এডিটর’স মাইন্ড

আত্মঘাতী আওয়ামী লীগ

প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ২০ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম দুই ধাপের নির্বাচন ছিল সহিংস, সন্ত্রাসে ভরপুর। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার ১৯৮ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। এ নির্বাচনে সহিংসতায় মারা গেছেন ৪০ জনের বেশি। আহত হয়েছেন ৫ হাজারের ওপর। ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেছেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে অতীতেও সহিংসতা হয়েছে। তবে এ সহিংসতা ও মৃত্যু কাম্য নয়।’ একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এবার নির্বাচনী সহিংসতা একটু ভিন্ন ধরনের। আগে নির্বাচনে সন্ত্রাস হতো দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংসতায় রূপ নিত। কিন্তু এবার নির্বাচনী সহিংসতার প্রায় পুরোটাই আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে। আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগকে খুন করছে, জখম করছে। যারা একসঙ্গে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছেন তারা এখন একে অন্যের ঘাতক। আওয়ামী লীগই যেন আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। নিজেরাই নিজেদের সব অর্জন ধ্বংস করছে। আত্মহননের এক ভয়ংকর খেলা চলছে আওয়ামী লীগেই। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ৭২ বছরের পুরনো। এখনো আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সংগঠিত রাজনৈতিক দল। তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনটি বিস্তৃত। এ দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। জাতির পিতার আদর্শের ধারক দল আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগ নানা চড়াই উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য এ দলের নেতা-কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আওয়ামী লীগের চেয়ে জুলুম-নির্যাতন আর কোনো রাজনৈতিক দল সহ্য করেনি। ৭২ বছরে আওয়ামী লীগকে সংগ্রাম করতে হয়েছে ৫০ বছরের বেশি। কিন্তু আওয়ামী লীগের ইতিহাস একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাইরের রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগকে কখনো পরাজিত করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ যতবার হেরেছে প্রতিবার ঘরের শত্রুরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আত্মঘাতী গোল আওয়ামী লীগকে বিপর্যস্ত করেছে। মুসলিম লীগ, আইয়ুব খান, মোনায়েম খান আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে পারেননি। বরং এদের নিষ্পেষণে শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু থেকে হয়েছেন জাতির পিতা। জাতির পিতাকে স্বাধীন বাংলাদেশে জাসদ সর্বহারা, পরাস্ত করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে আওয়ামী লীগের ভিতরে। খুনি মোশতাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীরা প্রায় সবাই ’৭৫-এর পর অবৈধ সরকারের অংশ হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দিয়েই তারা বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন শপথ নিতে। আওয়ামী লীগের মোশতাক চক্ররা যদি সেদিন বিশ্বাসঘাতকতা না করত তাহলে আগস্ট ট্র্যাজেডি ঘটত কি না তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ যতবার হোঁচট খেয়েছে, সংকটে পড়েছে প্রতিবার আওয়ামী লীগের একাংশের আত্মঘাতী তৎপরতার জন্য। আওয়ামী লীগ এ অন্তর্ঘাত অস্বীকারও করেনি। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ও নীতিনির্ধারণী সভাগুলোয় আওয়ামী লীগের আত্মঘাতী তৎপরতার আদ্যোপান্ত পাওয়া যায়। ’৭৫-এর ট্র্যাজেডির পর আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল হয় ৩ মার্চ ১৯৭৮। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ওই সম্মেলনের আহ্বায়ক ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে আওয়ামী লীগের আত্মঘাতী তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে বলা হয়েছিল- ‘জনাব মিজান চৌধুরীদের সংগঠনের বিরুদ্ধে এহেন অপতৎপরতা এই প্রথম নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর আমলে অকাজ-কুকাজের জন্য বহিষ্কৃত জনাব মিজান চৌধুরী ও জনাব মতিউর রহমানের মতো লোকেরা সংগঠনের নেতৃত্ব কুক্ষিগত এবং কবজাভূত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন।’ (সূত্র : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল। রচনা, গ্রন্থনা ও সম্পাদনা নূহ উল আলম লেনিন, পৃষ্ঠা ৪৪৭)। আওয়ামী লীগের বিভক্তি এবং হতচ্ছাড়া অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি উপায়ই ছিল তা হলো বঙ্গবন্ধু কন্যাকে দলের নেতৃত্বে আনা। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের চাপে তা-ই হয়েছিল। দল বাঁচাতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনাকে। ১৯৮১-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হন এবং ১৭ মে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকেও দলের ভিতরের আত্মঘাতী তৎপরতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে শুরুতে তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা হয়েছে দলের মধ্যে থেকেই। আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সেই আত্মঘাতী তৎপরতার বিবরণও পাওয়া যায়। ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রিপোর্ট পেশ করেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। ওই রিপোর্টে তিনি বলেন, ‘কতিপয় ব্যক্তি দলীয় সংকট মোচনের পথে অগ্রসর না হয়ে সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলতে সচেষ্ট হন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন, ১৯৪৯-এ আওয়ামী লীগের জন্মের পর হতেই বহুবার বহু নেতা-কর্মীর স্বীয় স্বার্থে ও উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার মানসে এবং বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও অশুভ শক্তির প্ররোচনায় কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সংগঠনকে “ডানপন্থিদের সংগঠন” রূপে আখ্যায়িত করে নিজেদের তথাকথিত অতিবিপ্লবী বাম রাজনীতির ও প্রগতির ধ্বজাধারীর পরিচয় দিয়ে, আবার কেউ কেউ একই অভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগ সংগঠন “বামপন্থিদের সংগঠন” রূপে আখ্যায়িত করে নিজেদের তথাকথিত ওয়েস্টার্ন ডেমোক্র্যাসি, ফ্রি ইকোনমি ও ইসলামের অকৃত্রিম খাদেম পরিচয় দিয়ে দল ত্যাগ করেছেন।’ (সূত্র : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল। পৃষ্ঠা ৪৯৯)।

১৯৮৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ সঠিক না ভুল ছিল তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অমীমাংসিত। এরশাদের নজিরবিহীন কারচুপি ও ‘মিডিয়া ক্যু’ ওই নির্বাচনের ফল পাল্টে দিয়েছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে আবদুর রাজ্জাকদের আত্মঘাতী তৎপরতা না হলে ভোটবিপ্লব হতো বাংলাদেশে। একইভাবে ১৯৯১-এর নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি গ্রুপের আত্মঘাতী হয়ে ওঠা ছিল আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। বিদ্রোহী প্রার্থী, অন্তঃকলহ ’৯১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেয়নি। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা করেছে সফলভাবে। কিন্তু একসময় দলের ভিতরে কারও কারও অপতৎপরতা আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ের কারণ উঠে আসে ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে দলের সভানেত্রীর ভাষণে। ওই কাউন্সিলে প্রদত্ত ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দলের ভিতরে কোথাও কোথাও কোন্দল ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার ঘটনাটিকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় কিছুসংখ্যক নিশ্চিত বিজয়ের আসন আমাদের হাতছাড়া হয়েছে।’

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও আওয়ামী লীগে দেখা যায় আত্মঘাতী তৎপরতা। দলে গণতন্ত্রের জিকির তুলে আওয়ামী লীগ ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। এ ষড়যন্ত্র হয়েছিল দলের ভিতরেই।
আওয়ামী লীগ বারবার সংকটে পড়েছে দলের ভিতরের সমস্যার কারণেই। তার পরও দলটি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী সংগঠন এজন্য যে এ ‘আত্মঘাতী’ তৎপরতা প্রতিহত করেছেন কর্মীরা, তৃণমূল। এরাই আওয়ামী লীগের প্রাণ। এরাই ৭২ বছরেও আওয়ামী লীগকে সজীব ও সতেজ রেখেছেন। এদের ঐক্য, স্বার্থহীন ত্যাগ ও নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের ফলেই আওয়ামী লীগ আজকের অবস্থায়। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগের সেই নিঃস্বার্থ, ত্যাগী তৃণমূলই যেন আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। এটাই হলো ভয়ের কারণ।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দিচ্ছে চেয়ারম্যান পদে। শুরু থেকেই এ মনোনয়ন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক। তৃণমূলের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রতিক্রিয়া বেশ স্বচ্ছ। জেলা ও উপজেলা নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রে নাম পাঠান। দলের সভানেত্রীর নেতৃত্বে আছে স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। এ বোর্ড স্থানীয় পর্যায় থেকে পাঠানো একাধিক নামের প্রস্তাব থেকে একজনকে মনোনয়ন দেয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে মনোনয়ন নিয়ে সব সময় বিতর্ক থাকে। এখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক পরিচয় বড় করে দেখা হয়। তাই এসব নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকাই স্বাভাবিক। সবচেয়ে ভালো হতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন যদি দলীয়ভাবে না করা হতো। যে-যার মতো নির্বাচন করত। তা সম্ভব হয়নি। আর সে কারণেই এ নির্বাচনে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত অনেক সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে দেখেছি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তৃণমূলের একটি বিদ্রোহ হয়েছে। এ বিদ্রোহ মনোনয়ন-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের বিদ্রোহীরা দাবি করেছেন, স্থানীয় নেতা, এমপি এমনকি কেন্দ্রীয় নেতারা মনোনয়ন-বাণিজ্যে জড়িত। একজন তৃণমূলের নেতা বলেছিলেন, ‘একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া সবাই মনোনয়ন-বাণিজ্যে জড়িত।’ সবাই না হলেও এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যে ব্যাপক মনোনয়ন-বাণিজ্য হয়েছে তা ওপেন সিক্রেট। আওয়ামী লীগের মধ্যেই আলোচনা হয়, চেয়ারম্যান পদে এমপিরা মনোনয়ন বিক্রি করেছেন। সব এমপি যে মনোনয়ন বিক্রি করেছেন তা নয়। অনেক নব্য আওয়ামী লীগার এমপি হয়ে এলাকায় তার ভিত শক্ত করার মিশনে নেমেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের নেতা-কর্মীদের ওএসডি করেছেন। নতুন আওয়ামী লীগ তৈরি করেছেন। এদের ‘এমপি লীগ’ও বলা যায়। এমপি লীগে রাজনীতিবিদ নেই। আছেন ঠিকাদার, গ্রাম্য টাউট, সুবিধাবাদী, মৌলবাদী, ধর্ষক, সন্ত্রাসীরা। এমপি সাহেব ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে এদের মধ্যেই তো কাউকে বাছাই করবেন। এরপর কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের কাছে ধরনা দিয়েছেন। কারও কাজ হয়েছে, কারও হয়নি। যার হয়েছে তিনি তার নতুন আওয়ামী লীগের একান্ত চামচাকে ‘নৌকা’ প্রতীক উপহার দিয়েছেন। তৃণমূলের ত্যাগী প্রার্থীরা হতবাক হয়েছেন। ২০০১-এর পর বিএনপি-জামায়াত তাণ্ডবে এই ব্যক্তি কোথায় ছিলেন? ২০০৭-এর ওয়ান-ইলেভেনে কোথায় ছিলেন? তৃণমূল এটা মেনে নিতে পারেনি। তারা নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। নিজেরা চাঁদা তুলে প্রার্থীর জন্য খরচ করেছেন। নতুন করে সন্ত্রাসী হামলা ও প্রশাসনের অন্যায় আচরণ হজম করেছেন। (সত্যিকারের আওয়ামী লীগ তো এসবে অভ্যস্ত)। তারপর তারা নৌকা প্রতীক পাওয়া নব্য আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দিয়েছেন। কদিন আগে বিজয়ী এক বিদ্রোহী প্রার্থী এবং কয়েকজন তৃণমূল নেতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। এমপি সাহেব যে ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছেন তিনি ছিলেন যুদ্ধাপরাধী সাঈদী মুক্তি পরিষদের অন্যতম নেতা। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর যারা আক্রমণ করেছিল তাদের একজন ছিলেন নৌকা প্রতীক পাওয়া ওই প্রার্থী। তার মনোনয়ন স্থানীয় তৃণমূল মেনে নিতে পারেনি। তাই সম্মিলিতভাবে তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বেছে নেন একজন প্রবীণ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে। ওই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এ রকম ১৩১টি ইউনিয়ন পরিষদে নৌকা প্রতীকের ভরাডুবি হয়েছে। এরা নির্বাচনে দ্বিতীয়, তৃতীয়ও হতে পারেননি। আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে প্রতিহত করেছে। মনোনয়ন-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের এটি ছিল দৃশ্যমান প্রতিবাদ। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ তৃণমূলের প্রকাশ্য বিদ্রোহ।

আবার বিপরীত চিত্রও আছে। অনেক স্থানে এমপিরা চেষ্টা-তদবির করেও তার পছন্দের প্রার্থীর মনোনয়ন আদায় করতে পারেননি। কেন্দ্রীয় স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত মনোনয়ন বোর্ড দলের পরীক্ষিত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু এমপি সাহেব তা মানবেন কেন? এটা যদি তিনি মানেন তাহলে তার এমপি লীগের কী হবে? দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে তিনি তার ‘একান্ত অনুগত’ ব্যক্তিকে বিদ্রোহী প্রার্থীরূপে দাঁড় করালেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ম্যানেজ করলেন। তারপর নৌকার প্রার্থীকে দৌড়ের ওপর রাখলেন। টাকা ছড়িয়ে আওয়ামী লীগকেও বিভক্ত করলেন। অবশেষে এমপির পছন্দের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হলেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হেরে গেলেন। ফলে ইউনিয়ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয় ঘটেছে। প্রথম দফায় কম থাকলেও দ্বিতীয় দফায় শতকরা ৪২ ভাগ ইউনিয়নে বিদ্রোহী বা আওয়ামীবিরোধীরা জয়ী হয়েছেন। সামনে এ প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

অতীতে আওয়ামী লীগের তৃণমূল ছিল ঐক্যের প্রতীক। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যখন দলের স্বার্থের বিরুদ্ধে, দলের নেতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তখন তৃণমূলের ঐক্যই তা প্রতিহত করেছে। তৃণমূলের ঐক্যের ফলেই বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা জাতীয় গণদাবি হয়েছে। তৃণমূলের সংগ্রামেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে জাতির পিতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। তৃণমূলের ত্যাগের জন্যই ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে পেরেছেন শেখ হাসিনা। তৃণমূলের ভালোবাসায় ওয়ান-ইলেভেনের অপশক্তি আওয়ামী লীগের ক্ষতি করতে পারেনি। ২০০৯ সালের কাউন্সিলে উদ্বোধনী ভাষণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের এ শক্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের ভয়ভীতি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সেদিন যেভাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন তাতে বাঙালি জাতি আবারও উপলব্ধি করতে পেরেছে, একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে তাদের আশা-আকাঙ্খা ধারণ করতে।... আওয়ামী লীগের যে কোনো সংকটে তৃণমূল নেতা-কর্মীরাই বারবার দলকে টিকিয়ে রেখেছেন।

এবার যেন সেই তৃণমূলকেই আত্মঘাতী বানানো হচ্ছে। তৃণমূল বিভক্ত মানেই আওয়ামী লীগ বিভক্ত। তৃণমূলে হানাহানি মানে আওয়ামী লীগে সংকট। তৃণমূলকে বিভক্ত করে কি আওয়ামী লীগের বারোটা বাজানো হচ্ছে? আওয়ামী লীগই হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের হন্তারক। আওয়ামী লীগের কাছেই হেরে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগে যে আত্মঘাতী তৎপরতা তা আওয়ামী লীগকে আরেকটি সংকটের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। আওয়ামী লীগে যেসব স্থানীয় নেতা, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতা মনোনয়ন-বাণিজ্য করছেন তারা কি জানেন আওয়ামী লীগ দুর্বল হলে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না। আওয়ামী লীগে যারা দলের বিদ্রোহীদের মদদ দিয়েছেন, উসকে দিয়েছেন তারা কি জানেন এ বিভক্তি আওয়ামী লীগেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি নয়, এটা দেশেরও ক্ষতি। কারণ আওয়ামী লীগ যখন জয়ী হয় তখন একাই জয়ী হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন পরাজিত হয় তখন গোটা বাংলাদেশ হারে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

জাফর ইকবাল স্যাররা কেন উপাচার্য হন না

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৯ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) রাতেই শুনলাম জাফর ইকবাল স্যার সিলেটের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। বুধবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই টেলিভিশনে দেখলাম তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন। বললেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের অনশন না ভাঙিয়ে যাব না’। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি এবং অধ্যাপক ইয়াসমিন হক মিলে শিক্ষার্থীদের অনশন ভঙ্গ করান। টেলিভিশনে দেখছিলাম, শিক্ষার্থীরা জাফর ইকবাল স্যারকে দেখে আবেগে, কান্নায় ভেঙে পড়লেন। স্যারও পরম মমতায় তাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অজান্তেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। চোখ দিয়ে পানি বেরোল। স্মৃতিক্রান্ত হলাম। ১৯৮৪ সাল, এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলাম নিজেও জানি না। আন্দোলনের অংশ হিসেবে হরতাল ডেকেছে রাজনৈতিক দলগুলো। এস এম হল থেকে মিছিল করতে করতে আমরা কজন অবস্থান নিলাম পলাশীর মোড়ে। আলমগীর ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ৮-১০ জন। কিছুক্ষণের মধ্যে বুয়েট থেকে খন্দকার মোহাম্মদ ফারুকের নেতৃত্বে বিরাট মিছিল এলো। ফারুক ভাই বিশাল লম্বা, দরাজ গলা। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। প্রচণ্ড জনপ্রিয়। দু-একটি গাড়ি চলছিল, সেগুলো থামিয়ে দেওয়া হলো। ফারুক ভাই বললেন, কোনো ভাঙচুর নয়। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার নয়। আমরা রিকশার যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছিলাম। শান্ত, উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু হঠাৎ পুলিশের দুটি গাড়ি এলো দুই দিক থেকে। নেমেই শুরু করল বেধড়ক মার। কিছু বোঝার আগেই আমি লুটিয়ে পড়লাম। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম আমি একটি খাটে। চারদিকে তাকিয়ে বুঝলাম এটা কোনো বাড়ি। এরপর একজন পিতৃতুল্য মানুষ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। বললেন, এখন ঘুমাও বাবা। মোহসীন স্যার। সলিমুল্লাহ হলের প্রভোস্ট। পরে শুনেছি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। প্রভোস্ট স্যার জানার পর তাঁর বাংলোয় নিয়ে যান। ডাক্তার ডাকেন। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় হয়ে উঠেছি তখন এ রকমই পিতৃতুল্য কিছু শিক্ষক পেয়েছিলাম যাঁদের সঙ্গে সব কথা বলতে পারতাম আবার প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতাম। জাফর ইকবাল স্যারের মমতা এবং আবেগ দেখে সেসব শিক্ষকের কথা মনে পড়ল। মনে হলো, তাঁরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন না। কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, সরকার কেন এঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করে না? এখন উপাচার্য কিংবা শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মমতার বন্ধনটা কেন আলগা? কেন সেখানে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নেই?

আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি তার আগেই অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী স্যার পদত্যাগ করেছেন। নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক শামসুল হক। তখন উপাচার্য নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ কিছুটা হলেও মানা হতো। সিনেট তিনজনের নামের প্যানেল প্রস্তাব করত আচার্যের কাছে। সিনেট নির্বাচনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার পেয়েছিলেন সর্বোচ্চ ভোট। তিনজনের মধ্যে তৃতীয় হয়েছিলেন শামসুল হক স্যার। এরশাদ সর্বনিম্ন ভোট পাওয়া শিক্ষককেই পছন্দ করেছিলেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার ছিলেন জ্ঞানতাপস। সত্যিকার অর্থে একজন অভিভাবক। পরে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে বহুবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি। যতবার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে, ততবার মনে হয়েছে নতুন কিছু শিখলাম। কিন্তু এই মানুষটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়নি কোনো দিন। কেন? শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে যখন টানটান উত্তেজনা, তখন আমার মনে কিছু একটা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে কেন পণ্ডিত, শিক্ষার্থীদের কাছে শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় শিক্ষকদের বেছে নেওয়া হয় না? কেন অনুগত, অযোগ্য, পদলেহী, চাটুকারদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। আমার কাছে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চার তীর্থ কেন্দ্র। একজন পন্ডিত, পিতৃতুল্য সেরা শিক্ষকেরই এ পদ পাওয়া উচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক শামসুল হক। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো জ্ঞানভাণ্ডার ছিলেন না। শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতিও তেমন একটা ছিল না। কিন্তু তিনি শিক্ষাঙ্গনে ন্যূনতম পবিত্রতা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছিলেন। স্বৈরাচার এরশাদ সরকার হয়তো জ্ঞান, পাণ্ডিত্যকে ভয় পেতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাঁর একটা ভীতি ছিল। এজন্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো একজন ব্যক্তিত্ববান, আদর্শবাদী শিক্ষককে তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব দিতে ভয় পেয়েছিলেন। সে সময় থেকে অদ্যাবধি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদটি যেন একান্ত দলীয় অনুগতদের জন্য সংরক্ষিত। কোনো সরকারই উপাচার্য নিয়োগে পণ্ডিত, গবেষক, উদ্ভাবনী চিন্তাবিদ কাউকে খোঁজে না। একজন দলীয় পাহারাদার খোঁজে। ফলে গার্মেন্ট মালিক, এনজিও নেতা, অনারারি মেজর পর্যন্ত উপাচার্য হচ্ছেন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। উপাচার্য হতে অনেকে তদবির করেন। ছাত্র সংগঠনের নেতাদের খাতির করেন। মন্ত্রীর বাড়িতে মাছ, মিষ্টি নিয়ে যান। এখন যেভাবে উপাচার্য নিয়োগ হচ্ছে সমানে যদি আমলারা প্রেষণে উপাচার্য হন, অবাক হব না। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জ্ঞানচর্চার নিত্যনতুন চিন্তা বিকাশে মনোযোগী নন। তাঁরা ব্যস্ত থাকেন সরকারের মন্ত্রী, প্রভাবশালী, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে তুষ্ট রাখতে। জ্ঞানবিজ্ঞান চুলায় যাক, সরকার বাহাদুর খুশি থাকলেই তাঁরা নিজেদের সফল মনে করেন। উপাচার্য পদটি যেন এখন প্রকৃত শিক্ষকের জন্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মনে হলেই কয়েকজন ব্যক্তিত্বের নাম মনে আসে। জ্ঞানচর্চায় তাঁরা প্রত্যেকেই যেন একেকটি প্রতিষ্ঠান। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, রঙ্গলাল সেন, সরদার ফজলুল করিম, আহমদ শরীফ। এঁরা কেউ বিশ্ববিদ্যায়য়ের উপাচার্য হননি। আশির দশকে প্রায় প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে অন্তত একজন আলোকিত শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের আমরা শ্রদ্ধা করতাম। আমাদের আইন বিভাগে অধ্যাপক কামরুদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিকতায় অধ্যাপক সাখাওয়াৎ আলী খান, ইংরেজি বিভাগে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এ রকম বহু নাম। কিন্তু তাঁরা কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হননি। এর পেছনে ক্ষমতাসীনদের যে অনাগ্রহ ছিল তা যেমন সত্য, তেমন এসব শিক্ষকও উপাচার্য পদটিকে ঝামেলা মনে করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষেই  সাংবাদিকতায় জড়িয়ে যাই। এর ফলে সব বিভাগের শিক্ষকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটা বিরাট সুযোগ পেয়েছিলাম। তাঁদের মধ্যে ইংরেজি বিভাগের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই নৈকট্য হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারকে একবার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। স্যার তা গ্রহণ করেননি। স্যার আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘কিছুতেই আমি উপাচার্য হব না’। এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে এক সন্ধ্যায় দীর্ঘ তর্কও হয়েছিল। তাঁর সার কথা- ‘উপাচার্য পদটি কোনো ব্যক্তিত্ববান মানুষের জন্য নয়’। একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের কাছ থেকেও। শিক্ষার্থীদের কাছে বিপুল জনপ্রিয় হওয়ার পরও তিনি উপাচার্য হননি। অথচ আমার মনে হয় এ দায়িত্ব নিলে তিনি দেখাতে পারতেন উপাচার্যের কাজ কী? কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে হয়। এই মানুষটির মুগ্ধ ভক্ত আমি। আমি যখন ‘পরিপ্রেক্ষিত’ করি, তখন এক সাক্ষাৎকার নিতে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়।  আমি অবাক হয়ে যাই, এত সহজে শুধু কথা বলে একজন মানুষ কীভাবে এত আপন হয়ে যান। এরপর বিভিন্ন সময় নানা কাজে তাঁর  কাছে গিয়েছি। সর্বশেষ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎটা ছিল অন্যরকম। ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ শিশু সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের একটি কর্মসূচি হাতে নিল। ঢাকা, সাভার এবং চট্টগ্রাম থেকে ৪০টি বাচ্চাকে এক বছর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কে প্রধান অতিথি থাকবেন। সেভ-এর সঙ্গে মিটিংয়ে নানা নাম। আমি জাফর ইকবাল স্যারের নাম প্রস্তাব করলাম। সবাই বললেন, স্যার আসলে তো খুবই ভালো, কিন্তু স্যার কি আসবেন? আমি বললাম, শিশুদের ব্যাপারে স্যারের আলাদা দরদ আছে। স্যারকে টেক্সট করলাম। বিকালে স্যার ফোন করলেন। সব শুনলেন। তারপর জানতে চাইলেন কবে অনুষ্ঠান করতে চাই।  আমি বললাম, স্যার আপনি যেদিন বলবেন। স্যার একটা তারিখ দিলেন, ব্যস। স্যার তত দিন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন। জঙ্গি মৌলবাদীরা তাঁকে হুমকিও দিচ্ছে। সরকার এজন্য তাঁর বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। অনুষ্ঠানের দিন স্যারের বাসায় গিয়ে দেখলাম নিচে পুলিশ। বেল টিপতেই দেখি স্যার রেডি। আমরা নামলাম। স্যার বললেন, একজন পুলিশ ভাইও আমাদের সঙ্গে যাবেন। চালকের পাশে পুলিশ ভাইকে বসিয়ে আমরা রওনা হলাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির উদ্দেশে। আমাদের অনুষ্ঠানের সময় ছিল বেলা সাড়ে ১১টা। আমরা সাড়ে ৯টায় স্যারের মহাখালীর বাসা থেকে রওনা দিলাম। কিন্তু সেদিন এক ভয়ংকর ট্রাফিক জ্যামে পড়লাম। ২ ঘণ্টা জাফর ইকবাল স্যার আর আমি। এ ২ ঘণ্টা যেন আমার জীবনের এক সেরা অভিজ্ঞতা। নানা বিষয়ে আমরা কথা বলছিলাম। একপর্যায়ে স্যারের কাছে জানতে চাইলাম, আপনি কেন উপাচার্য হলেন না? স্যার খুব গুছিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। যদিও তাঁর ব্যাখ্যার সঙ্গে আমি একমত নই। কিন্তু ওইদিন আমি অন্য এক জাফর ইকবালকে আবিষ্কার করলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। মৎস্য ভবনের কাছে এসে গাড়ি আর কিছুতেই এগোচ্ছে না। প্রায় ১৫ মিনিট। ঘড়িতে সাড়ে ১১টা বাজে। স্যার হঠাৎ বিড়বিড় করছেন, বাচ্চাগুলো অপেক্ষা করছে। এটা ঠিক না। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন অনুষ্ঠান কটায়? বললাম, স্যার অসুবিধা নেই। একটু দেরিতে গেলেও সমস্যা নেই।  স্যার একটু রেগে গেলেন। ‘কী বলেন! ছেলেমেয়েরা বসে থাকবে, এটা কী করে হয়। চলেন হাঁটি।’ গাড়ি থেকে নেমে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। পেছনে পুলিশ ভাই। ১০ মিনিট হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে যখন পৌঁছলাম তখন সবাই অবাক। এ রকম দায়িত্ববান মানুষের হাতে উপাচার্যের দায়িত্ব গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারাই পাল্টে যেত। প্রকৃত শিক্ষকের এ অনাগ্রহে উপাচার্য পদটি চাটুকার, অনুগত, ব্যক্তিত্বহীনদের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। (অবশ্য সব উপাচার্যের জন্য এটি প্রযোজ্য নয়। দু-একজন গুণী শিক্ষকও উপাচার্য হচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা খুবই কম)। আবার অনেক গুণী, প্রতিভাবান শিক্ষক দেশেই থাকেন না। চাকরি ছেড়ে চলে যান। জাফর ইকবাল স্যার যেমন বিজ্ঞ, বিপুল টাকার হাতছানি উপেক্ষা করে দেশে ফিরে এসেছেন। চাকরি নিয়েছেন, ঢাকা থেকে বহুদূরে। সবাই তো আর সে রকম ঝুঁকি নেন না।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ১৪ দিনের মাথায় টিএসসি গেছি। ঢুকতেই দেখলাম চমৎকার হাতের লেখা একটি পোস্টার। খান মোহাম্মদ ফারাবী বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আয়োজক সংস্কৃতি সংসদ। কিছু না বুঝেই ফরম নিয়ে ফিলাপ করে জমা দিলাম। বিতর্কের দিন দেখলাম বিচারক আলী রীয়াজ, মাহাবুব মোকাদ্দেম আকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ডাকসাইটে বিতার্কিকের ভিড়ে আমি এক পিচ্চি। বিরূপাক্ষ পাল যথারীতি প্রথম হলেন। আমি দ্বিতীয়। সেখানেই পরিচয় হলো আলী রীয়াজ স্যারের সঙ্গে। আমার বিতর্কের প্রশংসা করলেন। তাঁর ডিপার্টমেন্টে যেতে বললেন। মুহূর্তেই আপন করে নিলেন। এরপর কবে কীভাবে রীয়াজ ভাই হয়ে গেলেন তিনি, নিজেও জানি না। আলী রীয়াজের সঙ্গে সখ্যের সূত্রেই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে যাওয়া-আসা শুরু হলো। আলী রীয়াজ, সুব্রত শংকর ধর আর আনিসুজ্জামান তিন তরুণ প্রভাষক বসতেন কোনার এক রুমে। তিনজন যেন টগবগে দীপ্ত তারুণ্যে। আমার মনে হতো এরা কেউ একদিন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চার এক উৎসব। বটতলায় ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মেজবাহ কামাল ছাত্রমৈত্রী করেন। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়েছেন। আলী রীয়াজ বাসদ ছাত্রলীগের নেতা। ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক। সদ্য শিক্ষক। এম এম আকাশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। সদ্য অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আশা সোনালি প্রজন্মের এসব মেধাবী কেউ উপাচার্য হননি। আলী রীয়াজ এখন মার্কিন মুলুকে অধ্যাপনা করেন। সুব্রত দা বিশ্বব্যাংকের বড় কর্তা। আনিস ভাই ট্র্যাজেডির এক করুণ অধ্যায় রচনা করে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। অন্য মেধাবীরা দায়িত্ব থেকে সযত্নে  নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রেখেছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার দৌড়ে দলীয় লেজুড়রাই রাজত্ব করেন। ক্ষমতাসীন দলেও যাঁরা ব্যক্তিত্ববান, প্রতিবাদী, নীতিমান তাঁরাও উপাচার্য পদটি ঝামেলা মনে করেন। ড. আবুল বারকাত, কিংবা ড. সাদেকা হালিম, ড. মিজানুর রহমানের মতো সরকার সমর্থক শিক্ষকেরও উপাচার্য পদে নিয়োগ দিতে সরকারের অজানা শঙ্কায় বুক কাঁপে! আমার বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী সম্ভবত শেষ মেরুদণ্ডসম্পন্ন উপাচার্য। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ সবার ওপরে স্থান দিতেন। যিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিয়ে একটা শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলেন। তিনি কখনো শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা সচিবের পিএসের রুমে নতজানু হয়ে বসে থাকেননি। দলীয় বিবেচনায়ও যে ভালো, উপযুক্ত এবং দক্ষ উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া যায়, তার সর্বশেষ প্রমাণ অধ্যাপক চৌধুরী। এখন যাঁরা উপাচার্য হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পান তাঁদের কাউকে কাউকে দেখে আমার আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। আহমদ ছফার এ উপন্যাসের প্রথম লাইনটা এ রকম- ‘আবু জুনায়েদের উপাচার্য পদে নিয়োগ প্রাপ্তির ঘটনাটি প্রমাণ করে দিল আমাদের এই যুগেও আশ্চর্য ঘটনা ঘটে।’... হঠাৎ হঠাৎ উপাচার্য পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তার নাম শুনে মনের অজান্তেই ওই বাক্যটি বেরিয়ে আসে। আমার মাথায় দ্বিতীয় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, বিতর্কিত হওয়ার পরও উপাচার্যরা পদত্যাগ করেন না কেন? ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা ধিকৃত, নিন্দিত হওয়ার পরও কেন পদ আঁকড়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা করেন তাঁরা?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের আগেই পদত্যাগ করেছিলেন অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী। সামরিক সরকার তাঁর অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢুকিয়েছিল। নির্ভীক এই মানুষটি অভিভাবক হিসেবে এ ঘটনা মেনে নিতে পারেননি। আর এখন উপাচার্যরা নিজেদের চেয়ার রক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের পুলিশ দিয়ে পেটান! কী ভয়াবহ। অধ্যাপক শামসুল হকের বাসভবনে হামলা চালিয়েছিল ছাত্রদলের ক্যাডাররা। উপাচার্য ভবনে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। স্যার সে সময় ছিলেন না। ফিরে এসে পদত্যাগে সময় নেননি। আর এখন দেখি উপাচার্যরা শিক্ষার্থীদের সাত দিন অনশনের পরও চেয়ার আঁকড়ে থাকেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দলকানা, চাটুকার, অযোগ্য হলে তা ক্ষমতাসীনদের জন্যই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি বুঝি না সরকার কেন এসব লোভাতুর উদ্বাস্তুর ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়। উপাচার্য পদটিকে কেন অনুগতদের পুনর্বাসন কেন্দ্র বানানো হয়। তার চেয়ে যদি ‘গাভী বিত্তান্ত’র উপাচার্য আবু জুনায়েদের মতো এদের একটি করে গাভী কিনে দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রক্ষা পেত।

 লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

উপাচার্য   বিশ্ববিদ্যালয়  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগে কজন আইভী আছেন

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২২ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে। ১৬ জানুয়ারির এ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট উৎসবে ফিরল দেশ। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার পর্যন্ত বললেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন বর্তমান কমিশনের অধীনে সেরা নির্বাচন। এ নির্বাচনে ১৭ দিন ধরে উৎসবমুখর প্রচারণা চলেছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নোংরা, কুৎসিত অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেনি। কেউ কারও পোস্টার ছেঁড়েনি। নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো মিছিলে প্রতিপক্ষের হামলা হয়নি। প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের কোনো গুরুতর অভিযোগ ওঠেনি। ফলে ভোটের দিন ভোটাররা লাইন ধরে ভোট দিয়েছেন। ইভিএমে অনভ্যস্ততাসহ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি এ ভোটের উৎসবকে এতটুকু ম্লান করেনি। যে কোনো বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন একটি মডেল নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এ নির্বাচন প্রমাণ করেছে কমিশন, প্রশাসন, প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল চাইলে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন। ওই নির্বাচনের পর ভোটাররা নির্বাচনবিমুখ হয়ে পড়েন। অনেক সরকারদলীয় প্রার্থীর বিনা ভোটে বিজয়ের খায়েশ চাপে। তারা টাকা দিয়ে, অথবা প্রভাব খাটিয়ে প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেন। বিনা ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের এক সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেখা যায় বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী, বিএনপি-জামায়াত এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও মনোনয়ন পান। মনোনয়ন বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এমপিরা তাদের ‘মাই ম্যান’দের প্রার্থী করাতে সবকিছু উজাড় করে দেন। যেখানে এমপির একান্ত অনুগতরা ‘নৌকা’ প্রতীক পাননি, সেখানে বিদ্রোহী হিসেবে তাদের প্রার্থী করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ক্রমে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরা কোণঠাসা হতে শুরু করেন। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে গিয়ে দেখা যায়, আওয়ামী লীগই ব্যাকফুটে। একদিকে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনীহা, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের হতচ্ছিরি অবস্থা। এ রকম এক পরিস্থিতির মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অনেক কিছু প্রমাণ করতে হয়েছে। এ নির্বাচনকে আমি বলতে চাই নমুনা জরিপ। আওয়ামী লীগের প্রতি কতটা জনসমর্থন আছে তা ছোট্ট করে পরীক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে এক ব্যক্তি বা দলের প্রতি জনগণের অরুচি হয় কি না তা পরখ করে দেখার নির্বাচন ছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যেই বিএনপি মহাসচিব এক বক্তৃতায় বললেন, ‘আওয়ামী লীগের জনসমর্থন এখন শূন্যে।’ ওই জনসভাতেই বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইকবাল মাহমুদ টুকু বললেন, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনবিস্ফোরণ এখন সময়ের ব্যাপার।’ বিএনপি নেতার বক্তব্য যদি ন্যূনতম সত্য হয়, তাহলে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে তো আওয়ামী লীগের মহাভরাডুবি হওয়ার কথা ছিল। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ পালাবার পথ পাবে না।’ এ রকম কথামালার মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন জমিয়ে ফেলেন তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করেন। শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ নির্বাচন বিএনপির জন্যও ছিল এক বড় পরীক্ষা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকেই অবশ্য বিএনপি এ নিয়ে নিরীক্ষা চালাচ্ছে- দলীয় পরিচয় ব্যবহার না করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করা। এ কৌশলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি আংশিক সফল। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা ছিলেন জলের মতো। যে পাত্রে গেছেন সে পাত্রের আকার ধারণ করেছেন। কোথাও তারা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন, কোথাও জামায়াত বা অন্য দলকে। আর যেসব এলাকায় তাদের শক্তি সংহত (যেমন বগুড়া) সেখানে তারা কোমর কষে লড়েছেন। কত ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপি করা ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীরা বিজয়ী হলেন, তা মুখ্য বিষয় নয়। এ নির্বাচনের আবহে বিএনপির তৃণমূল নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে। কর্মীরা একটু হলেও গা-ঝাড়া দিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ হয়েই সম্ভবত বিএনপি তৈমূর আলম খন্দকারকে বলির পাঁঠা বানায় নারায়ণগঞ্জে। অথবা তৈমূর আলম খন্দকার তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন জুয়ার বোর্ডে রাখেন। লক্ষণীয়, ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলের আগে তৈমূর আলম খন্দকারকে পদ থেকে শুধু অব্যাহতি দেওয়া হয়। তৈমূর যদি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেন তাহলে তো শুরুতেই তাঁকে বহিষ্কার করা উচিত ছিল। কিন্তু বিএনপি দীর্ঘদিনের ত্যাগী এক নেতাকে নিয়ে নোংরা রাজনীতি করেছে। বিএনপি অপেক্ষা করেছে নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত। এ নির্বাচনে যদি নাটকীয়ভাবে তৈমূর আলম খন্দকার জয়ী হতেন তাহলে কি বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করত? অসম্ভব। বিএনপি নেতারা তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিতেন। বিএনপি নেতারা তখন কী বলতেন তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিএনপি নেতারা বলতেন, এ সরকার যে কত অজনপ্রিয় তা নারায়ণগঞ্জে প্রমাণিত হলো। তাঁরা বলতেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরাজিত হয়, সরকারের এখনই পদত্যাগ করা উচিত, ইত্যাদি। তৈমূর আলম খন্দকার শুধু প্রতীক ছাড়া বিএনপির প্রার্থীই ছিলেন। গোটা দল তাঁর পেছনে ছিল। তৈমূর আলম রাজনীতির হিসাব কষেই নির্বাচন করেছিলেন। তিনি জানতেন, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত। একাংশের ভোট আওয়ামী লীগের সেলিনা হায়াৎ আইভী পাবেন না। তৈমূর জানতেন, ২০০৩ সাল থেকেই কখনো পৌরসভায়, কখনো সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে আইভী। নারায়ণগঞ্জের মতো জায়গায় ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকা একজনকে অনেক ভোটার ভোট দেবেন না। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে জনগণের একঘেয়েমি আসে। সবাইকে খুশি করা সম্ভব হয় না। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঝোঁকে। এ দুই হিসাব মিলিয়ে তৈমূর নির্বাচনের মাঠে নেমেছিলেন। তিনিও হয়তো বাংলাদেশের সুশীল সমাজের মতো মনে করেছিলেন, এ নির্বাচনও কলঙ্কিত হবে। জয়ী হতে আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে ব্যবহার করবে। হাতি প্রতীকের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হবে। প্রচারণায় মাঠে অন্যদের নামতেই দেওয়া হবে না। ফলে জয় অথবা কারচুপির অভিযোগে কলঙ্কিত নির্বাচন- এ দুই গন্তব্যই তৈমূরের রাজনৈতিক অধ্যায়কে আরও উজ্জ্বল করবে। এ রকম হিসাব-নিকাশ নির্বাচনের আগে অনেকের মুখেই শুনেছি। এ নির্বাচনে তৈমূর আলম খন্দকারের হারাবার কিছু নেই। কিন্তু তিনি কি জানতেন, ১৬ জানুয়ারির পর সব হারাবেন?

আওয়ামী লীগের জন্য এ নির্বাচন ছিল এক জটিল সমীকরণ। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা, একই সঙ্গে জয়- দুটো অর্জন একসঙ্গে করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নামায় আওয়ামী লীগ। যদি আইভী পরাজিত হতেন তাহলে দেশে কথার বন্যা বয়ে যেত। আওয়ামী লীগের এখন ন্যূনতম জনপ্রিয়তা নেই এ কথা এখন ফিসফিস করে অনেকেই বলেন। এ নির্বাচনের পর এ ধরনের কথাবার্তা বলা হতো ঢাকঢোল পিটিয়ে। আওয়ামী লীগে অনৈক্য-বিভক্তি নিয়ে এখন প্রকাশ্যেই কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে হারাতে আওয়ামী লীগই যথেষ্ট। আইভী পরাজিত হলে এ বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হতো। আইভী হারলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের পদত্যাগের দাবি বেগবান করার চেষ্টা হতো। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীও জানতেন, এ নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং। বিতর্কমুক্ত নির্বাচন করে নৌকাকে বিজয়ী করতে হবে। এজন্য তিনি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেন দলের ত্যাগী, দুঃসময়ের কান্ডারি দুই নেতার হাতে। জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম। এঁরা দুজন দলের জন্য উৎসর্গীকৃত দুই প্রাণ। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের কঠিন সময়ে এঁরাই দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। দলের স্বার্থের প্রশ্নে এঁরা আপস করেননি কখনো। জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজম আরও কয়েকজন নেতাকে যুক্ত করেন। আবদুর রহমান, বাহাউদ্দিন নাছিম, এস এম কামাল নির্বাচনী টিমে যুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বের যুগের সূচনা করেন। নানক-আজমরা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা। তাঁরা চাইলে শুরুতেই নির্বাচনের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারতেন। তাঁরা যদি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কর্মীদের নির্দেশ দিতেন, অন্য কোনো প্রার্থীকে প্রচারণার জন্য মাঠে নামতে দেওয়া হবে না- তাহলে এ প্রশাসন, এ নির্বাচন কমিশন কি কিছু করতে পারত? না। নানক-আজম টিম যদি সিদ্ধান্ত নিত, যে কোনো প্রকারে নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে জয়ী করতেই হবে- তাহলে কি নারায়ণগঞ্জ ভোটের উৎসবে রঙিন হতো? যে কোনো দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের সদিচ্ছা এবং আকাঙ্খার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। ক্ষমতাসীন দল যদি না চায় তাহলে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন করা প্রায় অসম্ভব। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চান এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর আকাঙ্খার বাস্তবায়নে কাজ করছে জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় টিম। এ টিম প্রশাসনকে প্রভাবিত করা ও ভোট কারচুপির কৌশল আবিষ্কারের চেয়ে ভালো নির্বাচন করে জয়ে আগ্রহী ছিল। সেভাবেই তাঁরা পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। এ টিম জানত আইভীর জয়ের প্রধান এবং একমাত্র বাধা হলো আওয়ামী লীগের অন্তঃকলহ। এ কারণে তাঁরা আওয়ামী লীগের কোন্দল মেটাতে কাজ করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে, কঠোর হাতে। নারায়ণগঞ্জ ছাত্রলীগের কমিটি বাতিলের মধ্য দিয়ে তাঁরা প্রথম বার্তা দেন। এরপর শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলন। আইভীবিরোধীদের নৌকার পক্ষে প্রচারণা। নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগকে বাহ্যিকভাবে হলেও এক সুতোয় গেঁথেছে পাঁচজনের কেন্দ্রীয় টিম। আমি মনে করি এটাই তাঁদের সবচেয়ে বড় সফলতা। 
আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর জন্য এ নির্বাচন ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জের। ২০০৩ সালে এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচন করেন। তখন ক্ষমতায় বিএনপি-জামায়াত জোট। সে নির্বাচনে জয়ী হওয়া যতটা কঠিন ছিল, তার চেয়েও কঠিন ছিল এবারের নির্বাচনে জয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। সিটি করপোরেশন হওয়ার পর ২০১১ ও ২০১৬ সালের দুটি নির্বাচনেই তিনি বিজয়ী হন। যে দেশে মানুষ একটি টিভির চ্যানেল বেশিক্ষণ দেখে না। রিমোট কন্ট্রোলে চাপ দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে চ্যানেল পাল্টায়। যে দেশে জনপ্রতিনিধির চেহারা, পোশাক এমনকি তার আত্মীয়স্বজনের স্ফীতি নিয়ে জনগবেষণা হয়। সে দেশে একজন নারীর তৃতীয়বারের মতো মেয়র হওয়াটা এত সহজ নয়। কিন্তু আইভী নারায়ণগঞ্জে তাঁর একটা আলাদা ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কটা তিনি আলগা হতে দেননি। নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করেন তিনি লড়াকু, সাহসী, সৎ। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে তিনি দৃশ্যমান কিছু উন্নতি করেছেন। জনগণ তাঁকে বিশ্বাস করে। একদিকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা টিম নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রকাশ্য কোন্দল বন্ধ করেছে, অন্যদিকে আইভীর ইমেজ- এ দুইয়ে মিলে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিজয় সহজ হয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে লাভ হয়েছে অন্য জায়গায়। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন জয়ের ফরমুলা আওয়ামী লীগ পেয়ে গেছে। শেখ হাসিনার ইমেজ, উন্নয়ন, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং আইভীর মতো যোগ্য প্রার্থী- এ চার স্তম্ভকে এক বিন্দুতে মেলাতে পারলেই আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিততে পারে। আগামী নির্বাচনে জয়ের জন্য হুদার মতো নির্বাচন কমিশন দরকার নেই। আমলারা নির্বাচন জিতিয়ে দেবে এ ভরসায় তাদের অন্যায় আবদার মানার প্রয়োজন নেই। ডিসিরা পক্ষে থাকলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া যাবে এমন উদ্ভট চিন্তার প্রয়োজন নেই। ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী সংগঠন এবং যোগ্য প্রার্থী আওয়ামী লীগের জন্য আগামী নির্বাচন সহজ করে দিতে পারে। বিশেষ করে গত ১৩ বছর আওয়ামী লীগ যে উন্নয়ন করেছে তা বিস্ময়কর। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। এ বছরই পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হবে। এসবই হবে আওয়ামী লীগের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। আওয়ামী লীগ হয়তো তার অনৈক্য এবং বিভক্তিও কাটিয়ে তুলতে পারবে। কারণ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর প্রতি প্রতিটি কর্মীই আস্থাশীল। কিন্তু আইভীর মতো যোগ্য প্রার্থী কজন আছেন? ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভুল প্রার্থীর মাশুল দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। ফরিদপুরের মতো আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকায় নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। অযোগ্য প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক দেওয়ার পরিণাম কী ভয়াবহ হতে পারে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। এখন যারা আওয়ামী লীগের এমপি আছেন, তাদের কজন জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন? কজন দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন? এ প্রশ্নের মুখোমুখী আওয়ামী লীগকে হতেই হবে। আওয়ামী লীগের দুই ডজনের বেশি এমপি আছেন যাঁরা গত দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, অথচ ভোট কী তা জানেন না। এঁরা বিনা ভোটে হ্যাটট্রিক এমপি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এক জেলায় এমপি হয়েছেন সাবেক এক আমলা। তিনি এলাকায় যান না। জনগণের সঙ্গে কথা বলেন না। যে দু-চার জনের সঙ্গে বলেন, সেখানে তাঁকে স্যার না বললে ক্ষুব্ধ হন। এ রকম উদাহরণ অনেক। এমপিদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্যসহ অভিযোগের স্তূপ। সেদিন সংসদে এক এমপি বললেন, পিয়ন নাকি এমপিদের পাত্তা দেয় না! এমপি যদি তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে সম্মান আদায় করতে না পারেন তাহলে তাঁকে কি ত্রাণের ঢেউটিনের মতো সম্মান বণ্টন করা হবে! কজন এমপি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন জনগণের সঙ্গে তাঁর মধুর সম্পর্ক। জনগণের জন্য তিনি সবকিছু করতে প্রস্তুত। যেসব জনপ্রতিনিধি সংসদ সদস্য পদ টাকা বানানোর মেশিন মনে করেন তাঁরা আবার মনোনয়ন পেলে কারচুপির পথই খুঁজবেন। তাঁরা কোন মুখে ভোট চাইতে যাবেন? এজন্য তাঁরা আবার বিনা ভোটে এমপি হতে চাইবেন। অথবা প্রশাসন দিয়ে ভোট কারচুপি করাতে মরিয়া হবেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে কি আওয়ামী লীগে যোগ্য প্রার্থী নেই? আইভীর মতো সৎ, জনবান্ধব নেতা কি আওয়ামী লীগে কমে গেছে? অবশ্যই না। অনেক আইভী আওয়ামী লীগে আছেন। অনেক জনবান্ধব, জনপ্রিয় ব্যক্তি আওয়ামী লীগে আছেন। পদ-পদবি ছাড়াও জনগণ যাঁদের সম্মান করে, তাঁদের খুঁজে বের করাই আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর যাঁরা মনে করেন ২০১৪ কিংবা ২০১৮-এর মতো আবার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এমপি হবেন তাঁদের হাতে এলাকা, দেশ এবং আওয়ামী লীগ কোনোটাই নিরাপদ নয়। তাঁরা সম্ভবত কার্ল মার্কসের সেই অমর উক্তি জানেন না। মার্কস বলেছিলেন, ‘ইতিহাসে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি একইভাবে হয় না।’

 
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

আওয়ামী লীগ   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন: চমকের অপেক্ষা

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৫ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে কি কোনো চমক হবে? আজ নির্বাচনী প্রচারণা ছিল না কিন্তু তারপরও তৈমুর আলম খন্দকার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন যে, তিনি নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোটে বিজয়ী হবেন এবং মরে গেলেও মাঠ ছাড়বো না। তার এই বক্তব্যের আগেই গতকাল নারায়ণগঞ্জের কিছু ভোটার তাকে চমকে দেন। তিনি যখন জনসংযোগ করছিলেন তখন কয়েক'শ মানুষ হঠাৎ করেই তার সঙ্গে যুক্ত হন। এই সমস্ত ঘটনাগুলো নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে চমকের আভাস দিচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কোনো চমক হবেনা, নির্বাচনে অনিবার্যভাবেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী বিজয়ী হবে। চমক হোক না হোক, নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন জাতি প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে গত কিছুদিন ধরে মানুষের মধ্যে নির্বাচন সম্পর্কে যে অনীহা, অনাস্থা তৈরি হয়েছে সেই অনীহা, অনাস্থা দূর করার ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে অনেকে বিশ্বাস করে। নানা কারণে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের ব্যাপারে ভোটাররা এবং সাধারণ জনগণ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

প্রথমত, এই নির্বাচনে দুই পক্ষই সমান্তরালভাবে প্রচারণা করেছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আইভী এবং বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার দুজনেই প্রায় সমানে-সমানে প্রচারণা করেছেন। অনেক সময় দেখা যায় যে, নির্বাচনী প্রচারণার মাঝপথেই অভিযোগ ওঠে যে বিএনপিকে নির্বাচনী প্রচারণা করতে দেওয়া হচ্ছে না বা বিরোধীদলের পোস্টার লাগাতে দেওয়া হচ্ছে না, বিরোধী দলের কর্মীদেরকে বাদ দেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি এবার নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে এ ধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি। বরং এই নির্বাচনের প্রচারণার শেষদিন পর্যন্ত দুই পক্ষই সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনী প্রচারণা করেছেন।

দ্বিতীয়ত, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে কাদা ছোড়াছুড়ি কম হয়েছে। একবার মাত্র তৈমুর আলম খন্দকার আইভীকে গডমাদার বলে সম্বোধন করেছিলেন এর কিন্তু পরবর্তীতে তিনি এই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণার দিকে আর এগিয়ে যাননি।

তৃতীয়ত, নারায়ণগঞ্জে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মোটামুটি নিরপেক্ষ ভূমিকাই পালন করতে দেখা গেছে প্রচারণার সময়।

চতুর্থত, অন্যান্য নির্বাচনে যেটা দেখা যায় যে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়ান, ভোটের দু'এক ঘণ্টা পরেই তারা নানা রকম অভিযোগ এনে ভোট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। কিন্তু তৈমুর আলম খন্দকার বলেছেন যে, মরে গেলেও তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন না। অবশ্য এর আগে আরেকবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি নির্বাচনের দিন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। তবে এবার তিনি সেটি করবেন না বলে জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন।

ফলে শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ভোট উৎসবে সাধারণ মানুষ ফিরবে, এটাই সকলে প্রত্যাশা করে। সাধারণ মানুষ যদি ভোট দেয় তাহলে সেটিই হবে বাংলাদেশের নির্বাচনে একটা বড় চমক। ২০১৮ সালের পর থেকে নির্বাচন সম্পর্কে যে অনাস্থা এবং অনীহা সেটা দূর করার ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ একটা বড় ভূমিকা পালন করবে বলে অনেকে প্রত্যাশা করেন। পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জবাসী তাদের মেয়র বাছাই করবে। এর ফলে নির্বাচন নিয়ে যে সংকট এবং নেতিবাচক কথাবার্তা, সেটিও অনেকাংশে দূর হবে বলে অনেক মহল আশা করে। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে চমক হোক বা নাই হোক, নির্বাচনের পরে যেন সকল পক্ষ এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সেটি হবে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভোটাররা সেই প্রত্যাশাই করেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন   নাসিক   নির্বাচন   আওয়ামী লীগ   বিএনপি   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী   শামীম ওসমান   তৈমুর আলম খন্দকার  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচন কমিশনে নতুন হুদা-আজিজ যেন না আসে

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৫ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

ঘটনাটি লিখেছেন ড. আকবর আলি খান। তাঁর ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ শিরোনামে গ্রন্থের একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ‘নির্বাচন পরিচালনা : আমার ভোট আমি দেব’। এ প্রবন্ধে আকবর আলি খান লিখেছেন, ‘উনিশ শ ষাটের দশকে তদানীন্তন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত ছিল। তার নির্বাচনী এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক ব্যক্তি বাস করতেন। তাদের কাছে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই তারা কোনোমতেই ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ভোট দেবেন না। অন্যদিকে সব সংখ্যালঘু ভোট তার বিপক্ষে চলে গেলে তার নির্বাচনে পাস করার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ হয়ে যায়। চৌধুরীর চেলারা তাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে ভোটারদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। চৌধুরী এ পরামর্শ গ্রহণ করেননি। তিনি সরাসরি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় যান এবং সেখানে তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের ব্যবস্থা নেন। গ্রামের বৈঠকে তিনি প্রথমেই তার নিজের এলাকায় রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ এবং স্বাস্থ্য খাতে যেসব কাজ করেছেন সেগুলো তুলে ধরেন এবং প্রশ্ন করেন যে তিনি কি সত্যি কথা বলেছেন? সবাই এক সুরে বলে উঠলেন- চৌধুরী সাহেব যা বলেছেন তা ঠিক। এরপর তিনি প্রশ্ন করলেন, এত কাজ করার পর জনসাধারণের পক্ষে তাকে ভোট দেওয়া ঠিক হবে কি হবে না। সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন- তাকেই নির্বাচনে ভোট দেওয়া উচিত। এরপর চৌধুরী সাহেব বললেন, জনগণের স্বীকৃতিতে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এবং তিনি মনে করেন যে তিনি ভোট পেয়ে গেছেন। তিনি তখন তাদের পরামর্শ দেন, আপনাদের কষ্ট করে কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই। আমি আপনাদের ভোট পেয়ে গেছি। আর সঙ্গের চামুণ্ডাদের বলে দিলেন এ অঞ্চলের কোনো ভোটার যেন কষ্ট করে কেন্দ্রে না যায় তা নিশ্চিত করতে। সংখ্যালঘু ভোটাররা তার ইঙ্গিত বুঝতে পারেন এবং ভয়ে কেউ কেন্দ্রে হাজির হননি। বিপুল ভোটে ফজলুল কাদের চৌধুরী নির্বাচিত হন।’ (পৃষ্ঠা : ৩১৭, অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি)

ফ কা চৌধুরী ষাটের দশকে যে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের’ ফরমুলা আবিষ্কার করেছিলেন, নূরুল হুদার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন গত প্রায় পাঁচ বছরে তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার এমন কোনো পথ নেই যা তাঁর নেতৃত্বে কমিশন পরীক্ষা করেনি। কারচুপি, ভোটাধিকার হরণের যত ফরমুলা আছে সবই প্রয়োগ হয়েছে হুদা কমিশনের আমলে বিভিন্ন নির্বাচনে। এখন নির্বাচন, ভোটের ফলাফল নিয়ে মানুষের আগ্রহ নেই। নির্বাচন কমিশনের কোনো কথা মানুষ এখন বিশ্বাস করে না। এ রকম ব্যর্থ ও অযোগ্য নির্বাচন কমিশন বিদায় নিচ্ছে এটাই হলো জাতির সব থেকে স্বস্তি। (ভাগ্যিস প্রধান নির্বাচন কমিশনারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কোনো বিধান নেই।)

বিদায়ের আগে বর্তমান নির্বাচন কমিশন শেষ বড় নির্বাচনের তদারকি করছে নারায়ণগঞ্জে। আগামীকাল (১৬ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ভোটে যখন মানুষের তীব্র অরুচি, ভোট দেওয়ার ফ কা ফরমুলা যখন আবার জাঁকিয়ে বসেছে তখন হুদা কমিশনের জন্য নারায়ণগঞ্জে সিটি নির্বাচন এক বিরাট সুযোগ। নিরুত্তাপ হওয়ার হাত থেকে এ নির্বাচন রক্ষা করেছেন বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার। তিনি প্রার্থী হওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জে ভোটের উত্তাপ তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান আর আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর দীর্ঘদিনের বিরোধ এ নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। নির্বাচন কমিশন যদি অন্তত এ নির্বাচনে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াত, সংবিধান ও আইনে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করত তাহলে একটা সুখস্মৃতি নিয়ে তারা বিদায় নিতে পারত। যাওয়ার আগে তাদের ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও দায়িত্বহীনতার বিপরীতে একটা ভালো নির্বাচনের উদাহরণ থাকত। কিন্তু নির্বাচন জমে উঠতেই কমিশন দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। নির্বাচন সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জে ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠেছে। সংসদ সদস্য হওয়ার পরও শামীম ওসমানের নৌকার পক্ষে প্রচারণার ঘোষণা আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যা বলেছেন তা রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার মতো। তিনি বলেছেন, ‘শামীম ওসমান আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, কিন্তু শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেননি।’ অবুঝ সিইসিকে কে বোঝাবে আচরণবিধি লঙ্ঘনই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব অভিযোগ ও বিতর্কের মুখেই কাল নির্বাচন।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা স্টালিন ভোট সম্পর্কে এক মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘জনগণ যারা ভোট দেয়, তারা কিছুই নির্ধারণ করে না, যারা ভোট গণনা করে তারাই সবকিছু নির্ধারণ করে।’ একনায়ক স্টালিনের কথার প্রতিধ্বনি দেখা যায় হুদা কমিশন পরিচালিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয়। জনগণ ভোট দিল কি দিল না, কাকে দিল এসব আজকাল আর ব্যাপার নয়। ভোটের শেষে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি রিটার্নিং অফিসাররা যা বলেন তা-ই আসল। কেন্দ্র জনশূন্য থাকার পরও রিটার্নিং অফিসাররা দেখাচ্ছেন ৭০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। এটাই এখন ভোট। নির্বাচনের আগেই ক্ষমতাবান প্রার্থী ঘোষণা করছেন তার বাইরে কাউকে ভোট দিতে চাইলে কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই। অনেক স্থানে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট না দিলে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হবে। ইদানীং এসব কথা লুকিয়ে, গোপনে কেউ বলে না। প্রকাশ্যে বলে। এসব বলার পরও নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। বরং যে কোনো বাজে নির্বাচনের পরও দাঁত কেলিয়ে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে’ বলাটা নির্বাচন কমিশনের এক রোগে পরিণত হয়েছে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন এসব সমালোচনা মোটেও গায়ে মাখে না। কে কী বলল না বলল তা নির্বাচন কমিশনের কিছুই যায় আসে না। বিশ্বে এই প্রথম একটি নির্বাচন কমিশন যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দল আছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা আর নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার গত পাঁচ বছর একে অন্যের সমালোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। নূরুল হুদা যেন আওয়ামী লীগকে জেতাতে মরিয়া। আর তালুকদার বিএনপির ভাষায় কথা বলতে ব্যাকুল। মাহবুব তালুকদারকে অবশ্য আমার নির্বাচন কমিশনার মনে হয় না। তাঁকে আমার বিরোধী দলের নেতা মনে হয়। একটি সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তি এত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অনৈতিক হন কীভাবে তা আমার এক বড় প্রশ্ন। প্রতিটি নির্বাচনের পরই তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। নির্বাচন নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। সুষ্ঠু নির্বাচন না করার ব্যর্থতা তাঁরও। তিনি যদি দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তাহলে পদত্যাগ করেন না কেন? গাড়ি, বাড়ি, বেতন, পিয়ন-চাপরাশি নিয়ে তিনি শুধু সমালোচনা করেন। এটা কি নৈতিক?

এ নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা এখন ধ্বংসস্তূপ। হুদা কমিশনের রাজত্বে বাংলাদেশের নির্বাচনগুলোকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, ভোট ছাড়া নির্বাচন। একে বলা যেতে পারে ফজলুল কাদের চৌধুরী ফরমুলার নির্বাচন। এ পদ্ধতিতে ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার হয় না। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভোটারদের ‘মনের ভাব’ বুঝে ফেলেন। সে অনুযায়ী ভোট হয়ে যায়। এ ভোটে কোনো রক্তারক্তি নেই, খুনোখুনি নেই। নির্বাচন কর্তারাই নির্ধারণ করেন ভোটের ফলাফল। হুদা কমিশন আবিষ্কৃত দ্বিতীয় ধরনের ভোট আরও নিরাপদ। এখানে একাধিক প্রার্থী ফরম কিনছেন। কিন্তু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন দেখা যায় একজন ছাড়া আর কোনো প্রার্থী নেই। অন্য প্রার্থীদের ‘ম্যানেজ’ করা হয়। ভোটের আগেই নির্বাচন কমিশন ওই একক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে। এটা অত্যন্ত আধুনিক ও ঝুঁকিহীন ভোটব্যবস্থা। এ ভোটে অর্থ খরচ কম, ভোট নিয়ে প্রচারণার জন্য শব্দদূষণের ঝুঁকি নেই। লোকজনের অযথা পরিশ্রমের দরকার নেই। হুদা কমিশন উদ্ভাবিত তৃতীয় ধরনের ভোটব্যবস্থা একটু সহিংস, ঝুঁকিপূর্ণ। একে ভোট না বলে যুদ্ধ বলা ভালো। এখানে মোটা দাগে দুটি পক্ষ থাকে। এরা নির্বাচনী প্রচারণা, জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনায় খুব একটা আগ্রহী থাকে না। চর দখলের মতো এরা এদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এলাকা দখলে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর চড়াও হয়। বেশ কিছু নিরীহ মানুষের প্রাণও যায়। তাতে কী, ভোটের অধিকারের জন্য রক্তদানের নজির তো এ দেশের পুরনো ইতিহাস। দুই পক্ষের খুনোখুনি-মারামারিতে যে পক্ষ জয়ী হয় কেন্দ্র তার। তিনিই ভোটে বিজয়ী। এ সহিংসতার সময় নির্বাচন কর্মকর্তারা খানিকটা বিশ্রামে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে যে কোনো একটা পক্ষকে সমর্থন দেয়। জনগণ ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। যুদ্ধ শেষে বিজয়ীকে কমিশন নির্বাচিত ঘোষণা করে।

নির্বাচন কমিশনের এ বেহাল দশার মধ্যেই শেষ হচ্ছে তার মেয়াদ। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান কমিশন বিদায় নেবে। হুদা কমিশনের বিদায়ের দিন দেশে ভোটমুক্তির উৎসবের দিন হতে পারে। এ কমিশন যেন মানুষের ভোটাধিকার বোতলবন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু হুদা কমিশন বিদায় নিলেই কি মানুষ দলবেঁধে, লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট উৎসব করবে? বর্তমান কমিশন চলে গেলেই কি জনগণের ভোটের অনীহা কেটে যাবে? আমি তা মনে করি না। হুদা কমিশনের পর আবার যদি একই ধরনের একটা নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় তাহলে হয়তো আমাদের ভোটব্যবস্থা আরও অন্ধকারে চলে যাবে। তা যদি হয় তাহলে গণতন্ত্র সংকটে পড়বে। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে সংলাপ শুরু করেছেন। ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে এ সংলাপ শেষ হবে। কিন্তু এ সংলাপ নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিএনপিসহ দেশের বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এ সংলাপে যায়নি। আমি মনে করি বিএনপির এটি আরেকটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে সব দলের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ভোট ব্যবস্থার এই হালের জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও কম দায়ী নয়। যে কোনো প্রকারে ক্ষমতায় থাকার জন্য অথবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা নির্বাচনব্যবস্থা কলুষিত করেছে। জনগণের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। বিএনপি আজিজ মার্কা নির্বাচন কমিশন করে ভোটে জয়ী হতে চেয়েছিল। এরশাদ অনুগতদের নির্বাচন কমিশনে বসিয়ে নির্বাচন কমিশনকে তামাশায় পরিণত করেছিলেন। বর্তমান সরকারও রকিব-হুদাদের কমিশনে বসিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছে। এবার আরেকটা হুদা কমিশন হলে তা হবে গোটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশে বহু যোগ্য ব্যক্তি আছেন। সরকারকে এখন সবার আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়ে একটা নির্বাচন কমিশন গঠন করতেই হবে। নূরুল হুদার মতো নির্বাচন কমিশন যদি আওয়ামী লীগ সরকার আবার গঠন করে তাহলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আওয়ামী লীগই। এ দেশে গণতন্ত্র এবং ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে ত্যাগ স্বীকার করা দল আওয়ামী লীগ। এবার নির্বাচন কমিশন গঠন তাই আওয়ামী লীগের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। তবে একটি কথা মনে রাখা দরকার, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব নয়। বিরোধী দলেরও দায়িত্ব। বিরোধী দল যদি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, ভোটে উদ্বুদ্ধ করতে পারে তাহলে ক্ষমতাসীনরা কারচুপি করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনও যা খুশি করতে পারে না। এ নারায়ণগঞ্জেই ২০০৩ সালের পৌরসভা নির্বাচন তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তখনো নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন হয়নি। পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। সে সময় নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গণগ্রেফতার করা হলো। নির্বাচনী প্রচারে গেলেই বাধা, হামলা। নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের দেড় শতাধিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু আইভী দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে নির্বাচনের মাঠে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত আইভী বিজয়ী হন। চট্টগ্রামে প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরী, ঢাকায় প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ মাটি কামড়ে থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করেই জিতেছিলেন। ইদানীং বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হতে ‘জনগণ’ নয় ক্ষমতাসীন দলের ওপর নির্ভর করে। তারা মনে করে সরকার আদর-আপ্যায়ন করে তাদের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেবে। কিন্তু নির্বাচনে কেউ তো কাউকে জামাই আদর করবে না। নির্বাচনে কীভাবে জয়ী হতে হয় সে শিক্ষা পাওয়া যায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি থেকে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু তাঁর নির্বাচনের বিবরণ দিয়েছেন এভাবে- ‘ঢাকা থেকে পুলিশের প্রধানও গোপালগঞ্জে হাজির হয়ে পরিষ্কারভাবে তার কর্মচারীদের হুকুম দিলেন মুসলিম লীগকে সমর্থন করতে। ফরিদপুর জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট জনাব আলতাফ গওহর সরকারের পক্ষে কাজ করতে রাজি না হওয়ায় সরকার তাকে বদলি করে আরেকজন কর্মচারী আনলেন। তিনি আমার এলাকায় গিয়ে নিজেই বক্তৃতা করতে শুরু করলেন এবং ইলেকশনের তিন দিন আগে সেন্টারগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে জামান সাহেবের সুবিধা হতে পারে। আমার পক্ষে জনসাধারণ, ছাত্র ও যুবকরা কাজ করতে শুরু করল নিঃস্বার্থভাবে। নির্বাচনের চার দিন আগে শহীদ সাহেব সরকারি দলের ওইসব অপকীর্তির খবর পেয়ে হাজির হয়ে দুটো সভা করলেন। আর নির্বাচনের একদিন আগে মওলানা সাহেব হাজির হয়ে একটা সভা করলেন। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে খন্দকার শামসুল হক মোক্তার সাহেব, রহমত জান, শহীদুল ইসলাম ও ইমদাদকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে ফরিদপুর জেলে আটক করা হলো। একটা ইউনিয়নের প্রায় ৪০ জন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে আরও প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট দেওয়া হয়। শামসুল হক মোক্তার সাহেবকে জনসাধারণ ভালোবাসত। তাঁর কর্মীরা খুব নামকরা ছিল। আরও অনেককে গ্রেফতার করার ষড়যন্ত্র আমার কানে এলে তাদের আমি শহরে আসতে নিষেধ করে দিলাম। আমার নির্বাচনী এলাকা ছাড়া আশপাশের দুই এলাকাতে আমাকে যেতে হয়েছিল- যেমন যশোরের আবদুল হাকিম সাহেবের নির্বাচনী এলাকায়, ইনি পরে স্পিকার হন; এবং আবদুল খালেকের এলাকায়, ইনি পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন।

নির্বাচনে দেখা গেল ওয়াহিদুজ্জামান সাহেব প্রায় ১০ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন। জনসাধারণ আমাকে শুধু ভোটই দেয়নি, প্রায় পাঁচ হাজার টাকা নজরানা হিসেবে দিয়েছিল নির্বাচনে খরচ চালানোর জন্য। আমার ধারণা হয়েছিল, মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবনও দিতে পারে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী-শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা : ১৫৬-৫৭)।

রাজনীতি এবং নির্বাচনের মূল কথা এটাই, জনগণকে ভালোবাসতে হবে। জনগণের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কিন্তু এখন রাজনীতিতে তা কতটা আছে? রাজনীতিবিদরা জনগণের ওপর আস্থা কতটা রাখেন। জনগণের ওপর আস্থা থাকলে কেউ নির্বাচনে নয়ছয়ের কথা ভাবে না। হুদা কমিশনের মতো দৈত্যও রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসে না। জনগণের ওপর আস্থাহীন রাজনীতি নির্বাচন কমিশনে হুদাদেরই খুঁজবে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

নির্বাচন কমিশন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

বাংলা ইনসাইডার প্রেডিকশন: অনেক ব্যবধানে জিতবেন আইভী

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৩ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

আগামীকাল মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা। নির্বাচনের জমজমাট প্রচারণায় এখন পর্যন্ত সহ-অবস্থান এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রয়েছে। তৈমুর আলম খন্দকার এখন পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তিনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আজ আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের শুরুতে তৈমুর আলম খন্দকার যে চমক দেখিয়েছেন তা নির্বাচনী প্রচারণা যতই এগিয়েছে ততই তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে যখন আইভী বিরোধীরা গুটিয়ে গেছেন, তাদেরকে প্রচারণায় কোন পক্ষে দেখা যায়নি, তখন তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচনের দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে গেছেন। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত জামায়াত এবং হেফাজত কাকে সমর্থন দিবে এটিও এখন একটি বড় রহস্য হয়ে রয়েছে। এ সমস্ত বাস্তবতায় নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে স্পষ্ট ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে আইডির সঙ্গে তৈমুর আলম খন্দকারের। বাংলা ইনসাইডার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ করে এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে যে, নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী আবারও নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তিনি বিপুল ভোটেই নির্বাচিত হবেন।

আইভী ইতিমধ্যেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনে যেন কোনরকম কারচুপি করা না হয়, বিপক্ষ দলের এবং অন্যান্য বিরোধীদলের এজেন্টসহ কাউকে যেন ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে না দেওয়া হয়। আইভী নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম বিতর্ক হোক এটি চাচ্ছেন না। তিনি কোনোভাবেই চাইছেন না যে, নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন উঠুক বা কোনরকম বিতর্ক হোক। বরং একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি মেয়র হতে চান। আর তৈমুর আলম খন্দকার মনে করছেন যে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নারায়ণগঞ্জের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে আইভী এবং তৈমুর আলম খন্দকারের একটি গোপন সমঝোতা কিনা, সেটাও দেখার বিষয়। কারণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে পরবর্তীতে নৌকার পক্ষে সমর্থন জানানো শামীম ওসমান স্পষ্টতই চাপের মুখে যেটা করেছেন সেটি সকলের কাছে পরিষ্কার। আর এই নির্বাচনে প্রথমদিকে বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে তিনি যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের কাছে বিতর্কিত হয়েছেন সেটিও অনেকে মনে করছেন। আর এ কারণেই, কেউ কেউ মনে করে যে নারায়ণগঞ্জে এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন আইভী এবং তৈমুর আলম খন্দকার উভয়েরই লাভ হবে। আইভী নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন, অন্যদিকে তৈমুর আলম খন্দকার বিএনপির প্রধান নেতা দাঁড়াবেন। এরকম একটি পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তৈমুর আলম খন্দকারও যে মেনে নিবেন, সেটা অনেকে ধারণা করছেন। ফলে এই নির্বাচনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জে একটি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে। বাংলা ইনসাইডার প্রক্ষেপণ করছে যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভী অনেক ব্যবধানেই তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করবেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন   নাসিক   নির্বাচন   আওয়ামী লীগ   বিএনপি   ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী   শামীম ওসমান   তৈমুর আলম খন্দকার  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন