ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিখ্যাত ছবির স্মরণীয় গল্প

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ আগস্ট ২০২০ বুধবার, ১০:৩৫ পিএম
বিখ্যাত ছবির স্মরণীয় গল্প

একাধিক কালজয়ী সিনেমা পেয়েছি স্বাধীনতার পর থেকে। কিছু সিনেমার নাম জানলেও পেছনের অনেক গল্প থাকে অজানা। এমন কয়েকটি সিনেমার পেছনের গল্প বলেছেন সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরা।

‘সুজন সখী’র নায়ক ফারুক

নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘লাঠিয়াল’-এর শুটিংয়ে একদিন খান আতা ভাই এলেন। তখন একটি নাটকীয় দৃশ্যের শুটিং চলছিল। শট শেষ হলে আমাকে বসিয়ে ‘সুজন সখী’র কথা বললেন। যেদিন ‘সুজন সখী’র শুটিং শুরু হলো সেদিন আমাকে আর কবরী ম্যাডামকে নিজের গাড়িতে করে স্পটে নিয়ে গেলেন। গাড়িতে আবারও গল্পে গল্পে ছবির চরিত্রগুলো এমনভাবে বললেন আতা ভাই, মনে মনে আমি সুজন হয়ে গেলাম। শুটিংয়ে উপচেপড়া মানুষের ভিড় সামলাতে পুলিশ লাঠিপেটা করার সময় আমিও হাতে ব্যথা পাই। কবরী ম্যাডাম তখন সুপারস্টার। ওনার সঙ্গে আমাকে দর্শক কেমন গ্রহণ করে সেটা দেখার জন্য ভয়ে ভয়ে হলে গিয়েছিলাম। শেষ দৃশ্যে আমরা যখন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে, তখন দর্শক আহ, ইশ শব্দ করে আফসোস করত। খান আতা ভাই খুব কষ্ট করে সিনেমাটা বানান। পারিশ্রমিক বাবদ আমাকে পাঁচ হাজার টাকা আর একটা হূদয়কাড়া চিঠি দিয়েছিলেন। এই ছবি আমাকে কুফা, অপয়া হিরো থেকে হিট বানিয়ে দিল। ‘সুজন সখী’সহ অনেক ছবিতেই আমাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা থেকে তো বঞ্চিত করা যায়নি! জীবনে এমন অনেক ভক্ত পেয়েছি যারা আমাকে বলেছে, তাদের মা-বাবা হলে গিয়ে বারবার ছবিটি দেখেছে। পণ করেছে, ছেলে হলে নাম রাখবে সুজন। এমন অনেক সুজনকেই আমি দেখেছি।

‘রংবাজ’এর গাজী মাজহারুল আনোয়ার

‘রংবাজ’-এর গান লেখার মিষ্টি মিষ্টি গল্প আছে। আমি হাঁস খেতে খুব পছন্দ করতাম। একদিন মা আমাকে কুমিল্লায় যেতে বললেন। গিয়ে দেখি পাঁচটি হাঁস রান্না করেছেন। হঠাত্ ঢাকা থেকে সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজের ফোন। ‘রংবাজ’-এর গান লেখার জন্য ঢাকায় ফিরতে হবে। দুই দিনের মধ্যেই শুটিং। বললাম, এ সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়। ‘সে যে কেন এলো না কিছু ভালো লাগে না’—গানটি টেলিফোনেই দিলাম। সবাই পছন্দ করলেন; কিন্তু কবরী বেঁকে বসলেন। তিনি ভাবলেন, যেহেতু আমি একসঙ্গে বসে গানটি লিখিনি, তার মানে তাড়াহুড়া করে লিখেছি। তাঁর সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বিধায় টেলিফোনেই মিষ্টি তর্ক হলো। বললাম, আপনি শুটিং করেন, খারাপ লাগলে আমরা দেব না। পরে তো এই গান সবারই পছন্দের হয়ে গেল। ‘হই হই রঙিলা’ গানটি নিয়েও উনি শর্ত দিয়ে বসলেন। তখন শীতকাল। আমি যেহেতু বৃষ্টিতে ভেজার গান লিখেছি, শুটিংয়ের সময় আমাকেও থাকতে হবে। এমনি নানা হাস্যরসের মধ্য দিয়েই ছবির গানগুলো তৈরি হয়েছিল। তখন সিনেমা ছিল টিমওয়ার্ক। সবাই সবাইকে বুঝতেন। ছবিটির সব গানই লিখেছিলাম আমি। তখনকার সময়ের আধুনিক ছবি ‘রংবাজ’ গানেও আধুনিকত্ব আনার চেষ্টা ছিল। আমরা সফল হয়েছিলাম বলেই গানগুলো এখনো বেঁচে আছে।

‘আলোর মিছিল’ এর সুজাতা

‘আলোর মিছিল’-এর মতো সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে আমি খুব তৃপ্ত ছিলাম সেই সময়। নারায়ণ ঘোষ মিতা বড় মাপের পরিচালক ছিলেন। বড় বড় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এ ছবিতে অভিনয় করেন। আজিম সাহেবের পর রাজ্জাকের সঙ্গে আমার বেশ কিছু সিনেমা হিট হয়। ‘আলোর মিছিল’ও সেই রকম সফল একটি সিনেমা। ছবিতে আমার চরিত্রের নাম দিনা। মজুদদার বাবার বিরুদ্ধে আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করি।

এ ছবিতে ববিতাও অভিনয় করেছে। দুই নায়িকা কাজ করলে নাকি প্রতিযোগিতা হয়, তেমন কিছুই ছিল না আমাদের মধ্যে। ও আমার জুনিয়র, শুটিংয়ের সময় তাই স্নেহই করতাম।

‘আলোর মিছিল’এর ববিতা

রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে কিছু ছবি হিট করার পর ‘আলোর মিছিল’-এর অফার এলো। গল্পটা ‘আলো’ নামের এক মেয়েকে ঘিরে। সব ইমোশন তাকে নিয়ে, কিন্তু ছবিতে রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে রোমান্টিক পেয়ার হলেন সুজাতা ম্যাডাম। আমি গল্পে রাজ্জাক সাহেবের ভাগ্নি। আমাকে নিয়ে তখন ইন্ডাস্ট্রিতে যাঁরা লগ্নি করছেন বা যাঁরা আমার বন্ধু, সবাই চাইলেন আমি যেন ছবিটা ‘না’ করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুন্দর গল্প, সুন্দর চরিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছারই জয় হলো।

নারায়ণ ঘোষ মিতা যখন সিকোয়েন্সগুলো অভিনয় করে দেখাতেন, বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠত। এ জন্যই এসব ছবি করার সময় গ্লিসারিন লাগত না। আমার একটা সংলাপ খুব জনপ্রিয় হয়েছে ‘চা গরম চা গরম।’ ক্লাসিক্যাল নাচ শিখতে হয়েছিল এ ছবির জন্য।

দর্শক ছবিটা কিভাবে নেয় তা দেখার জন্য বোরকা পরে গিয়েছিলাম ‘মধুমিতা’য়। আলো যখন মারা যায়, দর্শককে দেখেছি হাউমাউ করে কাঁদতে।

যাঁরা ছবিটি করতে মানা করেছিলেন তাঁরা সবাই পরে আমাকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। কারণ এ ছবির পরও রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে আমার রোমান্টিক ছবি হিট হয়েছে। অর্থাত্ দর্শক গল্প এবং চরিত্রই দেখে। সেই সময় এ ধরনের সিনেমাই করতে চেয়েছিলাম। পারিশ্রমিক নিয়ে ভাবতাম কম। অর্থই সব কিছু নয়। ‘আলোর মিছিল’ আমার প্রিয় সিনেমাগুলোর একটি।

‘নয়নমনি’র এ টি এম শামসুজ্জামান

‘নিরক্ষর স্বর্গে’ উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে আমজাদ ভাই ‘নয়নমনি’ বানাচ্ছেন শুনে খুশি হয়েছিলাম, কারণ এই গল্পে যে সিনেমা ব্যাপারটা আছে একদিন আমিই তাঁকে বলেছিলাম। আর ভাবলাম সহকারী পরিচালনার কাজটি পেলে ১৫০ টাকার একটা ব্যবস্থা হয়। আমাকে অবাক করে দিয়ে মোড়ল চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব করলেন আমজাদ। আমি তো করবোই না! আনোয়ার হোসেনের সম্মানী সেই সময় ছয় হাজার, আমিও ছয় হাজার চেয়ে বসলাম, যাতে আমাকে না নেয়। আমজাদ বললেন, এক হাজার টাকা দেবেন, তাতেই করতে হবে। অগ্রিম দিলেন ৫০০ টাকা। সেই টাকা পকেটে নিয়ে আমি অভিনয়ের ভয়ে কাঁদতে কাঁদতেই বাড়ি গেলাম। শুটিংয়ের দিন মেকআপম্যান শাজাহান আমাকে একটা কৃত্রিম আচিল মুখে লাগিয়ে দিয়ে বললেন, এটা যত্নে রাখবেন। আচিলটি লাগিয়ে গোলাম মোস্তফা ভাই ‘প্রীত জানে না রীত’-এ পরে সফল হয়েছিলেন। প্রথম শুটিং ছিল গ্রামে একটা লাশ দাফন করতে দেবে না মোড়ল। নয়নকে তখন বলে দিতে হবে, আমি বলি তুই কেডারে? এই ছবির একটা মজার ঘটনা আছে। শেষভাগে মনিকে নিয়ে পালানোর সময় আমি সুজনকে গুলি করতে যাই। মনি ধাক্কা দিয়ে আমাকে নদীতে ফেলে দেয়। শুটিংয়ের সময় শীতকালে কালীগঙ্গা নদীতে পড়ে আমি রীতিমতো কাঁপতে থাকি। আমাকে কেউ একজন ব্র্যান্ডি খাইয়ে দেয়। ছবি মুক্তির পর দেখি সবাই মোড়লকে খুঁজছে। এমন ঘটনাও আছে শুটিং স্পটে আমাকে দেখলেই গ্রামের মহিলারা নানা কটু কথা বলত। দুশ্চরিত্র মোড়ল আর আমি যে এক নই এটা তারা মানতে চাইত না।

‘সীমানা পেরিয়ে’র কাজী হায়াৎ

আমি তখন পরিচালক মমতাজ আলীর সহকারী। তিনি নতুন ছবি করছিলেন না বলে কাজ খুঁজছিলাম। আলমগীর কবিরই আমাকে ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির সঙ্গে যুক্ত হতে বললেন। খোলাখুলিভাবেই বললেন, দুজন সহকারী রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব না, আমাকে তাই বেশ পরিশ্রম করতে হবে। তাঁর সঙ্গে কাজ করার তীব্র আগ্রহ ছিল বলেই রাজি হয়ে গেলাম। কক্সবাজারে শুটিংয়ের দিনগুলো দারুণ কেটেছিল। সে সময় নেগেটিভ সংকট ছিল, রাত-দিন একাকার করে সম্পাদনার কাজ করতে হয়েছিল। এরপর তাঁর সঙ্গে কিছু তথ্যচিত্রের কাজও করেছিলাম। মাসে ২০০ টাকা করে দিতেন। এরপর মমতাজ আলী আবার ছবি শুরু করলে তাঁর কাছে ফিরে যাই। তবে আলমগীর কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। আলমগীর কবিরের জানাশোনা এত বেশি, তাঁকে দেখলে মনে হতো আমরা মনে হয় কোনো দিনই সিনেমা বানাতে পারব না। আমি তাঁর গুণমুগ্ধ। ‘সীমানা পেরিয়ে’ আমার কাছে নান্দনিক একটি সিনেমা। আমার ‘দায়ী কে’ জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর দেখা করতে গিয়েছিলাম তাঁর অফিসে। অভিনন্দন জানিয়ে আমাকে কিছু কষ্টের কথা বলেছিলেন সেদিন। ভালো ছবি নির্মাণের জন্য প্রচুর ঋণ করেছিলেন। ছবিগুলো ব্যবসা না করায় অনেকেই তাঁকে ভুল বুঝেছেন। যে স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন তার অনেক কিছুই পূরণ করতে পারেননি।