এডিটর’স মাইন্ড

আত্মঘাতী আওয়ামী লীগ

প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ২০ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম দুই ধাপের নির্বাচন ছিল সহিংস, সন্ত্রাসে ভরপুর। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার ১৯৮ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। এ নির্বাচনে সহিংসতায় মারা গেছেন ৪০ জনের বেশি। আহত হয়েছেন ৫ হাজারের ওপর। ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেছেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে অতীতেও সহিংসতা হয়েছে। তবে এ সহিংসতা ও মৃত্যু কাম্য নয়।’ একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এবার নির্বাচনী সহিংসতা একটু ভিন্ন ধরনের। আগে নির্বাচনে সন্ত্রাস হতো দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংসতায় রূপ নিত। কিন্তু এবার নির্বাচনী সহিংসতার প্রায় পুরোটাই আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে। আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগকে খুন করছে, জখম করছে। যারা একসঙ্গে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন তারা এখন একে অন্যের ঘাতক। আওয়ামী লীগই যেন আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। নিজেরাই নিজেদের সব অর্জন ধ্বংস করছে। আত্মহননের এক ভয়ংকর খেলা চলছে আওয়ামী লীগেই। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ৭২ বছরের পুরনো। এখনো আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সংগঠিত রাজনৈতিক দল। তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনটি বিস্তৃত। এ দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। জাতির পিতার আদর্শের ধারক দল আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগ নানা চড়াই উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য এ দলের নেতা-কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আওয়ামী লীগের চেয়ে জুলুম-নির্যাতন আর কোনো রাজনৈতিক দল সহ্য করেনি। ৭২ বছরে আওয়ামী লীগকে সংগ্রাম করতে হয়েছে ৫০ বছরের বেশি। কিন্তু আওয়ামী লীগের ইতিহাস একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাইরের রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগকে কখনো পরাজিত করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ যতবার হেরেছে প্রতিবার ঘরের শত্রুরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আত্মঘাতী গোল আওয়ামী লীগকে বিপর্যস্ত করেছে। মুসলিম লীগ, আইয়ুব খান, মোনায়েম খান আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে পারেননি। বরং এদের নিষ্পেষণে শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু থেকে হয়েছেন জাতির পিতা। জাতির পিতাকে স্বাধীন বাংলাদেশে জাসদ সর্বহারা, পরাস্ত করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে আওয়ামী লীগের ভিতরে। খুনি মোশতাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীরা প্রায় সবাই ’৭৫-এর পর অবৈধ সরকারের অংশ হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দিয়েই তারা বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন শপথ নিতে। আওয়ামী লীগের মোশতাক চক্ররা যদি সেদিন বিশ্বাসঘাতকতা না করত তাহলে আগস্ট ট্র্যাজেডি ঘটত কি না তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ যতবার হোঁচট খেয়েছে, সংকটে পড়েছে প্রতিবার আওয়ামী লীগের একাংশের আত্মঘাতী তৎপরতার জন্য। আওয়ামী লীগ এ অন্তর্ঘাত অস্বীকারও করেনি। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ও নীতিনির্ধারণী সভাগুলোয় আওয়ামী লীগের আত্মঘাতী তৎপরতার আদ্যোপান্ত পাওয়া যায়। ’৭৫-এর ট্র্যাজেডির পর আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল হয় ৩ মার্চ ১৯৭৮। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ওই সম্মেলনের আহ্বায়ক ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে আওয়ামী লীগের আত্মঘাতী তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বলা হয়েছিল- ‘জনাব মিজান চৌধুরীদের সংগঠনের বিরুদ্ধে এহেন অপতৎপরতা এই প্রথম নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর আমলে অকাজ-কুকাজের জন্য বহিষ্কৃত জনাব মিজান চৌধুরী ও জনাব মতিউর রহমানের মতো লোকেরা সংগঠনের নেতৃত্ব কুক্ষিগত এবং কবজাভূত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন।’ (সূত্র : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল। রচনা, গ্রন্থনা ও সম্পাদনা নূহ উল আলম লেনিন, পৃষ্ঠা ৪৪৭)। আওয়ামী লীগের বিভক্তি এবং হতচ্ছাড়া অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি উপায়ই ছিল তা হলো বঙ্গবন্ধু কন্যাকে দলের নেতৃত্বে আনা। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের চাপে তা-ই হয়েছিল। দল বাঁচাতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনাকে। ১৯৮১-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হন এবং ১৭ মে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকেও দলের ভিতরের আত্মঘাতী তৎপরতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে শুরুতে তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা হয়েছে দলের মধ্যে থেকেই। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সেই আত্মঘাতী তৎপরতার বিবরণও পাওয়া যায়। ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রিপোর্ট পেশ করেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। ওই রিপোর্টে তিনি বলেন, ‘কতিপয় ব্যক্তি দলীয় সংকট মোচনের পথে অগ্রসর না হয়ে সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলতে সচেষ্ট হন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন, ১৯৪৯-এ আওয়ামী লীগের জন্মের পর হতেই বহুবার বহু নেতা-কর্মীর স্বীয় স্বার্থে ও উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার মানসে এবং বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও অশুভ শক্তির প্ররোচনায় কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সংগঠনকে “ডানপন্থিদের সংগঠন” রূপে আখ্যায়িত করে নিজেদের তথাকথিত অতিবিপ্লবী বাম রাজনীতির ও প্রগতির ধ্বজাধারীর পরিচয় দিয়ে, আবার কেউ কেউ একই অভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগ সংগঠন “বামপন্থিদের সংগঠন” রূপে আখ্যায়িত করে নিজেদের তথাকথিত ওয়েস্টার্ন ডেমোক্র্যাসি, ফ্রি ইকোনমি ও ইসলামের অকৃত্রিম খাদেম পরিচয় দিয়ে দল ত্যাগ করেছেন।’ (সূত্র : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল। পৃষ্ঠা ৪৯৯)।

১৯৮৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ সঠিক না ভুল ছিল তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অমীমাংসিত। এরশাদের নজিরবিহীন কারচুপি ও ‘মিডিয়া ক্যু’ ওই নির্বাচনের ফল পাল্টে দিয়েছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে আবদুর রাজ্জাকদের আত্মঘাতী তৎপরতা না হলে ভোটবিপ্লব হতো বাংলাদেশে। একইভাবে ১৯৯১-এর নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি গ্রুপের আত্মঘাতী হয়ে ওঠা ছিল আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। বিদ্রোহী প্রার্থী, অন্তঃকলহ ’৯১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেয়নি। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা করেছে সফলভাবে। কিন্তু একসময় দলের ভিতরে কারও কারও অপতৎপরতা আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের কারণ উঠে আসে ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে দলের সভানেত্রীর ভাষণে। ওই কাউন্সিলে প্রদত্ত ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দলের ভিতরে কোথাও কোথাও কোন্দল ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার ঘটনাটিকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় কিছুসংখ্যক নিশ্চিত বিজয়ের আসন আমাদের হাতছাড়া হয়েছে।’

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও আওয়ামী লীগে দেখা যায় আত্মঘাতী তৎপরতা। দলে গণতন্ত্রের জিকির তুলে আওয়ামী লীগ ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এ ষড়যন্ত্র হয়েছিল দলের ভিতরেই।
আওয়ামী লীগ বারবার সংকটে পড়েছে দলের ভিতরের সমস্যার কারণেই। তার পরও দলটি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী সংগঠন এজন্য যে এ ‘আত্মঘাতী’ তৎপরতা প্রতিহত করেছেন কর্মীরা, তৃণমূল। এরাই আওয়ামী লীগের প্রাণ। এরাই ৭২ বছরেও আওয়ামী লীগকে সজীব ও সতেজ রেখেছেন। এদের ঐক্য, স্বার্থহীন ত্যাগ ও নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের ফলেই আওয়ামী লীগ আজকের অবস্থায়। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগের সেই নিঃস্বার্থ, ত্যাগী তৃণমূলই যেন আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। এটাই হলো ভয়ের কারণ।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দিচ্ছে চেয়ারম্যান পদে। শুরু থেকেই এ মনোনয়ন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক। তৃণমূলের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রতিক্রিয়া বেশ স্বচ্ছ। জেলা ও উপজেলা নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রে নাম পাঠান। দলের সভানেত্রীর নেতৃত্বে আছে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। এ বোর্ড স্থানীয় পর্যায় থেকে পাঠানো একাধিক নামের প্রস্তাব থেকে একজনকে মনোনয়ন দেয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে মনোনয়ন নিয়ে সব সময় বিতর্ক থাকে। এখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক পরিচয় বড় করে দেখা হয়। তাই এসব নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকাই স্বাভাবিক। সবচেয়ে ভালো হতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন যদি দলীয়ভাবে না করা হতো। যে-যার মতো নির্বাচন করত। তা সম্ভব হয়নি। আর সে কারণেই এ নির্বাচনে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত অনেক সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে দেখেছি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তৃণমূলের একটি বিদ্রোহ হয়েছে। এ বিদ্রোহ মনোনয়ন-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের বিদ্রোহীরা দাবি করেছেন, স্থানীয় নেতা, এমপি এমনকি কেন্দ্রীয় নেতারা মনোনয়ন-বাণিজ্যে জড়িত। একজন তৃণমূলের নেতা বলেছিলেন, ‘একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া সবাই মনোনয়ন-বাণিজ্যে জড়িত।’ সবাই না হলেও এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যে ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্য হয়েছে তা ওপেন সিক্রেট। আওয়ামী লীগের মধ্যেই আলোচনা হয়, চেয়ারম্যান পদে এমপিরা মনোনয়ন বিক্রি করেছেন। সব এমপি যে মনোনয়ন বিক্রি করেছেন তা নয়। অনেক নব্য আওয়ামী লীগার এমপি হয়ে এলাকায় তার ভিত শক্ত করার মিশনে নেমেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের নেতা-কর্মীদের ওএসডি করেছেন। নতুন আওয়ামী লীগ তৈরি করেছেন। এদের ‘এমপি লীগ’ও বলা যায়। এমপি লীগে রাজনীতিবিদ নেই। আছেন ঠিকাদার, গ্রাম্য টাউট, সুবিধাবাদী, মৌলবাদী, ধর্ষক, সন্ত্রাসীরা। এমপি সাহেব ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে এদের মধ্যেই তো কাউকে বাছাই করবেন। এরপর কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের কাছে ধরনা দিয়েছেন। কারও কাজ হয়েছে, কারও হয়নি। যার হয়েছে তিনি তার নতুন আওয়ামী লীগের একান্ত চামচাকে ‘নৌকা’ প্রতীক উপহার দিয়েছেন। তৃণমূলের ত্যাগী প্রার্থীরা হতবাক হয়েছেন। ২০০১-এর পর বিএনপি-জামায়াত তাণ্ডবে এই ব্যক্তি কোথায় ছিলেন? ২০০৭-এর ওয়ান-ইলেভেনে কোথায় ছিলেন? তৃণমূল এটা মেনে নিতে পারেনি। তারা নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। নিজেরা চাঁদা তুলে প্রার্থীর জন্য খরচ করেছেন। নতুন করে সন্ত্রাসী হামলা ও প্রশাসনের অন্যায় আচরণ হজম করেছেন। (সত্যিকারের আওয়ামী লীগ তো এসবে অভ্যস্ত)। তারপর তারা নৌকা প্রতীক পাওয়া নব্য আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দিয়েছেন। কদিন আগে বিজয়ী এক বিদ্রোহী প্রার্থী এবং কয়েকজন তৃণমূল নেতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। এমপি সাহেব যে ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছেন তিনি ছিলেন যুদ্ধাপরাধী সাঈদী মুক্তি পরিষদের অন্যতম নেতা। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর যারা আক্রমণ করেছিল তাদের একজন ছিলেন নৌকা প্রতীক পাওয়া ওই প্রার্থী। তার মনোনয়ন স্থানীয় তৃণমূল মেনে নিতে পারেনি। তাই সম্মিলিতভাবে তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বেছে নেন একজন প্রবীণ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে। ওই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এ রকম ১৩১টি ইউনিয়ন পরিষদে নৌকা প্রতীকের ভরাডুবি হয়েছে। এরা নির্বাচনে দ্বিতীয়, তৃতীয়ও হতে পারেননি। আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে প্রতিহত করেছে। মনোনয়ন-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের এটি ছিল দৃশ্যমান প্রতিবাদ। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ তৃণমূলের প্রকাশ্য বিদ্রোহ।

আবার বিপরীত চিত্রও আছে। অনেক স্থানে এমপিরা চেষ্টা-তদবির করেও তার পছন্দের প্রার্থীর মনোনয়ন আদায় করতে পারেননি। কেন্দ্রীয় স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত মনোনয়ন বোর্ড দলের পরীক্ষিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু এমপি সাহেব তা মানবেন কেন? এটা যদি তিনি মানেন তাহলে তার এমপি লীগের কী হবে? দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে তিনি তার ‘একান্ত অনুগত’ ব্যক্তিকে বিদ্রোহী প্রার্থীরূপে দাঁড় করালেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ম্যানেজ করলেন। তারপর নৌকার প্রার্থীকে দৌড়ের ওপর রাখলেন। টাকা ছড়িয়ে আওয়ামী লীগকেও বিভক্ত করলেন। অবশেষে এমপির পছন্দের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হলেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হেরে গেলেন। ফলে ইউনিয়ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয় ঘটেছে। প্রথম দফায় কম থাকলেও দ্বিতীয় দফায় শতকরা ৪২ ভাগ ইউনিয়নে বিদ্রোহী বা আওয়ামীবিরোধীরা জয়ী হয়েছেন। সামনে এ প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

অতীতে আওয়ামী লীগের তৃণমূল ছিল ঐক্যের প্রতীক। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যখন দলের স্বার্থের বিরুদ্ধে, দলের নেতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তখন তৃণমূলের ঐক্যই তা প্রতিহত করেছে। তৃণমূলের ঐক্যের ফলেই বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা জাতীয় গণদাবি হয়েছে। তৃণমূলের সংগ্রামেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে জাতির পিতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। তৃণমূলের ত্যাগের জন্যই ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে পেরেছেন শেখ হাসিনা। তৃণমূলের ভালোবাসায় ওয়ান-ইলেভেনের অপশক্তি আওয়ামী লীগের ক্ষতি করতে পারেনি। ২০০৯ সালের কাউন্সিলে উদ্বোধনী ভাষণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের এ শক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের ভয়ভীতি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সেদিন যেভাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন তাতে বাঙালি জাতি আবারও উপলব্ধি করতে পেরেছে, একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে তাদের আশা-আকাঙ্খা ধারণ করতে।... আওয়ামী লীগের যে কোনো সংকটে তৃণমূল নেতা-কর্মীরাই বারবার দলকে টিকিয়ে রেখেছেন।

এবার যেন সেই তৃণমূলকেই আত্মঘাতী বানানো হচ্ছে। তৃণমূল বিভক্ত মানেই আওয়ামী লীগ বিভক্ত। তৃণমূলে হানাহানি মানে আওয়ামী লীগে সংকট। তৃণমূলকে বিভক্ত করে কি আওয়ামী লীগের বারোটা বাজানো হচ্ছে? আওয়ামী লীগই হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের হন্তারক। আওয়ামী লীগের কাছেই হেরে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগে যে আত্মঘাতী তৎপরতা তা আওয়ামী লীগকে আরেকটি সংকটের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। আওয়ামী লীগে যেসব স্থানীয় নেতা, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতা মনোনয়ন-বাণিজ্য করছেন তারা কি জানেন আওয়ামী লীগ দুর্বল হলে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না। আওয়ামী লীগে যারা দলের বিদ্রোহীদের মদদ দিয়েছেন, উসকে দিয়েছেন তারা কি জানেন এ বিভক্তি আওয়ামী লীগেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি নয়, এটা দেশেরও ক্ষতি। কারণ আওয়ামী লীগ যখন জয়ী হয় তখন একাই জয়ী হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন পরাজিত হয় তখন গোটা বাংলাদেশ হারে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার এবং দুঃসময়ের যোদ্ধারা

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ১৬ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

১৬ জুলাই আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি দিন। ২০০৭ সালের এই দিনে মিথ্যা-ভিত্তিহীন মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ধানমন্ডির ‘সুধা সদন’ থেকে। বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণ বাস্তবায়নের জন্য এবং গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ীভাবে বিদায় দেয়ার জন্যই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ এবং মইন-উ আহমেদের নেতৃত্বে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশকে ঘিরে একটি নতুন নীল নক্সা প্রণয়ন করেছিলেন। গণতন্ত্রহীন করে রাখতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে। আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

তবে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের আগে পরিকল্পিত আওয়ামী লীগের ভেতরে সৃষ্টি করা হয়েছিলো অন্তঃকলহ এবং বিভক্তি। আওয়ামী লীগের ভেতর সংস্কারপন্থী নামে একটি নতুন গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়। যারা শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার জন্য প্রথম ভূমিকা পালন করেছিলেন। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তারা বুঝে হোক, না বুঝে হোক অগণতান্ত্রিক এবং সুশীলদের খপ্পরে পরেছিলেন। আর একারণেই এক এগারোর সময়ে তারা একের পর এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন শেখ হাসিনার প্রতিটি কাজে। আওয়ামী লীগের এই বিভক্তির সুযোগেই শেখ হাসিনাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছিলো তৎকালীন সরকারের পক্ষে। আওয়ামী লীগ সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্থ হয় ঘরের শত্রুদের কারণে। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট যেমন আওয়ামী লীগের আসল ক্ষতি করেছিল মোশতাক চক্র, ঠিক তেমনি ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগের সর্বনাশের চেষ্টা করে সংস্কারবাদীরা। বাইরের শত্রু নয় ঘরের শত্রুরাই আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর। ১৬ জুলাই তার আরেকটি প্রমাণ। 

২০০৭ সালের ১৬ জুলাইয়ের আগে অনেক নাটকীয়তা হয়েছিলো। বিশেষ করে ১১ জানুয়ারি তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে যখন ড. ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে তত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় তখন তারা দ্রুত একটি অবাধ, সুষ্টু, নিরপেক্ষ নির্বাচন দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। তৎকালীন সংবিধানে তত্বাবধায়ক সরকারের কাজের পরিধি ছিলো খুবই সীমিত। তাদের একমাত্র দায়িত্ব ছিলো একটি অবাধ, সুষ্টু, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। কিন্তু ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্বাবধায়ক সরকার এসে রুটিন দায়িত্বের বাইরে রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক বিষয়ের ওপর হস্তক্ষেপ শুরু করেন। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে তারা শুরু করেন দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান, যৌথ অভিযানের মতো চটকদার কর্মসূচী। আর এসব অভিযানের নামে তারা রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণের খেলায় মেতে ওঠেন। আর তাদের এই কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য ছিলো দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাংলাদেশে একটি অনির্বাচিত, অগণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা। এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়েই শেখ হাসিনাকে সেই সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। শুধু শেখ হাসিনাই নয় পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। কিন্তু শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার ছিলো বিরাজনীতিকরণের টার্নিং পয়েন্ট। 

আজ ১৭ বছর পরে এসে আমরা যদি পিছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব, ১৬ জুলাই ছিলো আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি কঠিন দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে যেমনভাবে আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিলো। ঠিক তেমনি ১৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে আওয়ামী লীগকে পঙ্গু করার চেষ্টা হয়। 

১৫ আগস্টের সঙ্গে ১৬ জুলাইয়ের মৌলিক পার্থক্য হলো, ১৫ আগস্টে জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছিলো আর ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু দু’টি ঘটনার মধ্যে অদ্ভুত মিল। দুই ট্রাজেডিতে বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছিলো আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই। আরও মিল হলো যারা সুসময়ে চাটুকার ছিলেন, যারা সুসময়ে আওয়ামী লীগ প্রধানের চারপাশে ঘুরঘুর করতেন, মধু খেয়েছেন তারাই দুঃসময়ে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছিলেন। এটা আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটি বড় শিক্ষা। 

১৫ আগস্টে খুনী মোশতাক যেমন বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলো তেমনি ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সংস্কারপন্থিরা শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের পর নির্লিপ্ত ছিলো। সুসময়ের সুবিধাভোগী চাটুকাররা দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়নি। দুঃসময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলো তারাই হলো আওয়ামী লীগের সত্যিকারের কাণ্ডারি। প্রয়াত জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, বেগম মতিয়া চৌধুরী, এডভোকেট সাহারা খাতুন এবং তৃণমূলের নিবেদিত প্রাণ নেতা-কর্মীরাই দুঃসময়ের কাণ্ডারি হয়েছিলেন। 

এটা শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সব রাজনৈতিক দলের জন্যই  একটি বড় শিক্ষা। ১৬ জুলাই আমাদের যে শিক্ষাটি দেয় তা হলো সুসময়ে যারা চারপাশে থাকে তাদের মধ্যে একটি বড় অংশই চাটুকার, মতলববাজ। দুঃসময়ে এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিলো। এসময় যাদের দুর্দন্ত প্রভার ছিলো, তারা ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনার জন্য রাজপথে নামেনি। তারা অনেকেই আত্মতুষ্টিতে ভুগেছিলেন। অনেকেই নেতৃত্ব দখলের খোয়াব দেখেছেন। অনেকে বাঁচতে পালিয়েছেন। যাদের কোন চাওয়া পাওয়া নেই। যারা চিরকাল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করেছে, ত্যাগ স্বীকার করেছে, তারাই সেদিন শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছে।

আওয়ামী লীগের সব সংকটেই এই তৃণমূল এবং আদর্শবানরাই সামনে এসেছে, রুখে দাঁড়িয়েছে, দলকে রক্ষা করেছে। তবে একটি বিষয় এখন উদ্বেগের, আতংকের। আওয়ামী লীগের তৃণমূলকেই এখন রক্তশূণ্য করা হচ্ছে। আদর্শবান নেতাদের দূরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তৃণমূলের মধ্যেও ঢুকে পরছে হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী। তৃণমূলেও কমিটিগুলোতে বাণিজ্য হচ্ছে কোটি টাকার। আর এই বাণিজ্যের কারণে সত্যিকারের ত্যাগী, আদর্শবাদীরা নিষ্ক্রিয়, নির্লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার একটি দুঃসময় এলে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করবে কে? সেটি এখন বড় প্রশ্ন। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


আওয়ামী লীগ   শেখ হাসিনা   গ্রেপ্তার   যোদ্ধা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কেরানি হওয়ার আন্দোলনে তরুণরা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৫ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন আন্দোলনে। গত ১ জুলাই থেকে এ আন্দোলন শুরু হয়েছে। আন্দোলন এখন ঢাকা থেকে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রধান দাবি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। কোটা সংস্কার করা উচিত কি না বা কোটা নিয়ে বর্তমানে যে সংকট, তার সমাধান কে করবে, তা নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত। বর্তমান কোটাব্যবস্থা ভালো না মন্দ, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। কোটা বিতর্কে বুঁদ হয়ে আছে দেশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, বন্যাদুর্গত মানুষের আহাজারি—সবকিছু ছাপিয়ে কোটা সংস্কার এখন জাতির সামনে সবচেয়ে বড় ইস্যু।

প্রচলিত যে কোটা পদ্ধতি আছে, তার বিজ্ঞানসম্মত এবং যুক্তিসংগত পরিবর্তনের পক্ষে সবাই। হাইকোর্ট কোটাসংক্রান্ত মামলায় যে আংশিক রায় প্রকাশ করেছেন, তাতেও সরকার চাইলে কোটা সংস্কার করতে পারবে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাবে কে’। আদালত, সংসদ নাকি রাজপথ? এ নিয়েও চলছে এক ধরনের বাহাস। এখন সরকারি চাকরিতে যেভাবে কোটা বিন্যাস আছে, তার পরিবর্তন প্রয়োজন। আবার একেবারে কোটা বাতিল অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমার কাছে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে এসেছে, তা হলো আমাদের তরুণ প্রজন্ম কি শুধু একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য কি শুধু একটি সরকারি চাকরি? তারুণ্যের স্বপ্নের সীমানা কি এত সংকীর্ণ? এই প্রশ্নগুলো আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা আজকে সম্মান দিয়ে যাকে বলি আমলাতন্ত্র, আদতে তা ‘কেরানিতন্ত্র’। সরকারি চাকরি যারা করেন, তারা আসলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। জনগণের সেবক বা চাকর। কেরানি হওয়ার জন্য আমাদের তরুণরা এখন যে যুদ্ধ করছে, এটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য, গ্লানিকর এবং ঘোরতর শঙ্কার।

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস নতুন নয়।’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০০৭ সালে অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন। সব আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ কারণেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা মহিমায় মহিমান্বিত। আন্দোলন, সংগ্রাম এবং মুক্ত ভাবনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গড়ে উঠেছে আগামীর নেতৃত্ব। যে কোনো সংকটে পথ দেখিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে বিবেচিত। আর তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলন করেন, তখন আমরা সেদিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকি। এ আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। এই আন্দোলন জাতিকে পথ দেখাবে—এমনটা প্রত্যাশা করি।

এবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটি কী ধরনের? এ আন্দোলন কি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের আন্দোলন? এ আন্দোলন কি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন? এ আন্দোলন কি বাংলাদেশে লুণ্ঠন, অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে তারুণ্যের প্রতিবাদ? এ আন্দোলন কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারুণ্যের দ্রোহ? এ আন্দোলন কি শিক্ষার বৈষম্য বিলোপের লড়াই? এসব কিছুই নয়। এটি একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা। গোটা দেশের শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে ফায়দা লোটার এক আত্মঘাতী কৌশল।

আমরা সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছাত্র আন্দোলন দেখছি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আন্দোলন সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছেন গাজায় ইসরায়েলি বর্বর হত্যাকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে। সেই আন্দোলনের ঢেউ বাংলাদেশে লাগেনি। গাজার গণহত্যার প্রতিবাদে যখন বিশ্বের তাবৎ দেশের মেধাবী তরুণরা সোচ্চার, তখন আমাদের তরুণরা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কসরতে ব্যস্ত। বিসিএস গাইড বুকে বুঁদ হয়েছিলেন তারা। তাদের এই আত্মকেন্দ্রিকতা এবং সমাজবিমুখতা হতাশার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন পথ দেখান না, সমাজ বদলান না, কেরানি হতে চান। সরকারি চাকরি চান। এ আন্দোলনকে একটি সামগ্রিক সমাজ পরিবর্তন, দেশ, রাষ্ট্র বা জাতির কল্যাণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এই আন্দোলন হতশ্রী, মেধাহীন সৃজনশীলতা বিবর্জিত তারুণ্যের প্রতিরূপ। দৈন্য তারুণ্যের মনোজগতের দারিদ্র্যের চিত্র এ আন্দোলন।

বিশ্বের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রতিবাদ করেছে, তার অগ্রভাগে আছে জেন. জি (জেনারেশন জুমাস) খ্যাত তরুণরা। তাদের চেতনা ও স্বতঃস্ফূর্ত নীতি আমাদের অতীত ছাত্র আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমাদের শিক্ষাজীবনকে উৎসর্গ করেছি। আমাদের ছাত্র-তরুণরা বুকের রক্ত দিয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, শিক্ষার অধিকারের জন্য। জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালি, রাউফুন বাসুনিয়া, সেলিম, দেলোয়ার শহীদ হয়েছেন দেশের জন্য, শিক্ষার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু এবার আন্দোলন কার জন্য? একটি সরকারি চাকরির জন্য। গত কয়েক বছরে সামগ্রিকভাবে এমন একটি পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যাতে মনে হচ্ছে, শিক্ষাজীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো সরকারি একটি চাকরি পাওয়া। সরকারি চাকরিই যেন সবকিছু। এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখে সেই কথাটি আরও বেশি করে মনে পড়ছে। সত্যিই আমি লজ্জিত।

এই সরকারি চাকরিকে কেরানিগিরি বলা যায়। এই কেরানিগিরির বিরুদ্ধে সৃজনশীল, উদ্ভাবনী মানুষের এক ধরনের অনীহা এবং ক্ষোভ ছিল সবসময়। বিশেষ করে মেধাবী তরুণরা ছকে বন্দি এই আনুগত্যের জীবনে আগ্রহী ছিলেন না কখনোই। আমরা বাংলা সাহিত্যেও এর প্রচুর উদাহরণ পাই। দুর্গাচরণ রায়ের ব্যঙ্গাত্মক ভ্রমণ কাহিনি ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ গ্রন্থে দেবতাদের বয়ানে সরকারি চাকরি বা কেরানিবৃত্তির অনবদ্য সমালোচনা করা হয়েছে। এই বইটিতে ব্রহ্মাদেব কলকাতা শহরে এসে বিস্মিত হন। বলেন, ‘কী আশ্চর্য! যাহাকেই দেখি, যাহার সঙ্গেই আলাপ করি, সেই কেরানি। দোকানদার, মহাজন, অধ্যাপক, চিকিৎসক, চামার, কুম্ভকার, কর্মকার আর চক্ষে দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলেই কেরানি।’ ব্রহ্মার বিস্ময়ের জবাবে তার সফরসঙ্গী বরুণ দেব বলেন, ‘চাকরি করা বাঙালি জাতির সংক্রামক রোগ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নচেৎ যে অধ্যাপকের জগৎজুড়ে মানসম্ভ্রম, যাহার গৃহে বিদায়ের ঘটি, বাটি, থালা, ঘড়া রাখিবার স্থান হয় না। তিনি নিজ ব্যবসাকে ধিক্কার দিয়ে পুত্রকে ১৫ টাকার কেরানি প্রস্তুত করিতেছেন। যে কবিরাজ ধন্বন্তরি নামে পরিচিত হইয়া অর্জিত ধন বহন করিয়া আনিতে পারিতেন না, তিনিও নিজ ব্যবসা পরিত্যাগ করিয়া পুত্রকে ইংরেজি শিখাইয়া কেরানি প্রস্তুত করিতেছে। যে কুম্ভকার উত্তম উত্তম ছবি ও পট আঁকিয়া স্বাধীনভাবে চল্লিশ টাকা উপার্জন করেন, সেও কাদা-ছানা অতি জঘন্য ব্যবসা বলিয়া পুত্রকে ইংরেজি শিখাইয়া কেরানি প্রস্তুত করিতেছেন। এরূপে ধোপা, নাপিত, মেথর, মুদ্দফরাস সকলেই কেরানি হইবার জন্য হাত ধুইয়া বসিয়া আছে।’ ১৮৮০ সালের দিকে দুর্গাচরণ এই গ্রন্থটি লিখেছিলেন। কিন্তু আজ বিভিন্ন সড়কে যে আন্দোলন হচ্ছে, সেই আন্দোলন দেখে আমার মনে হচ্ছে, দুর্গাচরণের লেখাটি আজকের বাস্তবতায় একেবারেই সত্যি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন কেরানি হওয়ার মনোবাসনায় এখন জীবন দিতেও প্রস্তুত! সব দেখে-শুনে পণ্ডিত বিনয় কুমার সরকারের মতো আমারও বলতে হচ্ছে করে, ‘কেরানির স্বরাজ প্রতিষ্ঠা হোক’। তরুণ সমাজের মধ্যে আমলা বা কেরানি অথবা সরকারি চাকরি করার আগ্রহ কেন এত তীব্র হলো? নতুন একটা সিনেমা, একটা উপন্যাস, একটা নতুন গানের চেয়ে ‘বিসিএস গাইড বই’ কেন তাদের এত প্রিয় হলো। কেন তারা পাঠ্যবই সেলফে রেখে বাংলা ব্লকেড করে। আমলাতন্ত্রে কি মধু আছে?

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র বা কেরানিতন্ত্রের আবির্ভাব বা বিকাশ অনেক পুরোনো। ড. আকবর আলি খান ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালের রাজনীতি’ গ্রন্থে ‘আমলাতন্ত্র: গ্রেশাম বিধির মতো ব্যামো’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র নিয়ে বিতর্কের শুরু কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর আগে। এ বিতর্ক শুরু হয়েছিল চীনে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস আমলাতন্ত্রকে ধ্রুব তারার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, এ তারকা স্থির এবং সব তারকাই এর নির্দেশে চলে।... বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র আদৌ নতুন নয়। ২০০০ বছরের বেশি আগে মৌর্য সাম্রাজ্যে আমলাতন্ত্র ছিল। ‘কৌটিল্যের অর্থ শাস্ত্রে’ আমলাতন্ত্রের বিশদ বিবরণ ড. খান তার অন্য এক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ গ্রন্থে তিনি চাণক্যের উদ্ধৃতি দেন এভাবে—‘চাণক্য লিখেছেন, সরকারি কর্মচারীরা দুইভাবে বড়লোক হয়, হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে। চাণক্যের অর্থ শাস্ত্রে সরকারি কর্মচারীদের চল্লিশ ধরনের তছরুপের ও দুর্নীতির পন্থা চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে সজাগ থাকা সত্ত্বেও চাণক্য রাজস্ব বিভাগে দুর্নীতি অনিবার্য মনে করতেন। অর্থ শাস্ত্রে বলা হয়েছে: ‘জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব, তেমনি অসম্ভব হলো সরকারের তহবিল নিয়ে লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে, তা জানা যেমন অসম্ভব, তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয় কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে।’ কৌটিল্যের ‘অর্থ শাস্ত্র’ যেন বর্তমান সময়ের আমলাতন্ত্রের আয়না! আমলামুখী তারুণ্যের স্রোত সেই মধুর আশায় এটা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহের মহামারির কারণ হলো, সরকারি চাকরিতে চাকচিক্য এবং উপরি আয়ের অবারিত সুযোগ। কেউ দেশপ্রেম বা দেশকে বদলে দেওয়ার জন্য সরকারি চাকরি করছেন, এমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানিদের পদলেহন করেছেন অনেক আমলা। এরপর আবার বাংলাদেশের অনুগত হয়ে মধু খেয়েছেন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খোলস পাল্টানো আমলাদের বড় বৈশিষ্ট্য। তারা যখন যার এখন তার। বর্তমান সরকার টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে আমলাতন্ত্রের দ্বারা বশীভূত হয়েছে। পে স্কেল, আমলাদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা, দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের ফ্রি লাইসেন্স, আইন করে দায়মুক্তি তাদের ‘চাকর’ থেকে ‘প্রভু’ বানিয়েছে। যে কারণে এখন সরকারি চাকরি একটি ঝুঁকিহীন আকর্ষণীয় পেশা। সরকারি চাকরি হওয়া মানেই একটি নিশ্চিন্ত জীবন, দ্রুত প্রমোশন। সঙ্গে উপরি আয় তো আছেই।

সরকারি চাকরি করলে দুর্নীতি করা যায় অবাধে। তার বিচার হয় না। যৌন নিপীড়ন করলে শাস্তি হয় না। সাংবাদিক পেটালেও দম্ভ মওকুফ হয়। এ রকম বেহেশতি সুবিধা আর কোথায় আছে? সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরিতে যে দুর্নীতির বাক্স খুলে গেছে, তাতে বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, কিছু শিক্ষার্থী কেন কেরানি হতে মরিয়া।

কিন্তু সব তরুণ কি সরকারি চাকরি চায়? না, অনেক তরুণই সরকারি চাকরিতে আগ্রহী নয়। আমি এমন অনেক তরুণকে চিনি, যাদের কেউ কেউ সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এখন গরুর খামার করছেন। কেউ নতুন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান করার জন্য এখন সংগ্রাম করছেন। কেউবা ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করছেন। ফ্রিল্যান্সিং করছেন, কেউ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন মেধাবী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বিজ্ঞানী হয়ে আলোকিত হয়েছেন অনেক মেধাবী মুখ। কেউ আবার গবেষণা করছেন, খেলাধুলায় উজ্জ্বল তারকা হয়ে ওঠা তারুণ্যের সংখ্যাও কম নয়। সংগীত, শিল্পকলার নানা শাখায় আমাদের তারুণ্যের বিচরণ আছে। এ বহুমাত্রিকতাই আমাদের তারুণ্যের আসল রূপ। আমাদের তরুণরা সব ক্ষেত্রে নতুন কিছু করবে, তবেই না দেশ এগোবে। আমাদের তরুণরা ব্যবসায়ী হবে, উদ্যোক্তা হবে, শিল্পী হবে, সাহিত্যিক হবে, চলচ্চিত্র নির্মাতা হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশে সব বন্ধ দুয়ার খুলে একটি মুক্ত প্রবাহের সূচনা করবে তরুণরা। কিন্তু তা না করে কিছু তরুণ সব সড়ক বন্ধ করে রাজপথে বসে আছে একটি সরকারি চাকরির প্রত্যাশায়। কী আশ্চর্য।

আমাদের তারুণ্যের ইতিহাস বর্ণাঢ্য সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের তারুণ্যের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। এ তরুণরা দেশকে বদলে দিয়েছে, এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ এখন একটি চাকরির কুঠিরে বন্দি হওয়ার জন্য উদগ্রীব। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ কি তাহলে বিভ্রান্ত? পথহারা? না, এটি তরুণদের খণ্ডিত রূপ। অধিকাংশ, বিশেষ করে মেধাবী তরুণরা এর সঙ্গে সংশ্রবহীন। আমাদের তরুণদের একাংশের মধ্যে গত কয়েক বছরে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কেউ এখন দেশে থাকছে না। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে সেখানেই ঠিকানা করছে। ভালো চাকরি, নিরাপদ জীবন থেকে তারা দেশে আসতে চাইছে না। বাকিরা বিসিএস যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করছে। সরকারি চাকরি না পেয়ে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে বেসরকারি চাকরিতে মেধাহীন শ্রম দিচ্ছে। তরুণদের একটি অংশ এখনো সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনী চিন্তার মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে। এই তরুণদের সামনে আসতে হবে। এটাই আমাদের তারুণ্যের আসল পরিচয়। চাকরির জন্য ‘বাংলা ব্লকেড’ করা তরুণরা আমাদের তারুণ্যের প্রতিনিধি নয়।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


কোটা আন্দোলন   কেরানি   আমলাতন্ত্র  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাস: স্বস্তির চেয়ে শঙ্কা বেশি

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম ৬ মাস অতিবাহিত হলো। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ  হাসিনা। গঠন করেন নতুন মন্ত্রিসভা। সেই চতুর্থ মেয়াদের সরকারের ৬ মাস পূর্তি হয়েছে। যদিও ৬ মাস একটি সরকারের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। বরং এটি সূচনা মাত্র। তবে আওয়ামী লীগ সরকার টানা চতুর্থ বারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। তাই একটি নতুন সরকার বলতে যা বোঝায় সেইরকম কোন অবস্থা আওয়ামী লীগের জন্য প্রযোজ্য নয়। টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারকে নতুন সরকার বলা যায় না। এটি ধারাবাহিকতা। সে কারণে এই সরকারের জন্য অপেক্ষাকালীন সময় নেই। সরকারকে জনগণ পর্যবেক্ষণ করছে না, বরং কাজ চাইছে। প্রতিটি নতুন সরকারের যে ‘মধু চন্দ্রিমা’ সময় থাকে, সেটি উপভোগ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। মূলত এক কঠিন প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নির্বাচন করে এবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এর প্রতিক্রিয়া কি হবে ইত্যাদি বিষয় ছিলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মনোভাবের কারণে নির্বাচন নিয়েই একধরনের শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিলো। 

বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য আওয়ামী লীগ ভিন্ন এবং অভিনব একটি কৌশল গ্রহণ করে । দলের নেতা-কর্মীদের জন্য প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিলো। যারা নৌকা প্রতীক পাননি, তাদেরকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। যেকারণে নির্বাচন মোটামুটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশের উপরে গেছে  মূলত আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী কৌশলের কারণে। নির্বাচনের পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বললেও শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নিয়েছে। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ দেশ। 

নির্বাচনের পর বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কি করে তা নিয়েও একধরনের শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ছিলো। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নতুন সরকার গঠন করলে বিএনপি হতাশায় ভেঙ্গে পরে। রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে নিজেরাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নেয়। ফলে নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক চাপ যেমন আওয়ামী লীগ সামাল দিতে পেরেছে, ঠিক তেমনি দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিলো তা দূর হয়ে যায়। তাছাড়া এই নির্বাচন ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনও হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কাজেই নির্বাচনের পর বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কিনা, বাংলাদেশ একঘরে হবে কিনা ইত্যাদি শঙ্কা ১১ জানুয়ারির পর আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকে। অন্যদিকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক আন্দোলনও মুখ থুবড়ে পরে। ফলে নতুন সরকারের সূচনা হয় স্বস্তির মধ্যে দিয়ে। 

কিন্তু নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার পরও গত ৬ মাসে আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে নেই। আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপ নেই। বিরোধী দল নিষ্প্রভ। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও আওয়ামী লীগের জন্য কোন রকম বড় ধরনের চাপ নেই। কিন্তু তারপরও সরকার অস্বস্তিতে, চাপে। নানা কারণে সরকারের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। অর্থমন্ত্রী তা নিজেই স্বীকার করেছেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গত জুনে নতুন সরকার প্রথম বাজেট দিয়েছে। কিন্তু এই বাজেটের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কতটুকু হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনীতির চেহারা বিবর্ণ থেকে উজ্জ্বল হবার কোন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং অনিয়ম। ব্যাংক খাতে রীতিমতো লুণ্ঠন হয়েছে, যে লুণ্ঠনের ক্ষতগুলো এখন দগদগে ঘায়ের মতো উন্মোচিত। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপী ঋণের পরিমাণ নতুন রেকর্ড গড়েছে। অর্থপাচারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিময়তা নষ্ট হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে যদি অর্থনীতিকে সামাল দিতে না পারে তাহলে সরকারের জন্য বড় সংকট অপেক্ষা করছে বলেই আমি মনে করি। 

অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে দ্রব্যমূল্যের। দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা ছিলো। কিন্তু গত ৬ মাসে এনিয়ে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য নেই। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা বাজারে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। যেকোন সময় এই দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি মানুষের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের যে উদ্যোগগুলো এখন পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে তার কোনটারই সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। বরং দ্রব্যমূল্যে সিন্ডিকেট, মুনাফা লোভী, মজুতদারদের দাপট বেড়েই চলেছে। প্রচন্ড ক্ষমতাবান সরকার বাজারের সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়।

দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টি আলোচনায় তাহলো দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজদের স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদকে সরাসরি দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুর্নীতির কারণে আজিজ আহমেদের মার্কিন ভিসা বাতিল হয়েছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিপুল বিত্ত-বৈভবের খবর পুরো জাতিকে চমকে দিয়েছে। বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির কেচ্ছা কাহিনী প্রকাশিত হতেই একে একে দুর্নীতিবাজদের চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে জাতির সামনে। দুর্নীতিবাজদের অপকর্মের ফিরিস্তি এখন গণমাধ্যমের প্রধান খাদ্য। প্রতিদিন গণমাধ্যমে কোন না কোন দুর্নীতিবাজের রত্নভান্ডারের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে ড্রাইভার পর্যন্ত শতকোটি টাকার মালিক হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে খোবলা করে দিয়েছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর শক্ত অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের বিপুল বিত্তের খবর প্রকাশ হওয়ার পরও তার আইনের আওতায় না আসা, তিনি দেশে আছেন না বিদেশে পালিয়ে গেছেন তা নিয়ে রীতিমতো চলছে লুকোচুরি। ছোট-মাঝারিসহ সব সরকারি কর্মকর্তাদের বিভৎস দুর্নীতির খবরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেন, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যাথা, মলম দিবো কোথায়’। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে কতটুকু আন্তরিক, এই যুদ্ধে সরকার শেষ পর্যন্ত কিভাবে জয়ী হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। সামনের দিনগুলোতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যদি সরকার নির্মোহ, শক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারে তাহলে সরকারের জন্য সেটি হবে একটি বড় ধরনের সংকট। এই সংকটে মোকাবেলা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষ দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেখতে চায়, সাধারণ মানুষ চায় দুর্নীতিবাজরা আইনের আওতায় আসুক। কিন্তু সেটি যদি সরকার করতে না পারে তাহলে সাধারণ মানুষ আস্থা হারাবে। সরকারকে বিশ্বাস করবে না জনগণ। 

সাম্প্রতিক সময়ে, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন সরকারকে হঠাৎ করেই চাপে ফেলেছে। যদিও এবিষয়ে সরকারের কিছু করণীয় নেই। এটা স্পষ্ট যে, এর পিছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। এর আগেও ২০১৮ সালে কোটা নিয়ে আন্দোলন করেছিলো শিক্ষার্থীরা। কোটার সেই আন্দোলনের ফলে সরকার প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে দিয়েছিলো। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকাররা আদালতে রিট পিটিশন করে এবং এর মাধ্যমে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল অবৈধ। ফলে ঐ পরিপত্রটি অকার্যকর হয়ে যায়। এরপর এখন শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে নতুন করে আন্দোলন করছে। তাদের বক্তব্য আংশিক যৌক্তিক, কিছুটা অযৌক্তিক। তাদের বক্তব্যের যৌক্তিক অংশটুকু হলো কোটা সংস্কার করা উচিত। বাংলাদেশে এখন এমন কিছু কোটা রয়েছে যেগুলো শুধু অযৌক্তিক নয়, অনভিপ্রেতও বটে। আবার এমন কিছু কোটা আছে যেগুলো থাকা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। যেমন, নারী কোটা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য কোটা। এই কোটাগুলো বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। একটি সাম্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অংশ তা পূরণের জন্যই কিছু কিছু কোটা রাখা অবশ্যই উচিত। তবে কিছু কোটা রয়েছে, যেগুলো থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে, প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের খারাপ দিকগুলো হলো, আন্দোলনকারীরা বেশি মনোযোগী হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। এই কোটা সংস্কার আন্দোলনে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। 

কোটা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, ২০১৮ সালে যখন কোটা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো তখন এই আন্দোলনের নীল নকশা প্রণয়ন করেছিলো যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্র শিবির। এবারও কোটা আন্দোলনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ছাত্র শিবিরের সম্পৃক্ততার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, প্রতিবছরই তিন থেকে পাঁচ হাজার চাকরিপ্রত্যাশিদের জন্য সরকারি চাকরিতে সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করেন। সরকারি চাকরির জন্য সবাইকে কেন আগ্রহী হতে হবে? বিসিএস কি একজন শিক্ষার্থীর একমাত্র লক্ষ্য? একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করে বিজ্ঞানী হবেন, চিকিৎসক হবেন, গবেষক হবেন, সাংবাদিক হবেন কিংবা অন্যকোন সৃজনশীল পেশা বেছে নেবেন। তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন, বাংলাদেশকে বিনির্মাণের জন্য নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করবেন। কিন্তু এসব না করে সবাই এখন সরকারি চাকরিতে আগ্রহী হচ্ছেন এটি বাংলাদেশের জন্য উৎকণ্ঠার বিষয় বলে আমি মনে করি। কিন্তু কোটা আন্দোলনের রাজনৈতিক কূটকৌশলে সরকার রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পরেছে। ছাত্র শিবির করুক বা বিএনপিই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকুক না কেন কোটা আন্দোলনের ডাল পালা মেলছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এরকম আন্দোলন থেকে যেকোন ধরনের বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। আর তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মোকাবেলা করতে হবে পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে। এখানে দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই।

কোটা আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়েও এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকরা প্রচলিত পেনশন স্কিমের বদলে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিমের আওতায় এসেছেন। জাতীয় পেনশন স্কিম সরকার প্রবর্তন করেছিলো। সরকার আশা করেছিলো, এই পেনশন স্কিম অত্যন্ত সফল হবে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী বা ব্যক্তিরা এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন সেক্টর, কর্পোরেশন এবং আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ১ জুলাই থেকে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিম চালু করা হয়েছে। এটি নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। আমলারা অন্য সব পেশার মানুষকে যেন রীতিমতো খেপিয়ে তোলার প্রকল্প নিয়েছে এই পেনশন স্কিমের মাধ্যমে। অদুর ভবিষ্যতে এই পেনশন স্কিম সরকারকে ভোগাবে। 

আওয়ামী লীগের চতুর্থ মেয়াদে দেখা যাচ্ছে সব ক্ষেত্রে চাটুকার মতলববাজ সুবিধাবাদীদের একটি চক্র বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী ক্ষমতার সব মধু খেয়ে নিচ্ছে। প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তার একটি উদহারণ। চিকিৎসকদের সিন্ডিকেট, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ শিক্ষকদের সিন্ডিকেট যোগ্যতা ও মেধাকে গিলে খাচ্ছে ক্রমশ:। এই ৬ মাসে সরকারের জন্য স্বস্তির খবর খুবই কম। সামনের দিনগুলো সরকারকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার বার্তা দিচ্ছে। সরকার আগামী দিনগুলোতে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে আমি মনে করি, সরকারকে সমস্যার সংকটগুলোর গভীরে যেতে হবে, সংকট সমাধানের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সবকিছুকে উপেক্ষা করা এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস সর্বনাশ ডেকে আনে। অতীত ইতিহাস সেকথাই বলে।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কোটা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা নীরব কেন?

প্রকাশ: ০৭:০০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

কোটা আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই কথা বলেছেন। বিশেষ করে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা বলছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল। এবং সরকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী। তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে চমৎকার ভাবে সার্বিক বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও কোটা আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কিন্তু কোটা আন্দোলনের বিষয়টি শুধু সরকারের বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়। এতে একটি রাজনীতিকরণ ঘটেছে। এবং এই রাজনীতিকরণের ফলে এর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। 

কোটা সংস্কার নিয়ে এখনও পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদেরকে নীরব দেখা যাচ্ছে। হেভিওয়েট নেতারা কোটা আন্দোলন নিয়ে তেমন কোনও কথা বলছেন না। 

আওয়ামী লীগের জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলেন আমির হোসেন আমু। আমির হোসেন আমু এখন পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে মুখ খোলেননি। তাকে কোনও কথাও বলতে দেখা যায়নি। অথচ একটা সময় ছাত্রলীগের মধ্যে তার বিপুল প্রভাব ছিল। জাতীয় পর্যায়ে তার একটা পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে। কোটা আন্দোলন নিয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং আরেক হেভিওয়েট নেতা বেগম মতিয়া চৌধুরীকেও। মতিয়া চৌধুরী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন কিন্তু কোটা আন্দোলন নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমকেও এখন পর্যন্ত কোটা আন্দোলন নিয়ে কোনও কথা বলতে দেখা যায়নি। কথা বলেননি আওয়ামী লীগের আরেক নেতা তোফায়েল আহমেদও। তবে তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। এমনি নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তাই তার বিষয়টি হয়তো সহানুভূতির সঙ্গে দেখা যায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদেরকেও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না। 

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক কোটা সংস্কার নিয়ে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত কথা বলেননি। অথচ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেই সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কোনও রকম কথা বলতে দেখা যাচ্ছেনা। কথা বলছেন না আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও। তবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে বাহাউদ্দিন নাছিম কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সরব রয়েছেন। বিভিন্ন ফোরামে তিনি কথা বলছেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে, ছাত্রলীগ যেমন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তেমনি যুবলীগ সহ অন্যান্য সংগঠনগুলোরও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলা উচিত। কোটা নিয়ে যারা বিভ্রান্তি তৈরি করছে সেই বিভ্রান্ত দূর করার জন্য জনপ্রিয় নেতাদের কথা বলা উচিত। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যাদেরকে পছন্দ করেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা পরিচিত তাদের এ নিয়ে প্রকৃত তথ্য শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে এখন পর্যন্ত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে।


কোটা আন্দোলন   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাসে আলোচিত ৬ মন্ত্রী

প্রকাশ: ০৫:০২ পিএম, ১০ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার তার ৬ মাস পূর্ণ করেছে আজ। এই ৬ মাসে সরকারকে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে অনেকগুলো সাফল্য অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ জানুয়ারী নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও ৭ জন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু এই ৬ মাসে সব মন্ত্রী একই সুরে এগোতে পারেননি। সব মন্ত্রীর সাফল্য ইতিবাচক নয়। যদিও ৬ মাস সময় একজন মন্ত্রী বা সরকারকে মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু সকালের সূর্য সারা দিনের আভাস দেয়। সেই বিবেচনায় ৬ মাসে যে সমস্ত মন্ত্রীরা স্ব-প্রতিভ, আলোচিত এবং উজ্জ্বল ছিলেন তাদেরকে নিয়েই এই প্রতিবেদন। 

এই ৬ মাসে আলোচিত এবং দৃশ্যমান মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন-

১. ওবায়দুল কাদের: 

ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তার নেতৃত্বেই পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল হয়েছে। এটি তার অসাধারণ সাফল্য। তবে বর্তমান ৬ মাস মেয়াদে সেতুমন্ত্রীর নেতৃত্বে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিসমাপ্তি হয়েছে। পরিসমাপ্তি অনুষ্ঠান হয়েছে সফলভাবে। ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নীরব বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসময় তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সরব ছিলেন। এই ৬ মাসে সবচেয়ে সরব মন্ত্রী হিসেবে উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের। 

২. ড. হাসান মাহমুদ: 

ড. হাসান মাহমুদ তথ্যমন্ত্রী থেকে এ মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশে ভারসাম্যের কূটনীতির ধারা অব্যাহত রেখেছেন। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সমাদৃত হয়েছে। তাছাড়া দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় কূটনীতির সফল বাস্তবায়ন করছেন হাসান মাহমুদ। ভারতের নির্বাচনে পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করছেন। এসমস্ত অর্জনের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এক্ষেত্রে ড. হাসান মাহমুদকে অত্যন্ত স্ব-প্রতিভ এবং উজ্জ্বল দেখা গেছে। 

৩. ডা. সামন্ত লাল সেন

১১ জানুয়ারীর মন্ত্রীসভায় সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে কেমন দায়িত্ব পালন করবেন  তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা রকম কৌতূহল ছিলো। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে প্রথম ৬ মাসে উজ্জ্বল ছিলেন সামন্ত লাল। তার সততা, নিষ্ঠার প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা সর্বমহলে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন অনিয়ম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন তিনি। তার সঙ্গে সহযোগিতা করছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রোকেয়া সুলতানা। সবকিছু মিলিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খোল-নলচে পাল্টে গেছে প্রথম ৬ মাসে। 

৪. আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। প্রথমবারের মতো তিনি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। এবার মৎস্য এবং প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। এ দায়িত্ব গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ সাধু পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। রমজানের সময় ন্যায্য মূল্যে মাংস, দুধ, ডিম বিতরণ করার ক্ষেত্রে তার অবদান প্রশংসিত হয়েছে। এবার কোরবানি ঈদে দেশিয় প্রাণী দিয়ে কোরবানির উদ্যোগে কোনরকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে আব্দুর রহমান প্রমাণ করেছেন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ মন্ত্রীত্বেও দক্ষতা দেখাতে সক্ষম। 

৫. জাহাঙ্গীর কবির নানক 

জাহাঙ্গীর কবির নানক এবার দ্বিতীয় বারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন। বস্ত্র এবং পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। যদিও এই মন্ত্রণালয়টিকে অনেকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তবুও এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি তার মেধা এবং দক্ষতা দিয়ে এ মন্ত্রণালয়কে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ করছেন। বিশেষ করে পাটের সোনালী যুগ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। টাঙ্গাইলের শাড়ি মেধাসত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে তার তড়িৎ পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। পাটের বহুমুখী বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্র সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। 

৬. মহিবুল হাসান চৌধুরী

মহিবুল হাসান চৌধুরী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী থেকে এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে পাবলিক পরীক্ষাগুলো এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে পাঠ্য বইসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার মেধা দীপ্ত উদ্যোগ সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।  


সরকারের ৬ মাস   মন্ত্রী  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন