এডিটর’স মাইন্ড

জলিলের ‘ট্রাম্পকার্ড’, বেগম জিয়ার ‘গৃহত্যাগ’, ফখরুলের ‘লালকার্ড’

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। আমাদের অহংকারের মাস। গৌরবের মাস। ডিসেম্বর, ফেব্রুয়ারি, মার্চ- এই তিনটি মাস নিয়ে আমাদের অনেক আবেগ। এই তিন মাস উৎসবমুখর থাকে বাংলাদেশ। নানা অনুষ্ঠানে, বর্ণিল আয়োজনে আমরা স্মরণ করি আমাদের অর্জন, এগিয়ে যাওয়াকে। কিন্তু এবারের ডিসেম্বর মাসটা যেন অন্যরকম। কিছুটা অস্বস্তির, খানিকটা আতঙ্কেরও বটে। ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকার মহাসমাবেশ ঘিরে রাজনীতিতে একটা উত্তেজনা লক্ষ্য করছি। এমনিতেই দেশের মানুষ টানাপোড়েনের মধ্যে আছেন। আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে হুমকি-পাল্টা হুমকিতে জনগণ খানিকটা বিস্মিতও বটে। বিএনপি কিছুদিন ধরে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করছে। সমাবেশগুলো বিএনপিকে উজ্জীবিত করেছে। এসব সমাবেশ করে বিএনপি মনে করছে সরকার পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমনকি দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সরকার পরে পালানোর পথ পর্যন্ত পাবে না।কিন্তু এরকম একশটা সমাবেশ করে কি সরকার পতন ঘটানো যায়? বিএনপির এসব সমাবেশকে কি আন্দোলন বলা যায়? এসব আন্দোলনে কি জনগণ সম্পৃক্ত হয়েছে? বাংলাদেশে আন্দোলন, সংগ্রাম সবচেয়ে ভালো বুঝতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি বেড়ে উঠেছেন। জনগণকে উদ্বেলিত করেছেন। অধিকারহারা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। আন্দোলনের মাধ্যমেই তিনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। আন্দোলন সম্পর্কে ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন। ওইদিন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনিআন্দোলনকীভাবে গড়ে তুলতে হয় তা পাঠদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আন্দোলন গাছের ফল নয়। আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনের জন্য আদর্শ থাকতে হয়। আন্দোলনের জন্য নিঃস্বার্থ কর্মী থাকতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার। আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ এবং ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার।

আন্দোলন গড়ে তোলার এই বুনিয়াদি শিক্ষা যদি আমরা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখি তাহলে দেশেআন্দোলনহচ্ছে কি না তা বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে কি পেরেছে? বিএনপির সমাবেশগুলো নেতা-কর্মীদের বিরিয়ানি-খিচুড়ির উৎসব। সাধারণ জনগণ নিরাপদ দূরত্বে। বিএনপির আন্দোলনের ইস্যু কী? নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নিয়ে কি জনগণের মাথাব্যথা আছে? বিএনপি বলছে, সরকার নাকি দেশকে দেউলিয়া বানিয়ে ফেলেছে। কদিন আগে বিএনপির মাঝে মাঝে উদয় হওয়া এক নেতা, দাঁত চিবিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার চেয়েও খারাপ।তাই নাকি? তাহলে শ্রীলঙ্কার জনগণের মতো বাংলাদেশের মানুষ তো রাস্তায় নামছে না। অর্থাৎ বিএনপি তাদের বক্তব্যের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো জনমত সৃষ্টি করতে পারেনি।জনগণ আমাদের সঙ্গেবলে তাদের চিৎকার দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে প্রহসন। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনের দ্বিতীয় শর্ত হলোআদর্শ বিএনপির আদর্শ কী, নিয়ে বিএনপির নেতাদের মধ্যেই নানা বিস্ময়। জিয়ার আদর্শ ছিলরাজনীতি ডিফিকাল্ট করে দাও।’ 

রাজনীতিতে কালো টাকা, লুটেরা ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, স্বাধীনতাবিরোধীদের সমন্বয়ে এমন এক ককটেল জিয়া আবিষ্কার করেছিলেন যে, এখন রাজনীতি সত্যিই ডিফিকাল্ট হয়ে গেছে। সৎ নিষ্ঠাবান আদর্শবাদীদের জন্য আজ রাজনীতি এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা। এটা এখন শুধু বিএনপির জন্য নয়, সব দলের জন্য প্রয়োজন। জিয়ার পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। বেগম জিয়ার আদর্শ ছিলসবার আগে পরিবার ফ্যামিলি ফার্স্ট। তিনি তার গৃহবধূ বোনকে মন্ত্রী বানিয়েছেন। প্রয়াত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ভাইকে এমপি এবং ছায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানিয়েছিলেন। নিজ পুত্রকেরাজপুত্রহিসেবে অভিষিক্ত করেছিলেন। এমনকি চাকর-বাকর, পাইক-পেয়াদাদেরও এমপি, রাজনৈতিক সচিব বানাতে কার্পণ্য করেননি। পরিবারের সবার তো বটেই এমনকি পরিবারের ফাই ফরমাশ খাটাদেরও হাজার কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দিয়েছেন। পরিবার ভালো থাকলেই দল ভালো থাকবে। দল ভালো থাকলেই দেশ ভালো থাকবে। এটাই ছিল বেগম জিয়ার আদর্শ। এই ফ্যামিলি ফার্স্ট নীতি থেকে তারেক জিয়ার রাজত্বে বিএনপি কিছুটা সরে এসেছে। বর্তমানে বেগম জিয়া বিএনপির নামমাত্র প্রধান। আসল ক্ষমতার মালিক হলেন তারেক জিয়া। তারেক জিয়ার বিএনপির আদর্শ হলোমানি ফার্স্ট যা কিছু কর সবার আগে টাকা লাগবে। নির্বাচন, আন্দোলন, কমিটি, লবিং, অপপ্রচার সবকিছুতেই মানি ফার্স্ট। সবার আগে টাকা। এই আদর্শ বিএনপিতে সংক্রমিত হয়েছে ভালোভাবেই। বিএনপি এখন মোটামুটি আর্থিক দিক থেকে আত্মনির্ভরশীল দলে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরাই দাবি করেন যে, টাকা না দিলে বিএনপির কোনো পর্যায়ের কমিটিতেই থাকা যায় না। কিছুদিন আগে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষিত হয়েছিল। পদবঞ্চিতরা কে কত টাকায় কোন পদ পেয়েছেন তার এক ফিরিস্তি প্রকাশ করেছিলেন গণমাধ্যমে। টাকার অঙ্ক দেখে আমার বিশ্বাস হয়নি। এক বিএনপি নেতাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই এসব নিশ্চয়ই গুজব তাই না। গুজবে দেশটা ভরে গেছে।তিনি কানের কাছে মুখটা আনলেন। হাত দিয়ে আমার কানটা ঢেকে যা বললেন তাতে তো আমার ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। তার মতে, বিএনপির থানা কমিটিতেও কোটি টাকার খেলা হয়।মানি ফার্স্টনীতিতে বিএনপি উজ্জীবিত। জন্য নেতারাও এখন নিজেদের দৃশ্যমান রাখতে সচেষ্ট। বিভিন্ন সেমিনার, গোলটেবিল থেকে সমাবেশে গরম বক্তৃতা দেন। তাদের কদর বাড়ে। কর্মীরা আসে। পদ চায়, সঙ্গে নগদ নজরানা। বিএনপির আদর্শ আসলে কী? বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জ্বালানি নীতি কী হবে? পররাষ্ট্রনীতি কী হবে? আর্থিক ব্যবস্থাপনার কী পরিবর্তন আনবে। ঋণখেলাপির লাগাম কীভাবে টেনে ধরা হবে। অর্থ পাচার বন্ধে বিএনপির পদক্ষেপ কী হবে? এসব নিয়ে বিএনপির কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা কৌশলপত্র দৃশ্যমান নয়। বিএনপি নেতারা সরকারের ঢালাও সমালোচনা করছেন। সব খারাপ বলতে বলতেই বিএনপি নেতারা তাদের ক্ষমতাকালীন সময়ের দুষ্কর্মও বেমালুম ভুলে গেছেন। কিছুদিন আগে যখন বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হলো তখন তাদের নেতারা বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারকে তুলাধোনা করলেন। কিন্তু তারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন বিদ্যুতের ভয়াবহতা নিয়ে কিছুই বললেন না। এখন বিএনপি নেতারা অর্থ পাচার নিয়ে অনেক কথা বলছেন। কিন্তু বাংলাদেশে অর্থ পাচারের আবিষ্কারক যে তাদের নেতা, এই সত্যটা সাহস করে স্বীকার করলেন না। তিনবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ বিএনপি-জামায়াত জোট জামানায়। সেই দল যখন প্রতিপক্ষকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে তখন রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তি নিজের অজান্তেই ঠোঁটে এসে যায়তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ আমি চোর বটে তাই আদর্শহীন একটি রাজনৈতিক দল (কিংবা ক্লাব) আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে কীভাবে, প্রশ্ন অনেকের। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন সূত্রের আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো নিঃস্বার্থ কর্মী। নিয়ে আমি বেশি কিছু লিখতে চাই না। গত শনিবার কুমিল্লায় বিএনপির সমাবেশ হলো। পত্রিকার খবরে দেখলাম, রুমিন ফারহানাসহ বিএনপির ৩০ নেতার মোবাইল চুরি হয়েছে। এটা কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কে বা কারা মোবাইল চুরি করেছে। যে দলের নেতাদের ফোন বা মূল্যবান সামগ্রী কর্মীদের কাছে নিরাপদ নয়, সেই দলের কর্মীদের আর যাই বলা হোক না কেন নিঃস্বার্থ বলা যাবে না। এখন তারা নেতাদের মোবাইল চুরি করছে। ক্ষমতায় গেলে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল সব খেয়ে ফেলবে। কাজেই আন্দোলন গড়ে তোলার বৈশিষ্ট্যগুলোকে এখন পর্যন্ত ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি একবিন্দুতে মেলাতে পারেনি। হুংকার কিংবা ধমক দিয়ে আত্মতৃপ্তি হয়। কিন্তু আন্দোলন হয় না। বিএনপি যে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ঢাকায় সমাবেশের স্থান নিয়ে অযাচিত, অপ্রাসঙ্গিক উত্তাপ ছড়ানো। নয়াপল্টনেই কেন জনসভা করতে হবে? ব্যাপারে বিএনপি নেতাদের ব্যাখ্যার কোনো যুক্তি নেই, জেদ আছে। যে কোনো মূল্যেই নয়াপল্টনে জনসভা করব। সরকার অনুমতি দিক না দিক পল্টনেই সমাবেশ হবে- ইত্যাদি কথা রাজনীতির ভাষা নয়। পল্টনে যে কোনো মূল্যে সমাবেশ করতে বিএনপি নেতারা বদ্ধপরিকর। তাহলে সমাবেশের অনুমতি চাইতে তারা ঢাকার পুলিশ কমিশনারের কাছে গিয়ে ফটোসেশন করলেন কেন? বিএনপির যদি এতই জনসমর্থন তাহলে সমাবেশের জন্য তাদের পুলিশের দ্বারস্থ হতে হবে কেন? যেখানে ইচ্ছা যখন খুশি সমাবেশ করবে। বিএনপি যদি সত্যি বিশ্বাস করে তাদের সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হবে। সে ক্ষেত্রে তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের সমাবেশে আরও উৎসাহিত হওয়া উচিত। তাহলে কি বিএনপি গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চাচ্ছে? ১০ ডিসেম্বরকে ঘিরে ঢাকায় একটা বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। পুলিশ কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সংঘর্ষ হবে। কয়েকজন মারা যাবেন। ব্যস, আন্দোলন বারুদের মতো জ্বলে উঠবে। এমন শর্ট-কাট পথে কি বিএনপি আন্দোলনে জয়ী হতে চায়? আমার তেমনটি মনে হয় না। আমার বরং মনে হয়, আন্দোলনের এই খেলায় বিএনপি আসলে পুতুল নাচের পুতুল মাত্র। বিএনপির আন্দোলনের সুতো অন্য কারও হাতে। কিংবা বিএনপির অবস্থা ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়াগণি মিয়ারমতো।গণি মিয়া একজন কৃষক। নিজের জমি নাই। অন্যের জমিতে চাষ করে।বিএনপি তেমনি অন্যের জন্য একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। কারও ঘরে ফসল তুলে দেওয়ার জন্য কেউ বা কারা যেন বিএনপিকে ভাড়া করছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে যাক-এটাই যেন বিএনপির একমাত্র চাওয়া। আওয়ামী লীগ সরে গিয়ে তৃতীয় শক্তিকে আনার সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বিএনপি? বিএনপির আন্দোলনের সুতো আসলে কার হাতে? বাংলাদেশ এখন গুজবের দেশে পরিণত হয়েছে। কান পাতলেই নানা গুজব শুনি। ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। গত বছর ওইদিনেই ্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বিএনপির সমাবেশ নিয়ে মূল মনোযোগ সবার। কিন্তু অলক্ষ্যে কি ১০ ডিসেম্বর অন্য কোনো ঘটনা ঘটবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর কয়েকটি মূলধারার গণমাধ্যম এখন প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ব্যর্থতার গুজব এবং অর্ধসত্য তথ্য প্রচার করে সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। এই অপপ্রচার এখন প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। কূটনৈতিকপাড়ায় এখন প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও চা-চক্র, ককটেল পার্টি কিংবা নৈশভোজের জমজমাট আয়োজন। সুশীলদের মলিন মুখে এখন হালকা হাসির রেখা। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে সংঘাত, হানাহানি লাগিয়ে কি কোনো তৃতীয় পক্ষ ফায়দা লুটতে চায়? আমলাদের মধ্যেও এখন সুবিধাবাদীরা নিরপেক্ষ সাজার মহড়া দিচ্ছেন। গোপনে সরকারের সমালোচনায় মুখর তারা। অতি উৎসাহী পুলিশের বাড়াবাড়ি, গায়েবি মামলা আসলে কার লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার? পর্দার আড়ালেই কি আসল খেলা চলছে? আবার কি এক-এগারোর মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির নীরব আয়োজন চলছে? এই প্রশ্নগুলো আমার মাথায় এসেছে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কৌশল এবং বক্তব্য দেখে। ছয় মাস ধরেই প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক শক্তিকে সামনে আনতে চাইছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।প্রধানমন্ত্রী বিরোধী আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছেন। ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ যেন নির্বিঘ্নে হতে পারে তার জন্য একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রথমত, তিনি ছাত্রলীগের সম্মেলন দুই দিন এগিয়ে এনেছেন। যেন ১০ ডিসেম্বর বিএনপির সমাবেশের মাঠ প্রস্তুত থাকে। বিএনপি মঞ্চ নির্মাণসহ আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী বিএনপির সমাবেশ নির্বিঘ্ন করতে পরিবহন ধর্মঘট না ডাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। তৃতীয়ত, এই সমাবেশের পাল্টা কোনো সমাবেশ না দেওয়ার জন্যও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দলের নেতা-কর্মীদের বলেছেন। শুধু বিএনপির সমাবেশের জন্য সহায়তা নয়। শেখ হাসিনা নিজেও দেশকে সুষ্ঠু রাজনীতিমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছেন। যশোরে জনসভা, আগামী ডিসেম্বর চট্টগ্রামের জনসভা তার বড় প্রমাণ। রাজনৈতিক গোলযোগে বিরাজনীতিকরণের পক্ষের মতলববাজরা যেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে সে ব্যাপারে শেখ হাসিনা সতর্ক। কিন্তু তাঁর দল কি তাঁর কৌশল বোঝে? নাকি কৌশল বুঝেও অপতৎপরতা চালাচ্ছে? আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যখন পরিবহন ধর্মঘট না ডাকার পরামর্শ দিচ্ছেন তখন জাসদ থেকে আমদানিকৃতগরু ছাগল চিনলেই ড্রাইভার হওয়া যায়এমন তত্ত্বের আবিষ্কারক এক নেতা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে ধর্মঘটের নেপথ্যে মদদ দিচ্ছেন। এই ধৃষ্টতা তিনি কীভাবে দেখান? এই সাহস কোত্থেকে তিনি পান। এখনো আওয়ামী লীগের কিছু নেতা দেখে নেব, খেয়ে ফেলব বলে যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছেন কার স্বার্থে? এক-এগারো এসেছিল সুশীল এবং পশ্চিমার কিছু দেশের পরিকল্পনায়। কিন্তু এর বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলের কিছু সুবিধাবাদী, আদর্শ বিবর্জিত নেতার হাত ছিল। সেই সময় রাজনীতির মাঠে যারা সবচেয়ে যুদ্ধংদেহি ছিলেন এবং এক-এগারোতে তারাই সংস্কারপন্থি ভাঁড় সেজেছিলেন। এখনো কি ওই অতি উৎসাহীরা একই খেলা খেলছেন? ১০ ডিসেম্বর কী হবে? ২০০৪ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আবদুল জলিল ট্রাম্পকার্ড তত্ত্ব হাজির করেছিলেন। ঘোষণা করেছিলেন ৩০ এপ্রিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পতন হবে। জন্য আওয়ামী লীগ লাগাতার বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল। ২১ এপ্রিল হাওয়া ভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ছিল। কিন্তু পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বনানী গুলিস্তান অবরুদ্ধ করে রাখে। ২৫ এপ্রিল স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা। ট্রাম্পকার্ড তত্ত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারও বিচলিত হয়েছিল। সময় তৎকালীন সরকার গণগ্রেফতার শুরু করে। ২৪ এপ্রিল থেকে আওয়ামী লীগ গণঅনাস্থা কর্মসূচি পালন করে। ২৮ এবং ২৯ এপ্রিল আওয়ামী লীগ ৪৮ ঘণ্টার হরতাল পালন করে। কিন্তু ৩০ এপ্রিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার থাকে বহাল তবিয়তে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০০৪ সালের ৩০ এপ্রিল ছিল বড় কৌতুক। এরকম কৌতুকের জন্ম দিয়েছিলেন বেগম জিয়াও। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে সরকারকে টেনেহিঁচড়ে নামাতে চেয়েছিলেন। ঘোষণা করেছিলেন গোপালগঞ্জ নামই পাল্টে দেবেন। ২০১৪-এর আন্দোলনে বেগম জিয়াগৃহত্যাগনাটক মঞ্চস্থ করেন। ২০১৩-এর জানুয়ারির নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বেগম জিয়া লাগাতার অবরোধের ডাক দেন।ফিরোজাথেকে বেরিয়ে আসেন গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে। ঘোষণা করেন তিনি ঘরে ফিরবেন না। সময় বেগম জিয়ার আন্দোলন নিয়েও অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। আতঙ্কিত মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। কিন্তু বেগম জিয়ারগৃহত্যাগনাটক ফ্লপ হয়। আজ অবধি বিএনপি ওই লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করেনি। বেগম জিয়ার ওই আন্দোলন বর্তমানে বিএনপির সমাবেশ নাটকের চেয়েও বড় পরিসরে ছিল। আন্দোলনের ব্যাপ্তিও ছিল ভয়ংকর। গাড়িতে গান-পাউডার দিয়ে মানুষ পোড়ানো। আগুন-সন্ত্রাস। নাশকতা। কী হয়নি সে সময়? কিন্তু সেই সময় সরকারের পতন হয়নি। তাই এবারও বিএনপির ঢাকা সমাবেশে কোনো দৈব বিপ্লব হবে না, এটা অনুমান করা যায়। আন্দোলন কোনো স্বপ্নে পাওয়া তাবিজ নয়। যা দিয়ে মুহূর্তেই মনের বাসনা পূরণ হবে। কিন্তু ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন ক্ষুধার্ত। তাই সরকারকে ১০ ডিসেম্বর লালকার্ড দেখানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই লালকার্ড কি ট্রাম্পকার্ডের মতোই হবে? কিন্তু ১০ ডিসেম্বর ষড়যন্ত্রের টানেল খুলে দিতে পারে। তৃতীয় শক্তির ক্ষমতায় আসার পথ তৈরির সূচনা হতে পারে। বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত ১০ ডিসেম্বর সহিংসতাকে উসকে দেয়। আওয়ামী লীগে ঘাপটি মেরে থাকা হাইব্রিড, সুবিধাবাদী এবং ষড়যন্ত্রকারীরা যদি বিএনপির সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তাহলে ষড়যন্ত্র ভয়ংকর হয়ে উঠবে। ১০ ডিসেম্বর রাজনীতিতে সহিংসতার আগুন লাগলে, সে আগুন সব খানে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত কুশীলবরা। তাই, শেখ হাসিনার নির্দেশনা মানতে হবে আওয়ামী লীগকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। সতর্কতার সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। না হলে বিরাজনীতি এবং অপরাজনীতির ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে যাবে রাজনীতি এবং গণতন্ত্র।  বিএনপি সেই ফাঁদে পা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ কি পারবে দূরে থাকতে?



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচনী সমঝোতা: কূটনীতিক পাড়ায় পাঁচ সমঝোতা প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণ মূলক করতে, বিশেষ করে বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেটি নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক পাড়ায় ব্যাপক তোড়জোড় চলছে। কূটনৈতিক মহল দফায় দফায় বৈঠক করছে। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য তারা বিভিন্ন মহলের সাথে দেনদরবার এবং কথাবার্তা বলছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। এই দাবি বাদ দিয়ে অন্য কোনো প্রস্তাব যদি দেওয়া হয় যেটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর সেটি বিবেচনা করা হবে। এই প্রেক্ষিতেই কূটনৈতিক মহল এখন তত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে একটি পাঁচ দফা প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। এই প্রস্তাবনা নিয়ে তারা নির্বাচন কমিশন, সুশীল সমাজ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নানা রকম কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে যে পাঁচ দফা প্রস্তাব এখন কূটনীতিকপাড়ায় ঝড় তুলেছে সেই প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে:

১. নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা নিশ্চিত করা। সচিবসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাতে নিয়ে আসা।


২. নির্বাচনকালীন সময়ে সেনা মোতায়েন এবং সেনা মোতায়েন তদারকির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে প্রদান করা।

৩. প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা যারা নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন তারা কোন রকম নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় অংশ গ্রহন করতে পারবেন না এমন অঙ্গীকার নিশ্চিত করা।

৪. নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরকে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাদেরকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা প্রদান করা। 

৫. নির্বাচনের আগে সরকার এবং বিরোধী দলের সমন্বয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ এবং সেই সংলাপের মাধ্যমে একটি নির্বাচনী সমঝোতা স্থাপন করা। 


সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে যে, এই বিষয়গুলোতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, একটি সংসদ বহাল রেখে মন্ত্রীদের স্বপদে দায়িত্বে রেখে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। এজন্য তারা সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। অবশ্য সে সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, এটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে যে, তারা যা কিছু করবে সংবিধানের আওতায় করবে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই।

তবে কূটনৈতিক মহল মনে করেন যে, নির্বাচন কমিশনকে আরও ক্ষমতাবান করে এবং এই ক্ষমতা বাধাহীনভাবে প্রয়োগ করা নিশ্চিত করলেই অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হতে পারে।

নির্বাচনী সমঝোতা   কূটনীতিক পাড়া   সরকার   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

রেডিমেড প্রার্থী, শর্টকাটে এমপি

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

ডিসেম্বর, ১৯৯০। সবে এরশাদ সরকারের পতন ঘটেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে। নির্বাচনী হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। সঙ্গে তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের তাগিদ।স্বৈরাচারের দালালদের প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে সম্মিলিত ছাত্রঐক্য। এর মধ্যেই এক বিকালে দুই সচিব ৩২ নম্বরেবঙ্গবন্ধু ভবনেহাজির হলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তারা দেখা করতে চান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নির্বাচন, তিন জোটের কার্যক্রম ইত্যাদি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তিনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতাকে দায়িত্ব দিলেন ওই দুই আমলার কথা শুনতে। আমলা মহলে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী ওই নেতা কেরামত আলী এবং এম কে আনোয়ারের সঙ্গে কথা বললেন। দুই আমলা জানালেন তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। এলাকায় তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। এখন দরকার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন। আওয়ামী লীগের ওই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এই দুই আমলার বক্তব্য দলীয় প্রধানকে জানালেন। কিন্তু শেখ হাসিনা তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। দুটি কারণে শেখ হাসিনা এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীকে ফিরিয়ে দিলেন। প্রথমত, এই দুজনই এরশাদের দোসর হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত। তিন জোটের রূপরেখায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, এরশাদের সহযোগী কাউকে তিন জোটের কোনো দল আশ্রয় দেবে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তিন জোটের রূপরেখার প্রতি সম্মান দেখালেন। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক সংগঠন। রাজনৈতিক সংগঠনে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার। রাজনীতিতে মনোনয়ন প্রাপ্তির কোনো শর্টকাট পথ নেই। হুট করে এসে কেউ মনোনয়ন পান না। দুই আমলার জন্য আওয়ামী লীগের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু ঘটনাচক্রে সে সময় বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা এসেছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেবঙ্গবন্ধু ভবনে তিন জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে। বৈঠক শেষে পেলেন ওই দুই আমলাকে। তাদের আগ্রহের কথা শুনে তাদের নিয়ে গেলেন বিএনপি কার্যালয়ে। বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করালেন। তারা পরদিন সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিলেন। নির্বাচনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন পেতেও কষ্ট হলো না এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীর। বিএনপির রেডিমেড প্রার্থী হিসেবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন এবং বিজয়ী হলেন।৯১-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সবাইকে চমকে দিয়ে জাতীয় সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। জামায়াতের সহযোগিতায় সরকার গঠন করল বিএনপি। এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলী দুজনই বিএনপি সরকারের মন্ত্রীও হলেন। তাদের মধ্যে এম কে আনোয়ার মৃত্যু পর্যন্ত বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শর্টকাটে এমপি এবং মন্ত্রী হওয়ার এটি একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ। আদর্শ চর্চা নেই। রাজনৈতিক চর্চা নেই। দলের প্রতি আনুগত্য নেই। দলের লক্ষ্য এবং আদর্শ সম্পর্কে জানাশোনা নেই। আলাদীনের চেরাগের মতো এক লহমায় এমপি, মন্ত্রী হয়ে গেলেন। এরশাদ জামানায় প্রতাপশালী দুই আমলা রাষ্ট্রের অর্থ খরচ করে এলাকায় উন্নতি করেছিলেন। রেডিমেড প্রার্থীও হয়েছিলেন।৯১ সালের নির্বাচনে এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীর কেরামতি রাজনীতিরশর্টকাটপথ উন্মোচন করে দেয়। অবশ্য৭৫-এর পর থেকে রাজনীতিতে শর্টকাটে এমপি হওয়ার হিড়িক শুরু হয়। জিয়া বিএনপি গঠন করেন বিভিন্ন দল থেকে ভাড়াটে লোক দিয়ে। এখন এই প্রবণতা সর্বব্যাপী। শর্টকাটে এমপি হওয়ার প্রবণতা যেমন ব্যক্তিদের মধ্যে বাড়ছে তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী, পরীক্ষিতদের বাদ দিয়েরেডিমেডপ্রার্থী খোঁজা এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।রেডিমেডপ্রার্থী অনেকটাই রেডিমেড জামাকাপড়ের মতো। আপনি দোকানে গেলেন গায়ে চরিয়ে বেরুলেন। আপনি দলে ভেড়ালেন, তিনি টাকার জোরে এমপি হয়ে গেলেন।৯১-এর ফলাফল বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগ তার প্রার্থী মনোনয়নের রক্ষণশীল অবস্থা থেকে সরে আসে।৯৬-এর নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আওয়ামী লীগও রেডিমেড এমপি প্রার্থীর খোঁজ শুরু করে। বিএনপি আগে থেকেই রেডিমেড প্রার্থীনির্ভর দল। প্রধান দুটি দল যখন রেডিমেড প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে থাকে, তখন শর্টকাটে এমপি হওয়াটা স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এমনকি আদম ব্যবসায়ী শর্টকাটে এমপি হওয়ার দৌড়ে শরিক হন। শর্টকাটে মনোনয়ন ইচ্ছুকদের জায়গা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ৯৬ সালের নির্বাচনে প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, মোজাফফর হোসেন পল্টুুসহ বহু মাঠের রাজনীতিবিদকে মনোনয়নবঞ্চিত করে। শর্টকাটে এমপি হওয়ার ফর্মুলা কী? আপনি বিপুল বিত্তের মালিক হলেন (বৈধ বা অবৈধ পথে) এলাকায় গিয়ে মসজিদ, মাদরাসা বানালেন। মানুষের বিয়েতে, অসুখে দান-খয়রাত করলেন। কোরবানির ঈদে এলাকায় ১০০ গরু কোরবানি দিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন। ব্যস, কিছু মানুষ আপনার হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপির কিছু লোকজন প্রকাশ্যে গোপনে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তাদের আপনি কচকচে নতুন ঘ্রাণযুক্ত টাকা দেবেন। শর্টকাটে এমপি হওয়ার এটাই একমাত্র পথ নয়। আপনি সরকারি কর্মকর্তা। হঠাৎ দেখলেন, এলাকার লোকজন আপনার কাছে আসেন। এলাকায় রাস্তা নেই, ব্রিজ নেই। স্কুল এমপিওভুক্ত করতে হবে। মসজিদের ছাদ ঢালাই করতে হবে। আর এলাকার বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে তো আপনাকে নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে। একজন আমলা যখন সচিব হন, তখন তার বিস্তর ক্ষমতা। আমলে তো সচিবদের ক্ষমতা আকাশ স্পর্শ করেছে। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ শুরু হলে জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয় সচিবদের। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জেলার সর্বময় ক্ষমতার মালিক হন সচিবরা। এমপি, মন্ত্রীদের পাত্তা নেই। আমলারাই জেলার সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এলাকায় তাদের কদর বাড়ছে। সুবিধাবাদী চাটুকাররা ভিড় জমাচ্ছে। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, আপনি তো সংসদ সদস্যের চেয়ে জ্ঞানী, বিচক্ষণ। আপনি এলাকার এমপি হলে তো এই এলাকাই পাল্টে যেত। জনগণ আপনাকেই চায়। চারপাশে চাটুকার পরিবেষ্টিত আমলারাও খুশিতে গদগদ। ভাবলেন তাই তো। এমপি এলাকায় কী করছেন। রাস্তা বানিয়ে দিলাম আমি। কাবিখার তালিকা তৈরি করছি আমি। আশ্রয়ণের ঘর কারা পাবে তার সিদ্ধান্ত আমার ওপর ন্যস্ত। তিনি হয়ে গেলেন আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার। শর্টকাটে এমপি হওয়ার খায়েশ তাকে পেয়ে বসল। আগে শর্টকাটে এমপি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে গেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের সংখ্যা এখন জাতীয় সংসদে ৫০ ভাগের বেশি। এদের বেশির ভাগেরই রাজনীতির অতীত অভিজ্ঞতা নেই। ব্যবসা করছেন। ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে নানা ফাঁকফোকর দিয়ে পরিশোধ করছেন না। আবার ঋণখেলাপিও হচ্ছেন না। তারা এলাকায় নিজস্ব ভাড়াটে বাহিনী তৈরি করেছেন।মাই ম্যানদের দিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই আরেক আওয়ামী লীগ বানিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা শর্টকাটে এমপি হয়েছেন বা হওয়ার মিছিলে আছেন, তাদের এক ধরনের ব্যবসায়িকমতলবআছে। এমপি বা মন্ত্রী হলে তার ব্যবসা বাগাতে সুবিধা হবে। সচিবালয়ে দেনদরবার সহজ হবে। ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিতে হবে না। টেন্ডার পেতে সুবিধা হবে। কাজেই ব্যবসায়ীদের জন্য নির্বাচন ভালো বিনিয়োগ।৭৫-এর পর থেকে ব্যবসায়ীরা তাই রাজনৈতিক খাতে বিনিয়োগে ব্যাপক উৎসাহী। তাদের টাকার জোয়ারে জাতীয় সংসদে রাজনীতিবিদরা রীতিমতো কোণঠাসা। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের শর্টকাটে এমপি হওয়ার কারিশমায় মুগ্ধ অনেক উঠতি রাজনীতিবিদও প্রলুব্ধ হয়েছেন। তারা সততা, আদর্শবাদিতা, ত্যাগ ইত্যাদি সেলফে উঠিয়ে রেখেছেন। মনোনয়ন পেতে হলে টাকা লাগবে। নির্বাচন করতে টাকা লাগবে। টাকা বানানোর উপায় কী? টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি। রাজনীতিবিদ পরিচয়ের আড়ালে তারা লুটপাটের মিশনে নামছেন কোমর কষে। টাকা ছাড়া এমপি হওয়া যাবে না। তাই শর্টকাটে এমপি হওয়ার জন্য তারা শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার দৌড়ে। এদের সংখ্যাও জাতীয় সংসদে কম না। সে তুলনায় জাতীয় সংসদে আমলাদের উপস্থিতি নগণ্য। নিয়ে আমলা মহলে কারও কারও অন্তহীন দুঃখ। চাকরিতে থাকতে প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। চাকরির মেয়াদ শেষ হলেই আমলাদের ছোটাছুটি শুরু হয়। কেউ চেষ্টা করেন বয়স শেষ হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে। কেউ চান কোনো কমিশন বা সংস্থার অবসরোত্তর চাকরি। কারও প্রত্যাশা নিদেনপক্ষে কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়া। এভাবে আমলারা প্রায় সব প্রতিষ্ঠান এবং পদ দখল করে ফেলেছেন। জাতীয় সংসদ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর প্রধান কারণ অবশ্য আমলাদের ব্যর্থতা নয়। এখন যেভাবে বর্ষার বিলের মাছের মতো ক্ষমতার চারপাশে আমলারা কিলবিল করেন, তাতে সংসদ ভবনে প্রবেশ তাদের মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন আমাদের করিৎকর্মা আমলারা। কিন্তু বাধা হয়ে আছে একটি আইনে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২। এই আইনের ১২() () ধারায় বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে কোনো ব্যক্তি সদস্য হিসেবে (সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হওয়ার বা থাকার যোগ্য হবেন না, যদি-

() তিনি প্রজাতন্ত্রের বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগে কোনো চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন বা অবসরে গেছেন এবং তার পদত্যাগ এবং অবসরে যাওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত না হয়।বাসি ফুলের যেমন কদর থাকে না, তেমনি অবসরের তিন বছর অতিবাহিত হলে আমলাদেরকৃত্রিম ক্ষমতানিঃশেষ হয়ে যায়। তিন বছর অতিবাহিত হওয়ার পর রাজনীতির মাঠে যারা টিকে থাকেন, তারা নিজস্ব শক্তিতে অস্তিত্ব বজায় রাখেন। সময় তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা আমলা থেকে নেতারা ঝরে পড়েন। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমলারাই (সামরিক এবং বেসামরিক) ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ করতে চাচ্ছেন। গত ১৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার এই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন করা হয়েছে। রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের তিন বছর পর সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিধান কেন সংবিধান পরিপন্থী নয়, হাই কোর্ট তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। বিচারপতি জাফর আহমেদ বিচারপতি মো. বশির উল্লার সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ১২ () () চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল। কিছু দিন ধরেই আমলাদের পক্ষ থেকে ধারাটি বাতিলের চাপ ছিল। প্রথমে কিছু আমলা ধারাটি বাতিল করার জন্য সরকারকে প্ররোচিত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত স্বপ্রণোদিত হয়ে আইন পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এর আগেও কয়েকজন আমলা আইনটি বাতিলের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু আদালতে রিট আবেদন করতে হলে আবেদনকারী সংক্ষুব্ধ হতে হবে- এই যুক্তিতে আবেদন আমলে নেয়নি হাই কোর্ট। এখন রিট আবেদনটি আদালতের বিচারাধীন বিষয়। বিচারকগণ স্বীয় বুদ্ধি এবং আইনগত দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এই আইনটির পক্ষে-বিপক্ষে দুই ধরনের যুক্তি আছে। একজন আমলা অবসরে যাওয়ার পর প্রথম এক বছর থাকেন অবসরোত্তর ছুটিতে। সময় তিনি কাজ করেন না বটে কিন্তু বেতন-ভাতাদি ভোগ করেন। পরবর্তী দুই বছরও তার গায়ে ক্ষমতার উত্তাপ লেগে থাকে। নির্বাচনী মাঠে তিনি বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন, এরকম বিবেচনা থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য তিন বছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যারা এর পক্ষে তারা মনে করেন, এই বিধান না থাকলে নির্বাচনের মাঠে আমলা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পাবেন। রাজনৈতিক দল প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে নির্বাচনে কারা বেশি দাপট দেখাতে পারবেন। সদ্য অবসরে যাওয়া একজন আমলা নির্বাচন পরিচালনায় মাঠ প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার প্রতি পক্ষপাত দেখাবে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো আমলাদের মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী হবে। তারাই হবে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন রেডিমেড প্রার্থী, যারা শর্টকাটে এমপি হতে পারবে।

আবার এর বিপক্ষের যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইন সমান। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।অবসরের পর একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারী আর ১০ জন সাধারণ নাগরিকের মতোই। কাজেই তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

পক্ষে-বিপক্ষে এরকম আরও যুক্তি আছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমলা, ব্যবসায়ী, লুটেরা, কালো টাকার মালিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।৭৫-এর পর জিয়া ক্ষমতা দখল করে বলেছিলেন, তিনি রাজনীতিডিফিকাল্টকরে দেবেন। সত্যি সত্যি দেশে রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। সংসদ সদস্য হওয়ার মিছিলে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন সত্যিকারের রাজনীতিবিদরা। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে কোনো ধরনের নির্বাচনে জয়ী হতে চায়। আর জয়ী হওয়ার জন্য তারা রেডিমেড প্রার্থী খোঁজে। আবার বিপুল অবৈধ বিত্তকে আরও স্ফীত করতে এবং তাকে নিরাপদ রাখতে শর্টকাটে এমপি হওয়ার মিছিলও বড় হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর- আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের কথা মনে আছে? টাকার জোরে উড়ে এসে এমপি হয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রীকেও টাকা দিয়ে মহিলা কোটায় সংসদ সদস্য বানিয়ে ছিলেন। অনেক পাপুলই এখন নির্বাচন করে দায়মুক্তি অর্জন করতে চায়। পরিস্থিতির মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারাও যদি এমপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন তাহলে সত্যিকারের রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি আরও কঠিন হয়ে যাবে। দেশের জন্য অবদান রাখার অনেক উপায় আছে। যে যেখানে যে অবস্থানে আছেন সেখান থেকেই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। একজন ব্যবসায়ী দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবেন। এটাই তার পবিত্র কাজ। কেন তাকে এমপি হতে হবে? একজন সরকারি কর্মকর্তা সততা, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেই দেশকে এগিয়ে নিতে পারেন। জন্য তার এমপি হওয়ার দরকার নেই। সমাজে প্রত্যেক পেশার নাগরিকের আলাদা আলাদা অবস্থান, ভূমিকা এবং দায়িত্ব আছে। ব্যবসায়ী কিংবা আমলাদের যেমন রাজনীতির মাঠ দখল শুভ লক্ষণ নয়, তেমনি রাজনীতিবিদদেরও ব্যবসায়ী হওয়াটা উচিত নয়। দেশের সবাই যদি এমপি-মন্ত্রী হতে চান, তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হবে। যে ভারসাম্যহীতা এখনই লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের কাছে রাজনীতি ফিরিয়ে আনার কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। একাধিক উপনির্বাচনে তিনি দলের ত্যাগী পরীক্ষিত রাজনীতিবিদদের মনোনয়ন দিয়ে একটি বার্তা দিয়েছেন। সংসদীয় দলের সভাতেও আগামী নির্বাচনে দলের পরীক্ষিতদের সামনে আনার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। কিন্তু ঝুঁকিবিহীন, গুরুত্বহীন উপনির্বাচনে তিনি এমনটা করতে পারছেন বটে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষ যখন রেডিমেড প্রার্থী খুঁজবে, তখন আওয়ামী লীগ কি শর্টকাটে এমপি হতে ইচ্ছুকদের উপেক্ষা করতে পারবে? ২০১৮ নির্বাচনে বিএনপিতে দেখা গেল রেডিমেড প্রার্থীর হিড়িক। এহছানুল হক মিলনের মতো জাতীয়ভাবে পরিচিত নেতাকে বসিয়ে টাকাওয়ালা রেডিমেড প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি তার আসল রাজনীতি প্রকাশ করেছিল। আগামী নির্বাচনে বিএনপিতে যে রেডিমেড প্রার্থীর হিড়িক পড়বে তা সহজেই অনুমান করা যায়। আওয়ামী লীগেও অনেক আসনে পরিবর্তনের তাগিদ আছে। ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাবেন নাকি শর্টকাটে এমপি বানাতে আওয়ামী লীগও রেডিমেড প্রার্থী খুঁজবে?

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা সংশয়ের কথা বলা হয়। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না। কিন্তু আমি মনে করি, আগামী নির্বাচন রাজনীতির জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। শর্টকাটে রেডিমেড এমপিদের হাতে যেন জাতীয় সংসদ জিম্মি না হয়, সেটি এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনীতি রাজনীতিবিদের হাতে থাকবে কি না, তা আগামী নির্বাচনের এক বড় পরীক্ষা।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কোন মিশনে গওহর রিজভী ঢাকায়

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail ড. গওহর রিজভী। ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর ঢাকা আগমন নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল আগামী রাষ্ট্রপতি পদের জন্য তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে এজন্যই তাকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, ড. গওহর রিজভী রাষ্ট্রপতি হচ্ছে না। বরং প্রধানমন্ত্রী অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্টে তাকে ঢাকায় ডেকে পাঠিয়েছে। গওহর রিজভী বাংলা ইনসাইডারকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। তবে কেন তিনি ঢাকায় এসেছেন এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তিনি জানাননি। 

বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ একটি কূটনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করার জন্য একটি প্রচ্ছন্ন চাপ প্রয়োগ করেছে। সর্বশেষ ডোনাল্ড লু এর সফরের পর আওয়ামী লীগ এবং সরকারের পক্ষ থেকে এক ধরনের আত্মতুষ্টি লক্ষ্য করা যায় এবং আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা অযাচিতভাবে মনগড়া কিছু বক্তব্য দিয়ে ডোনাল্ড লু এর সফর নিয়ে তাদের সাফল্য গাঁথা প্রচার করা শুরু করেন। এর প্রেক্ষিতে  মার্কিন দূতাবাস একটি বিবৃতি দিয়ে ডোনাল্ড লু এর সফর সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। যা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার বক্তব্য সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেটের ঢাকা সফরের সময়। সে সময় মিশেল ব্যাচেলেটের বাংলাদেশ সফর নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই একজন নেতা এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন যা মিশেল ব্যাচেলেট বলেনি। এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কিছু বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশ আগামী নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহঅবস্থান ঘোষণা করছে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে কূটনীতিক অঙ্গন সামাল দেওয়ার জন্যই ড. রিজভীকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানা গেছে। 

ঢাকায় এসেই ড. রিজভী ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। বাংলা ইনসাইডারকে তিনি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তিনি ৪৮ টি বিভিন্ন ধরনের বৈঠক করেছেন। উল্লেখ্য যে, কূটনৈতিক মহলে ড. গওহর রিজভীর একটি ভালো গ্রহণযোগ্যতা এবং সুনাম রয়েছে।  আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই বিশেষজ্ঞ কূটনৈতিক পাড়ায় অত্যন্ত শ্রদ্ধার আসনে আসীন। ২০১৪ নির্বাচনের আগে যে রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল তা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ড. গওহর রিজভীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় তিনি কূটনৈতিক মহলে দফায় দফায় বৈঠক করে তাদেরকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, নির্বাচন একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। তিনি এটিও বুঝেছিলেন যে, সংবিধান সবার ওপরে এবং এই প্রেক্ষিতে ২০১৪ নির্বাচনকে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গ্রহণ করে। 

ড. গওহর রিজভীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রভোষ্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ডেমোক্র্যাট শিবিরের বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং উপদেষ্টাদের সাথে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এখন যখন বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে ঠিকঠাক মতো গুছিয়ে নিতে পারছেন না তখন গওহর রিজভীর ডাক পড়েছে বলে বিভিন্ন মহল মনে করেন। ড. গওহর রিজভীর গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক সুনাম এবং তার কূটনৈতিক কৌশলকে কাজে লাগানোর জন্য আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গওহর রিজভীকে ঢাকায় এসেছেন বলে জানা গেছে। এখন আগামী দিনে গওহর রিজভী নির্বাচনী কূটনীতি কিভাবে সামাল দেন সেটিই দেখার বিষয়।

ড. গওহর রিজভী   প্রধানমন্ত্রী   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র   নির্বাচন   উপদেষ্টা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

বঙ্গভবনের যাবার প্রস্তুতি শুরু ড. মসিউরের

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail ড. মসিউর রহমান। ফাইল ছবি

অন্য কোন অঘটন না ঘটলে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান হতে যাচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করেছেন ড. মসিউর রহমান। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে ড. মসিউর রহমানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তার শারীরিক কোন বড় ধরনের সমস্যা নেই বলেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্টে জানানো হয়েছে। সাধারণত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা একটি বাধ্যবাধকতা। কারণে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হবেন এমন ব্যক্তির শারীরিক সুস্থতা অত্যন্ত জরুরী বিষয়। এর আগেও আর জিল্লুর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি হন তখন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তত্ত্বাবধানে জিল্লুর রহমানের পরীক্ষা করা হয়েছিল। আব্দুল হামিদকেও রাষ্ট্রপতি করার আগে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। এবার মসিউর রহমানের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরেই ধারণা করা হচ্ছে তিনি হতে যাচ্ছেন বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দার। 


ড. মসিউর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করা হবে এ ব্যাপারে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তিনি তার দাপ্তরিক কাজকর্ম ঘটিয়ে ফেলেছেন, কোন রকম কর্মসূচি তিনি গ্রহণ করছেন না। রাষ্ট্রপতি হবার প্রস্তুতি হিসেবে এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। উল্লেখ্য যে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের মেয়াদ আগামী এপ্রিলে শেষ হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে মেয়াদপূর্তির ৯০ দিনের মধ্যে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। ধারণা করা হচ্ছে যে, মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন শুধুমাত্র একটি মনোনয়নপত্র পড়বে। কারণ জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ৩৪৩জন জাতীয় সংসদ সদস্যের অধিকাংশ আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত। সে কারণে আওয়ামী লীগ যাকে মনোনয়ন দিবে তিনি নতুন রাষ্ট্রপতি হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 


আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে মনোনয়ন বোর্ডের সভা ডাকবেন। এমন তথ্য আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে। আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে যে, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মনোনয়ন বোর্ডের কমিটি রয়েছে, রয়েছে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কোনো মনোনয়ন বোর্ড নেই। গতবার আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের জন্য প্রেসিডিয়ামের সভা আহ্বান করেছিল। তার আগের বারের সময় (জিল্লুর রহমান) আওয়ামী লীগের সংসদীয় কমিটির বৈঠকের নতুন রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এবার নতুন রাষ্ট্রপতি কোন প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত করা হবে তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সভাপতির হাতেই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি যাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে যোগ্য বিবেচনা করবেন তাকেই যে দলের নেতাকর্মীরা রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেনে নিবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আর এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ  হলো ড. মসিউর রহমান। সেটিও এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, ড. মসিউর রহমান রাষ্ট্রপতি হবার বিষয়টি ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় মহলে জানাজানি হয়ে গেছে। আর সেকারণেই এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় ড. মসিউর রহমান।

বঙ্গভবন   রাষ্ট্রপতি   ড. মসিউর রহমান   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কবির বিন আনোয়ারের কি হলো?

প্রকাশ: ০২:০২ পিএম, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

গত ৩ জানুয়ারি মাত্র ১৭ দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গেছেন কবির বিন আনোয়ার। সাবেক ছাত্র লীগের নেতা হিসেবে পরিচিত এই দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা মাত্র ১৭ দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা মুখি আলোচনা হয়েছিলো। যখন তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব করা হয়, তখন অনেকেই ধারণা করেছিলো তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হবে। কিন্তু বিস্ময়কর ভাবে না বাড়িয়ে মাত্র ১৭ দিনের মাথায় তাকে অবসরে পাঠানো হয়। এরপর নানা রকম গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

কবির বিন আনোয়ারকে অবসরে পাঠানো নিয়ে বিভিন্ন মুখী বক্তব্য পাওয়া যায়। এর দুই দিন পরেই ৫ জানুয়ারি কবির বিন আনোয়ার ধানমন্ডির ৩ নম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে যান এবং সেখানে আওয়ামী লীগের দুইজন নেতা বিপ্লব বড়ুয়া ও ড. সেলিম মাহমুদ তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। সে কার্যালয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান প্রয়াত এইচ টি ইমামের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় কবির বিন আনোয়ারকে এবং তিনি এইচ টি ইমামের চেয়ারে বসেন। সে সময়ে বিভিন্ন নেতা কর্মীদেকে তিনি বলেন তাকে নির্বাচনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগের দিন অবশ্যক কবির বিন আনোয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সপরিবারে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এবং সেখানে আগামী সংসদ নির্বাচনে কাজ করার জন্য তিনি আগ্রহ ব্যক্ত করেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার আগ্রহে সায় দিয়েছেন এবং তাকে নির্বাচন পরিচালনার কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

এরপর কবির বিন আনোয়ারকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা যায়। সে সময়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েযে প্রয়াত এইচ টি ইমামের জায়গায় তাকে দেওয়া হচ্ছে এবং তিনি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীতে বা নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে কবির বিন আনোয়ারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিলো যে, কবির বিন আনোয়ারকে হয়তো প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হবে। কিন্তু সে ব্যাপারেও এখন পর্যন্ত কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাহলে কবির বিন আনোয়ারের পরিণতি কি হবে? কি হলো তার?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কবির বিন আনোয়ারের ব্যাপারে কতগুলো সুনির্দিষ্ট আইনগত সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা পি আর এল অবসরে আছেন। পি আর এলে থাকা মানে তিনি সরকারের বেতন ভাতা সহ সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে থাকেন। এই সময় তিনি একজন সরকারি কর্মচারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার কারণে এই সময়ে তাকে কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে যে, কবির বিন আনোয়ার এখন নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত কিছু দায়িত্ব পালন করছেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে তিনি কো-চেয়ারম্যান বা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হতে পারবেন না চাকরির বাধ্যবাদকতার কারণে। এজন্য তাকে পি আর এল সমপন্ন করতে হবে এবং সে কাজটি এখন পর্যন্ত করা হয়নি। আবার কোন কোন মহল মনে করছেন যে, গণপ্রতিনিধির আদেশে ১২ এক এর চ ধারা ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং এই ধারাটি যদি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায় তাহলে কবির বিন আনোয়ার আগামী সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জের একটি আসন থেকে নির্বাচন করবেন। সিরাজগঞ্জের ওই আসনে বর্তমান এমপি ডাক্তার হাবিবে মিল্লাত নানা কারণে আগামী নির্বাচনে তিনি মননোয়ন পাবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সে নির্বাচনের জন্য তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন পদ দেওয়া না হলেও কবির বিন আনোয়ার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রমের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত আছেন বলেই বিভিন্ন মহল জানিয়েছেন।



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন