ঢাকা, সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ৭ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মায়ের গায়ের গন্ধ

অর্পিতা সিদ্দিকী
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০১৮ রবিবার, ০৩:৩৫ পিএম
মায়ের গায়ের গন্ধ

 

জন্ম আমার খুলনায় । মা বাবার ছোট মেয়ে আমি । তিন বোনের মধ্যে ছোট। ভালোবাসার কমতি কখনো দেখিনি। মায়ের মুখে শুনেছি, আমার যখন জন্ম হয় আমি নাকি এক থেকে দেড় মিনিট কোনো শব্দ করিনি।

ছোট সন্তান হিসেবে হয়তো আবেগটা অতটা ছিল না আমার জন্য । আমার মা, পেশাগত ভাবে শিক্ষিকা । মানুষ গড়ার কারিগর, আমাদের তিন বোনের পড়াশুনা করানোর পাশাপাশি নিজেও পড়তেন।

বাসায় মেহমান আসলে বাবা যখন পরিচয় করিয়ে দিতেন আমাদের তিন বোনকে। প্রথমে বলতেন, আমার বড় মেয়ে আমাদের রাজকন্যা, ঠিক যেন পুতুলের মত, মেঝো মেয়ে সে তো হিটলার, আর ছোট মেয়ে মহা দুষ্টু ।

হ্যা, দুষ্টুমিতে আমি তিন বোনের মধ্যে সেরা। লেখাপড়ার হাতে খড়িটাও মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া । আর খুব বন্ধুপ্রিয় মানুষ আমি । নিজের সমালোচনা তো খুব হলো।

এবার আসি আমার ভালোবাসার কথায়, মা’ যাকে ঘিরে আমার সবটুকু সুখ। ছোট থেকেই মায়ের সঙ্গে সাথে সব জায়গায় আমাকে যেতেই হবে। মা তার চাকরিস্থলে গেলে আমাকে নিয়ে যেতে হবে, মা বাজারে গেলে আমাকে নিয়ে যেতে হবে এমন দাবি আমার সবসময়।

মা কে তো আর মা বলে ডাকি না, ডাকি আম্মু। কেনো জানি খুব আদুরে একটা ভাব আছে এই শব্দটার মধ্যে । আম্মু যখন কিছু বলতো , না করতাম না কখনো। বোনরা নাম দিয়ে দিলো "ঠিক আছে আম্মু" ।  আম্মুর গায়ের গন্ধ না নিলে আমার ঘুম হতো না ।

আস্তে আস্তে বয়স বাড়ে। সময় যায় পড়াশুনার চাপ বাড়ে, মনে আছে যখন স্কুলে পরীক্ষার সময় পরীক্ষার দিন সকাল বেলা কিছুই পারি না বলে কাঁদতাম,আম্মু এসে বইটা নিয়ে বসে বলতো "মা, সব পারবা, ভয় পেওনা" । যা পড়াতো হলে গিয়ে দেখতাম হুবহু সেটাই । আমিতো অবাক একি আম্মু জানলো কি করে, পরীক্ষায় এটা আসবে।মাস্টার্সের পরীক্ষা গুলো দেয়ার সময়ও মনে হয় , ইসস ! আম্মু যদি ঢাকায় আমার সাথে থাকতো , আবার সব বলে দিতো পরীক্ষায় কি আসবে , খুব ভালো হতো। চাকরি করে পড়তে গিয়ে যখন হাপিয়ে উঠি তখন মনে হয় , আমি আম্মুর মত ধৈর্য্যশীল হবো। কষ্ট হলেও পড়ব ।

আমার আম্মু খুব ধৈর্য্যশীল একজন মানুষ। আর সাহস তার অপরিসীম । মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যখন ঢাকায় চলে আসি, সেই মুখখানি আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই। হুহু করে কান্না । ট্রেন আগায় আর আমার আম্মুও একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে আমার থেকে। বড়বোনের কাছে থেকে পড়াশুনা করি।  খুব কষ্ট হতো আম্মুর গায়ের গন্ধ ছাড়া ঘুমাতে।

বিয়ের দিনের আম্মুকে ধরে আমি একটুও কাঁদিনি, বুঝতেই পারছিলাম না, ঠিক কত দূরে যাচ্ছি। এখন বলি মাগো , আমি আমার আবেগটা খুব কম প্রকাশ করতে পারি , বলে বুঝাতে পারি না । চোখের ভাষা দিয়েও না , কিন্তু আমি তোমাকে ঠিক আগের মতই ভালোবাসি।

তোমার সঙ্গে আমি তাল মিলিয়ে কথা বলতে পারি না, ঝগড়া তো হবেই। আর এখন সময়ের অভাবে কথাও ঠিকমত হয় না। কিন্তু আম্মু , জানোতো তুমি আমাকে বলেছো রাগ না করতে আমি একটুও রাগ করি না ।সামাজিক মাধ্যমে আমি ছবি দিয়ে একদিনে মা দিবস  প্রকাশ করতে পারি না। আমার কাছে মায়ের জন্য ভালোবাসা সবসময়, শুধু একদিন না । আমি তোমাকে সামনে বলতে পারি না ‘আমি তোমাকে ভালোবাস’"। আজও হয়তো জানবা না , কিন্তু আমি বলতে চাই  ‘ভালোবাসি’।

লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী।

বাংলা ইনসাইডার/ জেডএ