ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মায়া, মমতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার সিনেমার মানুষ

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০২০ সোমবার, ১০:৪৮ পিএম
মায়া, মমতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসার সিনেমার মানুষ

সিনেমাপাড়া বা বিএফডিসিকে নিয়ে কত মানুষের কত অভিযোগ। ভালো ছবি হয় না, ভালো শিল্পী নেই- কত কি! কিন্তু এই সিনেমাপাড়ায় কেউ গিয়ে থাকলে একটা জিনিস খেয়াল করবেন, সম্মান। আগের মতো না থাকলেও কমতি নেই। সিনিয়রদের পায়ে পড়ে সালাম, সম্মানে মাথা নিচু করে কথা বলা, স্যার, ম্যাডাম সম্বোধন করা- এগুলো এফডিসিতে দেখে আপনি বাইরের কেউ হলে অবাক হবেন। কিছু ঘটনা জানলে আপনি সেটা ভালোমতোই বুঝতে পারবেন।

পরিচালক রায়হান মুজিবের সেটে শুটিং করছিলে জসিম- শাবানা। শুটিংয়ের জন্য লাইট অন করা হলো। হুট করে শাবানাকে পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সে মেকাপ রুমে এক সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। জসিম পরিচালক মুজিবকে জিজ্ঞাস করলেন, তোমার কাছে কি বলে গেছে? মুজিব আমতা আমতা করে বললেন, না। জসিম তখন আর কিছু বললেন না। শাবানা স্পটে আসলেন। জসিম- শাবানার একটা দৃশ্য ধারণ হলো। পাশেই জসিমের আরেকটা সিনেমার সেট ডিজাইন চলছিল। সেখানে যাওয়ার জন্য মুজিবের অনুমতি নিলেন শাবানার কাছ থেকে। একটু জোরেই মুজিবকে বললেন, পরিচালক আমি কি যেতে পারি? নিজেই ওই ছবির প্রযোজক ছিলেন। কিন্তু তিনি পরিচালকের অনুমতি নিয়ে অন্য সেটে কিছুক্ষণের জন্য যেতে চাইলেন। শাবানার বুঝতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না। শাবানা গিয়ে মুজিবের গায়ে হাত দিয়ে বললেন, সরি ভাই। আমাকে মাফ করে দে। আমি তাড়াহুরায় খেয়াল করতে পারিনি। আমার আর কখনো এমন ভুল হবে না।’

জসিম যেদিন মারা গেলেন, মান্না গাজীপুরে ‘খবর আছে’ ছবির শুটিং করছিলেন। পাশেই ইলিয়াস কাঞ্চনের একটা সিনেমার শুটিং চলছিলো। সেখান থেকে ফাইটার মোসলেমকে একজন এসে জানালেন জসিম বস আর নেই। মান্না ধপ করে বসে পড়লেন। মাথায় হাত দিয়ে বললেন আমরা শেষ। শুটিং রেখে নিজে গাড়ি চালিয়ে জসিমের উত্তরার বাসায় চলে আসলেন। মান্না এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমি লাশ দেখার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস করিনি। গাড়ি চালাচ্ছিলাম আর আল্লাহকে জপছিলাম খবরটা যেন মিথ্যা হয়।

২৪ বছর আগের। এই ঘর এই সংসার এর শুটিং। পরিচালক মালেক আফসারী ক্যামেরা সেট করছিলেন ভর দুপুরে। সালমান শাহ একটা ছাতা এনে ছায়া দিলো তার মাথার উপর। এতো বড় স্টার হয়ে`ও  সালমান শাহ ছিল নিরহংকার। টেকশিয়ানের কাছে নিজেকে ছাত্র মনে করতেন। আফসারী একটা ছবি দিয়ে বললেন, ‘ওর চাঁদ মুখটি ভালো করে দেখুন কি গভীর মনোযোগ আমার দিকে। আমি কি বলছি? ক্যামেরায় কি লেন্স লাগাচ্ছি? সব কিছু মন দিয়ে দেখছে।’  

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে ছবির শুটিং-সেটে এরকম চিত্র নিছক কল্পনাই বলতে হবে। নায়ক-আর নায়িকাদের মেক-আপ রুমে থাকতে দেখা যায়। ক্যামেরার সামনে আসেন শট দেয়ার সময়। রোদ থাকলে তাদের মাথার ওপর ছাতা ধরে থাকেন প্রোডাকশনের লোকেরা।সালমান যেন একেবারে উলটো। ছবিটি বলে দেয়, সেই সময়ের সালমান কতটা উদার।’

নব্বই-পরবর্তী এমন নায়ক-নায়িকা খুব কমই পাওয়া যাবে, যাঁরা সাদেক বাচ্চুর কাছে অভিনয় শেখেননি।আশির দশকের শেষ দিককার কথা। সাদেক বাচ্চু তখন তুমুল জনপ্রিয়। বিটিভিতে বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করে নজর কেড়েছেন। পথে-ঘাটে মানুষের কাছে নিজের অভিনয়ের প্রশংসা শোনেন। এর মধ্যেই একদিন পরিচালক এহতেশামের ফোন পেলেন। শিগগির দেখা করার তাগিদ দিলেন। তাঁর অফিসে গেলেন বাচ্চু। সেদিনই দারুণ এক প্রস্তাব পেলেন গুণী এই পরিচালকের কাছ থেকে। সেদিনের কথা বললেন বাচ্চু, “আমার জ্ঞান সীমিত। কতটা অভিনয় জানি সেটা নিয়েও কথা বলতে চাইনি কখনো। এহতেশাম দাদুভাই সেদিন আমাকে একটা প্রস্তাব দিলেন, নতুন ছবি ‘চাঁদনী’র জন্য নতুন নায়ক-নায়িকা নিয়েছেন তিনি। আমার গুরুদায়িত্ব তাঁদের অভিনয়ের তালিম দেওয়ার। দাদুভাইয়ের প্রস্তাব কি আর ফেরানো যায়! এহতেশামের আবিষ্কার শাবনূরও প্রথম দিকে তাঁর কাছে গ্রুমিং করেছেন। আমিন খান, শাহীন আলমরাও বাচ্চুর হাতে গড়া। অবশ্য নিজে যে এত তারকার গুরু তা কখনো জানতে দেননি মানুষকে। ‘এখন হয়তো অনেকেই স্বীকার করবে না, আমি তাদের অভিনয় শিখিয়েছি। সত্যি বলতে, আমি চাই-ও না সেই স্বীকৃতি। তবে যেটুকু নিজের মধ্যে ছিল তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। অনেক কিছু হয়তো অজান্তে তাদের কাছে শিখেছিও। এটাকে আমি আদান-প্রদান বলব।’ নাঈম-শাবনাজ, আমিন খান, শাহীন আলম, জায়েদ খান, আমান রেজা ও বাপ্পী-অনেকের ভিড়ে শিষ্য হিসেবে এঁদের নাম বলতে পছন্দ করেন বাচ্চু। এঁদের কেউ কেউ তাঁকে বাবা বলেও ডাকেন, কেউ ডাকেন আংকেল বা স্যার। এতেই দারুণ খুশি এই অভিনেতা।

গুরুকে নিয়ে বললেন চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম শিষ্য নাঈম, ‘আমি আর শাবনাজ তাঁকে আংকেল বলে ডাকি। শাবনাজের বাবাও মঞ্চে অভিনয় করতেন। বাচ্চু আংকেল ছিলেন তাঁর বন্ধু। মনে পড়ে, প্রথম ছবির শুটিং শুরুর আগে তিনি আমাদের হাতে ধরে শেখিয়েছিলেন কিভাবে হাঁটতে হয়, কিভাবে ক্যামেরার সামনে লুক দিতে হয়, কোন সংলাপের ডেলিভারি কিভাবে দিতে হয়। আমি বাচ্চু আংকেলের চোখের অভিনয়টা খুব ফলো করতাম। একেকটা সংলাপ বলার সময় তাঁর চোখের ধরনটা থাকত একেক রকম। আর ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও বাচ্চু আংকেলের কোনো তুলনা হয় না।’

পূর্ণিমাকে সেদিনও দেখা গেছে গুরু জাকির হোসেন রাজুর পায়ে সালাম করতে। সাইমন সাদিক তার জাতীয় পুরস্কার উৎসর্গ করেন গুরু জাকির হোসেন রাজুকে। গুরুর কথা উঠলে যেভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলেন তা মুগ্ধ করার মতো। 

এমন শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর মমতার গল্প লিখলে শেষ হবে না। আর সিনেমার এত খারাপের দিনেও এই ভালোবাসা অটুট রয়েছে। এটাও কি বড় কথা না।