ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলা সিনেমা: যেমন খুশি তেমন সাজো আর কত?

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রবিবার, ১০:০০ পিএম
বাংলা সিনেমা: যেমন খুশি তেমন সাজো আর কত?

ভারতের ‘পাখি’ ড্রেসের জন্য বাংলাদেশের তরুণীর আত্মহত্যা করার ঘটনা আমরা জানি। ‘পাখি’ নামটি কলকাতার একটি সিরিয়াল থেকে আসা। আমরা এটাও জানি, যখন বাংলাদেশের কাপড়ের দোকানগুলোতে যাওয়া হয়। তখন কানে আসে শুধু ভারতীয় সিনেমার নামই। ‘দাবাং’ ছবি রিলিজের পর বাংলাদেশের শপিংমলগুলোতে `দাবাং` শাড়ি বিক্রি হতে দেখেছি আমরা। সঞ্জয় লীলা বানশালীর ‘দেবদাস’ ছবির মুক্তির পর এদেশে পার্বতী এবং চন্দ্রমুখীর শাড়ি কেনার হিড়িক পড়েছিলো।

যেখানে পাশের দেশেই আমরা দেখতে পাই কোনো একটি নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পেলে তার পরবর্তী সপ্তাহেই ঐ ছবির নায়ক কিংবা নায়িকার পোশাকের ডিজাইনের পোশাক শপিংমলগুলোতে বিক্রি শুরু হয় যায়। সেখানে আমাদের নাটক সিনেমা কতটা প্রভাব রাখতে পারছে এই সেক্টরে? একটা সিনেমায় তো সবাই নায়ক নায়িকাদেরকেই দেখে। সেই নায়ক নায়িকা তাদের চরিত্র অনুসারে ড্রেস পরে। তো ভাল কস্টিউম ছাড়া কিভাবে একটি ভাল ফিল্ম সম্ভব? মানুষকে আকর্ষণ করার জন্য নতুনত্ব লাগে।চলচ্চিত্রকে অনেক বেশি দৃষ্টি নন্দন করে তোলে এই কস্টিউম। সেই কস্টিউম বিষয়ে আমাদের ছবির নির্মাতা এবং প্রযোজকরা কতটুকু নজর দেয়? কস্টিউম তৈরিতে কতটুকু সময় দেয়? আমরা না পারছি নতুন কিছু তৈরী করতে। না পারছি নিজেদের পরিচয় বহন করতে। 

বাংলা চলচ্চিত্রের ফ্যাশন সম্পর্কিত কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে মোটা দাগে এর কিছু কারণ বের করতে পেরেছি।

১. অমিতাভ রেজার মতে, আমাদের চলচ্চিত্র ইন্সটিটিউট নেই বললেই চলে। সেখানে আমাদের নির্মাতারা কিভাবে শিখবে যে একটি ফিল্মে ফ্যাশনের মূল্য কতটুকু। আমাদের এখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলি, যেখানে ফিল্ম পড়ানো হয়। সেখানে এর উপরে কোন সাবজেক্টই নেই। তারপরও আমরা বাহির থেকে দেখে বুঝে যতটুকু শিখতে পারি। জোড়াতালি দিয়ে আর কতই বা ভালো হবে।

২. বাংলা সিনেমার ফ্যাশন ডিজাইনার ফারজানা সান জানালেন, এখানে ফোন করে পরিচালক ২০ দিন আগে বলেন আমার সিনেমার কস্টিউম করে দিতে হবে। এত অল্প সময়ে একটি সিনেমার লাইন আউট কিভাবে করবো বলেন। তাহলে ভাল কাজ কিভাবে হবে? কখনো কখনো সেটা এক কিংবা দুইদিন আগেও বলা হয়। তখন মনে হয় ভাগ্যিস সিনেমায় এই সেক্টরটা যে আছে সেটাই আমার কপাল।

৩. ফ্যাশন ডিজাইনার প্রথমে গল্পটা পড়বেন এবং চরিত্রটা বুঝবেন তারপর পোশাকের একটা লে আউট তৈরি করবেন। কিন্তু এর জন্য যথেষ্ঠ সময় দেওয়া হয় না কাউকে।

৪. গল্পের প্রয়োজনে ঢাকা থেকে ঢাকাইয়া জামদানি সংগ্রহ করে নিয়েছিলো ‘দেবদাস’ ছবির জন্য। সে বছর জামদানি শাড়ির কদর বেড়ে গিয়েছিলো হঠাৎ করে। বাংলা চলচ্চিত্রে আজ্যবধি এমন ঘটা করে কিছু হয়েছে সে ইতিহাস নেই। অথচ বড় বড় বাজেটের সিনেমা কম হয়নি।

৫. একটা সময়ে কিছু ট্রেন্ড জনপ্রিয় হয়েছিলো শাবানা হাতার ব্লাউজ, ববিতার শাড়ি সর্বশেষ এই ধারায় সালমান শাহ ছিলেন ফ্যাশন আইকনিক। নায়ক- নায়িকার ড্রেস আপে তার নিজের একটি রুচি ফুটে উঠবে, এটা তার ফ্যাশন স্টেটমেন্ট, এটাই তার আইডেন্টিটি। যা দেখলে বুঝা যাবে যে কে। যেটা লম্বা সময়ের সুপারস্টার শাকিব খান তৈরী করতে পারেননি।

৬. সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমা থেকে কপি হয় আমাদের সিনেমা। কিন্তু আমরা এটা শিক্ষা নিতে পারি না, তাদের সিনেমায় কিন্তু বলিউডের কোন প্রভাব নেই। তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে ধারণ করে। এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে মাথায় রেখেই তারা তাদের চলচ্চিত্রের কস্টিউম ডিজাইন করে থাকে। তাদের ফিল্মে লুঙ্গি পরেই নায়করা মারামরি করে। তাদের নায়িকারা সিল্কের শাড়ি পরে।আমাদের নায়িকারা বলিউডের লেহেঙ্গা পরে।

৭. আমাদের দেশে সিলেট এর মানুষজন এক রকম, চট্টগ্রামের মানুষজন এক রকম। কিন্তু আমরা কাউকে আলাদা করে উপস্থাপন করতে পারি না।

৮. কম্পজিশনের অনেক খেলা খেলতে হয়। পেইন্টিং থেকে আমরা কি শিখেছি, সামনে রেড হলে দূরেও কিন্তু একটু রেড রেখে আসতে হয় নইলে কম্পোজিশন পারফেক্ট হয়না। চাষী নজরুল ইসলাম, আমজাদ হোসেনরা যখন ছবি করতেন তারা কিন্তু ডিজাইনার নিয়োগ দিতো।এখন আর সেগুলো নেই।

৯. আজিজুল হক বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ফ্যাশন ডিজাইনার। তার একটি গল্প বললেন একজন, শাবানার একটি সিনেমায় ছেঁড়া শাড়ি লাগবে। সেখানে নতুন শাড়ি আনা হলো। যে কারণে শ্যুটিং পেকআপ করা হয়েছিলো শুধু মাত্র ছেঁড়া শাড়ি না থাকার কারণে। এখন তো স্ক্রিপ্ট দেয়া হয় না। এখনও সবাই পোশাক পরছে, কিন্তু সেই সমন্বয়টা নাই।

১০. আয়নাবাজি সিনেমার কাস্টিউম ডিজাইন করেছেন ফারজানা। তিনি জানালেন, একমাস সময় পেয়েছি এই ছবির জন্য। নায়কের অনেক চরিত্র ছিল। একমাস আগে সময় পেয়েছি বলে তাও বেটার কিছু করতে পেরেছি অন্যসবের চেয়ে।

১১. ডিজাইনার রমিম রাজ বলেন, আমাদের দেশের সবাই চেষ্টা করে বলিউডকে কপি পেস্ট করার। বলিউডকে নকল করলেও কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত ক্যামেরায় ফুটাতে পারে না। আমাদের দেশের কোথায় আছে যে মেয়েরা লেহেঙ্গা পরে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের সামাজিকতা আমরা কখনোই ফুটিয়ে তুলতে পারি না।

১২. মাহিকে মাহি-ই হতে হবে ক্যাটরিনা হলে চলবে না। কপি পেস্ট দিয়ে কিছু হবে না, নিজস্বতা লাগবে।

১৩.বিশ্বের সব দেশেই ফিল্মের ডিজাইনারদের সবাই চেনে। কিন্তু আমাদের এখানে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ডিজাইনারদের মানুষ চিনলেও ফিল্মের ডিজাইনারদের কেউ চেনে না। এখানে আইডেন্টিটি হচ্ছে ড্রেসম্যান হিসেবে।

১৪. আমাদের সিনেমায় আমাদের গল্প কই? কেন শাকিব খানের সিনেমা অস্কারে যাচ্ছে না। কারণ তা আমার সংস্কৃতিকে প্রেজেন্ট করছে না, করছে বলিউডের মুভিকে। এটাই সমস্যা।

১৫. আমাদের তারকাদের সাহিত্যাঙ্গনের জ্ঞান খুবই কম। বিভূতিভূষণ কি লিখে গেছেন, মানিক, তারাশঙ্করের গল্প কি, ৫০ বছরের আগের ঐতিহ্যকে যদি না জানি তাহলে কিন্তু আমরা নতুন কিছু দিতে পারবো না।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ