ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৮ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সিনেমার পুরোনো প্রযোজকরা কোথায়?

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৯:৩৫ পিএম
সিনেমার পুরোনো প্রযোজকরা কোথায়?

সিনেমা নির্মাণ করেন প্রযোজকরা, থাকে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। ষাট ও সত্তর দশকে চলচ্চিত্রের প্রাণ ছিল গুলিস্তান। বড় বড় প্রযোজক ও পরিবেশকদের অফিস ছিল গুলিস্তানে। সবাই ওই এলাকাকে বলত ‘ছবিপাড়া’। ইকবাল ফিল্মস, চিত্রা ফিল্মস, আলমগীর পিকচার্স, আনন্দমেলা চলচ্চিত্র, এসএস প্রডাকশন, সনি কথাচিত্র- বিখ্যাত সেসব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এখন আর সিনেমা বানায় না। আশির দশকে এসে চিত্র পাল্টে। গুলিস্তান থেকে কাকরাইলে স্থানান্তরিত হয় ‘ছবিপাড়া’।

ভুঁইয়া ম্যানশন, ইস্টার্ন কমার্শিয়ালসহ আশপাশের কয়েকটি বিল্ডিংয়ে প্রযোজক-পরিবেশকদের অফিস বসে। চলচ্চিত্রের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠল কাকরাইল। এইতো সাত-আট বছর আগেও ছিল সনি কথাচিত্র, শুভ ইন্টারন্যাশনাল, সন্ধানী কথাচিত্র, আশা প্রডাকশনস, ফাইভস্টার ফিল্মস, নবীন কথাচিত্র, জননী কথাচিত্র, তিতাস কথাচিত্রের মতো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একের পর এক ছবি নির্মাণ করেছে। কিন্তু তারা প্রায় সবাই ব্যবসা গুছিয়ে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বেশির ভাগ প্রযোজক অফিস পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে। সেসব প্রযোজকদের কোন খোঁজ নেই।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রায় ৩০ বছর জড়িত তিতাস কথাচিত্রের প্রযোজক আবুল কালাম। ২০১৪ সালে সর্বশেষ বানিয়েছিলেন শাকিব খানকে নিয়ে ‘ভালবাসা এক্সপ্রেস’। কিন্তু তারপর আর সাহস পাননি সিনেমা নির্মাণের। কারণ কী? ‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। সর্বশেষ শাকিব খানকে নিয়ে সিনেমা বানিয়েছি। তার আগের বছর বানালাম বাপ্পিকে নিয়ে। লাভ তো দূরের কথা, পুঁজিই ফেরত পাইনি। সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ করেছি। প্রতিষ্ঠিত প্রযোজক ছিলাম, ব্যাংক লোন পেতাম।  অনেক হিট ছবি উপহার দিতাম। পুঁজি নেই বলে নতুন করে ছবি বানানোর জন্য যখন ব্যাংকের দ্বারস্থ হলাম, তখন লোনও পেলাম না। কিভাবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে থাকব?’, বললেন কালাম।

কাকরাইলে গিয়ে খোঁজ নিলে আরও খারাপ অবস্থা চোখে পড়ে। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ‘মা কথাচিত্রের’ এম ডি বাদল। দুইযুগ সিনেমার সঙ্গে আছেন। তিনি বলেন,‘ চোখের সামনে রমরমা ব্যবসা দেখেছি। প্রযোজকরা ব্যাগ ভর্তি করে টাকা নিয়ে যেত। গাড়ি- বাড়ির মালিক হয়েছে এই সিনেমার বদৌলতে। কিন্তু যখনই ব্যবসায় একটু ধস নামতে শুরু করেছে, একদম কেটে পড়েছে। অন্য ব্যবসায় সে টাকা লগ্নি করেছেন। তারা যে সবাই বসে ভালো কিছু করবেন। তা কেউ আর করেনি। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত বেশির ভাগ প্রযোজক ছিল স্বার্থপর। নিজেদের স্বার্থ উসুল করে আমাদের মাঝপথে রেখে কেটে পড়েছে।’

খোঁজ নিয়ে তার কথার সত্যতাও মিলে যায়। কেউ গার্মেন্টস ব্যবসা কেউবা বড় মার্কেটে শো রুম দিয়েছেন। তাদের সামর্থ্য থাকলেও এখন আর ছবি বানাতে ইচ্ছুক নয়। ‘মুভি মোগল’ বলে পরিচিত আলমগীর পিকচার্সের জাহাঙ্গীর খান। কথা হলো তাঁর সঙ্গেও। একটা সময়ে তার প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বাধিক সিনেমা নির্মাণ হতো। এখন কেন সরে দাড়িয়েছেন? ‘২০০০ সালের পর থেকে একের পর এক রুচিহীন, মানহীন ছবি তৈরির অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হলো। ফলে সম্মান নিয়ে সরে দাঁড়িয়েছি’ বলেন জাহাঙ্গীর খান। তাঁর সঙ্গে একমত আনন্দমেলা চলচ্চিত্রের প্রযোজক আব্বাস উল্লাহও। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’খ্যাত এই প্রযোজক বলেন,‘ কখনোই আমি সিনেমা থেকে সরে দাড়াতে চাইনি। মাত্র একজন নায়ক এখন। তাঁর শিডিউল মেলানোও মুশকিল। তা ছাড়া আমি সিনিয়র প্রযোজক। একটা সম্মান তো আছে। শিডিউলের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোটা আমার সাজে না। আর পরিচালকও বা কে আছে যাকে দিয়ে সিনেমা নির্মাণ করবো। এমন কেউ নেই যার উপর ভরসা করবো। বাধ্য হয়েই এখন নাটক প্রযোজনা করছি।’

তাছাড়া একটা সময়ে শাবানা, আলমগীর, সোহেল রানা, সুচন্দা, সুচরিতা, রাজ্জাকসহ অনেক অভিনয়শিল্পীও নিয়মিত সিনেমা প্রযোজনা করতেন। বর্তমান সময়ে তারা সিনেমাতেও নেই। প্রযোজনাতেও নেই। সবটা থেকেই নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে।

মোহাম্মদ আলীর মিনা ফিল্ম, মনির হোসেনের আশা প্রডাকশন, মাহমুদ হোসেন মুরাদের মেরিনা মুভিজ, মনোয়ারা ফিল্মস, নাভী ফিল্মস, আশীর্বাদ চলচ্চিত্র - গেল কয়েকবছর সচেষ্ট থাকলেও অনেকটা নিষ্প্রভ এখন। বর্তমান সময়ে প্রভাবশালী চারটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। চারটিই নতুন। এর মধ্যে রয়েছে জাজ মাল্টিমিডিয়া, হার্টবিট, টাইগার মিডিয়া ও শাপলা মিডিয়া। এর মধ্যে হার্টবিট, যার বয়স মাত্র ১০ বছর। শাকিব খানকে নিয়েই বেশিরভাগ সিনেমা নির্মাণ করেছে এ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। জাজ মাল্টিমিডিয়া যাত্রা শুরু করেছে ২০১১ সালে। নতুন অভিনয়শিল্পী ও পরিচালক তৈরীতে তারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তবে নানা কারণে তারা বিতর্কিতও হয়েছে। শাপলা মিডিয়ার হাত ধরে মাত্র তিনটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সবগুলোই শাকিব খানের। টাইগার মিডিয়া বর্তমানে অনেকটা নিশ্চুপ। তারা শর্টফিল্ম নির্মাণ করছে।

এছাড়াও অনেক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরই মাঝেমধ্যে নাম শোনা যায়। সেগুলোর একটি কিংবা দুইটি সিনেমার পর আর খোঁজ থাকে না। এখন আসলে ‘সিনেমা পাড়া’ বলতে জায়গাটা নেই বললেই চলে।

বাংলা চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। যাদের হাত ধরে শুরু থেকে জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল সিনেমাগুলো মুক্তি পেয়েছে। সত্যিই চলচ্চিত্র খুব মিস করে, নায়ক রাজ রাজ্জাকের ‘রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন’, আব্বাস উল্লাহ ও মতিউর রহমান পানু ‘আনন্দমেলা সিনেমা লিমেটেড ও ছায়াছন্দ চলচ্চিত্র’, এস এম তালুকদার মান্না ‘কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র’, ওয়াহিদ সাদিক ও শাবানা ‘এস এস প্রোডাকশন’, মোহাম্মদ হোসেনের ‘সনি কথাচিত্র’, নায়ক জসিমের ‘জ্যাম্বস ইন্টারন্যাশনাল লি’, মনোয়ার হোসেন ডিপজলের ‘অমি বনি কথাচিত্র’ শফি বিক্রমপুরীর ‘যমুনা ষ্টার লি’, কৌহিনূর আক্তার সুচন্দা ‘সুচন্দা চলচ্চিত্র’, আরিফা জামান মৌসুমী ‘কপোতাক্ষ চলচ্চিত্র’, মোশাররফ হোসেন ‘মর্ডান ফিল্ম ইন্টারন্যাশনাল’, জোহরা গাজী ‘দেশ চিত্রকথা’, চিত্রা জহির ‘চিত্রা ফিল্মস’ নুরুল ইসলাম পারভেজ ‘এটলাস মুভিজ’  কামাল ইউসুফ ‘লীনা ফিল্মস’, এ জে মিন্টু ‘সানফ্লাওয়ার মুভিজ’ গায়ত্রী বিশ্বাস ‘গীতি চিত্রকথা’  মাসুদ পারভেজ সোহেল রানার ‘পারভেজ ফিল্ম’  রমলা সাহা ‘স্বরলিপি কথাচিত্র’, প্রদীপ দে ‘ঋদ্ধি টকিজ’, শফিকুল ইসলাম ‘বন্ধন বানীচিত্র’ , রোজী আফসারী ‘রোজী ফিল্মস’, খোশনূর আলমগীর ‘আঁখি ফিল্মস’ , রোজিনা ও ফজলুর রশীদ ঢালী ‘রোজিনা ফিল্মস’, হেলেনা মুস্তাফিজ সুচরিতা ‘মৌসুমী কথাচিত্র’, শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘জেকে. মুভিজ’ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। 


বাংলা ইনসাইডার/ এমআরএইচ