ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সৃজিত মুখার্জীঃ টালিগঞ্জের বাজিকর

মাহাবুব মোর্শেদ রিফাত
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ বুধবার, ১০:০২ পিএম
সৃজিত মুখার্জীঃ টালিগঞ্জের বাজিকর

 

একটা সময় কলকাতার বাংলা সিনেমা আটকে গিয়েছিলো বিশেষ কিছু গল্পের চোরাবালিতে। ধনী গরীবের অসম প্রেমের গল্প, পিতার হত্যাকারীকে বছরের পর বছর ধরে খুঁজে চলার গল্প, দক্ষিনী সিনেমার ফ্রেম টু ফ্রেম কপি আর বি গ্রেডের রগরগে যৌনতা নির্ভর গল্পের ভার যেন আর সইতে পারছিলো না কলকাতার সিনেমাপ্রেমী দর্শকেরা।

সময়টা ২০০৮ কিংবা ২০০৯ হবে। প্রেসিডেন্সী কলেজ আর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে অর্থনীতি আর পরিসংখ্যানের কর্মজীবনকে পেছনে ঠেলে এক যুবক আসলেন কলকাতার সিনেমা পাড়ায়। মনের মধ্যে বাংলা সিনেমার অংকের হিসেব বদলে দেবার ইচ্ছে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন প্রয়োজকদের দ্বারে দ্বারে। অথচ গল্প শুনিয়ে প্রযোজকদের মন জয় করতেই পারছিলো না ছেলেটি। অর্থনীতির ছাত্রের সিনেমার গল্পে নাকি বাণিজ্য খুঁজে পাচ্ছিলেন না প্রযোজকগণ। তার গল্পে নাকি কমার্শিয়াল বিষয়টা ঠিক নেই। অবশেষে শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের শ্রীকান্ত মোহতা শুনলেন সেই যুবকের গল্প। দুই বছর ধরে এই গল্পের সাথে বাস করতে থাকা ছেলেটি সেদিন তার গল্পের আকর্ষণে আকৃষ্ট করেছিলেন তাকে। গল্প শুনে মোহতা যখন ওই গল্পের পরিচালনা কে করবেন প্রশ্নটি করেছিলেন, সেদিন ওই যুবক দৃপ্ত কন্ঠে বলেছিলেন যদি পৃথিবীর কেউ এই গল্পটি বলতে পারে সেটি একমাত্র আমি। কলকাতার সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রির ভার অনেকটা একা বয়ে চলা নায়ক প্রসেনজিত এর ক্যারিয়ারে তখন বলতে গেলে এক রকমের ভাটা চলছিলো। সত্যজিৎ রায়ের “নায়ক” আর ইংরিদ বারিমানের “ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ” থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রসেনজিত চ্যাটার্জিকে নিয়ে ধরলেন এক বিশাল বাজি। তৈরী করলেন “অটোগ্রাফ”। ঐ এক বাজিতেই বদলে গেলো টালিগঞ্জের সিনেমার ধারা, শুরু হলো নতুন এক যুগের। হ্যা সেই বাজি ধরা ছেলেটির নাম সৃজিত মুখার্জী, টালিগঞ্জের বাজিকর।

যুগে যুগে সিনেমায় বাণিজ্যের দরকার ছিলো। মূলত আপনি আপনার সিনেমাকে কিভাবে বেচবেন এটা নির্ভর করবে আপনার দর্শকের রুচি আর জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। ওই সময়কার কলকাতার দর্শককের মধ্যে এক ধরণের বিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন সৃজিত মুখার্জী। গল্পই ছিলো তার সিনেমার মূল অস্ত্র। সেই সাথে এক্সপেরিমেন্টাল মাইন্ড দিয়ে অসাধারণ সব অভিনেতা আর হৃদয় জুড়িয়ে দেওয়া গানে যেন বদলে দিলেন গোটা একটা ইন্ড্রাস্ট্রির সিনেমার ধারাকেই।

পরের বছর সৃজিত বাঙ্গালীকে ডুবালেন এক ঘোর লাগা থ্রিলারের দুনিয়াতে। “বাইশে শ্রাবণ”! সৃজিত মুখার্জীর দ্বিতীয় সিনেমায় পর্দায় আনলেন পরমব্রতকে। সেইসাথে বদ্ধ ঘরের চার দেয়ালের মাঝে নিজের সাথে নিজে দাবা খেলে যাওয়া উন্মাদ পুলিশ অফিসার রুপে আবির্ভূত হলেন অটোগ্রাফের বদৌলতে প্রসেনজিত চ্যাটার্জি থেকে প্রসেনজিত বাবুতে বদলে যাওয়া চরিত্র “প্রবির রায় চৌধুরী”। বাঙ্গালি মুগ্ধ হলো, থ্রিলারের এই রুপ বাঙ্গালী আগে দেখেনি। বাজিমাত করলেন সৃজিত মুখার্জী।

বাঙ্গালী ভাবতেও পারেনি আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য কোনো কোচিং সেন্টার থাকতে পারে, আবার সেই গল্প থেকে আস্ত একটা বাংলা সিনেমা হতে পারে। হ্যা হয়েছিলো, সৃজিত নির্মাণ করলেন “হেমলক সোসাইটি” নামের অদ্ভুত কন্টেন্ট এর এক সিনেমা। যা অনেক মানুষকেই বুঝিয়েছে যে “আত্মহত্যা কোনো সমাধান হয়”।

এরপর একে একে কাকাবাবু, মিশর রহস্য, জাতিস্মর দিয়ে সৃজিত নিজের জাত চিনিয়েছেন কলকাতার দর্শকদের। যার ফলস্বরূপ ৬১ তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে চারটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে নেয় সৃজিতের জাতিস্মর।

ডায়লগ যে একটা সিনেমাকে কতোটা উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে সেটির প্রতিফলন দেখালেন “চতুস্কোন” সিনেমাতে। চতুর্ভুজ প্রেম নিয়েও যে টুইস্টে ভরপুর থ্রিলার নির্মাণ সম্ভব তা দেখালেন সৃজিত মুখার্জী। সৃজিতের অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে, যে সকল অভিনেতারা অনেকদিন অভিনয় থেকে দূরে আছেন তাদের কাজ করার ক্ষুধাকে কাজে লাগিয়ে মাস্টারপিস তৈরী করেন তিনি। ৬২ তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে জিতে নেন সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার।

সৃজিতের ক্যারিয়ারের সবথেকে বড় মাস্টারপিস ছিলো সম্ভবত “নির্বাক” নামের সিনেমাটি। অঞ্জন দত্তের নির্বাক হাসির সাথে মর্গের ড্রয়ার থেকে ধোঁয়ার সাথে সাথে উড়ে আসা প্রেম আর সমুদ্রের মাঝে মৃত লাশকে সিনেমার পর্দায় যেন জীবন্ত রুপ দিয়েছিলেন সৃজিত মুখার্জী।

বড় একটি ঘটনার ইমপ্যাক্ট যে ছোট একটি ব্রোথেলেও এসে পড়তে পারে এবং এই ঘটনা থেকেও যে সিনেমা নির্মান সম্ভব তা কলকাতাবাসীর সামনে আনলেন সৃজিত। নির্মাণ করলেন দেশভাগের ঘটনা নিয়ে “রাজকাহিনী” যা পরবর্তীতে হিন্দিতে “বেগমজান” নামেও তিনি নির্মাণ করেছিলেন। এরপর একে একে নির্মাণ করেন জুলফিকার, ইয়েতি অভিযান, উমা, শাহজাহান রিজেন্সি, এক যে ছিলো রাজা, ভিঞ্চিদা।

নেতাজী শুভাস বোস এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সৃজিত নির্মাণ করলেন “গুমনামী”, যা সৃজিতের রাজনৈতিক চিন্তার গভীরতার ছাপ রেখেছে। সৃজিত মুখার্জীর সিনেমাতে যেমন মুগ্ধ থাকেন সাধারণ দর্শকেরা, তেমনি সমালোচকদের মুগ্ধতাও কুড়িয়ে নেন গল্প আর কন্টেন্ট এর জোরে। সৃজিতের মধ্যে খুব জটিল সিনেমার প্লটকেও পাড়ার চায়ের দোকানের উঠতি যুবকদের আড্ডার টপিকে পরিণত করার গুণ রয়েছে। সাবলিল ভাষায় কোনো ভাঁড়ামি ছাড়া ডায়লগ কিভাবে মানুষের মন ছুঁয়ে যেতে পারে এটির বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে সৃজিতে মুখার্জীর সিনেমাগুলো। সামনে তিনি হাজির হচ্ছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক মোহাম্মাদ নাজিম উদ্দিনের বিখ্যাত বই অবলম্বনে “রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি” নিয়ে। যা দুই বাংলার দর্শকদের রহস্যময় চরিত্র “মুশকান জুবেরি” তে বুদ করবে বলে দেওয়া যায়।

টালিগঞ্জে সৃজিত সেই ২০১০ এ যে বাজি ধরেছিলেন সেই বাজি না ধরলে হয়তো কলকাতার দর্শকরা সেই ম্যাড়মেড়ে প্রেমের গল্প আর বি গ্রেড যৌনাচার দিয়েই মন ভরাতো। হয়তো সৃজিত নামের বাজিকরের কারণেই আজ কলকাতা পেয়েছে স্মার্ট দর্শকশ্রেনী। টালিগঞ্জের এই বাজিকরের আজ ৪৩ তম জন্মদিন। সৃজিত মুখার্জী তার নিত্য নতুন সিনেমা দিয়ে মুগ্ধ করে রাখুক বাঙ্গালীকে। বাংলা ভাষার দর্শকদের ডাল ভাত আর বিরিয়ানির পার্থক্য বুঝতে শেখানো টালিগঞ্জের বাজিকরকে জানাই শুভ জন্মদিন।