এডিটর’স মাইন্ড

মেসি একা পারেননি, শেখ হাসিনা কি পারবেন?

প্রকাশ: ০৯:৫৯ এএম, ২৬ নভেম্বর, ২০২২


Thumbnail

দিলীপ বড়ুয়া একজন ভাগ্যবান রাজনীতিবিদ। বাম রাজনীতি করলেও ক্ষমতার চারপাশেই তার আনাগোনা। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার সফরসঙ্গী হয়ে চীন সফর করেছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তার সাম্যবাদী দলের তিনিই সর্বেসর্বা। কর্মী নেই, আসন নেই তবু তিনি মন্ত্রী হওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগ একলা চলো নীতিতে।  এ কারণে বামপন্থি ওই নেতা অপাঙ্ক্তেয়। অনাদরে-অবহেলায় পরিত্যক্ত সরঞ্জামের মতো পড়ে আছেন। এরকম কষ্টে থাকলে তো যে কারোরই মন খারাপ হওয়ার কথা। দিলীপ বড়ুয়ারও হয়েছে। এ কারণেই ক্ষোভ ঝেড়ে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিবিসিতে। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় আন্তর্জাতিক সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে সুষ্ঠু নির্বাচনে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্লোগানের মধ্য দিয়ে আদৌ নির্বাচন না-ও হতে পারে।’ বড়ুয়া একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে তার অভিমানের কথা যেমন বলেছেন, ঠিক তেমনি নির্বাচন নিয়ে তিনি যে শঙ্কার কথা বলেছেন, সেটি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামীর শঙ্কার বিষয়টা তিনি অকপটে এবং খোলামেলাভাবে বলেছেন।

বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হওয়ার কথা। এক বছর দুই মাস আগে থেকেই নির্বাচন নিয়ে রাজনীতির মাঠ আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা কথাবার্তা বলছে। নির্বাচন নিয়ে সুশীল সমাজের ঘুম নেই। নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে, গাইবান্ধার মতো নির্বাচন রুখতে তারা বদ্ধপরিকর। সবার উদ্যোগ, আয়োজন, উৎকণ্ঠা এবং কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নয়। আগামী নির্বাচন বানচাল করাই যেন একটি সম্মিলিত শক্তির প্রধান লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর প্রধান এবং অব্যর্থ অস্ত্র যেন নির্বাচন হতে না দেওয়া। এমনকি আগামী সংসদ নির্বাচন যেন না হয়, সে জন্য ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ তৎপর। প্রশাসনের মধ্যেও ঘাঁপটি মেরে আছে নির্বাচন বানচাল করার অপশক্তি। তর্কের খাতিরে আমরা যদি ধরে নিই শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলো না, তাহলে কী হবে? 

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর অন্তর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এই নির্বাচন না হলে দেশে একটি সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতায় আসার সুযোগ পাবে। আবার সংবিধান কাটাছেঁড়া হবে। অগণতান্ত্রিক এবং অনির্বাচিত একটি সরকার জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের বুকের ওপর চেপে বসবে। সে রকম একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যই কি সমন্বিত প্রয়াস? আবার কি দেশে একটি এক-এগারো আনার পাঁয়তারা চলছে?

গত তিনটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সেরা নির্বাচন। ২০১৪-এ বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে নির্বাচন বর্জন করে। অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। জাতীয় পার্টি আংশিক রঙিন সিনেমার মতো ওই নির্বাচনে আংশিক অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বিএনপি ওই নির্বাচন প্রতিরোধ করতে পারেনি। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের মতো প্রধান প্রধান দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন হয়েছে মোট চারটি। ১৯৮৬ সালের ৭ মের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টির নেতা সামরিক একনায়ক এরশাদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে দেন। তারপর বানোয়াট ফলাফল বেতার এবং টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। ওই নির্বাচনকে বলা হয় মিডিয়া ক্যু-এর নির্বাচন। ’৮৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের আয়ু ছিল মাত্র দেড় বছর। ১০ জুলাই সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি তীব্র বিরোধী আন্দোলনের মুখে সংসদ বিলুপ্ত করেন। ১৯৮৮-এর ৩ মার্চের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি কোনো দলই অংশ নেয়নি। আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে কিছু রাজনৈতিক ভাঁড়কে নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল এবং জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনিদের ফ্যাসিস্ট দল ফ্রীডম পার্টি ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে কোনো ভোট হয়নি। বানোয়াট ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ২৫ এপ্রিল ১৯৮৮-তে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। ’৯০-এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে এই সংসদ বিলুপ্ত হয়। প্রধান সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। মাগুরা, মিরপুর উপনির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সে সময় বিএনপি বলেছিল, ‘পাগল এবং ছাগল ছাড়া কেউই নিরপেক্ষ নন।’ তীব্র গণআন্দোলন উপেক্ষা করে বেগম জিয়া নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। প্রতিরোধের ডাক দেয়। বিএনপি ছাড়া আত্মস্বীকৃত খুনিদের দল ফ্রীডম পার্টি ওই নির্বাচনে অংশ নেয়। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ’৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি আসলে কোনো ভোট হয়নি। নির্বাচনে বিএনপির ৪৯ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভোট ছাড়াই কমিশন বিএনপি এবং ফ্রীডম পার্টির মধ্যে আসন বণ্টন করে একটি ভৌতিক ফলাফল ঘোষণা করে। এটা করতেই কমিশনের সময় লাগে পাঁচ দিন। গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কোনো রকমে ১৯ মার্চ রাতে সংসদ অধিবেশন বসানো হয়। এই সংসদের আয়ু ছিল মাত্র সাত দিন (চার কর্মদিবস)। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করেই এই সংসদ বিলুপ্ত হয়। প্রধান যে কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া সংসদ তার মেয়াদপূর্তি করতে পারে না- এরকম একটি ধারণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৪-তে বিএনপির ভোট বর্জনের পক্ষে প্রধান প্রেরণা ছিল এই সূত্রই। শুধু বিএনপি কেন, আওয়ামী লীগেরও অধিকাংশ নেতা এবং প্রার্থী মনে করেছিলেন, এই নির্বাচন একটি আপৎকালীন ব্যবস্থা। দ্রুতই আরেকটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে বিনা ভোটে জয়ী হওয়ার হিড়িক পড়ে। নির্বাচনের প্রচারণা এবং টাকা খরচ করা থেকে আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ প্রার্থীই বিরত থাকেন। অল্প কিছু টাকা দিয়ে প্রতিপক্ষকে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। কোথাও কোথাও প্রশাসনকে ব্যবহার করে হুমকি দিয়েও প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দেড় শর বেশি আসনে ভোট হয়নি। যেসব স্থানে ভোট হয় সেখানেও ভোটারদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল না। ওই নির্বাচনের পর এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটে গঠিত সংসদ তার মেয়াদপূর্ণ করে। এটার কারণ ছিল, বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি। এ দেশের জনগণ বিএনপির জ্বালাও- পোড়াও এবং ধ্বংসাত্মক রাজনীতির বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছিল ওই নির্বাচনকে মেনে নিয়ে। অবশ্য এর পেছনে আরেকটি ব্যাপার ছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগের সুশাসন, উন্নয়ন। জনগণের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আসছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছিল। মানুষ পরিবর্তনে সায় দেয়নি। অনিশ্চয়তার সাগরে ঝাঁপ দিতে চায়নি। ২০১৮-এর নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগকে কলঙ্কিত করার ষড়যন্ত্র। ওই নির্বাচন যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুষ্ঠু নির্বাচনও হতো তবু আওয়ামী লীগ জিতত। ২০১৮-এর নির্বাচনে বিএনপি শর্তহীনভাবে অংশ নিয়েছিল। দলটির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। ড. কামাল হোসেনকে নেতা মেনে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল নিশ্চিত পরাজয় জেনেই। কিন্তু কিছু অতি উৎসাহী চাটুকার দলীয় সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করে। ওই নির্বাচনে যারা এটা করেছে, তারা আসলে গণতন্ত্রের শত্রু। ওই নির্বাচন সুন্দর হলে আজ এই সংকট হতো না। নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর এমন অতিকথনের সুযোগও থাকত না। এখন বিএনপি সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচন বর্জনের নামে তারা একটি অসাংবিধানিক টানেলে বাংলাদেশকে নিতে চাইছে। এখন রাজনীতির আসল খেলা হচ্ছে নির্বাচন হওয়া না হওয়ার লড়াই। এখানে মাঠের লড়াই কেবল গ্যালারি শো। আসল খেলা হচ্ছে পর্দার আড়ালে। যেখানে আওয়ামী লীগ সব সময়ই আনাড়ি এবং অপরিপক্ব। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এখন প্রতিদিন ‘খেলা হবে’ সেøাগানের ব্র্যান্ডিং করছেন। শামীম ওসমান উদ্ভাবিত, পশ্চিম বাংলার মমতা ব্যানার্জি কর্তৃক বাজারজাতকৃত এই বহুল চর্চিত সেøাগান বারবার বলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কোন খেলার কথা বলছেন? তিনি কি ভুল নিশানায় গুলি ছুড়ছেন? কারণ এবারের খেলাটা কে নির্বাচনে জিতবে তার প্রতিযোগিতা নয় বরং নির্বাচন করা না করার খেলা। সংবিধান রক্ষার খেলা। এই খেলায় কে জিতবে?

এখন বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে গোটা দেশ। সারা বিশ্ব। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে চলছে মাতামাতি। খেলা যেমন অনিশ্চয়তা, তেমনি রাজনীতিও। মঙ্গলবার একটা মিটিং শেষ করে অফিসে এলাম বিকাল ৪টা নাগাদ। অফিসে ঢুকেই দেখি হইচই। ঘটনা কী? জানলাম আর্জেন্টিনা-সৌদি আরব খেলা। এ জন্য আমার সহকর্মীদের এত উচ্ছ্বাস। জাস্টিন, রিফাতসহ আরও কয়েকজন আর্জেন্টিনার জার্সি পরে খেলা দেখছে। আর্জেন্টিনার সঙ্গে সৌদি আরবের যোজন-যোজন পার্থক্য। আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্য বিস্ময়কর। আর সৌদি আরবের বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলাটাই বড় অর্জন। এই খেলায় আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না। দেখার বিষয় ছিল কত ব্যবধানে আর্জেন্টিনা জিতবে। পেলে, ম্যারাডোনার পর এই বিশ্বে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসি। ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি। বিশ্বকাপের ট্রফিটা ছাড়া ফুটবলের এমন কোনো প্রাপ্তি নেই যা মেসি অর্জন করেননি। অনেক বোদ্ধা ক্রীড়া সমালোচক বলেন, মেসির জন্যই এবার আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ট্রফিটা জেতা উচিত। মেসি যদি একটা বিশ্বকাপ জয় না করতে পারেন, তাহলে সেটা হবে ফুটবলের দুর্ভাগ্য। বিশ্বকাপে আসার আগে টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। তাই তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের মিশনেই কাতারে এসেছে আর্জেন্টিনা। খেলা শুরুর পর মনে হচ্ছিল সৌদি আরবকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করবে বিশ্বের তৃতীয় ফুটবল শক্তির দেশটি। ১০ মিনিটে গোল করেন মেসি। স্পর্শ করলেন অনন্য রেকর্ড। টানা চার বিশ্বকাপে গোল করা গ্রেটদের এলিট ক্লাবে প্রবেশ করেন ফুটবলের জাদুকর। কিন্তু তখন কে জানত বিস্ময়ের অনেক বাকি। দ্বিতীয়ার্ধের ৫ মিনিটের ঝড়ে ল-ভ- হয়ে গেল মেসির আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম আপসেট জন্ম দিয়ে জিতল সৌদি আরব। প্রথম ম্যাচে একমাত্র লিওনেল মেসি ছাড়া আর সব আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কে নিষ্প্রভ, মøান লেগেছে। মেসি নিঃসঙ্গ একাকী। সতীর্থরা মেসিকে মোটেও সহযোগিতা করতে পারছেন না। এই খেলাটা একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে দিল, তা হলো খেলা এক মহাতারকার বিজয়গাথা নয়। একটি সমন্বিত টিমওয়ার্ক। যেখানে জেতার জন্য সবাইকে অবদান রাখতে হয়। খেলার মতো রাজনীতিতেও টিমওয়ার্ক লাগে। নেতার বিশ্বস্ত, পরীক্ষিত, যোগ্য সহযোগী লাগে। লাগে সমঝোতা, বোঝাপড়া এবং সমন্বয়। আর্জেন্টিনা-সৌদি আরব খেলা দেখে আমার মানসপটে বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্রটা ভেসে উঠল। ওই খেলায় যেমন মেসি ছিলেন একা। তাকে তার সতীর্থরা সহযোগিতা করতে পারেননি। ঠিক তেমনি আমার মনে হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতেও শেখ হাসিনা একাকী। তাঁকে সহায়তা করার মতো যোগ্য লোক নেই সরকারে কিংবা দলে। টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পরিচালনা করছে। ১৪ বছর বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই কৃতিত্ব একজনের, শেখ হাসিনার। তিনি দেশকে একাই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রথম এবং দ্বিতীয় মেয়াদে তাও কয়েকজন দৃশ্যমান সহযোগী ছিলেন। কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে এসে মনে হচ্ছে শেখ হাসিনা একাই লড়ছেন।

একটি সরকারে প্রধানমন্ত্রীর পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন অর্থমন্ত্রী। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। বরিস জনসন তাকে অর্থমন্ত্রী (চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার) নিযুক্ত করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে করোনাকালীন বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন। বিবিসির সঙ্গে তখন এক সাক্ষাৎকারে ঋষি বলেছিলেন, ‘বিশ্বে সবচেয়ে নিদ্রাহীন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং অসুখী ব্যক্তি হলেন একটি দেশের অর্থমন্ত্রী।’ ঋষি সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট। মঙ্গলবার তিনি গার্ডিয়ানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এই বিশ্বের কোনো অর্থমন্ত্রীর দম ফেলার সুযোগ নেই।’ জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন। অর্থমন্ত্রী (সেক্রেটারি অব ট্রেজারি) হিসেবে নিয়োগ দেন জ্যানেট ইয়েলেনকে। মার্কিন ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী। সম্প্রতি তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে জর্জরিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন পোস্টে এর পরিপ্রেক্ষিতে এক সাক্ষাৎকারে জ্যানেট ইয়েলেন বলেছেন, ‘এই দায়িত্বটা এমন যে, এক মুহূর্তও আপনি নিজের কথা ভাবতে পারবেন না।’ এই যখন দেশে দেশে অর্থমন্ত্রীদের অবস্থা তখন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর দর্শন প্রাপ্তিই যেন এক বিরাট খবর। যে কোনো সময়ে তার জন্য ‘নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি’ দেওয়া যেতেই পারে। সংকট উত্তরণে তিনি ভূমিকাহীন। কেন তিনি অর্থমন্ত্রী- এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো তিনি নিজেই দিতে পারবেন না। বাণিজ্যমন্ত্রীর বাজারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি কখন কী বলেন, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী সরকারের জন্য কত বড় বোঝা তা নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই ব্যাপক আলোচনা শোনা যায়। রেলমন্ত্রী তো তার নিজ নির্বাচনী এলাকাকেই রেলের সদর দফতর বানিয়ে ফেলেছেন। তার কিঞ্চিৎ পুরনো হওয়া নববধূর মন্ত্রণালয়ের কাজে হস্তক্ষেপের পরও তিনি এটাকে শপথ ভঙ্গ মনে করতে রাজি নন। এ নিয়ে তিনি পদত্যাগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন সাংবাদিকতা শেখাচ্ছেন। এত বাচাল এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা বলা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ কি আগে কখনো পেয়েছে? একা মেসি সৌদি আরবের সঙ্গেই হেরে গেছেন। এসব খেলোয়াড় (মন্ত্রী) দিয়ে শেখ হাসিনা কি পারবেন, ‘নির্বাচন বর্জন’ ষড়যন্ত্রকে হারাতে? এসব মন্ত্রী সামনে আরও বড় সংকটে কী করবেন? কিছু কিছু মন্ত্রী (সবাই নন) সরকারকে আরও ঝামেলায় ফেলছেন। কয়েকজনের কারণে সরকারের দুর্নাম হচ্ছে। মন্ত্রীদের যোগ্যতা, সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা যা জানি, তার চেয়ে বেশি জানেন শেখ হাসিনা। এ কারণেই তিনি মন্ত্রীদের ছেড়ে দিয়েছেন ফিতা কাটা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। কাজ করাচ্ছেন আমলাদের দিয়ে। বাড়ির কাজের সহায়তাকারী যদি একবার বুঝে ফেলে তাকে ছাড়া বাড়ির লোকজন অসহায়, তাহলে তাদের কেউ কেউ পেয়ে বসে। জি বাংলা, স্টার জলসা দেখার সময় থেকে শুরু করে সুগন্ধি সাবানের দাবি ওঠে। প্রতিদিন চাহিদার ফর্দ লম্বা হতেই থাকে। আমলারা যখন বুঝে গেলেন, মন্ত্রীরা ‘কচিকাঁচা’ (প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভাষা ধার করে) তখন কিছু কিছু আমলাও আবদারের তালিকাটা প্রতিদিন বাড়াচ্ছেন। এরা সরকারের সঙ্গে জনগণের মধ্যে দেয়াল তৈরি করছেন। রাজনীতি আর খেলার এক মৌলিক পার্থক্য আছে। ফুটবল বা ক্রিকেটে সমর্থকদের শুধু হাততালি দেওয়া কিংবা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা ছাড়া কোনো ভূমিকা থাকে না। সমর্থকরা পছন্দের দলকে জেতাতে পারেন না। কিন্তু রাজনীতির খেলায় সমর্থকরাই আসল। সমর্থকরাই শক্তি। সমর্থকরাই দলকে জেতান। আর সমর্থক সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সংগঠন এবং ভালো কাজ। সংগঠন শক্তিশালী হলেই সমর্থন বাড়ে। দল জনপ্রিয় হয়। আর সংগঠন না থাকলে বিশাল বড় নেতাও বিলীন হয়ে যান। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার নির্বাচনে আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মাহাথির মোহাম্মদের পরাজয় তার সবচেয়ে টাটকা উদাহরণ। ৫৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে মাহাথির প্রথম পরাজিত হলেন। জামানত হারালেন। কারণ তার সংগঠন ছিল না। নতুন রাজনৈতিক দলকে ঠিকঠাক মতো গড়ে তুলতে পারেননি ৯২ বছরের এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগ এখনো টিকে আছে, তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনের জন্যই। কিন্তু এখন যে জেলায়, উপজেলায় সম্মেলন হচ্ছে, তা কি মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের সংগঠন ঠিকঠাক আছে? নাকি সুবিধাবাদীর মতলববাজরা দখল করে নিয়েছে আওয়ামী লীগকে। সংগঠনে তারুণ্যের জয়ধ্বনি নেই। সেই বিতর্কিত পুরনো মুখরা আবার নেতৃত্বে আসছেন। এই সংগঠন কি নির্বাচনী খেলায় শেখ হাসিনাকে যোগ্য সহযোগিতা করতে পারবে? এই খেলা কঠিন হবে। এই খেলা ২০১৪ কিংবা ২০১৮-এর মতো হবে না। মাঠের খেলা আর রাজনীতির খেলায় একটি ব্যাপার হুবহু এক। মিরাকল। অনেক কিংবদন্তি একাই খেলার ভাগ্য পাল্টে দেন। যেমন ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা। রাজনীতিতেও কখনো কখনো মহামানবের উত্থান ঘটে। তার এক অঙ্গুলি হেলনে জনগণ উদ্বেলিত হয়। সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়। যেমন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শেখ হাসিনার ধমনিতে সেই রক্ত। যখনই বিপর্যয়, যখনই কালো মেঘে ঢাকা অন্ধকার তখনই শেখ হাসিনা আলোকবর্তিকা হয়ে সামনে এসেছেন। একাই সংকট কাটিয়েছেন। এটাই হয়তো তাঁর খেলার কৌশল। ’৭৫ দেখেছেন, ২০০১ দেখেছেন, ২০০৪-এর ২১ আগস্ট দেখেছেন। দেখেছেন এক-এগারো।  এ জন্য হয়তো একাই ঝুঁকি নিতে চাইছেন। বিশ্বাস শব্দটাই তাঁর চিন্তা থেকে উবে গেছে। একাই তিনি জয়ী করতে চান বাংলাদেশকে, জনগণকে। কি তিনি পারবেন? মেসি পারেননি কিন্তু ম্যারাডোনা পেরেছেন।  শেখ হাসিনা কি পারবেন?



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সুশীলদের তৈরি সূচকে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান কেন এগিয়ে?

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

দেউলিয়া হওয়ার পথে পাকিস্তান। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি; যা দিয়ে দেশটি মাত্র তিন সপ্তাহের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারবে। পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণ ২৭৪ বিলিয়ন ডলার। মুদ্রাস্ফীতি ২৯ শতাংশের বেশি। রকম চরম পরিস্থিতিতে দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে ৭৫০ কোটি ডলারের জরুরি ঋণ সহায়তা চেয়েছিল। আইএমএফ ১১০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। এজন্য বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে। শর্ত পূরণ করতে গিয়ে এখন আরও মুখ থুবড়ে পড়েছে পাকিস্তানের অর্থনীতি। কষ্টের মধ্যেই পাকিস্তানে একটা কৌতুক বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। পাকিস্তানের সাংবাদিকরা বলেছেন, আইএমএফের কাছে ঋণ নেওয়ার দরকার কী? বরং পারভেজ মোশাররফ, নওয়াজ শরিফ আসিফ আলী জারদারির কাছ থেকে ঋণ নিলেই পারে। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, পাকিস্তানের এই তিন সাবেক সরকার রাষ্ট্র প্রধানের কাছে লুণ্ঠিত সম্পদের পরিমাণ হাজার কোটি ডলার। যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি আরবে এদের লুণ্ঠিত অর্থ অলস পড়ে আছে। কৌতুক নিয়ে যখন পাকিস্তানে নানামুখী আলোচনা তখন ৩১ জানুয়ারি পাকিস্তানের জন্য এক সুখবর দিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ওই দিন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রতিবেদন ২০২২ প্রকাশ করে। ১৮০টি দেশের তালিকায় পাকিস্তান বাংলাদেশ আফগানিস্তানের চেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২৫ পয়েন্ট পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান যখন তালিকায় ১৪৭তম। সেখানে বাংলাদেশের চেয়ে পয়েন্ট (২৭) বেশি পেয়ে পাকিস্তান সাত ধাপ এগিয়ে (১৪০তম) এতে পাকিস্তানিদের নিশ্চয়ই খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তা নয় বরং পাকিস্তানিরা এতে বিস্মিত এবং হতবাক।দুনিয়া নিউজ’-এর জনপ্রিয়দুনিয়া কামরান খানকে সাথঅনুষ্ঠানে টিআইয়ের প্রতিবেদনকে বছরের সেরা কৌতুক বললেন একজন অর্থনীতিবিদ। রসিকতা করে বললেন, ‘ট্রান্সপারেন্সিকে নিশ্চয়ই পাকিস্তান সরকার নজরানা দিয়েছে, যেন পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের ওপর রাখা হয়। ওই অর্থনীতিবিদ বললেন, ‘পাকিস্তানে যেভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুণ্ঠন হয়েছে, তা বিশ্বে কোথাও হয়নি। দুর্নীতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। বাংলাদেশের চেয়ে যদি পাকিস্তানে কম দুর্নীতি হয়, তাহলে তো দেখতে হবে এত দুর্নীতি করেও বাংলাদেশ কেন পাকিস্তানের চেয়ে এত এগিয়ে। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতির অনেক সূত্রই বদলে ফেলতে হবে।কয়েক বছর ধরেই পাকিস্তানে বাংলাদেশচর্চা বেশ জোরেশোরে চলছে। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া, বিস্ময়কর উন্নতি ইত্যাদি নিয়ে এখন খোলামেলা আত্মসমালোচনা হয়। পাকিস্তানের গণমাধ্যমকর্মী, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে যখন বাংলাদেশ বন্দনা, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে কিছু পাকিস্তানপ্রেমীর পাকিস্তানপ্রীতি লক্ষ করার মতো। তারা পাকিস্তানের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়। পাকিস্তানের মতো সুপ্রিম কোর্ট চায়। পাকিস্তানের মতো ভারতবিরোধিতা চায়। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের করিৎকর্মা মহাসচিব বলেন, পাকিস্তান আমলই ভালো ছিল। টিআইয়ের দুর্নীতি সূচক প্রতিবেদনে তারা নিশ্চয়ই উল্লসিত হবেন। যে দেশটিতে রাজনীতিবিদ এবং সেনাবাহিনী মিলেমিশে লুণ্ঠনের উৎসব করে। যে দেশে ১২৬ হাজার কোটি রুপির উন্নয়ন কাগজে আছে বাস্তবে নেই। সিন্ধুতে ৪২টি সেতু নির্মাণের জন্য টেন্ডার হয়েছে। টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে সেতু নির্মাণ সমাপ্ত! ঠিকাদার টাকা তুলে হজম করে ফেলেছে। পাঁচ বছর পর আবিষ্কৃত হয়েছে, আদতে কোনো সেতুই নির্মিত হয়নি। টাকা স্রেফ সরকারি কোষাগার থেকে ঠিকাদারের কাছে গেছে। ঠিকাদার টাকা ভাগ করে দিয়েছে রাজনীতিবিদ, জেনারেলদের মধ্যে। আইএমএফ পাকিস্তান সম্পর্কে বলেছে, দেশটির ন্যূনতম জবাবদিহিতা নেই। মার্কিন কংগ্রেসে অভিযোগ করা হয়েছে, বন্যার্তদের ত্রাণ সহায়তা পাকিস্তানের সরকারি ব্যক্তিরা মেরে দিয়েছেন। সেই দেশকে বাংলাদেশের চেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ দেখিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কী প্রমাণ করল? শুধু পাকিস্তান কেন, টিআইয়ের প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কার দুর্নীতির অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো। রাজাপক্ষে পরিবারের নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে দেশটি এখন দেউলিয়া। মুদ্রাস্ফীতি ৯৫ শতাংশ। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘একটি পরিবারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণেই শ্রীলঙ্কার এই পরিণতি।ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলএকটি পরিবারের লোভে ধ্বংসপ্রাপ্ত এক দেশ সেই শ্রীলঙ্কা টিআইয়ের দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে ৪৬ ধাপ এগিয়ে (১০১তম) শ্রীলঙ্কার পয়েন্ট ৩৬। দুর্নীতির পরীক্ষায় পাস করেও শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্বচ্ছতায়শ্রীলঙ্কাএক বড় প্রশ্ন। এর আগেও বার্লিনভিত্তিক এই দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনটি বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কা পাকিস্তানের চেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে। দুর্নীতির ধারণা সূচক বাংলাদেশকে আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত দেশ হিসেবেই চিত্রায়ণ করে সংস্থাটি। তখন পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার অবস্থা ছিল না। দেশ দুটির ভিতরের দুর্নীতির চিত্র উঠে আসেনি ট্রান্সপারেন্সির আগের প্রতিবেদনগুলোয়। চরম সংকটে থাকা দেশ দুটির অর্থনৈতিক সংকটের আসল কারণ এখন নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। তাতে দেশ দুটির সীমাহীন দুর্নীতি, প্রকাশ্য লুণ্ঠনের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা ভয়ংকর। কোনো দেশের দুর্নীতির সঙ্গেই দুই দেশের তুলনা করা চলে না। টিআইয়ের প্রতিবেদন যে অর্ধসত্য, মনগড়া এবং রাজনৈতিকভাবে দুরভিসন্ধিমূলক, তা দুটি দেশের মান নির্ণয় থেকেই পরিষ্কার হয়। সম্প্রতি ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী আদানিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে হুলুস্থুল চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিনডেনবার্গের এক গবেষণা প্রতিবেদনে তছনছ হচ্ছে আদানি সাম্রাজ্য। হিনডেনবার্গ দাবি করেছে, ‘ভারতের পতাকায় শরীর ঢেকে তারা দেশকে লুণ্ঠন করে চলেছে।এক আদানি শিল্প গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি এবং দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে তার পরিমাণ বাংলাদেশের এক বছরের জাতীয় বাজেটের সমপরিমাণ। অথচ টিআইয়ের ধারণা সূচকে ভারতের অবস্থান ৮৭তম। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটির স্কোর ৪০। ভারত বাংলাদেশের দুর্নীতির কি এত পার্থক্য?

শুধু দুর্নীতির ধারণা সূচক কেন, যে কোনো সূচকে বাংলাদেশকে হতশ্রী, ব্যর্থ, খারাপ দেখানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই যে গত বছররিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারগণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক প্রকাশ করল। এতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২। ওই প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের চেয়েও পাকিস্তান (১৫৭), আফগানিস্তান (১৫৬) রাশিয়ার (১৫৫) গণমাধ্যম স্বাধীন। কী অদ্ভুত ব্যাপার! কোনো তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই সূচককে হাস্যকর, কাল্পনিক বলা যায়। পাকিস্তানের গণমাধ্যম সম্পর্কে এএফপির একটি প্রতিবেদন উল্লেখ করতে চাই। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তানের গণমাধ্যম বুটের তলায় পিষ্ট। সেখানকার গণমাধ্যম ততটুকু স্বাধীন যতটুকু সেনাবাহিনী চায়।ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) বছরের ১২ জানুয়ারি পাকিস্তানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২২-এর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের ওপর এই প্রতিবেদনে পাকিস্তানের ৩৮টি গুরুতর অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করে আইপিআই। এর মধ্যে এপ্রিলে তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার গণমাধ্যমের অবস্থা নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না। ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কমিউনিস্ট শাসনের সময়ও রাশিয়ার গণমাধ্যম বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে ভালো ছিল।রাশিয়ার গণমাধ্যম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত এবং শতভাগ সেন্সরশিপের আওতায়। আফগানিস্তানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বে গণমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে দুরূহ এবং দুর্গম জায়গা হলো আফগানিস্তান।গণমাধ্যমের জন্য এসব ভীতিকর দেশের পেছনে বাংলাদেশকে রাখা হয় কীভাবে? ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। সম্প্রতি বিবিসিতেইন্ডিয়া : দ্য মোদি কোশ্চেনশিরোনামে প্রায় এক ঘণ্টার একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরপরই ভারত প্রামাণ্যচিত্রটির ব্যাপারে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করে। ইউটিউবসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ওই প্রামাণ্যচিত্রটি নামিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভারতে প্রামাণ্যচিত্রটির সব ধরনের প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করে। বলে নেওয়া দরকার, ‘দ্য মোদি কোশ্চেনএকপেশে একটি তথ্যচিত্র। সাংবাদিকতার ন্যূনতম রীতিনীতি এতে অনুসরণ করা হয়নি। যে-কেউ প্রতিবেদনটি দেখলেই বুঝবেন এর পেছনে একটি রাজনৈতিক মতলব আছে। প্রতিবেদনের শেষ ভাগে এসে ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও সংশয় এবং শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিরোধীমত দমন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তার পরও ভারতের মতো মুক্তচিন্তার দেশে একটি তথ্যচিত্র নিষিদ্ধ হওয়াটা অবশ্যই গণমাধ্যমের জন্য অস্বস্তিকর ঘটনা। সে তুলনায় বাংলাদেশ কি তাহলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে অনেক উদার নয়? বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও আলজাজিরায়অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেনশিরোনামে একটি অসত্য ভিত্তিহীন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার কিন্তু ওই প্রতিবেদনটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। একপেশে, মনগড়া ভিত্তিহীন প্রতিবেদনটি এখনো ইউটিউবসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু ওই প্রতিবেদন কেন, ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন চলছে ঘৃণা উৎসব। চরিত্রহননের খেলা। কিছু ব্যক্তি রাষ্ট্র, দেশ, সরকার এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুৎসিত আক্রমণ করছে। এসব লাগামহীন কনটেন্ট বন্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অবাধে এসব কুরুচিপূর্ণ নোংরা প্রচারণা জনগণ দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণহীন স্বেচ্ছাচারিতা এখন এক বড় ব্যাধির নাম। শুধু সোশ্যাল মিডিয়া কেন, টেলিভিশন টকশোগুলোয় সরকারকে কেটে ছিঁড়ে লবণ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দু-একটি মূলধারার গণমাধ্যম তো পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে দুটি গণমাধ্যম যেভাবে অপতৎপরতা চালাল তা রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহিতা। কিন্তু সরকার ক্ষেত্রে কোনো সেন্সরশিপ আরোপ করেনি। কোনো বিধিনিষেধও দেয়নি। এজন্য কেউ নিপীড়িত হয়েছেন কিংবা কাউকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। জনগণ মত প্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করছে অবাধে। গণমাধ্যমকর্মীরা নিশ্চয়ই যে কোনো উৎস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করবেন। অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিকতা বিকশিত করবেন। কিন্তু সরকারি নথি চুরি তথ্য সংগ্রহের উপায় হতে পারে না। এটি শুধু সাংবাদিকতার নীতিবিরোধী নয়, নৈতিকতা পরিপন্থীও। চুরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ বাংলাদেশে সরকারি নথি চুরি করা গণমাধ্যমকর্মীকেও কেউ কেউ হিরো বানিয়ে ফেলেছেন। নানান পুরস্কারে ভূষিত করে, তার আসল অপরাধ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। কারও কারও মনোভাব এমন যে, নথি চুরি করাটাই আসল স্বাধীনতা। দেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। যে কোনো গণমাধ্যমকর্মী সরকারের যে কোনো বিভাগের তথ্য চাইতে পারেন। তথ্য না দিলে কমিশনে অভিযোগ করার ব্যবস্থাও আছে আইনে।  তার পরও কেন তথ্য চুরি করতে হবে? অনৈতিক কাজকে প্রশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশ্য কী? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। কথা সত্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু কিছু ধারা আপত্তিকর। ধারাগুলো বাতিলের দাবি সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘদিনের। আইনমন্ত্রী একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছিলেন আইনের অসংগতিগুলো দূর করার। এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি। তবে সম্প্রতি আইনের অপপ্রয়োগ অনেক কমেছে। কিন্তু আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার একমাত্র বাধা, তা আমি মানতে রাজি নই। আইনের আগে মানিক চন্দ্র সাহা (১৫ জানুয়ারি, ২০০৪), হুমায়ুন কবীর বালু (২৭ জুন, ২০০৪)সহ বহু সংবাদকর্মী পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হন। তাঁদের নির্মম হত্যাকান্ড গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে কী ছিল গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থা? সেই ভয়ংকর সময় আমরা পেরিয়ে এসেছি। ধরনের ঘটনা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়ায় অবাধে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে। সঙ্গে চলছে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে চরিত্রহনন। তার পরও সূচকে বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার করুণ অবস্থা কেন? টিআইয়ের সূচকে যে কারণে বাংলাদেশ পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার চেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। ঠিক একই কারণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকেও বাংলাদেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে। এর কারণ বুঝতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কিংবা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো সূচক তৈরি করে কীভাবে। সংস্থাগুলো রিপোর্টের জন্য তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশ থেকেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের কথাই ধরা যাক। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি বা বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের আর্থিক বিষয় নিয়ে বছরজুড়ে নানা জরিপ এবং গবেষণা করে। জরিপ গবেষণাগুলোর তথ্যই টিআইয়ের দুর্নীতির ধারণা সূচকের প্রধান উৎস। জরিপ গবেষণার কাজ করেন আমাদের সুশীল বুদ্ধিজীবীরা। তারা ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সেবা গ্রহণকারীর সঙ্গে কথা বলেই জরিপ এবং গবেষণার কাজ করেন। দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের এই সুশীলরা দুই দোষে দুষ্ট। প্রথমত, তারা মনে করেন তাদের আয়-উপার্জন টিকিয়ে রাখতে হলে বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে দেখাতে হবে। বাংলাদেশ ভালো, সবকিছু ঠিক আছে দেখালে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবাজারে তাদের কদর কমে যাবে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যার কথাই ধরা যাক। রোহিঙ্গারা যদি তাদের দেশে ফিরে যায় তাহলে মুহূর্তে ছোটবড় প্রায় হাজার দেশি-আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বন্ধ হয়ে যাবে অথবা অর্থসংকটে পড়বে। কাজেই যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গা সংকট জিইয়ে রাখা তাদের মহান দায়িত্ব। এজন্য ইস্যুতে তারা নানান মনগড়া তথ্য দেন। রোহিঙ্গাদের উসকে দেন। তাদের অধিকারের লম্বা ফিরিস্তি তৈরি করেন। ঠিক তেমনি দুর্নীতির বিষয়টিও। বাংলাদেশে দুর্নীতি কমছে। কিংবা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার চেষ্টা করছে, এমন বার্তা অনেকের পাজেরো গাড়ি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসকে ঝুঁকিতে ফেলবে। ফলে দুর্নীতিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলাটাই তাদের রুটিরুজির জন্য জরুরি। কেউ বলবে না বাংলাদেশে দুর্নীতি নেই। একটি শ্রেণির লাগামহীন দুর্নীতি দেশের উন্নয়ন গ্রাস করছে। অর্থ পাচার বাংলাদেশের জন্য এক মরণঘাতী ব্যাধি। আগামী প্রজন্মের জন্য, বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত রাখার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশ পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার চেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত- কথা কোনো বিবেকবান, সুস্থ মানুষ বিশ্বাস করবে না। বাংলাদেশ তো নয়, বিশ্বে কোনো দেশেই নাগরিক সচেতনতা ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব না। কিন্তু ছিদ্রান্বেষণ এবং দোষারোপের সংস্কৃতি দুর্নীতিবাজদের আড়াল করবে।

বাংলাদেশে যেসব সুশীল বুদ্ধিজীবী দুর্নীতি, মানবাধিকার এবং গণমাধ্যমসংক্রান্ত জরিপ গবেষণা করেন তাদের আরেকটি সমস্যা রয়েছে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলা যায়, এদের একটিমতলবরয়েছে। মতলবটা হলো, বিরাজনীতিকরণ। বাংলাদেশের সুশীলসমাজের একটি অংশ গণতন্ত্রবিরোধী।৭৫ থেকে আজ পর্যন্ত যতবার অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে, ততবার সুশীলদের অংশটি ছিল উচ্ছিষ্টভোগী। অগণতান্ত্রিক সরকারের পদলেহন করে এরা নিজেদের আখের গুছিয়েছে। জনগণের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের নেশা এদের। এই উচ্ছিষ্টভোগী সুশীলদের লক্ষ্য হলো যে কোনো ধরনের রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক ধারা বিপন্ন করা। সর্বশেষ এরা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। দীর্ঘদিন এরা অভুক্ত, ক্ষুধার্ত। তাই দুর্নীতি, মানবাধিকার, সুশাসন ইত্যাদি শব্দমালায় এরা গণতন্ত্রকে ক্ষতবিক্ষত করতে চায়। সেজন্যই এরা এমন সব জরিপ করে যাতে বাংলাদেশের একটি বিবর্ণ চেহারা ফুটে ওঠে। যাতে জনগণ রাজনীতির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে। অগণতান্ত্রিক শাসনকে স্বাগত জানায়। সে কারণেই এসব প্রতিবেদনে বাড়তি রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়। প্রকৃত অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ দেখানো হয় বাংলাদেশকে।

ছাড়া আরও একটি কারণ আছে। আমাদের এই উঁচুতলার সফেদ সুশীলরা বংশগতভাবে বাংলাদেশবিরোধী। পাকিস্তানপন্থি। পৈতৃকসূত্রে পাকিস্তানপ্রীতি এদের রক্তে প্রবাহিত। প্রকাশ্যে বলতে পারে না, কিন্তু পাকিস্তানের জন্য এদের মন কাঁদে। তাই এরা এমনভাবে তথ্য-উপাত্ত তৈরি করে যেন বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে আছে এটি প্রমাণ করা যায়। কিন্তু এবার পাকিস্তানপ্রেম দেখাতে গিয়ে এদের আসল চেহারাটাই ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেখাতে গিয়ে পাকিস্তানের চেয়ে খারাপ বানিয়ে ফেলেছে। এখন তো সুশীলদের মাথা হেঁট হওয়ার কথা। তাতে কী? এভাবেই তো সুশীলরা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সব ভবিষ্যদ্বাণী, অনুমান, প্রক্ষেপণ ভুল হওয়ার পরও তারা গর্বিত ভঙ্গিতে বলতেই থাকে, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন।বাংলাদেশ যতই এগিয়ে যায়, ততই এদের হতাশার দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ হয়।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

যুক্তরাষ্ট্রই সরকারের একমাত্র মাথাব্যথা

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের জন্য একদিকে যেমন নিজেদের দলকে প্রস্তুত করছে অন্যদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দল যেন অংশগ্রহণ করে সেটিও নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আশা বা বিএনপিকে ছাড় দিয়ে আগামী নির্বাচনের মাঠে যুক্ত করার কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা এখনও নেই। যদিও পর্দার আড়ালে বিএনপির সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বিএনপি যেমন বলছে যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না, ঠিক তেমনি ভাবে আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচন হতে পারে না। যা কিছু হবে সংবিধানের আওতায় হবে।

প্রধানমন্ত্রী ১ ফেব্রুয়ারি বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানলে, অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আনলে সংবিধান অশুদ্ধ হবে। তার এই বক্তব্যের পর থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার কোনো অবস্থাতেই বিএনপির মূল দাবি অর্থাৎ নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন না। এরকম পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কি আরেকটি একতরফা নির্বাচনের পথে যাচ্ছে? আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করছেন যে, বিএনপি এখন রাজনীতিতে গুরুত্বহীন। আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে তিনটি কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে প্রথমত, তারা মনে করছে, শেষ পর্যন্ত বিএনপি আন্দোলনের অংশ হিসেবে এবং সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এবং বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে তারা নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে গ্রহণ করবে। এর ফলে আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক হবে এবং বিএনপিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করবে। এটিই আওয়ামী লীগের প্রথম বিকল্প।

দ্বিতীয়ত বিকল্পে আওয়ামী লীগ মনে করছে যে, বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জন করেও তারপরও বিএনপির মধ্যে নির্বাচনে ইচ্ছুক বহু প্রার্থী রয়েছে তারা আগামী নির্বাচনে স্বতন্ত্র হলেও বা দল ভেঙে অংশগ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে স্বাগত জানাবে। এরই একটি টেস্ট কেস হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচনে উকিল আব্দুস সাত্তারকে আওয়ামী লীগ ছাড় দিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করছে বিএনপিতে অনেক জনপ্রিয় প্রার্থী রয়েছেন যাঁরা তাদের নিজ নির্বাচনী এলাকা ধরে রাখার জন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত যদি দলগতভাবে বিএনপির একটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে আওয়ামী লীগ মনে করছে। 

আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে তৃতীয় বিকল্প হল বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচন। শেষ পর্যন্ত যদি বিএনপি ২০১৪ পথে যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না এই ব্যাপারে অটল অবস্থানে থাকে সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে তাদেরকে ছাড় দিয়ে এবং প্রত্যেকের একক অবস্থান থেকে নির্বাচন করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করবে। সেক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিভিন্ন ইসলামী দল সহ আরও কিছু রাজনৈতিক দলকে নিয়ে তারা একটি নির্বাচন করবে এবং এরকম নির্বাচন এবং অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা মনে করছেন। কিন্তু এই তিন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং অবাধ সুষ্ঠু করার ব্যাপারে তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। এমনকি বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ  না করে সেই নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে সেটি নিয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্ন রয়েছে।

অতীতে দেখা গেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত উপমহাদেশের বিষয়ে ভারতের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের ব্যাপারে আলাদা এজেন্ডা রয়েছে বলে কোনো কোনো কূটনৈতিক মনে করছেন। তারা মনে করছেন যে, নির্বাচনে যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপি অংশগ্রহণ না করে এবং নির্বাচন যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয় সেক্ষেত্রে তারা এই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতির নাও দিতে পারে। বিভিন্ন কূটনীতিক মেরুকরণ চলছে নির্বাচনকে ঘিরে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বলে একাধিক মহল মনে করছেন। তাদের মতে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচন যেভাবে করতে চায় সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা এখনও যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কি হবে তার ওপর নির্ভর করছে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা। কাজে শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে বাদ দিয়ে বা খন্ডিত বিএনপিকে নিয়ে নির্বাচন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে সেটাই দেখার বিষয়। দফায় দফায় মার্কিন প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ করছেন এবং তারা মূলত নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। সর্বশেষ ডোনাল্ড লু’র সফরের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে অনেক কূটনীতিক মনে করছেন। তাই বিএনপিকে ছাড়া আগামী নির্বাচনের পথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান বাধা হলো এখন যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র   আফরিন আক্তার   নির্বাচন কমিশন   ডোনাল্ড লু   পিটার ডি হাস   বিএনপি   সরকার  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নতুন রাষ্ট্রপতি: শেষ মুহুর্তে আওয়ামী লীগ কি মত পাল্টাবে?

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

আগামী সপ্তাহে আওয়ামী লীগকে নতুন রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন। তার আগেই আওয়ামী লীগকে মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে হবে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কীভাবে চূড়ান্ত হবে তার একটি রুপরেখা ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, আগামী সপ্তাহে আওয়ামী লীগ সভাপতি দলের প্রেসিডিয়াম এবং সংসদীয় কমিটির সভায় নতুন রাষ্ট্রপতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন এবং সেখানেই চূড়ান্ত করবেন। সংসদীয় বোর্ডের সভায় রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত হবে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে তার আগে প্রেসিডিয়ামে বিষয়টি আলোচিত হতে পারে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে। গতবার রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত করার বিষয়টি আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির সভায় অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের জন্য কোনো মনোনয়ন বোর্ডের কথা নেই। মনোনয়ন বোর্ডের মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন বোর্ড। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলছেন, রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন হবে জাতীয় সংসদ সদস্যদের আলোচনার ভিত্তিতে। এইজন্য একটি সংসদীয় বোর্ডের মিটিং হবে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি হিসবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু শেষ মুহুর্তে গিয়ে মসিউর রহমানের ব্যাপারেও বিভিন্ন আওয়ামী লীগের নেতারা নেতিবাচক কথাবার্তা বলছেন।  এই সমস্ত নেতিবাচক কথাবার্তা প্রধানমন্ত্রীর কানেও দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

মসিউর রহমানের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের তিন ধরনের আপত্তি রয়েছে। প্রথমত, তিনি শারিরীকভাবে কতটুকু সক্ষম সেই প্রশ্ন কোনো কোনো আওয়ামী লীগের নেতা তুলেছেন। বিশেষ করে তার চোখের স্বাস্থ্য বেশ খারাপ বলেই আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা বলেছেন। কিছুদিন আগেই তার স্ত্রী বিয়োগ ঘটেছে। এরপর থেকেই তিনি অনেকটা একাকীত্ব এবং নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন- সে কথাও কেউ কেউ বলেছেন। তবে আওয়ামী লীগের অন্তত দুইজন নেতা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন যে, একজন আমলার চেয়ে একজন রাজনীতিবিদকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন দেয়া ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এই দুইজন রাজনৈতিক নেতা মনে করেন যে, কঠিন সময়ে আমলারা দৃঢ়তার পরিচয় দিবেনা এবং শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবেনা। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকেই তারা এই পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদের মধ্যে একজন বাংলা ইনসাইডারকে বলেছেন, তারা একজন রাজিনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি করার ব্যাপারে কথা বলে এসেছেন।  তবে তা সত্ত্বেও ডা. মসিউর রহমান এখনও রাষ্ট্রপতি হবার দৌড়ে সবার থেকে এগিয়ে রয়েছেন নানা কারণে। তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আছে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বস্ত একজন ব্যাক্তি হিসেবে পরিচিত। 

ডা. মসিউর রহমানের বিকল্প কে হতে পারে এ নিয়েও আওয়ামী লীগের মধ্যে নানামুখী আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো মহল দিনাজপুর-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ চৌধুরীর নাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব করেছেন বলে জানা গেছে। আবুল হাসান মাহমুদ চৌধুরী একজন পরীক্ষিত রাজনীতিবিদ এবং রাজনীতিতে তার কোনো বিচ্যুতি নেই। তিনি একজন সাবেক আমলা থাকলেও এখন তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবেই অধিকতর পরিচিত। 

চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সাবেক গৃহায়ণ পূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নামও অনেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করছেন। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের রাষ্ট্রপতি হবার ক্ষেত্রে একটিই প্রতিবন্ধকতা, তার বয়স। তিনি প্রায় ৮০ বছরের কাছকাছি বলে তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব এবং সাম্প্রতিক কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবেন তা নিয়ে কারও কারও প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া তিনি জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পাননি। চট্টগ্রামের রাজনীতিবিদ হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। শিরীন শারমিন চৌধুরীকে স্পিকার হিসেবে রাখা হবে এমন গুঞ্জনের পরও কোনো কোনো মহল এখনও শিরীন শারমিন চৌধুরীকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর  আস্থাভাজন, বিশ্বস্ত এবং রাজনীতিবিদ বিবেচনা করেই শিরীন শারমিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এখনও পর্যন্ত কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন সে ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত করেননি। কারও কাছে তার অভিপ্রায়ের কথাও বলেননি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহে তিনি এই ব্যাপারে তার অবস্থান পরিষ্কার করবেন। তখনই সু স্পষ্ট হবে কে হচ্ছেন পরবর্তি রাষ্ট্রপতি।

নতুন রাষ্ট্রপতি   আওয়ামী লীগ   ড. মসিউর রহমান  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচনী সমঝোতা: কূটনীতিক পাড়ায় পাঁচ সমঝোতা প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণ মূলক করতে, বিশেষ করে বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেটি নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক পাড়ায় ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। কূটনৈতিক মহল দফায় দফায় বৈঠক করছে। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য তারা বিভিন্ন মহলের সাথে দেনদরবার এবং কথাবার্তা বলছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। এই দাবি বাদ দিয়ে অন্য কোনো প্রস্তাব যদি দেওয়া হয় যেটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর সেটি বিবেচনা করা হবে। এই প্রেক্ষিতেই কূটনৈতিক মহল এখন তত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে একটি পাঁচ দফা প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। এই প্রস্তাবনা নিয়ে তারা নির্বাচন কমিশন, সুশীল সমাজ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নানা রকম কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে যে পাঁচ দফা প্রস্তাব এখন কূটনীতিকপাড়ায় ঝড় তুলেছে সেই প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে:

১. নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা নিশ্চিত করা। সচিবসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাতে নিয়ে আসা।


২. নির্বাচনকালীন সময়ে সেনা মোতায়েন এবং সেনা মোতায়েন তদারকির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে প্রদান করা।

৩. প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা যারা নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন তারা কোন রকম নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় অংশ গ্রহন করতে পারবেন না এমন অঙ্গীকার নিশ্চিত করা।

৪. নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরকে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাদেরকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করা। 

৫. নির্বাচনের আগে সরকার এবং বিরোধী দলের সমন্বয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ এবং সেই সংলাপের মাধ্যমে একটি নির্বাচনী সমঝোতা স্থাপন করা। 


সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে যে, এই বিষয়গুলোতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, একটি সংসদ বহাল রেখে মন্ত্রীদের স্বপদে দায়িত্বে রেখে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। এজন্য তারা সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। অবশ্য সে সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, এটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে যে, তারা যা কিছু করবে সংবিধানের আওতায় করবে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই।

তবে কূটনৈতিক মহল মনে করেন যে, নির্বাচন কমিশনকে আরও ক্ষমতাবান করে এবং এই ক্ষমতা বাধাহীনভাবে প্রয়োগ করা নিশ্চিত করলেই অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হতে পারে।

নির্বাচনী সমঝোতা   কূটনীতিক পাড়া   সরকার   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

রেডিমেড প্রার্থী, শর্টকাটে এমপি

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

ডিসেম্বর, ১৯৯০। সবে এরশাদ সরকারের পতন ঘটেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে। নির্বাচনী হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। সঙ্গে তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের তাগিদ।স্বৈরাচারের দালালদের প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে সম্মিলিত ছাত্রঐক্য। এর মধ্যেই এক বিকালে দুই সচিব ৩২ নম্বরেবঙ্গবন্ধু ভবনেহাজির হলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তারা দেখা করতে চান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নির্বাচন, তিন জোটের কার্যক্রম ইত্যাদি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তিনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতাকে দায়িত্ব দিলেন ওই দুই আমলার কথা শুনতে। আমলা মহলে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী ওই নেতা কেরামত আলী এবং এম কে আনোয়ারের সঙ্গে কথা বললেন। দুই আমলা জানালেন তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। এলাকায় তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। এখন দরকার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন। আওয়ামী লীগের ওই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এই দুই আমলার বক্তব্য দলীয় প্রধানকে জানালেন। কিন্তু শেখ হাসিনা তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। দুটি কারণে শেখ হাসিনা এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীকে ফিরিয়ে দিলেন। প্রথমত, এই দুজনই এরশাদের দোসর হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত। তিন জোটের রূপরেখায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, এরশাদের সহযোগী কাউকে তিন জোটের কোনো দল আশ্রয় দেবে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তিন জোটের রূপরেখার প্রতি সম্মান দেখালেন। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক সংগঠন। রাজনৈতিক সংগঠনে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার। রাজনীতিতে মনোনয়ন প্রাপ্তির কোনো শর্টকাট পথ নেই। হুট করে এসে কেউ মনোনয়ন পান না। দুই আমলার জন্য আওয়ামী লীগের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু ঘটনাচক্রে সে সময় বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা এসেছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেবঙ্গবন্ধু ভবনে তিন জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে। বৈঠক শেষে পেলেন ওই দুই আমলাকে। তাদের আগ্রহের কথা শুনে তাদের নিয়ে গেলেন বিএনপি কার্যালয়ে। বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করালেন। তারা পরদিন সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিলেন। নির্বাচনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন পেতেও কষ্ট হলো না এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীর। বিএনপির রেডিমেড প্রার্থী হিসেবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন এবং বিজয়ী হলেন।৯১-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সবাইকে চমকে দিয়ে জাতীয় সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। জামায়াতের সহযোগিতায় সরকার গঠন করল বিএনপি। এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলী দুজনই বিএনপি সরকারের মন্ত্রীও হলেন। তাদের মধ্যে এম কে আনোয়ার মৃত্যু পর্যন্ত বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শর্টকাটে এমপি এবং মন্ত্রী হওয়ার এটি একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ। আদর্শ চর্চা নেই। রাজনৈতিক চর্চা নেই। দলের প্রতি আনুগত্য নেই। দলের লক্ষ্য এবং আদর্শ সম্পর্কে জানাশোনা নেই। আলাদীনের চেরাগের মতো এক লহমায় এমপি, মন্ত্রী হয়ে গেলেন। এরশাদ জামানায় প্রতাপশালী দুই আমলা রাষ্ট্রের অর্থ খরচ করে এলাকায় উন্নতি করেছিলেন। রেডিমেড প্রার্থীও হয়েছিলেন।৯১ সালের নির্বাচনে এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীর কেরামতি রাজনীতিরশর্টকাটপথ উন্মোচন করে দেয়। অবশ্য৭৫-এর পর থেকে রাজনীতিতে শর্টকাটে এমপি হওয়ার হিড়িক শুরু হয়। জিয়া বিএনপি গঠন করেন বিভিন্ন দল থেকে ভাড়াটে লোক দিয়ে। এখন এই প্রবণতা সর্বব্যাপী। শর্টকাটে এমপি হওয়ার প্রবণতা যেমন ব্যক্তিদের মধ্যে বাড়ছে তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী, পরীক্ষিতদের বাদ দিয়েরেডিমেডপ্রার্থী খোঁজা এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।রেডিমেডপ্রার্থী অনেকটাই রেডিমেড জামাকাপড়ের মতো। আপনি দোকানে গেলেন গায়ে চরিয়ে বেরুলেন। আপনি দলে ভেড়ালেন, তিনি টাকার জোরে এমপি হয়ে গেলেন।৯১-এর ফলাফল বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগ তার প্রার্থী মনোনয়নের রক্ষণশীল অবস্থা থেকে সরে আসে।৯৬-এর নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আওয়ামী লীগও রেডিমেড এমপি প্রার্থীর খোঁজ শুরু করে। বিএনপি আগে থেকেই রেডিমেড প্রার্থীনির্ভর দল। প্রধান দুটি দল যখন রেডিমেড প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে থাকে, তখন শর্টকাটে এমপি হওয়াটা স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এমনকি আদম ব্যবসায়ী শর্টকাটে এমপি হওয়ার দৌড়ে শরিক হন। শর্টকাটে মনোনয়ন ইচ্ছুকদের জায়গা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ৯৬ সালের নির্বাচনে প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, মোজাফফর হোসেন পল্টুুসহ বহু মাঠের রাজনীতিবিদকে মনোনয়নবঞ্চিত করে। শর্টকাটে এমপি হওয়ার ফর্মুলা কী? আপনি বিপুল বিত্তের মালিক হলেন (বৈধ বা অবৈধ পথে) এলাকায় গিয়ে মসজিদ, মাদরাসা বানালেন। মানুষের বিয়েতে, অসুখে দান-খয়রাত করলেন। কোরবানির ঈদে এলাকায় ১০০ গরু কোরবানি দিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন। ব্যস, কিছু মানুষ আপনার হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপির কিছু লোকজন প্রকাশ্যে গোপনে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তাদের আপনি কচকচে নতুন ঘ্রাণযুক্ত টাকা দেবেন। শর্টকাটে এমপি হওয়ার এটাই একমাত্র পথ নয়। আপনি সরকারি কর্মকর্তা। হঠাৎ দেখলেন, এলাকার লোকজন আপনার কাছে আসেন। এলাকায় রাস্তা নেই, ব্রিজ নেই। স্কুল এমপিওভুক্ত করতে হবে। মসজিদের ছাদ ঢালাই করতে হবে। আর এলাকার বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে তো আপনাকে নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে। একজন আমলা যখন সচিব হন, তখন তার বিস্তর ক্ষমতা। আমলে তো সচিবদের ক্ষমতা আকাশ স্পর্শ করেছে। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ শুরু হলে জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয় সচিবদের। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জেলার সর্বময় ক্ষমতার মালিক হন সচিবরা। এমপি, মন্ত্রীদের পাত্তা নেই। আমলারাই জেলার সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এলাকায় তাদের কদর বাড়ছে। সুবিধাবাদী চাটুকাররা ভিড় জমাচ্ছে। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, আপনি তো সংসদ সদস্যের চেয়ে জ্ঞানী, বিচক্ষণ। আপনি এলাকার এমপি হলে তো এই এলাকাই পাল্টে যেত। জনগণ আপনাকেই চায়। চারপাশে চাটুকার পরিবেষ্টিত আমলারাও খুশিতে গদগদ। ভাবলেন তাই তো। এমপি এলাকায় কী করছেন। রাস্তা বানিয়ে দিলাম আমি। কাবিখার তালিকা তৈরি করছি আমি। আশ্রয়ণের ঘর কারা পাবে তার সিদ্ধান্ত আমার ওপর ন্যস্ত। তিনি হয়ে গেলেন আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার। শর্টকাটে এমপি হওয়ার খায়েশ তাকে পেয়ে বসল। আগে শর্টকাটে এমপি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে গেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের সংখ্যা এখন জাতীয় সংসদে ৫০ ভাগের বেশি। এদের বেশির ভাগেরই রাজনীতির অতীত অভিজ্ঞতা নেই। ব্যবসা করছেন। ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে নানা ফাঁকফোকর দিয়ে পরিশোধ করছেন না। আবার ঋণখেলাপিও হচ্ছেন না। তারা এলাকায় নিজস্ব ভাড়াটে বাহিনী তৈরি করেছেন।মাই ম্যানদের দিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই আরেক আওয়ামী লীগ বানিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা শর্টকাটে এমপি হয়েছেন বা হওয়ার মিছিলে আছেন, তাদের এক ধরনের ব্যবসায়িকমতলবআছে। এমপি বা মন্ত্রী হলে তার ব্যবসা বাগাতে সুবিধা হবে। সচিবালয়ে দেনদরবার সহজ হবে। ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিতে হবে না। টেন্ডার পেতে সুবিধা হবে। কাজেই ব্যবসায়ীদের জন্য নির্বাচন ভালো বিনিয়োগ।৭৫-এর পর থেকে ব্যবসায়ীরা তাই রাজনৈতিক খাতে বিনিয়োগে ব্যাপক উৎসাহী। তাদের টাকার জোয়ারে জাতীয় সংসদে রাজনীতিবিদরা রীতিমতো কোণঠাসা। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের শর্টকাটে এমপি হওয়ার কারিশমায় মুগ্ধ অনেক উঠতি রাজনীতিবিদও প্রলুব্ধ হয়েছেন। তারা সততা, আদর্শবাদিতা, ত্যাগ ইত্যাদি সেলফে উঠিয়ে রেখেছেন। মনোনয়ন পেতে হলে টাকা লাগবে। নির্বাচন করতে টাকা লাগবে। টাকা বানানোর উপায় কী? টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি। রাজনীতিবিদ পরিচয়ের আড়ালে তারা লুটপাটের মিশনে নামছেন কোমর কষে। টাকা ছাড়া এমপি হওয়া যাবে না। তাই শর্টকাটে এমপি হওয়ার জন্য তারা শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার দৌড়ে। এদের সংখ্যাও জাতীয় সংসদে কম না। সে তুলনায় জাতীয় সংসদে আমলাদের উপস্থিতি নগণ্য। নিয়ে আমলা মহলে কারও কারও অন্তহীন দুঃখ। চাকরিতে থাকতে প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। চাকরির মেয়াদ শেষ হলেই আমলাদের ছোটাছুটি শুরু হয়। কেউ চেষ্টা করেন বয়স শেষ হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে। কেউ চান কোনো কমিশন বা সংস্থার অবসরোত্তর চাকরি। কারও প্রত্যাশা নিদেনপক্ষে কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়া। এভাবে আমলারা প্রায় সব প্রতিষ্ঠান এবং পদ দখল করে ফেলেছেন। জাতীয় সংসদ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর প্রধান কারণ অবশ্য আমলাদের ব্যর্থতা নয়। এখন যেভাবে বর্ষার বিলের মাছের মতো ক্ষমতার চারপাশে আমলারা কিলবিল করেন, তাতে সংসদ ভবনে প্রবেশ তাদের মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন আমাদের করিৎকর্মা আমলারা। কিন্তু বাধা হয়ে আছে একটি আইনে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২। এই আইনের ১২() () ধারায় বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে কোনো ব্যক্তি সদস্য হিসেবে (সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হওয়ার বা থাকার যোগ্য হবেন না, যদি-

() তিনি প্রজাতন্ত্রের বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগে কোনো চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন বা অবসরে গেছেন এবং তার পদত্যাগ এবং অবসরে যাওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত না হয়।বাসি ফুলের যেমন কদর থাকে না, তেমনি অবসরের তিন বছর অতিবাহিত হলে আমলাদেরকৃত্রিম ক্ষমতানিঃশেষ হয়ে যায়। তিন বছর অতিবাহিত হওয়ার পর রাজনীতির মাঠে যারা টিকে থাকেন, তারা নিজস্ব শক্তিতে অস্তিত্ব বজায় রাখেন। সময় তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা আমলা থেকে নেতারা ঝরে পড়েন। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমলারাই (সামরিক এবং বেসামরিক) ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ করতে চাচ্ছেন। গত ১৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার এই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন করা হয়েছে। রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের তিন বছর পর সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিধান কেন সংবিধান পরিপন্থী নয়, হাই কোর্ট তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। বিচারপতি জাফর আহমেদ বিচারপতি মো. বশির উল্লার সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ১২ () () চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল। কিছু দিন ধরেই আমলাদের পক্ষ থেকে ধারাটি বাতিলের চাপ ছিল। প্রথমে কিছু আমলা ধারাটি বাতিল করার জন্য সরকারকে প্ররোচিত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত স্বপ্রণোদিত হয়ে আইন পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এর আগেও কয়েকজন আমলা আইনটি বাতিলের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু আদালতে রিট আবেদন করতে হলে আবেদনকারী সংক্ষুব্ধ হতে হবে- এই যুক্তিতে আবেদন আমলে নেয়নি হাই কোর্ট। এখন রিট আবেদনটি আদালতের বিচারাধীন বিষয়। বিচারকগণ স্বীয় বুদ্ধি এবং আইনগত দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এই আইনটির পক্ষে-বিপক্ষে দুই ধরনের যুক্তি আছে। একজন আমলা অবসরে যাওয়ার পর প্রথম এক বছর থাকেন অবসরোত্তর ছুটিতে। সময় তিনি কাজ করেন না বটে কিন্তু বেতন-ভাতাদি ভোগ করেন। পরবর্তী দুই বছরও তার গায়ে ক্ষমতার উত্তাপ লেগে থাকে। নির্বাচনী মাঠে তিনি বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন, এরকম বিবেচনা থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য তিন বছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যারা এর পক্ষে তারা মনে করেন, এই বিধান না থাকলে নির্বাচনের মাঠে আমলা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পাবেন। রাজনৈতিক দল প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে নির্বাচনে কারা বেশি দাপট দেখাতে পারবেন। সদ্য অবসরে যাওয়া একজন আমলা নির্বাচন পরিচালনায় মাঠ প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার প্রতি পক্ষপাত দেখাবে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো আমলাদের মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী হবে। তারাই হবে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন রেডিমেড প্রার্থী, যারা শর্টকাটে এমপি হতে পারবে।

আবার এর বিপক্ষের যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইন সমান। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।অবসরের পর একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারী আর ১০ জন সাধারণ নাগরিকের মতোই। কাজেই তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

পক্ষে-বিপক্ষে এরকম আরও যুক্তি আছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমলা, ব্যবসায়ী, লুটেরা, কালো টাকার মালিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।৭৫-এর পর জিয়া ক্ষমতা দখল করে বলেছিলেন, তিনি রাজনীতিডিফিকাল্টকরে দেবেন। সত্যি সত্যি দেশে রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। সংসদ সদস্য হওয়ার মিছিলে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন সত্যিকারের রাজনীতিবিদরা। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে কোনো ধরনের নির্বাচনে জয়ী হতে চায়। আর জয়ী হওয়ার জন্য তারা রেডিমেড প্রার্থী খোঁজে। আবার বিপুল অবৈধ বিত্তকে আরও স্ফীত করতে এবং তাকে নিরাপদ রাখতে শর্টকাটে এমপি হওয়ার মিছিলও বড় হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর- আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের কথা মনে আছে? টাকার জোরে উড়ে এসে এমপি হয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রীকেও টাকা দিয়ে মহিলা কোটায় সংসদ সদস্য বানিয়ে ছিলেন। অনেক পাপুলই এখন নির্বাচন করে দায়মুক্তি অর্জন করতে চায়। পরিস্থিতির মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারাও যদি এমপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন তাহলে সত্যিকারের রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি আরও কঠিন হয়ে যাবে। দেশের জন্য অবদান রাখার অনেক উপায় আছে। যে যেখানে যে অবস্থানে আছেন সেখান থেকেই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। একজন ব্যবসায়ী দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবেন। এটাই তার পবিত্র কাজ। কেন তাকে এমপি হতে হবে? একজন সরকারি কর্মকর্তা সততা, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেই দেশকে এগিয়ে নিতে পারেন। জন্য তার এমপি হওয়ার দরকার নেই। সমাজে প্রত্যেক পেশার নাগরিকের আলাদা আলাদা অবস্থান, ভূমিকা এবং দায়িত্ব আছে। ব্যবসায়ী কিংবা আমলাদের যেমন রাজনীতির মাঠ দখল শুভ লক্ষণ নয়, তেমনি রাজনীতিবিদদেরও ব্যবসায়ী হওয়াটা উচিত নয়। দেশের সবাই যদি এমপি-মন্ত্রী হতে চান, তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হবে। যে ভারসাম্যহীতা এখনই লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের কাছে রাজনীতি ফিরিয়ে আনার কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। একাধিক উপনির্বাচনে তিনি দলের ত্যাগী পরীক্ষিত রাজনীতিবিদদের মনোনয়ন দিয়ে একটি বার্তা দিয়েছেন। সংসদীয় দলের সভাতেও আগামী নির্বাচনে দলের পরীক্ষিতদের সামনে আনার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। কিন্তু ঝুঁকিবিহীন, গুরুত্বহীন উপনির্বাচনে তিনি এমনটা করতে পারছেন বটে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষ যখন রেডিমেড প্রার্থী খুঁজবে, তখন আওয়ামী লীগ কি শর্টকাটে এমপি হতে ইচ্ছুকদের উপেক্ষা করতে পারবে? ২০১৮ নির্বাচনে বিএনপিতে দেখা গেল রেডিমেড প্রার্থীর হিড়িক। এহছানুল হক মিলনের মতো জাতীয়ভাবে পরিচিত নেতাকে বসিয়ে টাকাওয়ালা রেডিমেড প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি তার আসল রাজনীতি প্রকাশ করেছিল। আগামী নির্বাচনে বিএনপিতে যে রেডিমেড প্রার্থীর হিড়িক পড়বে তা সহজেই অনুমান করা যায়। আওয়ামী লীগেও অনেক আসনে পরিবর্তনের তাগিদ আছে। ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাবেন নাকি শর্টকাটে এমপি বানাতে আওয়ামী লীগও রেডিমেড প্রার্থী খুঁজবে?

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা সংশয়ের কথা বলা হয়। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না। কিন্তু আমি মনে করি, আগামী নির্বাচন রাজনীতির জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। শর্টকাটে রেডিমেড এমপিদের হাতে যেন জাতীয় সংসদ জিম্মি না হয়, সেটি এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনীতি রাজনীতিবিদের হাতে থাকবে কি না, তা আগামী নির্বাচনের এক বড় পরীক্ষা।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন