী করবেন তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম। এদের কেউ কেউ পুরস্কৃত হয়েই তাদের জাত চিনিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জাতীয় সংসদে বক্তৃতা দিয়ে, দুটি পত্রিকা পড়েন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এর কারণও তিনি একাধিকবার ব্যাখ্যা করেছেন। একজন দেখলাম কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পেয়েই বিরাজনীতিকরণের মুখপাত্র এক ইংরেজি দৈনিকে কলাম লিখে ফেলেছেন। কী প্রতিভা। এরাই তো ভবিষ্যতে ষড়যন্ত্রের রাস্তা পরিষ্কার করবে। ঘর ঠিক থাকলে বাইরের ষড়যন্ত্র আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে পারে না। ঘরে শত্রুদের বিশ্বাসঘাতকতা, লোভ এবং আপসকামিতা ছাড়া আওয়ামী লীগ কখনো হারেনি। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হলো আওয়ামী লীগই। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগই একমাত্র রাজনৈতিক দল, যারা আন্দোলনে পরাস্ত হয়নি। আওয়ামী লীগ যতবার হেরেছে ততবারই ভিতর থেকে বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রের চারপাশ আগে দখল করেছে আদর্শহীন, চাটুকার, সুবিধাবাদী, ছদ্মবেশী বহিরাগতরা।৭৫, ’৯১, ২০০১- আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের প্রধান কারণ ঘরের ইঁদুরের বাঁশ কাটা। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ সবসময়ই অপরাজেয়। কারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দলটিকে জনগণের সংগঠনে পরিণত করেছিলেন। দেশের মাটি মানুষ, জল-কাদায় বেড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগকে হারানোর একমাত্র সূত্র হলো ঘরের ভিতরবিভীষণতৈরি করা। আর শঙ্কা তখনই বাড়ে যখন বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের বিনিময়ে সংগঠনে সুবিধাবাদী চাটুকারদের ভিড় বাড়ে। অবশ্য এক-এগারো আওয়ামী লীগকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নয় বরং শেখ হাসিনা এক-এগারোর পর নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন। দলের পুরো নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। সবকিছু তিনি একাই সামলাচ্ছেন। সরকার এবং দল চালাচ্ছেন একা। তাঁর কৌশল সঠিক না ভুল তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এর ফলে ষড়যন্ত্রকারীরা একটা বৃত্তের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকছে। শেখ হাসিনা যাকে যতটুকু দরকার তাকে ততটুকু ব্যবহার করছেন। সবাই সবটুকু জানেও না। কারণেই আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। শেখ হাসিনা এখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছেই এক দুর্বোধ্য বইয়ের পাতা। ২০১৪- এর নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনার কৌশল ছিল আওয়ামী লীগের অজানা। জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের প্রায় সবাই নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা ভাবছিলেন। ২০১৮-এর নির্বাচন এভাবে হবে আওয়ামী লীগের কেউ ভাবতেও পারেনি। সাম্প্রতিক সময় শেখ হাসিনাকে অনেক দৃঢ়, সাহসী এবং প্রত্যয় দীপ্ত মনে হচ্ছে। জানুয়ারি, ১০ জানুয়ারি এবং ১১ জানুয়ারি তাঁর বক্তৃতাগুলো ভালোভাবে শুনলে বোঝা যায় তিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। আগামী নির্বাচনের রোডম্যাপ তিনি তৈরি করে ফেলেছেন। আন্দোলনের জল কোন সাগরে পড়বে সেটাও ঠিক করা। তাই ঘর থেকে বিশ্বাসঘাতকরা কিছু করবে এমনটা খুব সহজসাধ্য ব্যাপার না। কিন্তু ১৪ বছরে একটা ব্যাপার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে পরিষ্কার। শেখ হাসিনাই একমাত্র প্রতিপক্ষ। তিনিই পথের কাঁটা। ইদানীং বিএনপি এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত গুজব সেল সব কামান তাক করেছে তাঁর দিকে। টার্গেট একটাই- শেখ হাসিনা। সামনের লড়াইটা তাই শেখ হাসিনার একার।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নতুন রাষ্ট্রপতি: তালিকা আরও সংক্ষিপ্ত হচ্ছে

প্রকাশ: ০৭:০২ পিএম, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

আগামী মাসেই একজন নতুন রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত করতে হবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী এপ্রিলে। সে হিসেবে নব্বই দিন অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন চূড়ান্ত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেনি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। এই উপলক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন যথাযথ সময়ে তফসিল ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু তফসিল ঘোষণা করার আগেই আওয়ামী লীগের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে নানারকম আলাপ-আলোচনা, গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতির আলোচনার দৌড়ে যারা যারা আছেন তাদের তালিকা আস্তে আস্তে সংক্ষিপ্ত হচ্ছে এবং তালিকা সংকুচিত হচ্ছে। অন্তত দুইজন ব্যক্তি যারা যারা রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় ছিলেন, তারা ইতোমধ্যে ঝড়ে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য নন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত করবে। গত বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি একথা বলেছেন। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেল, ওবায়দুল কাদের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন না। 

অবশ্য টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরপরই এটা অনেকের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন না। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছিল, যেহেতু ড. হাছান মাহমুদকে এক নম্বর যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে সেজন্য ওবায়দুল কাদেরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ওবায়দুল কাদের রাষ্ট্রপতি হলেও ড. হাছান মাহমুদ ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু এমনটি হচ্ছে না সেটি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। 

রাষ্ট্রপতি হিসেবে আরেকজন রাজনীতিবিদও আলোচনায় ছিলেনভ তিনি হলেন বেগম মতিয়া চৌধুরী। কিন্তু বেগম মতিয়া চৌধুরী সংসদের উপনেতা হওয়ার পর এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, শেষ পর্যন্ত তিনিও রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন না। কারণ স্বাভাবিক নিয়মে বেগম মতিয়া চৌধুরীকে যদি রাষ্ট্রপতি করা হতো তাহলে তাকে সংসদ উপনেতার পদে আসীন করা হতো না। এটি মন্ত্রী পদমর্যাদার একটি দায়িত্ব এবং সংসদীয় দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি। এখন রাষ্ট্রপতি দৌড়ে যারা এগিয়ে আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। কিন্তু নানা কারণেই মনে করা হচ্ছে যে, শিরীন শারমিন চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি করা হবে না। কারণ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মাথায় রেখে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সংগঠন এবং প্রশাসন গোছাছেন। কারণ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত কঠিন হবে এবং সেই নির্বাচনে জয়লাভ করলে জাতীয় সংসদও ভারসাম্যপূর্ণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

প্রধানমন্ত্রী গত ৬ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ এ সম্পর্কিত ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। এরকম পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে বিকল্প কাউকে খুঁজে না পেলে শিরীন শারমিনের রাষ্ট্রপতি হওয়াটা এখনো ঝুকিপূর্ণ বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক। কারণ এখন স্পিকার হিসেবে তিনি যে গ্রহণযোগ্যতা এবং সক্ষমতা অর্জন করেছেন তার বিকল্প না পাওয়া গেলে স্পিকার পদে পরিবর্তন করা হবে না বলেই আওয়ামী লীগের অনেক নীতিনির্ধারকের ধারণা। 

রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন এবং অনেকের বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ড. মশিউর রহমান। মশিউর রহমান যে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি তার কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তিনি সকল কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তিনি তার কর্মকাণ্ড কমিয়ে এনেছেন। নানা কারণে তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাইরে কখনো যাননি। পচাঁত্তরের আগে তিনি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছিলেন এবং পচাঁত্তর পরবর্তী পর্যায়ে নানা টানাপড়েন এবং চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি চাকরিতে টিকে ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে তিনি উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত যদি ড. মশিউর রহমান রাষ্ট্রপতি না হন তাহলে সেটি হবে এক ধরনের বিস্ময়কর ঘটনা এবং একটি বড় চমক। 

রাষ্ট্রপতি দৌড়ে আরও যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। কিন্তু আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত দলের বাইরে কাউকে রাষ্ট্রপতি করবেন কিনা সেটি এখন একটি বড় প্রশ্ন। রাষ্ট্রপতির দৌড়ে ড. গওহর রিজভী।  ড. গওহর রিজভী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। কিন্তু গওহর রিজভী সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। লেখালেখি এবং গবেষণার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। এ কারণে রাষ্ট্রপতি হয়ে তিনি সময় দিবেন কিনা সেটি একটি দেখার বিষয়। তাছাড়া নতুন রাষ্ট্রপতিকে আগামী নির্বাচনের এক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। সেই সময়ে  ড. গওহর রিজভীর মতো একজন কূটনৈতিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব কতটুকু দেশে থাকবেন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন সেটা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নামও কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে যে, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে শেষপর্যন্ত কে রাষ্ট্রপতি হবে সেটি চূড়ান্ত করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চলতি মাসের মধ্যেই এটি চূড়ান্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

রাজনৈতিক সমঝোতা: ভারতকে পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ০৭ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তা একের পর এক বাংলাদেশ সফর করছেন। আজ ঢাকায় এসেছেন জো বাইডেনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এবং হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ডিরেক্টর রিয়ার অ্যাডমিরাল আইলিন লাউবাচার। তিনি চার দিনের সফরে তিনি ঢাকায় আসছেন। এরপর পরই ঢাকায় আসবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিযা বিষযক অ্যাসিসটেন্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু। এ সফরগুলো প্রত্যেকটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা এবং চিন্তাগুলো নিয়ে ধারণা দেওয়ার জন্যে এইসব সফর হচ্ছে বলে জানা গেছে। যদিও প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী নির্বাচন সম্পর্কে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আগামী নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক এবং জনগণের মতামত যেন তাতে প্রতিফলিত হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আর এ লক্ষ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মনোভাব যেন রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিপালন করে, সেটির জন্যই ঘন ঘন মার্কিন কূটনীতিকদের বাংলাদেশ সফর বলেও বিভিন্ন মহল মনে করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে, কার অধীনে হবে - ইত্যাদি বিষয়গুলো একান্তই বাংলাদেশের ব্যক্তিগত বিষয়। এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহবানকে বাংলাদেশ খুব একটা আমলে নিচ্ছে বলেও মনে হয় না। কারণ, বাংলাদেশ এখন আগের অবস্থানে নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা এখন অনেক কমে গেছে। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির জন্য বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিরাট বাজার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে চাপে রেখে বাজার দখলের কৌশল নিয়েছেন বলেও কোনো কোনো মহল মনে করে। এবং এ কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আহবানগুলোকে একেবারে নিরপেক্ষ এবং আন্তরিক মনে করে না বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো কোনা মহল। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সর্বজনবিদিত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালো মতোই জানে যে, বাংলাদেশকে খুব বড় ধরনের চাপ দেওয়ার অবস্থানে তারা নেই। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র যেটি চায়, সেই বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সহযোগিতা চাইছে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে যে, ভারতকে পাশে পেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ মিশন বাস্তবায়ন করা দুরূহ এবং কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ ইস্যু নিয়ে যোগাযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভারত যদি শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং কৌশলকে সমর্থন না করে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেটি করতে চায় সেটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কি চায়? আগামী নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশে তিনটি বিষয় হতে পারে -

১. সরকার আগের মতোই ২০১৪ বা ২০১৮ এর মতোই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে। এবং নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন তত্ত্বাবধান করবে। 

২.শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের আন্দোলনের তীব্র চাপে সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছাকাছি একটি নির্বাচনী ব্যবস্থায় রাজি হবে। 

৩. শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতা, গোলোযোগে একটি অসাংবিধানিক শক্তি ১/১১ এর মতো আবার ক্ষমতায় আসবে। 

এই তিনটি মতামতের মধ্যে কোন মতামতটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতামত, সেটিই দেখার বিষয়। তবে বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে যে, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির সঙ্গে ভারত তো নয়ই, অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশই একমত নয়। তাছাড়া, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিষয়টি রাশিয়া এবং চীনও ভালোভাবে নিচ্ছে না। কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে যা খুশি করবে - এমন সুযোগ আপাতত নেই। আর অন্যদিকে, ভারতও তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিদমন ইত্যাদি নানা বাস্তবতায় এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারের বিরোধীতা করবে না। সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ মিশন কতটুকু সফল হবে সেটিই দেখার বিষয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র   পিটার ডি হাস   ভারত   রিয়ার অ্যাডমিরাল আইলিন লাউবাচার   ডোনাল্ড লু   বাংলাদেশ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ছাত্রলীগ পরিচয় কি অযোগ্যতা

প্রকাশ: ০৯:৫৯ এএম, ০৭ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

কবির বিন আনোয়ার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার খবরে আমি উল্লসিত হয়েছিলাম।৭৫-এর পর এই প্রথম সরাসরি ছাত্রলীগ রাজনীতি করা কোনো কর্মকর্তা সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব পেলেন। ১১ ডিসেম্বর অপু ভাইয়ের (কবির বিন আনোয়ারের ডাকনাম) নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়। সময় আমি বিদেশ সফরের প্রস্তুতি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। ভাবলাম দেশে ফিরে অপু ভাইয়ের অফিসে যাব। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের রুমে তার সঙ্গে আড্ডা দেব। কিন্তু দেশে ফিরতে ফিরতেই দেখলাম নতুন প্রজ্ঞাপন। কবির বিন আনোয়ারকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। গত জানুয়ারি তার বয়স ৫৯ বছর পূর্ণ হয়। বিগত মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুই দফা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেও কবির বিন আনোয়ারের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। মাত্র ১৯ দিনের জন্য তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে দায়িত্ব পালনের নতুন রেকর্ড। এর আগে সবচেয়ে কম সময় ক্যাবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড ছিল চৈনিক বাম . কামাল সিদ্দিকীর। তিনি এক মাস চার দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কবির বিন আনোয়ারের আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি তার চাকরি জীবনের শেষপ্রান্তে এই দায়িত্ব পান। এরপর দুবার তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পুরস্কার পেয়েছিলেন। কবির বিন আনোয়ারকে যখন এই দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন সবাই ধরেই নিয়েছিলেন, তিনিও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাবেন। অন্তত আগামী নির্বাচনে তিনিই প্রশাসনের প্রধান কর্মকর্তা থাকবেন। কিন্তু আচমকাই তিনিই বিদায় নিলেন। কবির বিন আনোয়ার আওয়ামী পরিবারের সদস্য। সিরাজগঞ্জের রাজনীতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সেখান থেকে ভবিষ্যতে নির্বাচন করবেন, এমন ইচ্ছার কথা তিনি প্রায়ই বলেন। কিন্তু এখন গণপ্রতিনিধি আদেশের যে বিধান, তাতে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন না। এক-এগারোর সময় ওই বিধান সংশোধন করা হয়। নতুন বিধান অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার দুই বছর অতিবাহিত না হলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। অনেক সরকারি কর্মকর্তাই এখন এই বিধানকে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছেন। অপু ভাই তার প্রিয় দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন কি না ভিন্ন প্রশ্ন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারবেন কি না সেটি আইনগত বিষয়। অবশ্য তাকে অবসর দেওয়ার পর পরই নতুন দায়িত্ব দেওয়ার গুঞ্জন শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার কবির বিন আনোয়ার আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে ফুলেল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমামের কক্ষে তার চেয়ারে তিনি বসেছিলেন। আওয়ামী লীগের মধ্যে গুঞ্জন আছে, এইচ টি ইমামের শূন্যপদের দায়িত্ব কবির বিন আনোয়ারকে দেওয়া হতে পারে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হতে পারেন এমন কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কবির বিন আনোয়ার কি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে পারতেন না? তাকে কিসান্ত্বনা পুরস্কারহিসেবেই ক্যাবিনেট সচিব করা হয়েছিল? এমন নয় যে, সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় না। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন ডাল-ভাতের মতো। আবার অনেক সরকারি কর্মকর্তা অবসরের পর নানা কমিশনে নানা পদে চাকরি জুটিয়ে ফেলেন। অনেকটা পুনর্জন্মের মতো। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিবের কথাই ধরা যাক। মুখ্য সচিবের দায়িত্ব যখন শেষ তখন তিনি দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। দুই বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই তিনি পেলেন বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব। সেটিও তিন বছরের জন্য। মুখ্য সচিবের পদমর্যাদায়। এমন সৌভাগ্যবান সরকারি কর্মকর্তা কজন আছেন? নিশ্চয়ই তিনি অসাধারণ মেধাবী। তিনি অবসরে গেলে এই রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। শুধু প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব নন, বহু সরকারি কর্মকর্তা যাদের অতীত জীবন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, তারাও প্রশাসনে নিজেদের অপরিহার্য প্রমাণ করে চুক্তিতে ঝুলে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং পাচ্ছেন। তাহলে কবির বিন আনোয়ারের অযোগ্যতা কোথায়? তিনি ছাত্রলীগ করতেন, এটাই কি তার অযোগ্যতা? শুধু কবির বিন আনোয়ার নন, শিক্ষাজীবনে ছাত্রলীগ করেছেন, এমন সরকারি কর্মকর্তাকে কেন যেন অযোগ্য মনে করা হয়। ধরেই নেওয়া হয়, তারা কম মেধাবী। আবদুল মালেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাকে বদলি করা হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার বিভাগে। কিন্তু সেখানে টিকতে পারেননি তিনি। পরে তথ্য মন্ত্রণালয়ে তার চাকরিজীবন শেষ করেন। নুরুল ইসলাম তো ধর্ম সচিব থেকেই চাকরি শেষ করলেন। মেসবাহ উদ্দিন যুব ক্রীড়া সচিব হয়েছিলেন, এটাই যেন বিরাট অপরাধ। তার সচিব হওয়ার পর অনেক আমলা নাক সিটকে বলেছিলেন, ‘সচিব পদের আর মর্যাদা থাকল না।প্রশাসনে ছাত্রলীগ থেকে উঠে আসা কর্মকর্তারা কোণঠাসা কেন? তাও আবার আওয়ামী লীগ যখন টানা ১৪ বছর ক্ষমতায়। শুধু ছাত্রলীগ থেকে নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন, দুঃসময়ে কষ্ট করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জন্য নিজের চাকরি ঝুঁকিতে ফেলেছেন-এমন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের সুসময়ে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে যান। তালিকা এত দীর্ঘ যে, এই লেখার জন্য সম্পাদক আমাকে যে জায়গা বরাদ্দ দিয়েছেন তাতে সব নাম লেখা যাবে না। আমি দু-একটি উদাহরণ দিতে চাই। ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। আমার দেখা সিভিল প্রশাসনে অন্যতম সৎ, মেধাবী, পরিচ্ছন্ন এবং যোগ্য কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগের সব কঠিন সময়ে তিনি পাশে থেকেছেন। আবার সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি কোণঠাসা হয়েই বিদায় নিলেন। তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হয়নি। অবসরের পর তিনিআকর্ষণীয়কোনো চেয়ারও পাননি। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো কঠিন সময়ে আওয়ামী লীগের পাশে থাকা কি অযোগ্যতা? সরকারি চাকরিতেই শুধু নয়, সর্বত্র ছাত্রলীগের প্রতি এক ধরনের উপেক্ষা এবং নাক সিটকানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কবির বিন আনোয়ার ভাগ্যিস বিসিএস দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা হয়েছিলেন। সে কারণেই হয়তো তিনিআমলা কোটায়আওয়ামী লীগের পদ-পদবি পেতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি রাজনীতিতে থাকতেন তাহলে তার কপালে কী জুটত, তা ভেবে দেখার বিষয় বটে। জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠনছাত্রলীগ এই সংগঠনটি আওয়ামী লীগেরলাইফলাইনহিসেবে বিবেচিত হয়। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জন্য সরকারি চাকরি নেননি। ব্যবসা-বাণিজ্য করে নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন করেননি। রাজনীতিতে কি তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে? ১৯৮১-৮৩ সালে ছাত্রলীগ কমিটির সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন অনেক কসরত করে এবার প্রেসিডিয়ামে জায়গা পেয়েছেন। পরের কমিটির (১৯৮৩-৮৫) আবদুল মান্নান অনাদরে-অবহেলায় চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। ওই কমিটির জাহাঙ্গীর কবির নানক বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। স্রোতের বিপরীতে লড়াই করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে কোনোমতে টিকে আছেন। আবদুর রহমান প্রেসিডিয়াম সদস্য বটে; কিন্তু গত নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত। ১৯৮৮-৯২ সালের ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক তাও এমপি। এর পরের অবস্থা কী? ১৯৯২ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি হন মঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী। শিক্ষিত, মেধাবী। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার পর বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। শিক্ষিত ছেলেমেয়েরাও তাহলে ছাত্রলীগ করে। তিনি এখন কোথায়? রাজনীতিতে মূলধারায় তিনি কি অযোগ্য? ’৯৪-৯৮ সালে ছাত্রলীগ সভাপতি হন এনামুল হক শামীম। সেই কঠিন সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন শামীম। চমৎকার সংগঠক। কর্মিবান্ধব। উপমন্ত্রী করে যেন তাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটাই যেন তার জন্য যথেষ্ট। কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেই, এমপিও নন ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্না। বাহাদুর ব্যাপারী, অজয় কর খোকন কোথায়? আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাওয়ার কি কোনো যোগ্যতাই এদের নেই। এভাবে আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখার প্রত্যাশায় যারা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, তারা এখন হতাশায় ডুকরে কাঁদেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রাজনীতি থেকে সযত্নে দূরে থেকে যারা নিজেদের ক্যারিয়ার গড়েছেন। মাখন-রুটি খেয়ে বড় হয়েছেন। ছাত্ররাজনীতির চেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকছেন। তারা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন আওয়ামী লীগে এবং রাজনীতিতে। রাজনীতিতেও এখনছাত্রলীগযেন এক অপরাধ। অযোগ্যতা।

৭৫-পরবর্তী ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে এক সর্বব্যাপী প্রচারণা শুরু হয়। ছাত্ররাজনীতি দূষিত। ছাত্ররাজনীতি নষ্ট। পচা-দুর্গন্ধময় এমন একটি নীরব বার্তা শিক্ষার্থীদের কানে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। এটি এখনো চলমান। আগে তাও ছাত্র ইউনিয়ন কিংবা বাম ছাত্র সংগঠন যারা করে, তাদের মেধাবী বলা হতো। এখন সেই রেওয়াজও উঠে গেছে। তুমি ভালো ছাত্র। বেশ, ছাত্ররাজনীতি থেকে নক্ষত্র দূরত্বে থাক। ছাত্ররাজনীতি শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর। এমন একটি বার্তা সারাক্ষণ শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতিতে যে পঙ্কিলতা, সুবিধাবাদ আর আখের গোছানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়েনি, তা নয়। ছাত্ররাজনীতিকে কুৎসিত করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর। জিয়া মেধাবী শিক্ষার্থীদেরহিজবুল বাহারপ্রমোদতরীতে নিয়ে গিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন অস্ত্র। বিএনপিকে এবং তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলকে শিক্ষাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে অস্ত্র, টাকা আর পেশিশক্তির আমদানি ঘটিয়েছিলেন ছাত্ররাজনীতিতে। জিয়া যে কৌশলে শিক্ষাঙ্গন দখলে রাখতে চেয়েছিলেন, ঠিক একই কৌশলের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন আরেক সামরিক একনায়ক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ছাত্রদল আর নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ একই প্রক্রিয়ায় গঠিত। একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই সৃষ্টি।৭৫-পরবর্তী ছাত্ররাজনীতিতে যে দূষিত রক্তপ্রবাহ শুরু হয়, তা ছাত্রলীগসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের মধ্যেও সঞ্চালিত হয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, ছাত্ররাজনীতিকে ধ্বংস করার এক পরিকল্পিত নীলনকশার বাস্তবায়ন চলছে এখনো। এখন বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি টিকে আছে কেবল জাতির পিতার আদর্শে গড়া ছাত্রলীগের জন্যই। নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি সমালোচনার পর ছাত্রলীগই এখনো ছাত্ররাজনীতির বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে। তাই ছাত্রলীগকে যদি ধ্বংস করা যায় কিংবা এরকম একটি পরিস্থিতি যদি তৈরি করা যায়, ক্ষমতাসীন দলইছাত্রলীগকে উটকো ঝামেলা বা আপদ মনে করবে। ছাত্রলীগকে বিলুপ্ত করবে। তাহলে ষড়যন্ত্রের ষোলকলা পূর্ণ হয়। তাহলেইছাত্ররাজনীতি মুক্তবাংলাদেশ বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে। আর এটি করা গেলেই বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য দ্রুত বাস্তবায়ন করা যাবে। ইতোমধ্যে ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই পথটা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারলেই সুশীল রাজত্ব কায়েমের পথ পরিষ্কার হবে। এবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও সুশীলদের উজ্জ্বল উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। শেখ হাসিনা-বিহীন আওয়ামী লীগ যে সুশীলদের দখলে চলে যাবে তার এক বার্তাও পাওয়া গেছে। ছাত্ররাজনীতিকে পুরোপুরি বস্তাবন্দি করতে না পারলে বিরাজনীতিকরণ ফর্মুলা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আরছাত্রলীগকে নষ্ট না করতে পারলে ছাত্ররাজনীতিকে পুরোপুরি বাতিল করা অসম্ভব। তাই এখন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সর্বগ্রাসী প্রচারণা তৎপরতা চলছে। ছাত্রলীগ মানেই চাঁদাবাজ। ছাত্রলীগ মানেই ধর্ষক। ছাত্রলীগ মানেই অশিক্ষিত। এমন একটি প্রচারণা৭৫-পরবর্তী সময় থেকেই চলে আসছিল। এখন এই প্রচারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রলীগে নাম লিখিয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। এখন ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। গণমাধ্যমে তাকে ছাত্রলীগ নেতা বানিয়ে লেখা হচ্ছেছাত্রলীগ নেতার ধর্ষণ ছাত্রলীগে ঢুকে কেউ টেন্ডারবাজি করছে। তাকে ছাত্রলীগের নেতা বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের ভালো কাজগুলোকে আড়াল করা হচ্ছে। তার মানে এই নয় যে, ছাত্রলীগ দূষিত হয়নি। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগে ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে। পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগে জামায়াত-বিএনপি ঢুকে নানা অপকর্ম করছে।আর এই অপকর্মগুলোকেই এখন সাইনবোর্ড হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে। ছাত্রলীগ পরিচয়কে অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে সর্বত্র। ছাত্রলীগের কোনো ছেলেমেয়ে যদি মেধার জোরে সরকারি চাকরি পায়, তাহলে বলা হয় তদবিরে চাকরি পেয়েছে। প্রশাসন ছাত্রলীগে ভরে গেছে। ছাত্রলীগ সরকারি চাকরি কেন করবে? ছাত্রলীগের কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পান, তাহলে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে। ছাত্রলীগও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়-এমন আর্তনাদ শোনা যায়। ছাত্রলীগের রাজনীতি শেষ করে কেউ যদি ব্যবসা করে, তাহলে তো রীতিমতো ভূমিকম্প হয়। টেন্ডার বাণিজ্য করে ছাত্রলীগ লুটপাট করছে। আওয়ামী লীগের মূল রাজনীতিতে ছাত্রলীগ ঠাঁই পেলেও সমালোচনা হয়। রাজনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার এমন চিন্তিত মন্তব্য করেন সুশীলরা। তাহলে ছাত্রলীগ করা একটি ছেলে বা মেয়ে কী করবে? কোথায় যাবে? এটি অবশ্য দীর্ঘদিনের প্রবণতা। ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী যত বড় চক্ষু বিশেষজ্ঞ হন না কেন, তিনি পণ্ডিত নন। কেন? তিনি তো ছাত্রলীগ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তৎকালীন সভাপতি ছিলেন। জন্য সারা জীবনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি স্বাধীনতা পদক বা একুশে পদক পাওয়ার যোগ্য নন। জাহাঙ্গীর কবির নানক যত ত্যাগ স্বীকার করুন না কেন, প্রতিমন্ত্রী হওয়াটাই তার বিরাট অর্জন। লেখাপড়া নেই। আর কত? . মিজান যত ভালো শিক্ষক হোন না কেন, তাকে শিক্ষকের মতো লাগে না। কেন? তিনি ছাত্রলীগ করেছেন। সুভাষ সিংহ রায় কোনো দিনই বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন না। কারণ ছাত্রলীগ। ফার্মাসিস্টরা তাকে বলে সাংবাদিক। আর সাংবাদিকরা বলে বহিরাগত। সদ্য ছাত্রলীগ সভাপতি হয়েছেন আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র সাদ্দাম হোসেন। এই তরুণ যে উদ্দীপ্ত বক্তৃতা দেয়, তা যদি কোনো বাম-ঘরানার ছাত্রনেতা দিত, তাহলে দেশে হইচই পড়ে যেত। বলা হতো, মাহমুদুর রহমান মান্নার পর আরেকজন তুখোড় ছাত্রনেতার আবির্ভাব ঘটেছে ছাত্ররাজনীতিতে। সাদ্দাম ছাত্রলীগের নেতা। তার ওপর বাড়ি উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জেলায়। কাজেই তার বক্তব্য জ্ঞানশূন্য। গভীরতাহীন। ছাত্রলীগ করা শাবান মাহমুদ যখন দিল্লিতে প্রেস মিনিস্টার হিসেবে সফল হন, তখন ভ্রু কুঁচকে কেউ বলে, ‘ বিদেশে মিশনে চাকরি পায় কীভাবে। কি ইংরেজি জানে।ছাত্রলীগ করাটা কি এখন তাহলে অপরাধ হয়ে গেল? আওয়ামী লীগ নেতারাও ইদানীং ছাত্রলীগকে ইচ্ছামতো গালমন্দ করে মজা পান। আড়ালে-আবডালে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত মন্ত্রী হতাশার সুরে বলেন, ‘ছাত্রলীগ আমাদের সব ধ্বংস করে দিল তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, কিছু ছাত্রলীগ দুর্নীতি করে, ঠিকাদারিতে মাস্তানি করে। তাদের সব অন্যায় এক পাল্লায় দিলেও একজন মন্ত্রীর দুর্নীতির তুলনায় তুচ্ছ। একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া কেউই ছাত্রলীগের পক্ষে না। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউই ছাত্রলীগ থাকুক চায় না।ছাত্রলীগকে আঁস্তাকুড়ে পাঠাতে যেন এক জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই জাতীয় ঐকমত্য আসলে বিরাজনীতিকরণের এক প্রকল্প। ছাত্রলীগ না থাকলে রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের রক্তপ্রবাহ বন্ধ হবে। তাহলেই রাজনীতিমুক্ত বাংলাদেশ তৈরি করা সম্ভব হবে। যে কারণেই ছাত্রলীগ এখন সবার টার্গেট। কারণেই ছাত্রলীগ পরিচয় এখন অযোগ্যতা।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন