ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

করোনার পরে যদি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থাকে; কি করা যেতে পারে?

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২০ শনিবার, ১০:০০ পিএম
করোনার পরে যদি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থাকে; কি করা যেতে পারে?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সংকট বহুমুখী। একটা সংকটের চেয়ে আরেকটা বড়। করোনা যেন সব সঙ্কট শেষ করে দিলো। সব শেষ করা মানে, এই ইন্ডাস্ট্রির আঁকড়ে ধরার আর তেমন কিছুই রইলো না। সিনেমাগল ঠিক কবে খুলবে তার নিশ্চয়তা নেই। এমনিতেই হলগুলো সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, এখন খুলে ভুর্তুকি আর কত দেওয়া যায়! যদিও অনেকে বলছেন, রেস্টুরেন্টসহ শপিংমল, দোকানপাট খুললেও সিনেমাহল কেন খোলা যাবে না? সিনেমা হল খুলতে যে সিনেমা দরকার সেটাও কি বাংলাদেশে আছে? বাংলাদেশের সিনেমা বাঁ঳চিয়ে রাখার জন্য অনেক পরামর্শই অনেকে দেয়। তবে বাস্তবিক যে সমস্যাগুলোর সমাধান দরকার।

১. বেসরকারী বড় বড় কোম্পানীগুলো চলচ্চিত্র শিল্পে বিনিয়োগ করার জন্য সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বসুন্ধরা গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, গ্রামীনফোন এসব বড় বড়ঙ্কোম্পানীগুলো চলচ্চিত্র বিনিয়োগে এগিয়ে আসলে হয়তো সুদিন ফিরতো, তবে তাদের কোনো আগ্রহ নেই চলচ্চিত্র শিল্পে বিনিয়োগের কারন ওই একটা। মেধাবী নির্মাতার অভাব, শিল্পী সংকট ও ছোট বাজার।

২. সব কিছুর জন্য সরকারের দিকে চেয়ে থাকার প্রবনতা দূর করতে হবে। ছবির উন্নয়ন হচ্ছে না। সরকারের দিকে চেয়ে থাকে বাংলাদেশি ফিল্ম মেকাররা। নিজেরা সমন্বিতভাবে কোনো উদ্যোগ নিবে বেসরকারীভাবে সেই প্রচেষ্টা নেই। সরকারমুখীতা চলচ্চিত্র শিল্পের বিপর্যয়ের অন্যতম কারন। সরকার তো ছবি বানিয়ে দিবে না। ছবি তাদেরই বানাতে হবে। নিজেদের নেই মেধা। তাই সরকারের ঘাড়ে দায়িত্ব দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে চায় বাংলাদেশি ফিল্ম মেকাররা। কাউকে প্রতিহত করার জন্য ঠিকই রাস্তায় নামে শিল্পীরা। কিন্তু কখনো কোন মিটিং করতে শোনা যায় না, যেখানে সব শিল্প পরিচালকরা বসে সিনেমা নিয়ে কথা বলবেন। প্রযোজকদের নিয়ে বসে এমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় না যেন নতুন সিনেমা নির্মাণ হয়। এখন সেই উদ্যোগ নিতে হবে।

৩. তথ্যমন্ত্রী অভিবাবক হয়েও সবাইকে নিয়ে বসার উদ্যোগ নিতে পারেন। তিনি প্রযোজকদের নিয়ে বসতে পারেন। তাদের সবাইকে ডেকে বলতে পারেন কে কত এখন ইনভেস্ট করতে পারেন। সেই অর্থ দরকার হয় একসঙ্গে করে সিনেমা নির্মাণের প্লান করা যায়। সেই অর্থ দিয়ে ভাগ ভাগ করে কয়েকজন পরিচালককে দিয়ে একটা সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এই সিনেমাগুলোর ক্রমান্বয়ে মুক্তি পাবে। এর মার্কেটিং সরকার উদ্যোগ নিয়ে করবে। সরকারী- বেসরকারী চ্যানেলে এর মার্কেটিং করতে হবে।

৪. বাংলাদেশি ফিল্ম মেকারদের মধ্যে সবকিছু ভারতীয় ছবির নকল করে বানানোর প্রবনতা ব্যাপক। নিজের থেকে যে কিছু ইনপুট দিবে সেই মেধা নেই। তিনটা ভারতীয় ছবি ইউটিউবে বা পাইরেট বে থেকে ডাউনলোড করে দেখে সেটার কপি ছবি বানায়। এখান থেকে কিছু সিন, ওখান থেকে কিছু সিন নিয়ে একটা বাংলাদেশি ছবি দাড় করায়। এমন পরিচালকদের হাতে কাজ দিতে হবে যারা এ পথে হাটেন না।

৫. শিল্পী সংকট চরমে। শুধু এক নায়ক শাকিব খান। বাংলাদেশের শিক্ষিত ও রুচিশীল দর্শকদের জন্য শাকিব খানকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। সিনেমায় যারা আছেন, তারাও সংখ্যায় কম নয়। সেইসব নায়ক কিংবা নায়িকাদের ঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। ফুল ফ্রেমের সিনেমা নির্মাণ করতে পার্শ্ব চরিত্রের প্রতি মনোযোগি হতে হবে। সিনেমার মূল নায়ক কিছুটা দুর্বল হলেও আশেপাশের চরিত্রগুলো একটি সিনেমাকে প্রাণবন্ত করতে পারে। সেই কৌশলে সিনেমা নির্মাণ করা যায়। 

৬. ইন্টারনেটের এই যুগে কপি পেস্ট করে পার পেয়ে যাওয়া কঠিন। বাংলাদেশিরা ভারতীয় ছবি মুক্তির সাথে সাথে সেটা টরেন্ট থেকে ডাউনলোড করে নেয়। ১০ বছর আগের তামিল ছবির সিনও মনে থাকে বাংলাদেশি দর্শকদের। তাই আগের মতো কপি পেস্ট করতে পারে না বাংলাদেশি ফিল্ম মেকাররা। করলেই ধরা খাওয়ার চান্স ১০০ পারসেন্ট। তবুও নকল ছবি হচ্ছে। সেগুলো মারও খাচ্ছে। তাই এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে নতুন কিছু ভাবতে হবে।

৭. একটি ভালো ছবি করতে হলে বিগ বাজেট লাগবে এমন কোন কথা নেই। মেধা থাকলে কম বাজেটের ছবি করে অস্কার পাওয়াও সম্ভব কিন্তু ছবির গল্প যদি ১০ কোটি টাকার বাজেট দাবি করে আর সেটা ২ কোটি দিয়ে নির্মান করা হয় তখন ছবির মান নষ্ট হতে বাধ্য। বাংলাদেশের ছবির দর্শক তৈরি না হওয়ায় এবং বাজার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অন্তত সম্প্রসারন না হওয়াতে বাজেট বাড়াতে পারে না প্রযোজক। ফলে গোজামিল দিয়ে ছবি নির্মান করা হয়। তাই বড় বাজেট না নিয়ে এই সময়ে ভালো গল্পকেই উপজীব্য করা উচিত।

৮. চলচ্চিত্র নির্মানের ভালো কোনো প্রশিক্ষন কেন্দ্র নেই বাংলাদেশে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা হিন্দী, ইংরেজি ছবি দেখে ও পরিচালকের পিছনে সহকারী হিসেবে থেকে যা শিখে সেই জ্ঞান দিয়ে ছবি নির্মান করে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ খুবই সীমিত। এক্ষেত্রে বিদেশি দক্ষ টেকনেশিয়ানদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশে আনা যায়। এডিটিং থেকে শুরু করে ক্যামেরাশৈলী কিংবা মেকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞান দান করা যেতে পারে।

৯. বাংলাদেশি ছবির মহিলা দর্শক ফেরানো একটা চ্যালেঞ্জ। মহিলা দর্শকেরা অনেক আগেই হলে গিয়ে ছবি দেখা ছেড়ে দিয়েছে। মহিলা দর্শকেরা এখন ভারতীয় সিরিয়ালমুখী। মহিলাদের আবার হলমুখী করতে হলে তাদের গল্পও আনতে হবে পর্দায়। তার আগে মহিলাদের হলে যাওয়ার পরিবেশ তৈরী করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিতে হবে হলে পরিবেশ ঠিক করতে। তাছাড়া সরকারী উদ্যোগে যদি আরো কিছু সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা যায়। কমপক্ষে বিভাগীয় শহর সিনেপ্লেক্সের দাবি রাখে। 

১০. ভারতের সাথে যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মান না হওয়াও বাংলাদেশি চলচ্চিত্র শিল্পের সংকটের অন্যতম কারন। দু- দেশের কলাকুশলীরা বসে প্যাকেজ সিনেমা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দুই দেশ মিলিয়ে বড় বাজেট ও মার্কেট ধরে হলগুলো চালু করা যায়।