ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চলে গেলেন তাঁদের অভিনয় গুরু

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ সোমবার, ০১:১৫ পিএম
চলে গেলেন তাঁদের অভিনয় গুরু

গত বছর অসুস্থ হয়ে ১১ দিন কোমায় ছিলেন। অভিনয়ে আর ফেরার কথা ছিল না, সহকর্মী ও ভক্তদের দোয়ায় ফের কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু করোনার কাছে হার মানতে হলো বিশিষ্ট অভিনেতা সাদেক বাচ্চুকে। আজ ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। অভিনেতার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের অনেক তারকার অভিনয় গুরুও ছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তানের বিখ্যাত মঞ্চ অভিনেতা মোহাম্মদ আনিস। তাঁর শিষ্য সাদেক বাচ্চু। আনিসের কাছে অভিনয় শিখেছিলেন সে সময়ের পর্দা কাঁপানো তারকা আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক ও আনোয়ারারা। আনিস কিভাবে গ্রুমিং করাতেন সেটা আয়ত্তে নিয়েছিলেন সাদেক বাচ্চু। সেই দীক্ষা খাতা-কলমে কাজে লাগালেন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। নিজ হাতে গড়েছেন নাঈম-শাবনাজ, আমিন খান, শাহীন আলম থেকে শুরু করে হালের আরেফিন শুভ, বাপ্পী চৌধুরী কিংবা শান্তকে। 

আশির দশকের শেষ দিককার কথা। সাদেক বাচ্চু তখন তুমুল জনপ্রিয়। বিটিভিতে বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করে নজর কেড়েছেন। পথে-ঘাটে মানুষের কাছে নিজের অভিনয়ের প্রশংসা শোনেন। এর মধ্যেই একদিন পরিচালক এহতেশামের ফোন পেলেন। শিগগির দেখা করার তাগিদ দিলেন। তাঁর অফিসে গেলেন বাচ্চু। সেদিনই দারুণ এক প্রস্তাব পেলেন গুণী এই পরিচালকের কাছ থেকে। এহতেশাম দাদুভাই সেদিন প্রস্তাব দিলেন, নতুন ছবি ‘চাঁদনী’র জন্য নতুন নায়ক-নায়িকা নিয়েছেন তিনি। সাদেক বাচ্চুর গুরুদায়িত্ব তাঁদের অভিনয়ের তালিম দেওয়ার। দাদুভাইয়ের প্রস্তাব কি আর ফেরানো যায়!

সাদেক বাচ্চুর কাছে অভিনয় শেখেননি নব্বই-পরবর্তী এমন নায়ক-নায়িকা খুব কমই পাওয়া যাবে। এহতেশামের আরেক আবিষ্কার শাবনূরও প্রথম দিকে তাঁর কাছে গ্রুমিং করেছেন। আমিন খান, শাহীন আলমরাও বাচ্চুর হাতে গড়া। অবশ্য নিজে যে এত তারকার গুরু তা কখনো জানতে দেননি মানুষকে। নাঈম-শাবনাজ, আমিন খান, শাহীন আলম, জায়েদ খান, আমান রেজা ও বাপ্পী- এমন অনেককেই অভিনয় শিখিয়েছেন তিনি। এঁদের কেউ কেউ তাঁকে বাবা বলেও ডাকতেন, কেউ ডাকেন আংকেল বা স্যার। 

গুরুকে নিয়ে বললেন চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম শিষ্য নাঈম, ‘ মনে হচ্ছে আমার বাবাকে হারালাম। আমি আর শাবনাজ তাঁকে আংকেল বলে ডাকতাম। শাবনাজের বাবাও মঞ্চে অভিনয় করতেন। বাচ্চু আংকেল ছিলেন তাঁর বন্ধু। মনে পড়ে, প্রথম ছবির শুটিং শুরুর আগে তিনি আমাদের হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন কিভাবে হাঁটতে হয়, কিভাবে ক্যামেরার সামনে লুক দিতে হয়, কোন সংলাপের ডেলিভারি কিভাবে দিতে হয়। আমি বাচ্চু আংকেলের চোখের অভিনয়টা খুব ফলো করতাম। একেকটা সংলাপ বলার সময় তাঁর চোখের ধরনটা থাকত একেক রকম। আর ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও বাচ্চু আংকেলের কোনো তুলনা হয় না।’ গুরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ শাবনাজও, ‘আংকেল আমাকে মেয়ের মতো আদর করতেন। অভিনয়ে যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছেন ঠিক সেভাবে আমার আর নাঈমের সম্পর্কের সময়ও সাহায্য করেছেন। আমাদের বিয়ের সাক্ষীও তিনি। পর্দায় হয়তো বেশির ভাগ সময় তাঁকে খল চরিত্রে দেখা যায়। কিন্তু আমার দেখা ভালো মানুষদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি আমাদের পরিবারেরই সদস্য।’

বাচ্চুকে তুখোড় অভিনেতা মনে করেন সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা মিশা সওদাগর। তিনি নিজেই বেশ কিছু বিষয় শিখেছেন বাচ্চুর কাছে। সেটা অনায়াসে বাচ্চুর সামনে স্বীকারও করেন। মিশা অকপটে অনেক মানুষের মধ্যে বলে দেন বাচ্চু ভাই, এই ডেলিভারিটা কিন্তু আপনার কাছ থেকে নিয়েছি। গুরুকে হারিয়ে বেদনায় কাতর আমিন খানও। তিনি বলেন, ‘প্রথম ছবি থেকেই বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। অভিনয়ের নানা বিষয়ে টিপস দিয়েছেন। আমি সেগুলো সাদরে নিয়েছিলাম। আমার কাছে বাচ্চু ভাই একটা ইনস্টিটিউট। এখনকার নতুনরাও যদি বাচ্চু ভাইয়ের কাছে তালিম নিতো, ওরাও উপকৃত হতো। বাংলা চলচ্চিত্রের একটা ইনস্টিটিউট ভেঙ্গে গেল। ’

বাপ্পী চৌধুরীর প্রথম ছবি ‘ভালোবাসার রং’। শুটিং শুরুর আগেই বাপ্পীকে বাচ্চুর হাতে তুলে দেন প্রযোজক আব্দুল আজিজ।

বাপ্পী সেটা ভালোই মনে রেখেছেন। বলেন, ‘অনেকেই হয়তো ভালো অভিনেতা; কিন্তু সবাই ভালো শিক্ষক হতে পারেন না। তিনি দারুণ একজন শিক্ষক ছিলেন। নতুন অবস্থায় অভিনয়ে বেশ জড়তা ছিল আমার, সেটা কাটিয়ে উঠতে দারুণ সাহায্য করেছিলেন তিনি। দেখা হলেই জিজ্ঞাস করতো আমি কেমন করছি। উনি আমার সিনেমা দেখতেন। কারেকশন পাঠাতেন। সেগুলো আমি শ্রদ্ধাভরে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। 

যে মানুষটা এত তারকার অভিনয়জীবনের প্রথম গুরু, সেই মানুষটা পাননি জাতীয় স্বীকৃতি। ঝুলিতে জোটেনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এই অপূর্ণতা নিয়েই চলে গেলেন বরেণ্য এই অভিনেতা।