ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০১৮ শনিবার, ০৮:০৩ এএম
ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে, জাগরণের সঙ্গে, উন্নয়নের সঙ্গে যে রাজনৈতিক দলটির নাম জড়িয়ে আছে সেটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান সৃষ্টির দু বছর পর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। জেলে থাকা অবস্থায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলটির যুগ্ন সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। আজ ২৩ জুন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া এই দলটি পালন করতে যাচ্ছে তাদের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই ৬৯ বছরের যাত্রা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বাংলার জনগণের অধিকার আদায় করতে গিয়ে বারবার নিপীড়ণ-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দলটির কর্মীরা, নানান রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেকবার ভাঙ্গনের মুখেও পৌঁছে গিয়েছিল দলটি। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণের শপথ বুকে নিয়ে, স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির সকল ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে দিয়ে এখনো সগৌরবে টিকে আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস তো আওয়ামী লীগেরই ইতিহাস। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত করতে শুরু করে তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে। এছাড়া সাংস্কৃতিক দিক থেকেও পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ছিল বিশাল পার্থক্য, যে কারণে পাকিস্তান থেকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বেরিয়ে আসাটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছিল। আর বাঙালিদের মুক্তি সংগ্রামে একচ্ছত্র ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে একটিই দল – আওয়ামী লীগ।

১৯৫৫ সালের ১৭ জুন ঢাকার পল্টনের জনসভা থেকে আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসন দাবি করেন। সে বছরেই ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দ প্রত্যাহার করে নতুন নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’। এখনো আওয়ামী লীগ সেই ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। এর আগে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয় দলটি যা পূর্ব বঙ্গের জনগণের মধ্যে তাদের বিপুল জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিজেদের জন্মলগ্ন থেকেই দেশের জনগণের অধিকার আদায় ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় লড়াই করে আসছে। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয় সময়েই তাদের ওপর নির্ভর করেছে সাধারণ জনগণ। জনগণের অধিকার আদায়ে লড়তে গিয়ে বারবার কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের। পাকিস্তান সরকারের ২৩ বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু মোট ৪ হাজার ৬৭৫ দিন অর্থ্যাৎ ১৪ বছর কারাভোগ করেন। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু প্রথম জেলে যান ১৯৩৮ সালে। এরপর ১৯৪৮ সালে ও ১৯৪৯ সালে ৩ বার তিনি কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়। এরপর ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালেও তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে পাকিস্তানি অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠী। পূর্ব বাংলার জনগণের আশা-ভরসার প্রতিভূ হওয়ার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাঁকে ভয় পেত।

বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি উত্থাপন করে ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ। এর আগে বছরের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ৬ দফা গৃহীত হয় এবং বঙ্গবন্ধু সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর তিনি যেখানেই সমাবেশ করতে গেছেন সেখানেই তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারের ধামাধরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে ১ নং আসামি করে মোট ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। সে মামলা থেকে বেকসুর খালাস পেলেও একই বছরের ১৭ জানুয়ারি তাঁকে সেনাবাহিনী জেলগেট থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় যেখানে সেনা আইনে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ও তাঁর মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন গণ অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ছাত্র সমাজ ৬ দফার সমর্থনে ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে। তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ শিরোনামে মিথ্যা মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়। এর পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ডাকসু এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে দেওয়া এক বিশাল সংবর্ধনায় শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভুষিত করে।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ২৯৮টি আসন লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর দুরভিসন্ধি ছিল ভিন্ন। সে কারণে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ আকস্মিকভাবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। বঙ্গবন্ধু একে শাসকদের নতুন চক্রান্ত উল্লেখ করে ২ ও ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল আহবান করেন। এরপর ৭ মার্চ রাজনীতির কবি বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে এসে উচ্চারণ করেন সেই অপূর্ব কবিতা – ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

এরপর আসে ইতিহাসের ভয়াল সেই রাত্রি। বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ভয়ংকর পরিকল্পনা নিয়ে একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত বাঙালির ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হবার আগে বাংলাদেশের স্বাদীনতার ঘোষণা বার্তা চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীকে ওয়ারলেস যোগে প্রেরণ করেন। চট্টগ্রাম বেতার থেকে আওয়ামী লিগ নেতা হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী স্বকণ্ঠে প্রচার করেন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। ১৯৭২ সনের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এর দু দিন পর দেশে রাষ্ট্রপতি শাসনের পরিবর্তে সংসদীয় শাসন কাঠামো প্রবর্তন করে নতুন মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী শকুনদের দৌরাত্ন্য তখনো শেষ হয়নি। তারা তক্কে তক্কে ছিল স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিদের এদেশ থেকে নি:শেষ দিতে। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। একই সালের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এর মাত্র চার দিনের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী জিয়াউর রহমান অস্ত্রের মুখে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। আবার বাংলার বুকে নেমে আসে এক অন্ধকার কালো অধ্যায়। সে সময় স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগের চলছে চরম দুর্দিন।

১৯৮১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বহুধা বিভক্ত আওয়ামী লীগকে রক্ষায় হোটেল ইডেনে দলের কাউন্সিলে সর্বসম্মতভাবে শেখ হাসিনাকে দলের সভানেত্রী নির্বাচন করা হয়। তখনও শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আসতে পারেননি। অবশেষে ১৭ মে ১৯৮১ সালে স্বৈরাচারী সরকারের সকল ভ্রুকুটি ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। একই বছরের মে মাসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হলে নভেম্বরে দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়। সে নির্বাচনে বিএনপির নজিরবিহীন কারচুপি সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৩ কোটিরও বেশি ভোট পায়। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান থাকে। এরই মধ্যে ১৯৮২ সালের মার্চে সেনা প্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। মুজিব পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী স্বৈরাচারের হাত থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা। তিনিও পিতার মতো কারাবন্দী হওয়ার ভাগ্যই বরণ করেন। ১৯৮৩ সালে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদ করলে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার তাঁকে চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তার হন সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরীর মতো নেত্রীরাও। ওই বছরেরই নভেম্বর মাসে শেখ হাসিনা সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে দেশে সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দিয়ে শেখ হাসিনাকে মহাখালীর নিজ বাসায় অন্তরীন করে রাখা হয়। ১৪ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা মুক্তি পেলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চলতে থাকে। যা নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ১৯৯০ সালে তীব্র আকার ধারণ করে। এর মধ্যে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টাও করা হয়। উত্তাল গণ আন্দোলনের মুখে নব্বইয়ের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করে।

১৯৯১ এর ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। ১৯৯৪ এ শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনে গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করে বিএনপির সন্ত্রাসীরা। কিন্তু তাদের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ এবং দীর্ঘ একুশ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় তারা। তবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পথটাও সহজ ছিল না। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে গড়িমসি করলে ১৯৯৬ সালের ৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গড়ে ওঠে জনতার মঞ্চ। এই জনতার মঞ্চই হয়ে ওঠে অবৈধ বিএনপি সরকারের পতনের মূল কেন্দ্র। ক্ষমতায় আসার পর গঙ্গার পানি চুক্তি, পার্বত্য শান্তি চুক্তি, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু প্রভৃতির মতো জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। কিন্ত ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নজিরবিহীন কারচুপির ফলে নির্বাচনে পরাজিত হতে হয় স্বাধীনতার স্বপক্ষের এই দলকে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সারাদেশে সীমাহীন লুটতরাজ চালায়। সীমা ছাড়িয়ে যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের মহাসমাবেশে বিএনপির সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড হামলা চালালে আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৩ নেতাকর্মী নিহত হন। অল্পের জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি বেঁচে যান। এমনই রাজনৈতিক অস্থিরতায় ২০০৭ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দিন আহমদের সরকার। শেখ হাসিনাকে রাজনীতির ময়দান থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে এ অবৈধ সরকার তাঁকে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তীব্র জনসমর্থনের মুখে এগারো মাস পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। জনগণের তীব্র অসহযোগিতার মুখে ২০০৮ সালে অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় যাতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। নির্বাচনে জয়লাভের পর থেকেই দেশের উন্নয়ন আওয়ামী লীগ সরকারের ধ্যান-জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়।

২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার একুশ শতকের চাহিদার কথা মাথায় রেখে শিক্ষা ও তথ্য-প্রযুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দেয়। এসব খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে যে আওয়ামী লীগ বদ্ধপরিকর তা দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার প্রাপ্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরুস্কারের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ২০১০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশু মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার জন্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাতিসংঘ পদক, একই বছরের ১১ নভেম্বর নারী ক্ষমতায়নে অবদান রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী গ্ল্যামারের বিচারে বর্ষসেরা নারীর সম্মান, ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু, সর্বসাধারনের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বিশ্বের দরবারে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপনের জন্য জাতিসংঘের সাউথ ভিশনারি পুরস্কার, নারী শিক্ষায় অবদানের জন্য ইউনেস্কোর কাছ থেকে ‘শান্তি বৃক্ষ’ স্মারক লাভ করেন। নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য ও সাহসী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এজেন্ট অব চেঞ্জ পুরস্কার পান গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরামের কাছ থেকে। এছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন এবং জাতীয় উন্নয়নে নারীদের মূল ধারায় আনার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ও তুলে দেওয়া হয়।

কেবলমাত্র বাংলাদেশেই সার্ক দেশগুলোর মধ্যে ৯১ শতাংশ স্যানিটেশন কভারেজ অর্জিত হয়েছে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। ২০১২ সালে ৪৮ হাজার দরিদ্র অসহায় মানুষকে আইনি সুবিধার আওতায় এনেছে সরকার। একই বছরে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের আওতায় ১৬৩টি গুচ্ছগ্রামে ৭ হাজার ১৭২টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন এবং রাজধানী ঢাকার বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্তদের পুনর্বাসনে সরকারি জমিতে ১ হাজার ৬৩২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারে সামাজিক সুবিচারের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

এ বছরের ১৮ মে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট মালিক দেশগুলোর এলিট ক্লাবে প্রবেশ করে। এছাড়া কৃষি খাতে জোড় দিয়ে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ছিটমহল সমস্যা সমাধান ও সমুদ্র সীমা বিজয়ের মতো অর্জনগুলোও আওয়ামী লীগ সরকারের হাত ধরেই এসেছে। আর স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার সরকারের হাত ধরেই।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সাজা কার্যকর এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যের মুকুটে দুটি অনন্য পালক। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে বাঙালি তার পিতৃহত্যার অপরাধের কলঙ্ক মোচন করে, আর একই বছরের ২৫ মার্চ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার মাধ্যমে ৪০ বছরের পুরনো দায় থেকে মুক্তির পথে হাঁটে।

বাস্তবিকই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার স্বপক্ষের একমাত্র দল যারা দেশ ও জাতির উন্নয়নে কাজ করে চলেছে জন্মলগ্ন থেকেই। বঙ্গবন্ধু পরিবার যে এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে নেতৃত্ব দিয়েছে এ কথা বলাই বাহুল্য। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, তা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের হাত ধরেই পুনুরুদ্ধার হয়। আর ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গৌরব রক্ষায় এ রাজনৈতিক দলটির কোনো বিকল্প নেই।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ