ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

দিন-রাত, ভোর-সন্ধ্যা সবকিছু উৎসর্গ ছিল সিনেমার গানের জন্য

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ জুলাই ২০২০ সোমবার, ১০:৪৩ পিএম
দিন-রাত, ভোর-সন্ধ্যা সবকিছু উৎসর্গ ছিল সিনেমার গানের জন্য

প্রতিজ্ঞা সিনেমার ‘এক চোর যায় চলে, এই মন চুরি করে’ গানটা এন্ড্রু কিশোরের প্রথম জনপ্রিয়তা পাওয়া গান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তারপর শুধু নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার গল্প। মুকুল চৌধুরীর কথায় আলম খানের সুরে গানটি অসম্ভব রকমের সৌভাগ্য এনে দিয়েছে তার  জীবনে। অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়েছেন আলম খান আর ‘এক চোর যায় চলে’ গানটা।

দৃশ্যের পর দৃশ্যের জন্ম হয়। আলম খানের সুরে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কথায় ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ গানটা গাওয়ার পর সব্যসাচী বললেন, দেখবেন এ গানটার জন্য জাতীয় পুরস্কার থাকবে। হয়েছিলও তাই। গুণীরা হয়তো ভবিষ্যৎ দেখতে পান। না হলে এমন করে বলেছিলেন কেন? এরপর ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’ মানুষের প্রিয় গানের তালিকায় নীরবে জায়গা করে নিল। তবে ১৯৮২ সালে বড় ভালো লোক ছিল সিনেমার জন্য প্রথম জাতীয় পুরস্কার পাওয়া তার জীবনের একটি বড় ঘটনা। এরপর আটবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।

১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর জন্ম। তখন কি জানতেন একদিন এই ছেলে হবে বাংলাদেশের ‘প্লেব্যাক সম্রাট’। হয়তো জানতেন কেউ। মা শিক্ষিকা মিনু বাড়ৈ জানতেন একদিন এন্ড্রু অনেক বড় শিল্পী হবে। কিশোর কুমারের গান খুব পছন্দ করতেন মা। তাই তো ছেলের নামের শেষে কিশোর যোগ করেছিলেন। আজ শ্রোতারা মুগ্ধ হন এন্ড্রু কিশোরের গানে। চার দশক ধরে বেশ দাপটের সঙ্গেই গান গেয়েছেন।  অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। দীর্ঘ গানের তালিকায়- আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যখানে, আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন, আমার গরুর গাড়িতে, তোমায় দেখলে মনে হয়, পড়ে না চোখের পলক, প্রেমের সমাধি ভেঙে, সবাই তো ভালোবাসা চায়, হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, এত সুখ সইবো কেমন করে, তুমি ছিলে মেঘে ঢাকা চাঁদ, পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমার মাঝে খুঁজে পেয়েছি, আমি একদিন তোমায় না দেখিলে, তুমি আজ কথা দিয়েছো, দুঃখ বিনা হয় না সাধনা, এক বিন্দু ভালোবাসা দাও, আশা ছিল মনে মনে, চিঠি এলো জেলখানাতে অনেক দিনের পরে। তবে প্রথম প্লেব্যাক করেছিলেন আলম খানের সুরে ১৯৭৭ সালে। মেইল ট্রেন সিনেমায় ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ নামের গান ছিল সেটি।

আলম খানের সঙ্গে আমার অসংখ্য গান হিট হয়েছে। এতটা শ্রোতাপ্রিয় গান আর কেউ উপহার দিতে পারেননি। আলম খান ছাড়াও রয়েছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আলাউদ্দিন আলী, আনোয়ার পারভেজ ও আনোয়ার জাহান নান্টু। একটু সিনিয়রদের মধ্যে সুবল দাস, সত্য সাহা, আবু তাহের, শেখ সাদী খানের সুরেও গান গেয়েছেন। প্রতিটি সুরকার ও সংগীত পরিচালককে শ্রোতাপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। প্রেম, বিরহ, বিষাদ, হাসি, দেশাত্মবোধক সব ধরনের গান গেয়েছেন।

একক কণ্ঠের গানে দর্শকরা যেমন মুগ্ধ হয়েছেন, দ্বৈত কণ্ঠের গানগুলোও ছিল অনবদ্য। ‘বেদের মেয়ে জোছনা আমায় কথা দিয়েছে’ দ্বৈত কণ্ঠে গেয়েছিলেন। এমন অসংখ্য দ্বৈত গান তাঁর কণ্ঠে সুর পেয়েছে। ফেরদৌসী রহমান, আঞ্জুমান আরা বেগম, সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, আবিদা সুলতানা, শাম্মী আখতার, শাকিলা জাফর, কনকচাঁপা, সামিনা চৌধুরী, রিজিয়া পারভীন, বেবী নাজনীন, ডলি সায়ন্তনী, ফাহমিদা নবী, রোমানা ইসলাম, ন্যান্সি, সালমার সঙ্গে দ্বৈত গান গেয়েছেন।  এতো এতো কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে দ্বৈত গান একটা ঘটনা বটে।

সিনেমার গানের ‘সম্রাট’ হলেও অডিওর গানে খুব একটা দেখা যায়নি। প্লেব্যাক নিয়েই রাত-দিন মেতে থেকেছেন। অনেক পরে ‘ভুল সবই ভুল’ নামে একটি অডিও অ্যালবাম করেছিলেন। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে দুটি অডিও অ্যালবাম করেছিলেন। অ্যালবাম দুটির গানগুলো শ্রোতারা গ্রহণ করেছিলেন। তবে সিনেমার গানের মধ্যেই যেন জীবন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। দিন-রাত, ভোর-সন্ধ্যা সবকিছু উৎসর্গ ছিল সিনেমার গানের জন্য। সিনেমার গানে অভিনয় থাকতে হয় এটা শিখেছিলেন অনেকের কাছ থেকে।

নায়ক রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুকদের প্রজন্মে দারুণ উজ্জ্বল ছিলেন এন্ড্রু কিশোর। তার কণ্ঠের যাদুতে ইলিয়াস কাঞ্চনও হয়েছে আলোকিত। পৃথিবীর যত সুখ, বেদের মেয়ে জোসনার মতো গান ইলিয়াস কাঞ্চন পেয়েছেন এই গায়কের গলায়।

এরপর নাঈম, ওমর সানি, সালমান শাহদের প্রজন্মেও তার কণ্ঠ দ্যুতি ছড়িয়েছে। এরপর রিয়াজ, শাকিল, ফেরদৌসরাও এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে পেয়েছেন দর্শকপ্রিয় গান। রিয়াজের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট `পড়েনা চোখের পলক` গানটিও এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া।

হালের সুপারস্টার শাকিব খানের জন্যও `কী যাদু করেছো বলোনা`, `নাম্বার ওয়ান শাকিব খান`সহ বহু জনপ্রিয় গান তিনি গেয়েছেন।

দেশের সীমানা মাড়িয়েছিলেন। বিখ্যাত সুরকার, সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মণের সুরে গান করেছেন। ছবির নাম ছিল শত্রু। আর ডি বর্মণ আদর করে ঢাকাইয়া বলে ডাকতেন। বোম্বেতে তিনটা বাংলা ও একটা হিন্দি গান গেয়েছিলাম। ‘সুরজ’ নামে হিন্দি গানটা লিখেছিলেন আনন্দ বকসী।