এডিটর’স মাইন্ড

বিএনপির জন্য পিটার হাসের ‘শিক্ষা’

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২০ নভেম্বর, ২০২৩


Thumbnail

মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে যা কল্পনা করে, তা সবসময় সঠিক হয় না। এই যেমন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাসের কথাই ধরা যাক। আমি ভেবেছিলাম, বুধবার (১৫ নভেম্বর) জাতীয় নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর তার ব্যস্ততা বাড়বে। তিনি ছুটে যাবেন নির্বাচন কমিশনে। মার্কিন দূতাবাসে ডেকে নেবেন রাজনৈতিক নেতাদের। ব্যস্ত সময় কাটাবেন। কিন্তু কী আশ্চর্য, পিটার হাস গেলেন ছুটিতে। কতদিনের ছুটি, কবে ফিরবেন কেউ ঠিকঠাকমতো বলতে পারে না। অনুমান করা যায়, ২৩ নভেম্বর থ্যাঙ্কসগিভিং ডে পালন করে তিনি দেশে ফিরবেন। ততদিনে পদ্মা মেঘনায় অনেক জল গড়াবে। অথচ তপশিল ঘোষণার আগপর্যন্ত তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। তপশিল ঘোষণার দিন সকালবেলাই তিনি সচিবালয়ে ছুটে যান। ডোনাল্ড লুর চিঠি পৌঁছে দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের হাতে। ওই চিঠিতে শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এর দুদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দেখা করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের সঙ্গে। ওই সাক্ষাতের পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

২৮ অক্টোবর বিএনপির তাণ্ডবের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত শর্তহীন সংলাপ ইস্যু সামনে এনেছিলেন। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর গণমাধ্যমের কাছে সংলাপের ট্রিজার অবমুক্ত করেন পিটার হাস। এরপর তিনি আওয়ামী লীগের মরচেধরা নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গেও পরীবাগে গিয়ে বৈঠক করেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বিরামহীনভাবে নাক গলানো এ রাষ্ট্রদূতের তৎপরতায় জনগণের দৃষ্টি ছিল। বিএনপির নেতারাও ছিলেন আহ্লাদে আটখানা। পিটার হাসের ‘ম্যাজিক’ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন আমাদের সুশীল সমাজ। বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ তো কিছুদিন আগে থেকেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ‘অবতার’ মানছিলেন। কারাবন্দি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাখঢাক ছাড়াই বলেছিলেন, ‘বিদেশিদের তৎপরতা আমাদের সাহস জোগায়।’ বিএনপি নেতারা তো প্রকাশ্যেই বলতেন, পিটার ডি হাস যখন আছেন তখন আমাদের চিন্তা নেই। তাই নির্বাচন কমিশন তপশিল ঘোষণা করবে আর মার্কিন রাষ্ট্রদূত তা চুপচাপ বসে দেখবেন, এটা তো হতেই পারে না। তপশিলের পরেই দেখা যাবে অবতারের অগ্নিরূপ। নিষেধাজ্ঞা আসবে, অর্থনৈতিক অবরোধ আসবে, মার্কিন হুংকারে সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে। বিএনপি সবসময় বলেছে, ২০১৪-এর মতো নির্বাচন এবার আর যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। ডোনাল্ড লুর দরকার নেই, হাস মহাশয়ই আওয়ামী লীগের ঘাড় মটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এ আশায় বিএনপি দফায় দফায় অবরোধ ডাকছিল। অবরোধ ডেকে টোকাই আর ছিঁচকে মাস্তানদের পেট্রোল বোমা মারার ঠিকাদারি দিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। কাউকে কিছু করতে হবে না, যা করার করবেন ‘অবতার’। নির্বাচন কমিশন যখন তপশিল ঘোষণা করলেন, তখন বিএনপি নেতারা নিজেদের অজান্তেই মুচকি হেসেছেন। ভাবখানা এমন, এবার দেখবে অবতারের কারিশমা। কিন্তু কীসের কী, অবতার গেলেন ছুটিতে। ছুটি নিয়েও চলছে লুকোচুরি। এ নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই। একজন ব্যক্তি কিংবা একজন রাষ্ট্রদূত ছুটিতে যেতেই পারেন। তারও বিশ্রাম প্রয়োজন, দরকার একটু বিনোদন। কিন্তু তাই বলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ছুটি?

নির্বাচন একটি দেশের স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। সংবিধান এবং আইনের বিধিবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচন প্রতিবার রীতিমতো যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। এবারের ‘যুদ্ধ’ প্রকাশ্য রূপ লাভ করে, গত বছর ১৫ মার্চের পর থেকে। আরও সহজভাবে বললে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ডি হাসের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্র। তাই সব দেশেই মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিশেষ মর্যাদা পান। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নের পথে হাঁটা দেশগুলো নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ দেশে যারাই মার্কিন রাষ্ট্রদূত হয়ে এসেছেন, তারাই পেয়েছেন বিশেষ সম্মান ও সমীহ। তাদের অভিপ্রায়কেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাদের অনেকেই এ গুরুত্ব ও সম্মানকে মর্যাদা দিয়েছেন। তারা বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হয়েছেন। দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কাজ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তাদের মধ্যে ২০১৫ থেকে ’১৮ সালে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করা রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটের কথা বিশেষভাবে বলতেই হয়। বার্নিকাট রিকশায় চড়েছেন, ফুচকা খেয়েছেন, শাড়ি পরে বাঙালি সংস্কৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। তাই বলে এমন নয় তিনি নির্বাচন নিয়ে কথা বলেননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার তার এজেন্ডা থেকে বাদ গেছে। বার্নিকাটের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় হয়েছিল ২০১৬ সালে। আমার প্রতিষ্ঠান মার্কিন দূতাবাসের জন্য একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছিল। মার্কিন ভিসা পেতে অনেকে দালাল ধরে, তথ্য জালিয়াতি করে, এটা বন্ধের জন্য একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন দূতাবাস। বার্নিকাট নিজে বিজ্ঞাপন নির্মাণের তদারকি করেছিলেন। এ সময় তার সাংস্কৃতিক জ্ঞানে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমাদের বানানো বিজ্ঞাপন ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। ২০১৬ সালে নির্মিত ওই বিজ্ঞাপনটি এখনো দূতাবাসের ওয়েবসাইটে দেখে গর্বিত হই বৈকি। বিজ্ঞাপন নির্মাণের পর তিনি এ কাজে জড়িত আমাদের পুরো টিমকে আমেরিকান ক্লাবে দাওয়াত দিয়েছিলেন। আমি তাকে আড়ংয়ের ছোট্ট একটা রিকশা আর ‘এক তারা’ দিয়েছিলাম। বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতি, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি নিয়ে তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথা হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘এ দেশে আমি মুগ্ধ। আমি এ দেশ থেকে অনেক কিছু শিখতে এসেছি।’ বার্নিকাট ছিলেন বিনয়ী, স্নিগ্ধ। যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন শাড়ি পরে।

আরেকজন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সখ্য হয়েছিল, তিনি হলেন ড্যান মজিনা। তিনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০১১ সালের নভেম্বরের শেষদিকে। সে সময় আমরা পরিপ্রেক্ষিতের উদ্যোগে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিয়ে একটা নিরীক্ষামূলক প্রকল্প করেছিলাম। তাদের নিজস্ব কৃষ্টির স্মারক চিহ্নগুলোকে আমরা মূলধারায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিই। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ধানমন্ডিতেই পরিপ্রেক্ষিত কার্যালয়ে আমরা পাহাড়ি জনপদের মানুষদের তৈরি পণ্যের প্রদর্শনী করি। একবারেই ঘরোয়া উদ্যোগ। অপ্রত্যাশিতভাবে প্রদর্শনী দেখতে আসেন জাপানি রাষ্ট্রদূত। তিনি অনুরোধ করেন, তার বাসভবনে এরকম একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করতে। ওই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনে এসেছিলেন ড্যান মজিনা। আন্তরিক আর স্বতঃস্ফূর্ত মানুষ। ওইদিন তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আমি তাকে সমুচা ও শিঙাড়ার পার্থক্য বোঝাতে গলদগর্ম হয়েছিলাম। সে কথা মনে হলে এখনো হাসি পায়। বার্নিকাট কিংবা ড্যান মজিনাও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। কিছু বিতর্কেরও হয়তো জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু কেউই কূটনীতিক সীমার বাইরে যাননি। তাদের বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তৎপরতা কোনোভাবেই পিটার হাসের আগ্রাসী দৌড়ঝাঁপের ধারেকাছেও নয়। ২০০৯-এর পর যারাই বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে এসেছেন, তারা সবাই কমবেশি বন্ধুত্বের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পিটার হাস এসেই যেন ভিন্ন বার্তা দিতে শুরু করেন। একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তিনি যেভাবে মাথা ঘামিয়েছেন, তা বিস্ময়কর। তার কিছু আচরণ অনেকেই পক্ষপাতদুষ্ট মনে করে। যেমন ‘মায়ের ডাক’ বলে বিতর্কিত একটি সংগঠনের নেতার বাসায় যাওয়া। কিংবা গুম নিয়ে একটি বিতর্কিত প্রামাণ্যচিত্র দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুকে স্থান দেওয়া কতটা যৌক্তিক ছিল, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। গত বছর ৭ ডিসেম্বর বিএনপি অফিসের সামনের ঘটনার পর তার চটজলদি প্রতিক্রিয়া আদৌ জরুরি ছিল কি না, তা নিশ্চয়ই একদিন তিনিই মূল্যায়ন করবেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে গিয়ে গণমাধ্যম সম্পর্কে তার বক্তব্য হুমকি কি না, তা নিশ্চয়ই মিস্টার হাস বিবেচনা করবেন। কিন্তু এসব তাকে যে বিতর্কিত করেছে, তা বলাইবাহুল্য। যে কোনো দেশে একজন রাষ্ট্রদূতের কিছু নির্দিষ্ট এজেন্ডা থাকে। কিছু লক্ষ্য বাস্তবায়নের তাগিদ থাকে। নিশ্চয়ই পিটার হাসেরও তেমন কোনো এজেন্ডা আছে। কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্যই তিনি চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গত দেড় বছরে তার লক্ষ্য অর্জনের কৌশল ছিল আক্রমণাত্মক ও বিতর্কিত। বন্ধুত্ব নয়, তিনি যেন প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। পিটার ডি হাসের তৎপরতা অনেকের কাছেই ১৯৭৫ সালে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজেন বুস্টারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মিস্টার হাস বাংলাদেশের বিভক্ত রাজনীতি সম্পর্কে পড়াশোনা করেই এসেছেন। কিন্তু তিনি বোধহয় এ দেশের সংস্কৃতি, মানুষের মন-মানসিকতা কিংবা আবেগ সম্পর্কে ভালো হোমওয়ার্ক করেননি। বাংলাদেশ জোয়ার-ভাটার দেশ। এ দেশের মানুষ খুবই আবেগী। ভালোবেসে কিছু চাইলে বাঙালি নিজের জীবন দিয়ে হলেও অতিথির আবদার পূরণ করে। কিন্তু কেউ প্রভুত্ব করতে চাইলে, জীবন দিয়ে হলেও প্রতিরোধ করে। এই সহজ, সরল উপলব্ধিটি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের হয়েছিল কি না, আমি জানি না। কিন্তু আমি মনে করি, এরকম একজন মেধাবী উচ্চশিক্ষিত কূটনীতিক সবকিছু আরও শালীন ও শিষ্টাচার সম্মতভাবে করতে পারতেন। সবাইকে আস্থায় নিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের বার্তা বাহক হতে পারতেন পিটার হাস। তবে তিনি একটি কাজ করেছেন। তার তৎপরতার কারণে বিএনপির প্রত্যাশার বেলুন ফুলে উঠেছিল। বিএনপি তাকে দেবদূত ভাবতে শুরু করেছিল। নির্বাচনের তপশিলের পরদিন ছুটিতে গিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিএনপিকে দুটি শিক্ষা দিলেন। প্রথমত, অন্যের ভরসায় কোনো লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। বিএনপি ভেবেছিল, তারা নির্বাচনে যাব না বলে বসে থাকলেই সরকারের পতন হবে। তাদের কিছুই করতে হবে না, যা করার যুক্তরাষ্ট্র করবে। অনেকটা এমন, পরীক্ষায় পড়াশোনা না করলেও চলবে। ভগবানের কৃপায় আপনাআপনি সাফল্য আসবে। কিংবা ঈশ্বর অন্ন জোগানদাতা, আমরা ঘুমিয়ে থাকব, ঈশ্বর আমাদের মুখে খাবার তুলে দেবেন। এ ভাবনাতেই বিএনপিকে আচ্ছন্ন করেছিলেন পিটার হাস। আসলে এভাবে সাফল্য আসে না। অন্যের ওপর নির্ভর করে আন্দোলন করলে নিজেদেরই অস্তিত্বের সংকট হয়। সেটা তপশিল ঘোষণার পর বিএনপির হয়েছে।

দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, ব্যর্থ হলে বিশ্রামে যেতে হয়। ছুটি নিতে হয়। দেহ ও মনের ক্লান্তি দূর করে ঠান্ডা মাথায় নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে হয়। যেমন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছুটি কাটিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে নিশ্চয়ই নতুন পরিকল্পনা সাজাবেন। বিএনপি যদি সত্যি সত্যি মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তাদের প্রভু মানেন, তাহলে নিশ্চয়ই তার কাছ থেকে শিক্ষা নেবে। আন্দোলন ছুটিতে পাঠাবে। কারণ এসব অবরোধ, হরতাল এখন জংধরা অস্ত্র। এসব দিয়ে কোনো কাজ হয় না। মানুষ ভয়কে জয় করে কাজের জন্য বেরিয়ে পড়েছে। অবরোধে রাস্তাঘাটে রীতিমতো যানজট। এ ধরনের কর্মসূচি বিএনপিকে একটি হাস্যকর, খেলো রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছে। এভাবে ৪৮ দিন কর্মসূচি দিলে তা নিশ্চিত ২০১৫ সালে অবরোধের মতোই হবে। তার চেয়ে বিএনপির উচিত আন্দোলন থেকে কয়েক দিনের ছুটি নেওয়া। আর টিকে থাকতে চাইলে কৌশল পরিবর্তন করে জানুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। পিটার হাসের কাছ থেকে এ শিক্ষাটা কিন্তু বিএনপি দিব্যি নিতে পারে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল : poriprekkhit@yahoo.com


বিএনপি   পিটার হাস   মার্কিন দূতাবাস  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কেরানি হওয়ার আন্দোলনে তরুণরা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৫ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন আন্দোলনে। গত ১ জুলাই থেকে এ আন্দোলন শুরু হয়েছে। আন্দোলন এখন ঢাকা থেকে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রধান দাবি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। কোটা সংস্কার করা উচিত কি না বা কোটা নিয়ে বর্তমানে যে সংকট, তার সমাধান কে করবে, তা নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত। বর্তমান কোটাব্যবস্থা ভালো না মন্দ, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। কোটা বিতর্কে বুঁদ হয়ে আছে দেশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, বন্যাদুর্গত মানুষের আহাজারি—সবকিছু ছাপিয়ে কোটা সংস্কার এখন জাতির সামনে সবচেয়ে বড় ইস্যু।

প্রচলিত যে কোটা পদ্ধতি আছে, তার বিজ্ঞানসম্মত এবং যুক্তিসংগত পরিবর্তনের পক্ষে সবাই। হাইকোর্ট কোটাসংক্রান্ত মামলায় যে আংশিক রায় প্রকাশ করেছেন, তাতেও সরকার চাইলে কোটা সংস্কার করতে পারবে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাবে কে’। আদালত, সংসদ নাকি রাজপথ? এ নিয়েও চলছে এক ধরনের বাহাস। এখন সরকারি চাকরিতে যেভাবে কোটা বিন্যাস আছে, তার পরিবর্তন প্রয়োজন। আবার একেবারে কোটা বাতিল অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমার কাছে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে এসেছে, তা হলো আমাদের তরুণ প্রজন্ম কি শুধু একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য কি শুধু একটি সরকারি চাকরি? তারুণ্যের স্বপ্নের সীমানা কি এত সংকীর্ণ? এই প্রশ্নগুলো আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা আজকে সম্মান দিয়ে যাকে বলি আমলাতন্ত্র, আদতে তা ‘কেরানিতন্ত্র’। সরকারি চাকরি যারা করেন, তারা আসলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। জনগণের সেবক বা চাকর। কেরানি হওয়ার জন্য আমাদের তরুণরা এখন যে যুদ্ধ করছে, এটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য, গ্লানিকর এবং ঘোরতর শঙ্কার।

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস নতুন নয়।’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০০৭ সালে অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন। সব আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ কারণেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা মহিমায় মহিমান্বিত। আন্দোলন, সংগ্রাম এবং মুক্ত ভাবনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গড়ে উঠেছে আগামীর নেতৃত্ব। যে কোনো সংকটে পথ দেখিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে বিবেচিত। আর তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলন করেন, তখন আমরা সেদিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকি। এ আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। এই আন্দোলন জাতিকে পথ দেখাবে—এমনটা প্রত্যাশা করি।

এবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটি কী ধরনের? এ আন্দোলন কি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের আন্দোলন? এ আন্দোলন কি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন? এ আন্দোলন কি বাংলাদেশে লুণ্ঠন, অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে তারুণ্যের প্রতিবাদ? এ আন্দোলন কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারুণ্যের দ্রোহ? এ আন্দোলন কি শিক্ষার বৈষম্য বিলোপের লড়াই? এসব কিছুই নয়। এটি একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা। গোটা দেশের শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে ফায়দা লোটার এক আত্মঘাতী কৌশল।

আমরা সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছাত্র আন্দোলন দেখছি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আন্দোলন সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছেন গাজায় ইসরায়েলি বর্বর হত্যাকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে। সেই আন্দোলনের ঢেউ বাংলাদেশে লাগেনি। গাজার গণহত্যার প্রতিবাদে যখন বিশ্বের তাবৎ দেশের মেধাবী তরুণরা সোচ্চার, তখন আমাদের তরুণরা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কসরতে ব্যস্ত। বিসিএস গাইড বুকে বুঁদ হয়েছিলেন তারা। তাদের এই আত্মকেন্দ্রিকতা এবং সমাজবিমুখতা হতাশার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন পথ দেখান না, সমাজ বদলান না, কেরানি হতে চান। সরকারি চাকরি চান। এ আন্দোলনকে একটি সামগ্রিক সমাজ পরিবর্তন, দেশ, রাষ্ট্র বা জাতির কল্যাণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এই আন্দোলন হতশ্রী, মেধাহীন সৃজনশীলতা বিবর্জিত তারুণ্যের প্রতিরূপ। দৈন্য তারুণ্যের মনোজগতের দারিদ্র্যের চিত্র এ আন্দোলন।

বিশ্বের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রতিবাদ করেছে, তার অগ্রভাগে আছে জেন. জি (জেনারেশন জুমাস) খ্যাত তরুণরা। তাদের চেতনা ও স্বতঃস্ফূর্ত নীতি আমাদের অতীত ছাত্র আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমাদের শিক্ষাজীবনকে উৎসর্গ করেছি। আমাদের ছাত্র-তরুণরা বুকের রক্ত দিয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, শিক্ষার অধিকারের জন্য। জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালি, রাউফুন বাসুনিয়া, সেলিম, দেলোয়ার শহীদ হয়েছেন দেশের জন্য, শিক্ষার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু এবার আন্দোলন কার জন্য? একটি সরকারি চাকরির জন্য। গত কয়েক বছরে সামগ্রিকভাবে এমন একটি পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যাতে মনে হচ্ছে, শিক্ষাজীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো সরকারি একটি চাকরি পাওয়া। সরকারি চাকরিই যেন সবকিছু। এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখে সেই কথাটি আরও বেশি করে মনে পড়ছে। সত্যিই আমি লজ্জিত।

এই সরকারি চাকরিকে কেরানিগিরি বলা যায়। এই কেরানিগিরির বিরুদ্ধে সৃজনশীল, উদ্ভাবনী মানুষের এক ধরনের অনীহা এবং ক্ষোভ ছিল সবসময়। বিশেষ করে মেধাবী তরুণরা ছকে বন্দি এই আনুগত্যের জীবনে আগ্রহী ছিলেন না কখনোই। আমরা বাংলা সাহিত্যেও এর প্রচুর উদাহরণ পাই। দুর্গাচরণ রায়ের ব্যঙ্গাত্মক ভ্রমণ কাহিনি ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ গ্রন্থে দেবতাদের বয়ানে সরকারি চাকরি বা কেরানিবৃত্তির অনবদ্য সমালোচনা করা হয়েছে। এই বইটিতে ব্রহ্মাদেব কলকাতা শহরে এসে বিস্মিত হন। বলেন, ‘কী আশ্চর্য! যাহাকেই দেখি, যাহার সঙ্গেই আলাপ করি, সেই কেরানি। দোকানদার, মহাজন, অধ্যাপক, চিকিৎসক, চামার, কুম্ভকার, কর্মকার আর চক্ষে দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলেই কেরানি।’ ব্রহ্মার বিস্ময়ের জবাবে তার সফরসঙ্গী বরুণ দেব বলেন, ‘চাকরি করা বাঙালি জাতির সংক্রামক রোগ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নচেৎ যে অধ্যাপকের জগৎজুড়ে মানসম্ভ্রম, যাহার গৃহে বিদায়ের ঘটি, বাটি, থালা, ঘড়া রাখিবার স্থান হয় না। তিনি নিজ ব্যবসাকে ধিক্কার দিয়ে পুত্রকে ১৫ টাকার কেরানি প্রস্তুত করিতেছেন। যে কবিরাজ ধন্বন্তরি নামে পরিচিত হইয়া অর্জিত ধন বহন করিয়া আনিতে পারিতেন না, তিনিও নিজ ব্যবসা পরিত্যাগ করিয়া পুত্রকে ইংরেজি শিখাইয়া কেরানি প্রস্তুত করিতেছে। যে কুম্ভকার উত্তম উত্তম ছবি ও পট আঁকিয়া স্বাধীনভাবে চল্লিশ টাকা উপার্জন করেন, সেও কাদা-ছানা অতি জঘন্য ব্যবসা বলিয়া পুত্রকে ইংরেজি শিখাইয়া কেরানি প্রস্তুত করিতেছেন। এরূপে ধোপা, নাপিত, মেথর, মুদ্দফরাস সকলেই কেরানি হইবার জন্য হাত ধুইয়া বসিয়া আছে।’ ১৮৮০ সালের দিকে দুর্গাচরণ এই গ্রন্থটি লিখেছিলেন। কিন্তু আজ বিভিন্ন সড়কে যে আন্দোলন হচ্ছে, সেই আন্দোলন দেখে আমার মনে হচ্ছে, দুর্গাচরণের লেখাটি আজকের বাস্তবতায় একেবারেই সত্যি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন কেরানি হওয়ার মনোবাসনায় এখন জীবন দিতেও প্রস্তুত! সব দেখে-শুনে পণ্ডিত বিনয় কুমার সরকারের মতো আমারও বলতে হচ্ছে করে, ‘কেরানির স্বরাজ প্রতিষ্ঠা হোক’। তরুণ সমাজের মধ্যে আমলা বা কেরানি অথবা সরকারি চাকরি করার আগ্রহ কেন এত তীব্র হলো? নতুন একটা সিনেমা, একটা উপন্যাস, একটা নতুন গানের চেয়ে ‘বিসিএস গাইড বই’ কেন তাদের এত প্রিয় হলো। কেন তারা পাঠ্যবই সেলফে রেখে বাংলা ব্লকেড করে। আমলাতন্ত্রে কি মধু আছে?

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র বা কেরানিতন্ত্রের আবির্ভাব বা বিকাশ অনেক পুরোনো। ড. আকবর আলি খান ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালের রাজনীতি’ গ্রন্থে ‘আমলাতন্ত্র: গ্রেশাম বিধির মতো ব্যামো’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র নিয়ে বিতর্কের শুরু কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর আগে। এ বিতর্ক শুরু হয়েছিল চীনে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস আমলাতন্ত্রকে ধ্রুব তারার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, এ তারকা স্থির এবং সব তারকাই এর নির্দেশে চলে।... বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র আদৌ নতুন নয়। ২০০০ বছরের বেশি আগে মৌর্য সাম্রাজ্যে আমলাতন্ত্র ছিল। ‘কৌটিল্যের অর্থ শাস্ত্রে’ আমলাতন্ত্রের বিশদ বিবরণ ড. খান তার অন্য এক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ গ্রন্থে তিনি চাণক্যের উদ্ধৃতি দেন এভাবে—‘চাণক্য লিখেছেন, সরকারি কর্মচারীরা দুইভাবে বড়লোক হয়, হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে। চাণক্যের অর্থ শাস্ত্রে সরকারি কর্মচারীদের চল্লিশ ধরনের তছরুপের ও দুর্নীতির পন্থা চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে সজাগ থাকা সত্ত্বেও চাণক্য রাজস্ব বিভাগে দুর্নীতি অনিবার্য মনে করতেন। অর্থ শাস্ত্রে বলা হয়েছে: ‘জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব, তেমনি অসম্ভব হলো সরকারের তহবিল নিয়ে লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে, তা জানা যেমন অসম্ভব, তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয় কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে।’ কৌটিল্যের ‘অর্থ শাস্ত্র’ যেন বর্তমান সময়ের আমলাতন্ত্রের আয়না! আমলামুখী তারুণ্যের স্রোত সেই মধুর আশায় এটা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহের মহামারির কারণ হলো, সরকারি চাকরিতে চাকচিক্য এবং উপরি আয়ের অবারিত সুযোগ। কেউ দেশপ্রেম বা দেশকে বদলে দেওয়ার জন্য সরকারি চাকরি করছেন, এমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানিদের পদলেহন করেছেন অনেক আমলা। এরপর আবার বাংলাদেশের অনুগত হয়ে মধু খেয়েছেন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খোলস পাল্টানো আমলাদের বড় বৈশিষ্ট্য। তারা যখন যার এখন তার। বর্তমান সরকার টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে আমলাতন্ত্রের দ্বারা বশীভূত হয়েছে। পে স্কেল, আমলাদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা, দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের ফ্রি লাইসেন্স, আইন করে দায়মুক্তি তাদের ‘চাকর’ থেকে ‘প্রভু’ বানিয়েছে। যে কারণে এখন সরকারি চাকরি একটি ঝুঁকিহীন আকর্ষণীয় পেশা। সরকারি চাকরি হওয়া মানেই একটি নিশ্চিন্ত জীবন, দ্রুত প্রমোশন। সঙ্গে উপরি আয় তো আছেই।

সরকারি চাকরি করলে দুর্নীতি করা যায় অবাধে। তার বিচার হয় না। যৌন নিপীড়ন করলে শাস্তি হয় না। সাংবাদিক পেটালেও দম্ভ মওকুফ হয়। এ রকম বেহেশতি সুবিধা আর কোথায় আছে? সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরিতে যে দুর্নীতির বাক্স খুলে গেছে, তাতে বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, কিছু শিক্ষার্থী কেন কেরানি হতে মরিয়া।

কিন্তু সব তরুণ কি সরকারি চাকরি চায়? না, অনেক তরুণই সরকারি চাকরিতে আগ্রহী নয়। আমি এমন অনেক তরুণকে চিনি, যাদের কেউ কেউ সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এখন গরুর খামার করছেন। কেউ নতুন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান করার জন্য এখন সংগ্রাম করছেন। কেউবা ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করছেন। ফ্রিল্যান্সিং করছেন, কেউ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন মেধাবী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বিজ্ঞানী হয়ে আলোকিত হয়েছেন অনেক মেধাবী মুখ। কেউ আবার গবেষণা করছেন, খেলাধুলায় উজ্জ্বল তারকা হয়ে ওঠা তারুণ্যের সংখ্যাও কম নয়। সংগীত, শিল্পকলার নানা শাখায় আমাদের তারুণ্যের বিচরণ আছে। এ বহুমাত্রিকতাই আমাদের তারুণ্যের আসল রূপ। আমাদের তরুণরা সব ক্ষেত্রে নতুন কিছু করবে, তবেই না দেশ এগোবে। আমাদের তরুণরা ব্যবসায়ী হবে, উদ্যোক্তা হবে, শিল্পী হবে, সাহিত্যিক হবে, চলচ্চিত্র নির্মাতা হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশে সব বন্ধ দুয়ার খুলে একটি মুক্ত প্রবাহের সূচনা করবে তরুণরা। কিন্তু তা না করে কিছু তরুণ সব সড়ক বন্ধ করে রাজপথে বসে আছে একটি সরকারি চাকরির প্রত্যাশায়। কী আশ্চর্য।

আমাদের তারুণ্যের ইতিহাস বর্ণাঢ্য সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের তারুণ্যের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। এ তরুণরা দেশকে বদলে দিয়েছে, এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ এখন একটি চাকরির কুঠিরে বন্দি হওয়ার জন্য উদগ্রীব। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ কি তাহলে বিভ্রান্ত? পথহারা? না, এটি তরুণদের খণ্ডিত রূপ। অধিকাংশ, বিশেষ করে মেধাবী তরুণরা এর সঙ্গে সংশ্রবহীন। আমাদের তরুণদের একাংশের মধ্যে গত কয়েক বছরে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কেউ এখন দেশে থাকছে না। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে সেখানেই ঠিকানা করছে। ভালো চাকরি, নিরাপদ জীবন থেকে তারা দেশে আসতে চাইছে না। বাকিরা বিসিএস যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করছে। সরকারি চাকরি না পেয়ে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে বেসরকারি চাকরিতে মেধাহীন শ্রম দিচ্ছে। তরুণদের একটি অংশ এখনো সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনী চিন্তার মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে। এই তরুণদের সামনে আসতে হবে। এটাই আমাদের তারুণ্যের আসল পরিচয়। চাকরির জন্য ‘বাংলা ব্লকেড’ করা তরুণরা আমাদের তারুণ্যের প্রতিনিধি নয়।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


কোটা আন্দোলন   কেরানি   আমলাতন্ত্র  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাস: স্বস্তির চেয়ে শঙ্কা বেশি

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম ৬ মাস অতিবাহিত হলো। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ  হাসিনা। গঠন করেন নতুন মন্ত্রিসভা। সেই চতুর্থ মেয়াদের সরকারের ৬ মাস পূর্তি হয়েছে। যদিও ৬ মাস একটি সরকারের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। বরং এটি সূচনা মাত্র। তবে আওয়ামী লীগ সরকার টানা চতুর্থ বারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। তাই একটি নতুন সরকার বলতে যা বোঝায় সেইরকম কোন অবস্থা আওয়ামী লীগের জন্য প্রযোজ্য নয়। টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারকে নতুন সরকার বলা যায় না। এটি ধারাবাহিকতা। সে কারণে এই সরকারের জন্য অপেক্ষাকালীন সময় নেই। সরকারকে জনগণ পর্যবেক্ষণ করছে না, বরং কাজ চাইছে। প্রতিটি নতুন সরকারের যে ‘মধু চন্দ্রিমা’ সময় থাকে, সেটি উপভোগ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। মূলত এক কঠিন প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নির্বাচন করে এবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এর প্রতিক্রিয়া কি হবে ইত্যাদি বিষয় ছিলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মনোভাবের কারণে নির্বাচন নিয়েই একধরনের শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিলো। 

বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য আওয়ামী লীগ ভিন্ন এবং অভিনব একটি কৌশল গ্রহণ করে । দলের নেতা-কর্মীদের জন্য প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিলো। যারা নৌকা প্রতীক পাননি, তাদেরকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। যেকারণে নির্বাচন মোটামুটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশের উপরে গেছে  মূলত আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী কৌশলের কারণে। নির্বাচনের পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বললেও শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নিয়েছে। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ দেশ। 

নির্বাচনের পর বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কি করে তা নিয়েও একধরনের শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ছিলো। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নতুন সরকার গঠন করলে বিএনপি হতাশায় ভেঙ্গে পরে। রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে নিজেরাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নেয়। ফলে নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক চাপ যেমন আওয়ামী লীগ সামাল দিতে পেরেছে, ঠিক তেমনি দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিলো তা দূর হয়ে যায়। তাছাড়া এই নির্বাচন ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনও হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কাজেই নির্বাচনের পর বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কিনা, বাংলাদেশ একঘরে হবে কিনা ইত্যাদি শঙ্কা ১১ জানুয়ারির পর আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকে। অন্যদিকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক আন্দোলনও মুখ থুবড়ে পরে। ফলে নতুন সরকারের সূচনা হয় স্বস্তির মধ্যে দিয়ে। 

কিন্তু নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার পরও গত ৬ মাসে আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে নেই। আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপ নেই। বিরোধী দল নিষ্প্রভ। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও আওয়ামী লীগের জন্য কোন রকম বড় ধরনের চাপ নেই। কিন্তু তারপরও সরকার অস্বস্তিতে, চাপে। নানা কারণে সরকারের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। অর্থমন্ত্রী তা নিজেই স্বীকার করেছেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গত জুনে নতুন সরকার প্রথম বাজেট দিয়েছে। কিন্তু এই বাজেটের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কতটুকু হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনীতির চেহারা বিবর্ণ থেকে উজ্জ্বল হবার কোন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং অনিয়ম। ব্যাংক খাতে রীতিমতো লুণ্ঠন হয়েছে, যে লুণ্ঠনের ক্ষতগুলো এখন দগদগে ঘায়ের মতো উন্মোচিত। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপী ঋণের পরিমাণ নতুন রেকর্ড গড়েছে। অর্থপাচারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিময়তা নষ্ট হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে যদি অর্থনীতিকে সামাল দিতে না পারে তাহলে সরকারের জন্য বড় সংকট অপেক্ষা করছে বলেই আমি মনে করি। 

অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে দ্রব্যমূল্যের। দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা ছিলো। কিন্তু গত ৬ মাসে এনিয়ে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য নেই। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা বাজারে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। যেকোন সময় এই দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি মানুষের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের যে উদ্যোগগুলো এখন পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে তার কোনটারই সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। বরং দ্রব্যমূল্যে সিন্ডিকেট, মুনাফা লোভী, মজুতদারদের দাপট বেড়েই চলেছে। প্রচন্ড ক্ষমতাবান সরকার বাজারের সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়।

দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টি আলোচনায় তাহলো দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজদের স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদকে সরাসরি দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুর্নীতির কারণে আজিজ আহমেদের মার্কিন ভিসা বাতিল হয়েছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিপুল বিত্ত-বৈভবের খবর পুরো জাতিকে চমকে দিয়েছে। বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির কেচ্ছা কাহিনী প্রকাশিত হতেই একে একে দুর্নীতিবাজদের চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে জাতির সামনে। দুর্নীতিবাজদের অপকর্মের ফিরিস্তি এখন গণমাধ্যমের প্রধান খাদ্য। প্রতিদিন গণমাধ্যমে কোন না কোন দুর্নীতিবাজের রত্নভান্ডারের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে ড্রাইভার পর্যন্ত শতকোটি টাকার মালিক হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে খোবলা করে দিয়েছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর শক্ত অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের বিপুল বিত্তের খবর প্রকাশ হওয়ার পরও তার আইনের আওতায় না আসা, তিনি দেশে আছেন না বিদেশে পালিয়ে গেছেন তা নিয়ে রীতিমতো চলছে লুকোচুরি। ছোট-মাঝারিসহ সব সরকারি কর্মকর্তাদের বিভৎস দুর্নীতির খবরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেন, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যাথা, মলম দিবো কোথায়’। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে কতটুকু আন্তরিক, এই যুদ্ধে সরকার শেষ পর্যন্ত কিভাবে জয়ী হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। সামনের দিনগুলোতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যদি সরকার নির্মোহ, শক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারে তাহলে সরকারের জন্য সেটি হবে একটি বড় ধরনের সংকট। এই সংকটে মোকাবেলা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষ দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেখতে চায়, সাধারণ মানুষ চায় দুর্নীতিবাজরা আইনের আওতায় আসুক। কিন্তু সেটি যদি সরকার করতে না পারে তাহলে সাধারণ মানুষ আস্থা হারাবে। সরকারকে বিশ্বাস করবে না জনগণ। 

সাম্প্রতিক সময়ে, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন সরকারকে হঠাৎ করেই চাপে ফেলেছে। যদিও এবিষয়ে সরকারের কিছু করণীয় নেই। এটা স্পষ্ট যে, এর পিছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। এর আগেও ২০১৮ সালে কোটা নিয়ে আন্দোলন করেছিলো শিক্ষার্থীরা। কোটার সেই আন্দোলনের ফলে সরকার প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে দিয়েছিলো। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকাররা আদালতে রিট পিটিশন করে এবং এর মাধ্যমে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল অবৈধ। ফলে ঐ পরিপত্রটি অকার্যকর হয়ে যায়। এরপর এখন শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে নতুন করে আন্দোলন করছে। তাদের বক্তব্য আংশিক যৌক্তিক, কিছুটা অযৌক্তিক। তাদের বক্তব্যের যৌক্তিক অংশটুকু হলো কোটা সংস্কার করা উচিত। বাংলাদেশে এখন এমন কিছু কোটা রয়েছে যেগুলো শুধু অযৌক্তিক নয়, অনভিপ্রেতও বটে। আবার এমন কিছু কোটা আছে যেগুলো থাকা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। যেমন, নারী কোটা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য কোটা। এই কোটাগুলো বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। একটি সাম্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অংশ তা পূরণের জন্যই কিছু কিছু কোটা রাখা অবশ্যই উচিত। তবে কিছু কোটা রয়েছে, যেগুলো থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে, প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের খারাপ দিকগুলো হলো, আন্দোলনকারীরা বেশি মনোযোগী হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। এই কোটা সংস্কার আন্দোলনে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। 

কোটা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, ২০১৮ সালে যখন কোটা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো তখন এই আন্দোলনের নীল নকশা প্রণয়ন করেছিলো যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্র শিবির। এবারও কোটা আন্দোলনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ছাত্র শিবিরের সম্পৃক্ততার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, প্রতিবছরই তিন থেকে পাঁচ হাজার চাকরিপ্রত্যাশিদের জন্য সরকারি চাকরিতে সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করেন। সরকারি চাকরির জন্য সবাইকে কেন আগ্রহী হতে হবে? বিসিএস কি একজন শিক্ষার্থীর একমাত্র লক্ষ্য? একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করে বিজ্ঞানী হবেন, চিকিৎসক হবেন, গবেষক হবেন, সাংবাদিক হবেন কিংবা অন্যকোন সৃজনশীল পেশা বেছে নেবেন। তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন, বাংলাদেশকে বিনির্মাণের জন্য নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করবেন। কিন্তু এসব না করে সবাই এখন সরকারি চাকরিতে আগ্রহী হচ্ছেন এটি বাংলাদেশের জন্য উৎকণ্ঠার বিষয় বলে আমি মনে করি। কিন্তু কোটা আন্দোলনের রাজনৈতিক কূটকৌশলে সরকার রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পরেছে। ছাত্র শিবির করুক বা বিএনপিই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকুক না কেন কোটা আন্দোলনের ডাল পালা মেলছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এরকম আন্দোলন থেকে যেকোন ধরনের বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। আর তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মোকাবেলা করতে হবে পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে। এখানে দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই।

কোটা আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়েও এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকরা প্রচলিত পেনশন স্কিমের বদলে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিমের আওতায় এসেছেন। জাতীয় পেনশন স্কিম সরকার প্রবর্তন করেছিলো। সরকার আশা করেছিলো, এই পেনশন স্কিম অত্যন্ত সফল হবে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী বা ব্যক্তিরা এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন সেক্টর, কর্পোরেশন এবং আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ১ জুলাই থেকে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিম চালু করা হয়েছে। এটি নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। আমলারা অন্য সব পেশার মানুষকে যেন রীতিমতো খেপিয়ে তোলার প্রকল্প নিয়েছে এই পেনশন স্কিমের মাধ্যমে। অদুর ভবিষ্যতে এই পেনশন স্কিম সরকারকে ভোগাবে। 

আওয়ামী লীগের চতুর্থ মেয়াদে দেখা যাচ্ছে সব ক্ষেত্রে চাটুকার মতলববাজ সুবিধাবাদীদের একটি চক্র বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী ক্ষমতার সব মধু খেয়ে নিচ্ছে। প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তার একটি উদহারণ। চিকিৎসকদের সিন্ডিকেট, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ শিক্ষকদের সিন্ডিকেট যোগ্যতা ও মেধাকে গিলে খাচ্ছে ক্রমশ:। এই ৬ মাসে সরকারের জন্য স্বস্তির খবর খুবই কম। সামনের দিনগুলো সরকারকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার বার্তা দিচ্ছে। সরকার আগামী দিনগুলোতে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে আমি মনে করি, সরকারকে সমস্যার সংকটগুলোর গভীরে যেতে হবে, সংকট সমাধানের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সবকিছুকে উপেক্ষা করা এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস সর্বনাশ ডেকে আনে। অতীত ইতিহাস সেকথাই বলে।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কোটা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা নীরব কেন?

প্রকাশ: ০৭:০০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

কোটা আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই কথা বলেছেন। বিশেষ করে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা বলছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল। এবং সরকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী। তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে চমৎকার ভাবে সার্বিক বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও কোটা আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কিন্তু কোটা আন্দোলনের বিষয়টি শুধু সরকারের বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়। এতে একটি রাজনীতিকরণ ঘটেছে। এবং এই রাজনীতিকরণের ফলে এর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। 

কোটা সংস্কার নিয়ে এখনও পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদেরকে নীরব দেখা যাচ্ছে। হেভিওয়েট নেতারা কোটা আন্দোলন নিয়ে তেমন কোনও কথা বলছেন না। 

আওয়ামী লীগের জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলেন আমির হোসেন আমু। আমির হোসেন আমু এখন পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে মুখ খোলেননি। তাকে কোনও কথাও বলতে দেখা যায়নি। অথচ একটা সময় ছাত্রলীগের মধ্যে তার বিপুল প্রভাব ছিল। জাতীয় পর্যায়ে তার একটা পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে। কোটা আন্দোলন নিয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং আরেক হেভিওয়েট নেতা বেগম মতিয়া চৌধুরীকেও। মতিয়া চৌধুরী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন কিন্তু কোটা আন্দোলন নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমকেও এখন পর্যন্ত কোটা আন্দোলন নিয়ে কোনও কথা বলতে দেখা যায়নি। কথা বলেননি আওয়ামী লীগের আরেক নেতা তোফায়েল আহমেদও। তবে তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। এমনি নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তাই তার বিষয়টি হয়তো সহানুভূতির সঙ্গে দেখা যায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদেরকেও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না। 

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক কোটা সংস্কার নিয়ে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত কথা বলেননি। অথচ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেই সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কোনও রকম কথা বলতে দেখা যাচ্ছেনা। কথা বলছেন না আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও। তবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে বাহাউদ্দিন নাছিম কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সরব রয়েছেন। বিভিন্ন ফোরামে তিনি কথা বলছেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে, ছাত্রলীগ যেমন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তেমনি যুবলীগ সহ অন্যান্য সংগঠনগুলোরও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলা উচিত। কোটা নিয়ে যারা বিভ্রান্তি তৈরি করছে সেই বিভ্রান্ত দূর করার জন্য জনপ্রিয় নেতাদের কথা বলা উচিত। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যাদেরকে পছন্দ করেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা পরিচিত তাদের এ নিয়ে প্রকৃত তথ্য শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে এখন পর্যন্ত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে।


কোটা আন্দোলন   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাসে আলোচিত ৬ মন্ত্রী

প্রকাশ: ০৫:০২ পিএম, ১০ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার তার ৬ মাস পূর্ণ করেছে আজ। এই ৬ মাসে সরকারকে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে অনেকগুলো সাফল্য অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ জানুয়ারী নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও ৭ জন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু এই ৬ মাসে সব মন্ত্রী একই সুরে এগোতে পারেননি। সব মন্ত্রীর সাফল্য ইতিবাচক নয়। যদিও ৬ মাস সময় একজন মন্ত্রী বা সরকারকে মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু সকালের সূর্য সারা দিনের আভাস দেয়। সেই বিবেচনায় ৬ মাসে যে সমস্ত মন্ত্রীরা স্ব-প্রতিভ, আলোচিত এবং উজ্জ্বল ছিলেন তাদেরকে নিয়েই এই প্রতিবেদন। 

এই ৬ মাসে আলোচিত এবং দৃশ্যমান মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন-

১. ওবায়দুল কাদের: 

ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তার নেতৃত্বেই পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল হয়েছে। এটি তার অসাধারণ সাফল্য। তবে বর্তমান ৬ মাস মেয়াদে সেতুমন্ত্রীর নেতৃত্বে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিসমাপ্তি হয়েছে। পরিসমাপ্তি অনুষ্ঠান হয়েছে সফলভাবে। ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নীরব বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসময় তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সরব ছিলেন। এই ৬ মাসে সবচেয়ে সরব মন্ত্রী হিসেবে উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের। 

২. ড. হাসান মাহমুদ: 

ড. হাসান মাহমুদ তথ্যমন্ত্রী থেকে এ মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশে ভারসাম্যের কূটনীতির ধারা অব্যাহত রেখেছেন। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সমাদৃত হয়েছে। তাছাড়া দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় কূটনীতির সফল বাস্তবায়ন করছেন হাসান মাহমুদ। ভারতের নির্বাচনে পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করছেন। এসমস্ত অর্জনের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এক্ষেত্রে ড. হাসান মাহমুদকে অত্যন্ত স্ব-প্রতিভ এবং উজ্জ্বল দেখা গেছে। 

৩. ডা. সামন্ত লাল সেন

১১ জানুয়ারীর মন্ত্রীসভায় সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে কেমন দায়িত্ব পালন করবেন  তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা রকম কৌতূহল ছিলো। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে প্রথম ৬ মাসে উজ্জ্বল ছিলেন সামন্ত লাল। তার সততা, নিষ্ঠার প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা সর্বমহলে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন অনিয়ম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন তিনি। তার সঙ্গে সহযোগিতা করছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রোকেয়া সুলতানা। সবকিছু মিলিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খোল-নলচে পাল্টে গেছে প্রথম ৬ মাসে। 

৪. আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। প্রথমবারের মতো তিনি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। এবার মৎস্য এবং প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। এ দায়িত্ব গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ সাধু পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। রমজানের সময় ন্যায্য মূল্যে মাংস, দুধ, ডিম বিতরণ করার ক্ষেত্রে তার অবদান প্রশংসিত হয়েছে। এবার কোরবানি ঈদে দেশিয় প্রাণী দিয়ে কোরবানির উদ্যোগে কোনরকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে আব্দুর রহমান প্রমাণ করেছেন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ মন্ত্রীত্বেও দক্ষতা দেখাতে সক্ষম। 

৫. জাহাঙ্গীর কবির নানক 

জাহাঙ্গীর কবির নানক এবার দ্বিতীয় বারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন। বস্ত্র এবং পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। যদিও এই মন্ত্রণালয়টিকে অনেকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তবুও এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি তার মেধা এবং দক্ষতা দিয়ে এ মন্ত্রণালয়কে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ করছেন। বিশেষ করে পাটের সোনালী যুগ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। টাঙ্গাইলের শাড়ি মেধাসত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে তার তড়িৎ পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। পাটের বহুমুখী বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্র সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। 

৬. মহিবুল হাসান চৌধুরী

মহিবুল হাসান চৌধুরী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী থেকে এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে পাবলিক পরীক্ষাগুলো এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে পাঠ্য বইসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার মেধা দীপ্ত উদ্যোগ সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।  


সরকারের ৬ মাস   মন্ত্রী  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কর্তারা করেন দুর্নীতি, দোষ হয় রাজনীতির

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৮ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

দুর্নীতি নিয়ে দেশে এখন তোলপাড় চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছি। সে যে- হোক, দুর্নীতি করলে কারও রক্ষা নেই। যারাই দুর্নীতি করবে, তাদেরই আমরা ধরব।প্রধানমন্ত্রীর এই অনুশাসনের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, দুর্নীতির ক্ষেত্রে অতীতের সংস্কৃতি থেকে আওয়ামী লীগ সরকার বেরিয়ে আসতে চাইছে। অতীতেও আমরা লক্ষ করেছি, বড় দুর্নীতি হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। সরকারের মদদে। সব সরকারের আমলেই সরকারের ছত্রছায়ায় কিছু ব্যক্তি ভয়াবহ দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠেছিলেন। রাষ্ট্র তাদের সহযোগিতা করেছে। কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি কিংবা বিচারও হয়নি। একটি অস্বীকার করার সংস্কৃতিকে লালন করা হয়েছে। কিন্তু এবার সরকারের ভেতর যারা প্রভাবশালী, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত, সরকারের সঙ্গে যাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা সবাই জানত। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার বিষয়টি অস্বীকার করেনি। ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেনি। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখন পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করছে। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হবে কি হবে না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি জাগরণের সূচনা হয়েছে কথা নিঃসংকোচ বলা যায়। অন্য দুর্নীতিবাজ যারা সরকারের প্রভাব বলয়ে থেকে, সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে দুর্নীতি করার সাহস পেতেন তারা কিছুটা হলেও দমে গেছেন। বেনজীর আহমেদকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হবে, তার সম্পত্তি জব্দ হবে এরকম স্বপ্নেও হয়তো তিনি ভাবেননি। ভাবেননি এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানও। কিন্তু সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকার পরও তারা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। সামনের দিনগুলোতে ধারায় আরও যারা স্বীকৃত দুর্নীতিবাজ আছেন তারাও আইনের আওতায় আসবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। দুর্নীতি নিয়ে এই চর্চার মধ্যই কে বেশি দুর্নীতিবাজ তা নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। সরকারি চাকরিজীবী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী না সুশীল সমাজ, কারা বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত? এই প্রশ্ন এখন সবার। নিয়ে নানাজনের নানা মত। আপাতত সাধারণ মানুষের চোখে সরকারি কর্মকর্তারাই শীর্ষস্থান দখল করে আছেন। ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হলেও তারা এক ধরনের দায়মুক্তি পাচ্ছেন। দুর্নীতিতে তারাভিকটিমহিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে ব্যবসা চালাতে তারা রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্তাদের ঘুষ দেন। এটা যেন অন্যায় নয়, তাদের অসহায়ত্বের প্রকাশ। ঘুষ দিয়ে ব্যাংক ঋণ নিতে হয় ফলে ঋণখেলাপি হন। ঘুষের জন্যই অর্থ পাচার করেন। ব্যবসায়ীরা দুর্নীতিতে দাতা পক্ষ, গ্রহীতা পক্ষ নন। সুশীল সমাজের দুর্নীতি শ্বেত শুভ্র। দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। . ইউনূসের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও তিনি নিজেকেধোয়া তুলসী পাতাপ্রমাণে মরিয়া। অর্থ পাচার, অর্থ নয়ছয়ের সব অভিযোগকেই তিনি অসত্য বলে রীতিমতো বিক্ষোভ করেছেন। এভাবে সুশীলরা সুশাসন আর উন্নয়নের নামে লুণ্ঠনের দোকান খোলেন। যেগুলো নিয়ে কথা বললেই হয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ। দুর্নীতি কোথায় নেই? কোন পেশা দুর্নীতিমুক্ত?

দুর্নীতি নিয়ে আলোচনার একটি বিষয় নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। দুর্নীতিবাজদের কথা যখন বলা হচ্ছে তখন রাজনীতিবিদদের দিকেই তীর ছোড়া হচ্ছে। রাজনীতিকে দূষিত কলঙ্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে। দুর্নীতির সঙ্গে রাজনীতির যোগসাজশ আবিষ্কারের এক প্রাণান্ত চেষ্টা লক্ষণীয়। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, দুর্নীতির ভয়াবহ দূষণের জন্য রাজনীতিই দায়ী।

রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির যে ঘটনাগুলো আমরা দেখি, সেটি এখন সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির চেয়ে কমই শুধু নয়, তুচ্ছও বটে। কিন্তু তার পরও সব দুর্নীতির পেছনে রাজনীতির সম্পর্ক কেন খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের অনেক গভীরে যেতে হবে। বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে বাংলাদেশে রাজনীতিবিদদের কলঙ্কিত করার একটি নীরব প্রচেষ্টা সবসময় ছিল। সবসময় সুশীল জনগোষ্ঠী, বুদ্ধিজীবী এবং সরকারি আমলারা রাজনীতিবিদদের মূর্খ, অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণের জন্য একটি সংঘবদ্ধ মিশনে ছিলেন, আছেন। যে কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি রাজনীতিবিদ সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। রাজনীতিবিদ মাত্রই খারাপ, এমন একটি প্রচারণা চলে সারাক্ষণ। এর উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে রাজনীতিমুক্ত করা। বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা। এতে বেশি লাভবান হবেন সুশীল এবং আমলারা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যদি ব্যাহত হয়, তাহলে বাংলাদেশে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা গ্রহণ সম্ভব হবে। ক্ষমতালোভী সুশীলরা সিংহাসনে বসে তাদের ইচ্ছামতো লুণ্ঠন করতে পারবেন। আসলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ-এর ঘোষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতা দখল করা। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ শাসকদের সেবাদাস হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন আমাদের কিছু সুশীল।

আমাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৭৫-পরবর্তী সময়ে অগণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক শক্তির বিরোধ সমান্তরালভাবে চলছে। এই বিরোধ সবসময় দৃশ্যমান। জিয়াউর রহমান রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি যেসব স্তাবক এবং চাটুকারকে নিয়ে দল গঠন করেছেন, তাদের মধ্যেও সত্যিকারের রাজনীতিবিদ ছিলেন কম। যারা রাজনীতিবিদ হিসেবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন তারা ছিলেন পরিত্যক্ত উদ্বাস্তু এবং রাজনীতিতে উৎকট আবর্জনা, নীতিভ্রষ্ট সুবিধাবাদী। এসব আবর্জনাকে নিয়ে জিয়াউর রহমান একটি রাজনৈতিক ক্লাব খুলেছিলেন, যার নামবিএনপি এই ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতায় প্রাক্তন সামরিক-বেসামরিক আমলা, উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবী এবং কিছু পতিত রাজনীতিবিদদের নিয়ে একটা খিচুড়ি করা, যা দিয়ে সৎ, আদর্শের রাজনীতিকে ধ্বংস করা যায়। জিয়া নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করব।এরশাদও একই ধারাই বাংলাদেশের রাজনীতিকে হাস্যকর করার চেষ্টা করেছিলেন। এরশাদ রাজনীতিতে কিছু ঝাড়ুদার, চাটুকার ক্লাউনও যোগ করেন। এভাবেই রাজনীতিকে দূষিত হয়েছে অগণতান্ত্রিক ধারায়। দুর্নীতির বিস্তার ঘটে এদের হাত ধরেই।

অবৈধ শাসক জিয়া যেমন রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ প্রমাণের চেষ্টা করেন। তেমনি ১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেও রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য, অশিক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করেন। আবার এরশাদের পতনের পর বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক ধারা সূচনা হয়, তা নষ্ট করার জন্য সুশীলদের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা চালু হয়। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি ছিল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্র। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিবিদরা অযোগ্য, রাজনীতিবিদরা একটি নির্বাচন করতে অক্ষম এরকম একটি ধারণাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

১৯৯১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল তার মূল লক্ষ্য ছিল সুশীলদের ক্ষমতায়ন এবং রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করা। ক্ষমতায় সুশীলদের হিস্যা নিশ্চিত করতেই ব্যবস্থা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ থাকত তিন মাস। সুশীল এবং বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতরা এতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তারা বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সুশীল শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। আর এটি করার জন্যই রাজনীতিবিদদের বিরোধ উসকে দিয়ে ২০০৭ সালে আনা হয় অনির্বাচিত সরকার। তারা রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করে। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণ করার নিরন্তর প্রচেষ্টা করে। এক-এগারোর সরকারের সময় আমরা দেখি রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণের চেষ্টা করা হয়। তাদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণের জন্য শুরু হয় নানারকম তৎপরতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু প্রতিষ্ঠা করা গেছে? রাজনীতিবিদরা কত টাকা দুর্নীতি করেছেন? রাজনীতিবিদরা দেশের বারোটা বাজিয়েছেন বলে যেসব গালভরা খবর সে সময় করা হয়েছিল, তার কতটুকু সত্যতা পাওয়া গেছে নিয়ে ভালো গবেষণা হতে পারে।

রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজ, চোর, দুর্বৃত্ত বানিয়ে তাদের চাঁদাবাজ হিসেবে প্রমাণ করে এক-এগারোর সরকার নিজেরাই দুর্নীতির এক মহোৎসব শুরু করেছিল। দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল এক-এগারোর সরকার। মূলত এক-এগারোর সময় একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা হলো আমাদের সুশীলদের চেয়ে রাজনীতিবিদরা অনেক সৎ। সুশীলরা সুযোগ পেলে যে কী ভয়ংকর দুর্বৃত্ত দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠতে পারেনতার প্রমাণ এক-এগারো।

এক-এগারোর পর বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে। সুশীলদের আক্ষেপ হতাশা এবং নানা অপপ্রচারের পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। সময় আমলাতন্ত্র সুশীলদের বিকল্প হয়ে সামনে এসেছে। গণতান্ত্রিক সরকারের দুর্বলতা সুযোগ নিয়ে আমলারা দারোয়ান থেকে গৃহকর্তা হয়ে যাওয়ার কসরত করছেন। গণতান্ত্রিক সরকারকে নানাভাবে বশীভূত করে আমলারা আসলে ক্ষমতাকেন্দ্র প্রায় দখলের চেষ্টা করেছেন। প্রবণতাটি ভয়ংকর আকার ধারণ করে কভিডের সময়। সে সময় রাজনীতিবিদদের ঘরে তুলে আমলারা দেশে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে যান। বিভিন্ন জেলায় আমলাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসকরা সংসদ সদস্যদের ওপর খবরদারি শুরু করেন। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হন জনগণের প্রতিনিধি উপজেলা চেয়ারম্যানরা। আমলাতন্ত্রের এই সর্বগ্রাসী থাবার ফলে দেশে রাজনীতি কোণঠাসা হয়ে যায়। বিরোধী দলহীন সংসদ, গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে সরকার পুরোপুরি আমলানির্ভর হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়টি ছিল মূলত রাজনৈতিক দলের অবয়বে একটি আমলাতান্ত্রিক সরকার। এই ভূতুড়ে ব্যবস্থার কারণেই বেনজীর-মতির সৃষ্টি। সময় যেসব আমলা ক্ষমতাবান হয়েছিলেন তাদের লুণ্ঠনের তদন্ত হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি। তাদের দুর্নীতির যদি নির্মোহ তদন্ত হয় তাহলে দেখা যাবে যে, দুর্নীতিতে তারা সুশীলদেরও হারিয়ে দিয়েছেন।

২০২৪ সালে টানা চতুর্থবারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। মন্ত্রিসভায় বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা এলাকার কর্তৃত্ব গ্রহণ করছেন। বেনজীর-মতি বা যেসব সরকারি কর্মকর্তাদের হাঁড়ির খবর বেরিয়ে আসছে, আমি তাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখি না। এটি আমলাতন্ত্রের ক্ষত। এর মাধ্যমে একটি জিনিস প্রমাণিত হয়েছে, সুশীলরা যেমন ক্ষমতা পেলেই দুর্নীতিবাজ হয়, আমলারাও ক্ষমতা পেলে হয় দুর্বিনীত। সরকারের ভেতর এরকম অনেক বেনজীর-মতি রয়ে গেছেন। প্রয়োজন হলো তদন্ত করে তাদের খুঁজে বের করা এবং তাদের আইনের আওতায় আনা। রাজনীতিবিদরা শেষ পর্যন্ত দেশপ্রেমী। শেষ পর্যন্ত তাদের জনগণের কাছে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত তাদের জবাবদিহি করতে হয়, তা যে প্রক্রিয়ায় হোক না কেন। তাই একজন দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদও জনগণের জন্য কাজ করেন। সম্পদের একটি অংশ জনগণের মধ্যে বণ্টন করেন। এর মানে এই নয় যে, রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিকে আমি সমর্থন করছি কিন্তু রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির ছিটেফোঁটাও তার কর্মী-সমর্থকরা পায়।

অন্যদিকে আমলা বা সুশীলদের দুর্নীতির টাকা চলে যায় বিদেশে। তাই ঘটনাগুলোই একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতিবিদদের চালকের আসনে বসতে হবে। ক্ষমতার সবটুকু রাজনীতিবিদদের দিতে হবে। রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি করলে জনগণ তার বিচার করবে। রাজনীতিবিদদের জেলে যাওয়ার নজির অনেক। এই দেশে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন। শত শত মন্ত্রী দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে জেল খেটেছেন। কজন সচিব, কজন সরকারি কর্মকর্তা জেল খেটেছেন? কজন সুশীল দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন? আমলা বা সরকারি কর্তারা দুর্নীতি করলে দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন। সুশীলরা দুর্নীতি করে বিদেশে ঠিকানা করেন। দুর্নীতি মুক্তির যুদ্ধে রাজনীতিবিদদেরই সামনে আনতে হবে। আমলাতন্ত্র সুশীলমুক্ত আদর্শবাদী রাজনীতি দুর্নীতি প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com

 


দুর্নীতি  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন