ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ভিজ্যুয়াল আর্টে নগ্নতার প্রয়োজনীয়তা

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২০ বুধবার, ১০:০০ পিএম
ভিজ্যুয়াল আর্টে নগ্নতার প্রয়োজনীয়তা

ভিজ্যুয়াল আর্টের যে কয়টি ফর্ম আছে প্রায় সব কয়টিতেই কিন্তু নগ্নতাকে উপস্থাপন করা হয় এবং এই নিয়ে খুব বেশি উচ্যবাচ্য হয় না। চিত্রশিল্প, ভাস্কর্য, এবং ফটোগ্রাফিতে নগ্নতা নতুন কিছু নয় এবং নিষিদ্ধ কিছু নয়। অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশের বেশিরিভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুশাসন মেনে চলায় এগুলোর প্রচলন আমাদের দেশে অনেক কম। তারপরও চিত্রশিল্পি সুলতানের চিত্রকর্মে গ্রামীন জনপদের যে দৃশ্য ফুটে উঠেছে সেখানকার প্রায় সব মানুষই অর্ধনগ্ন। ১৩৫০ এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে জয়নুলের আঁকা ছবিতেও বেশ কিছু নগ্নতা চোখে পড়ে। এছাড়াও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন বীভৎসতা ফুটিয়ে তোলা অনেক ফটোগ্রাফেও নগ্নতা চোখে পরে। অথচ এইসব কোন নগ্নতাই আক্ষরিক অর্থে নগ্নতা নয়, পরিস্থিতি প্রকাশে এই নগ্নতার গুরুত্ব অপরিসীম। এই নগ্নতা যদি কারো মধ্যে যৌন আবেদন তৈরি করে বা কেউ যদি এর মাধ্যমে যৌন সুড়সুড়ি অনুভব করেন তাহলে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ, তাঁর চিকিৎসার দরকার। আমাদের আলোচনা কিন্তু এইসব নগ্নতাকে নিয়ে নয়। আমাদের আলোচনা সিনেমা, টিভি নাটক এবং হালের ওয়েব সিরিজ এ নগ্নতা ও যৌনতার শ্লীল এবং অশ্লীল উপস্থাপন।

নগ্নতা কিন্তু শ্লীলভাবেও উপস্থাপন করা যায়, যারা মেল গিবসনের এপোকালিপ্টো সিনেমাটা দেখেছেন তারা বুঝতে পারবেন যে সিনেমাটিতে প্রচুর নগ্ন দৃশ্য থাকলেও এই সিনেমা টিন এজ বয়সী সন্তানকে পাশে নিয়েও দেখা যায়। পরিস্থিতি প্রকাশে এর প্রদর্শন অনিবার্য ছিল এবং পরিচালক খুব সুন্দরভাবে এই নগ্নতাকে শৈল্পিক উপায়ে ব্যাবহার করেছেন সিনেমার প্রেক্ষাপটে। তবে নগ্নতার প্রদর্শন বরাবরই অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন অনেক বড় নামী পরিচালকরা। যেমন হলিউডের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালকের তালিকা করলে প্রথম দিকেই থাকবে স্পিলবার্গের নাম। তার সিনেমায় নগ্নতা তেমন ছিলো না বললেই চলে। কিন্তু এমন অনেক অনেক সিনেমা টিভি সিরিজ দেখেছি যেখানে নগ্নতাকে প্রচারের কৌশল হিসেবেই ব্যাবহার করা হয়েছে সিনেমা বা সিরিজে। এগুলো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাওয়া যেতো। নগ্নতা দেখিয়ে দর্শক আকৃষ্ট করা ছাড়া খুব বেশি শৈল্পিক উতকর্ষতা অর্জন করা যায় না।

সারা পৃথিবী জুড়েই গত কয়েক বছর ধরেই ওয়েব মিডিয়ার প্রচলন বাড়ছে। গত চার মাস ধরে সব ধরনের সিনেমা হল বন্ধ থাকায় ওয়েব মুভি এবং ওয়েব সিরিজগুলো সিনেমা হল গুলির বিকল্প হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। এই প্রতিযোগিতায় নতুন নতুন অনেক প্লাটফর্মও দেখা যাচ্ছে, শুরু হয়েছে ওয়েব মিডিয়া বানানোর প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কিছু স্বাধীনতা দিতেই হবে। এডাল্ট কনটেন্ট প্রদর্শন আটকে রাখার জন্য বিদেশি সিনেমার বাংলাদেশ প্রদর্শন নিষিদ্ধ এবং হাতো গোনা কয়েকটি টিভি চ্যানেলকে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হলেও ওয়েব মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব না। এডাল্ট কনটেন্ট থাকার অজুহাতে বাংলাদেশে তৈরি মুভি / সিরিজ নিষিদ্ধ করলে দর্শকদের কিছুই যাবে আসবে না তারা নেটফ্লিক্স, আমাজন, হইচই, জি ৫ এর মতো অসংখ্য ওয়েব প্লাটফর্ম থেকে বিদেশি মিডিয়া দেখবে, এগুলোর উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রন কোন কালেই ছিল না এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। তাহলে বাংলাদেশের মেকাররা যদি ভেবে থাকেন নগ্নতা দেখিয়ে টিকে থাকতে পারবেন সেটা ভুল। কনটেন্ট নিয়ে ভাবতে হবে, আরো ভাবেতে হবে।

মিডিয়াতে নগ্নতা, যৌনতা এবং অশ্লীলতা প্রদর্শনের যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, এটা বলা যেতে পারে যে অপ্রয়োজনে নগ্নতা এবং যৌনতার প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। তবে এখানে সমস্যা হচ্ছে মানদন্ড তৈরি করা, কোনটা প্রয়োজনীয় অথবা কোনটা অপ্রয়োজনীয় তা নির্ধারন করবে কে? একই সাথে কতটুকু দেখানো যাবে, কতটুকু অশ্লীলতার স্কেলে আটকে যাবে এই নির্ধারন কে করবে? হলিউড ফিল্মে টু পিস বিকিনি পরা নগ্নতার কাতারে না পড়লেও আমাদের দেশে এটা নগ্নতার শামিল। তাই একদিকে পরিচালকদের যেমন সেটা ভাবতে হবে, তেমনি সমালোচকদেরও ভাবতে হবে সংস্কৃতি নিয়ে।

সংস্কৃত শব্দটি এসেছে সংস্কার থেকে, আর সংস্কার শব্দের মানে পরিবর্তন, সময়ের সাথে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর জন্য পরিবর্তনকেই সংস্কার বলা হয় আর একজন সংস্কৃতবান মানুষ নতুন পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারলেই তিনি সংস্কৃতবান। যারা পুরনো রীতিনীতি বা মূল কে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় তারাই মৌলবাদী, তাই সংস্কৃতমনা লোক কখনই মূল কে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইবে না। সে সর্বদাই সমাজ পরিবর্তনের উপাদান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করবে, যেটা সমাজ গ্রহণ করবে সেটাকে প্রচার করবে যেটা গ্রহনযোগ্য নয় সেটাকে বর্জন করবে।

মিডিয়াতে নগ্নতা, যৌনতা এবং অশ্লীলতা প্রদর্শন এবং এর নিয়ন্ত্রন নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতেও আরো বহু বছর আলোচনা চলতেই থাকবে। যতদিন মানুষ থাকবে এবং ক্রিয়েটিভ মিডিয়া থাকবে ততদিন এই আলোচনা সমালোচনা চলতেই থাকবে কারন এই সমস্যার কোন সার্বজনিন গ্রহনযোগ্য কোন সমাধান নেই। আমি বলছি না সমাধান নেই, সমাধান আছে তবে তা সবার কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না। তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন গ্রহনযোগ্য না হলে সমাধান বলি কিভাবে। আসলে এর সমাধান একটা নয়, বহু সমাধান আছে তবে কোনটাই সর্ব লোকের কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না। যে সমাধানেই পৌছানো যাক না কেন তা বহু অথবা কিছু মানুষকে অসন্তুষ্ট করবেই। এখন আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কাকে সন্তুষ্ট এবং কাকে অসন্তুষ্ট করবেন, কাকে ধ্বংস করবেন আর কাকে বাঁচাবেন।