ঢাকা, রোববার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ , ৪ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বসন্ত বাতাসে

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার, ১১:১৩ এএম
বসন্ত বাতাসে

ইংরেজি কবি শেলী তাঁর এক কবিতায় লিখেছিলেন, ‘শীত যদি এসেই পড়েছে, বসন্ত দূরে নয়।’ শেলী আশাবাদী মানুষ ছিলেন, বিপ্লবে এবং মানুষের উথানে বিশ্বাস করতেন। তিনি নিরাশাবাদী হলে নিশ্চয় লিখতেন, ‘শীত যদি এসেই পড়েছে, লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকি।’ বাঙ্গালিরাও শেলীর মতো, আশাবাদী, সারা জীবন কষ্টে থেকেও তারা আশা ধরে রাখে-নিজেদের জন্য না হলেও সন্তানদের জন্য। বাঙালি আশাবাদী বলে অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করে এগোচ্ছে। তা না হলে ছোট্ট একটা দেশে ১৭ কোটির মতো অবিশ্বাস্য জনসংখ্যার বেশির ভাগ দুবেলা খেয়ে পরে ভালো থাকতে পারছে, এটি তো এক আশ্চর্য ব্যাপার।

শেলী শীত বলতে এক কঠিন ঋতুর কথা লিখেছেন, যার অল্পখানি স্পর্শ আমরাও পাই পৌষ-মাসের দু’এক সপ্তাহে। আর তাতেই জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। তারপরও মানুষ হতোদ্যম হয় না, তাকিয়ে থাকে সামনের দিকে। তবে শেলীর শীত শুধু দেয়াল পঞ্জিকার কটি মাস নয়- শীত হচ্ছে একটি অবস্থার প্রতীক। যখন চারদিকে আঁধার নামে, আশা হারিয়ে যায়, জীবন নিরুদ্দেশ হয়, তখন আমরা বলি শীত নেমেছে। আমাদের সাহিত্যে শীতের এই প্রতীকী প্রকাশ প্রচুর আছে। বছরের অবর্তনে যে শীত আসে, তাকে জয় করা অসম্ভব হয় না। কিন্তু যে শীত জীবনে নামে, তা কটিয়ে ওঠা বড়ই কঠিন। অনেকে এভাবে শীতগ্রস্ত হয়ে জীবন থেকেই বিদায় নেন। এরকম শীত যখন নামে, বসন্ত নিয়ে আশা করে থাকাটা সম্ভব হয় না। তারপরও মানুষ হয়তো চেষ্টা করে। বাঙালিরা যে হাল ছেড়ে দেয় না, সেই প্রমাণ তো আমরা বহুবার পেয়েছি। শীত যদি নেতির ঋতু হয় বসন্ত হয় প্রাপ্তির। বসন্ত মানে নতুন করে জেগে ওঠা, নিজেকে মেলে ধরা, বসন্ত মানে উদযাপন, প্রাণে প্রাণ মেলানো। বাঙ্গালিরা এসব বিষয়কে আদর্শ মানে এজন্যই বসন্ত সকলের প্রিয় ঋতু।

বসন্ত নিয়ে কবিতা-গানের সংখ্যা গুণতে বসলে ক্যালকুলেটর লাগবে। বসন্ত-সাহিত্যে যোগ হয়েছে দিনপঞ্জী, ভ্রমণকাহিনী: বসন্ত নিয়ে চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি, নৃত্য আর যাত্রাপালাও কম হয়নি। অনেক বছর থেকে বসন্ত নিয়ে উৎসব হয় শহবে গ্রামে। অনেক আগে শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসবে গিয়ে মনে হয়েছিল, এরা জানে কিভাবে বসন্তকে বরণ করতে হয়। তখন বাংলাদেশে বসন্ত হাজির হতো শুধু প্রকৃতিকে এবং মানুষের মনে এবং অবশ্যই সাহিত্যে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের বসন্ত উৎযাপন শান্তিনিকেতনকে ছাপিয়ে অনেক দূরে গেছে। এই উৎযাপনের প্রধান শক্তি তারুণ্যের অংশগ্রহণ। এত অসংখ্য তরুণ যখন বসন্তের প্রথম দিনে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন দিনটা, ঋতুটা সত্যিই রঙিন হয়ে ওঠে।

এখন ঢাকা শুধু নয়, বাংলাদেশের সকল জেলা এবং বোধকরি উপজেলা শহরেও বসন্ত উৎসবের আয়োজন হয়। অনেক বছর ধরেই এদেশের তরুণরা নিজেদের পোশাক-আশাকে রঙের বিচিত্র ব্যবহার করেছে- যাকে বলে ফ্যাশন, তা এখন অনেকের কাছে চর্চার একটি বিষয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের নানা উৎসব আর দিবসের রঙ। বাংলা বছরটা শুরু হয় নববর্ষের উৎসব দিয়ে- সেদিনের রঙ লাল সাদা। এরপর আসে ঈদ ও পূজাপার্বন। সেগুলোতেও আছে রঙ। বিজয় দিবসে দেখা যায় লাল-সবুজ। পয়লা ফাল্গুনে বাসন্তি আর হলুদ জ্বলজ্বল করে। একুশের দিনে সাদা-কালোতে আমরা শহীদদের এবং দিনটিকে স্মরণ করি। এর মাঝখানে বাঙালি নিজের মতো করে নিয়েছে সেন্ট ভ্যালেন্টান্স ডেকে, নাম দিয়েছে বিশ্ব ভালবাসা দিবস। সেদিন লালের প্রাধ্যান্য। তাঁর মানে বছরজুড়ে এই যে বঙের খেলা তাতো বিষাদের বিপরীতে আনন্দের, নেতির বিপরীতে ইতির, জীবনহীনতার বিরুদ্ধে জীবনেরই জয়গান।

এই বসন্তেও, আমি অনুমান করছি, জীবনকে উদযাপন করবে তরুণরা, করবে তারুণ্যকে,বন্ধুত্বকে,প্রেমকে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার ৪২ বছরের কর্ম জীবনের কেন্দ্রস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বসন্তের প্রথম দিনে বাসন্তী -হলুদে জেগে উঠবে, চারুকলায় হবে উতসব,মেয়েরা হলুদ-বাসন্তী শাড়িতে সাজবে, ছেলেরা গায়ে চড়াবে হলুদ-বাসন্তী পাঞ্জাবি।ফুলের বিক্রি বাড়বে, বিশেষ করে গাঁদা ফুল আর লাল-হলুদ যত ফুলের, আমার তো মনে হয় যত আমাদের জীবনে আসে, ক্ষট-দুঃখ এবং প্রতকূলতা, ততই আমি রুখে দাড়াই – রুখে দাঁড়াই জীবনের ও তারুণ্যের শক্তি নিয়ে, বসন্ত এই শক্তিকেই অভিবাদন জানায়। আমিও।

ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত – বলেছিলেন এক কবি, বাংলাদেশে এখন ফুল শুধু ফোটেই না, এর চাষও হয়। তবে ফুল না ফুটলেও আপত্তি নেই,কারণ তরুণেরা ফুল ফোটান তাঁদের মনে, কল্পনা, আনন্দের আবহনে।
বসন্তের প্রথম দিনে সবাইকে শুভেচ্ছা,সকলের জীবনে ছোঁয়া লাগিয়ে যাক বসন্তের উতলা বাতাস, সকলের মন রাঙিয়ে দিক বসন্তের সব রং।

শেলীর কথাটা একটু ঘুরিয়ে বললে এভাবে কি বলা যায়, ‘ বসন্ত যখন এসেই পড়েছে, একে আর যেতে দেওয়া হবে না।’

বাংলাদেশ চির বসন্তের দেশ।


বাংলা ইনসাইডার/জেডএ