ঢাকা, বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ২ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সেই দুঃসহ স্মৃতি

শেখ ফজলুল করিম সেলিম
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০১৮ সোমবার, ০৮:০৯ এএম
সেই দুঃসহ স্মৃতি

শোকের মাস আগস্ট। এই মাসেই জাতি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্বাধীন দেশের মাটিতে ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে। শোকের মাসে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে জাতির পিতা ও অন্যান্য শহীদদের।

এই শোকাবহ মাসে বাংলা ইনসাইডার পাঠকদের জন্য নিয়েছে বিশেষ আয়োজন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের কিছু স্মরণীয় লেখা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ থাকছে রহীম শাহ সম্পাদিত শেখ ফজলুল করিম সেলিম এর ‘সেই দুঃসহ স্মৃতি’ শিরোনামে একটি লেখা। লেখাটি নেওয়া হয়েছে রহীম শাহ সম্পাদিত‘পঁচাত্তরের সেই দিন’ বই থেকে।

সেই দুঃসহ স্মৃতি

শেখ ফজলুল করিম সেলিম

পনেরই আগস্ট। ৭৫- এর এ দিনটিতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যা করা হয়েছিল আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের। সেই কালোরাত্রিতে আরও হত্যা করা হয়েছিল বাংলা বাণীর প্রতিষ্ঠাতা, অগ্রজ শেখ ফজলুল  হক মনি ও আমার অন্তঃস্বত্ত্বা ভাবী শামসুন্নাহার আরজুকে। মনি ভাই ও ভাবীকে যখন হত্যা করা হয়, তখন আমিও তাঁদের পাশে ছিলাম। ঘাতকদের ব্রাশ ফায়ারের বুলেটে বিদ্ধ মনি ভাই ও ভাবীর দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। আমিও তাঁদের সঙ্গে লুটিয়ে পড়ি। তাঁদের রক্তধারার উপর আমার লুটিয়ে পড়ায় দেহের জমাকাপড় ভিজে যায়। স্বজন হননের সেই হৃদয়বিদারক মর্মন্তুদ মূহূর্তে নৃশংস ঘটনার সময় আমি প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই দুঃসহ স্মৃতি আজ এত বছর পরও চোখের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে।

ঐ কালো অধ্যায় আজ কালের চাকায় বহু বছর পিছনে। কিন্তু স্মৃতির মিনারে ইতিহাসের সেই করুণ অধ্যায়টির চাক্ষুস অবলোকন এখনও আবছা হয়ে যায়নি। বরং যতই দিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, আর বছর ঘুরে পনেরই আগস্ট আসছে, ততই স্বজন হারানোর পাথরচাপা শোক শুধু অশ্রুতে নয়, স্মুতির মিনারে অক্ষয় চিরঞ্জীব মানুষগুলোর মহান মৃত্যুর রক্তধারার উষ্ণ স্রোতের স্পর্শের অনুভবে সেই শোক এখন শক্তির উৎস। কী করে, কীভাবে চোখের সামনে মনি ভাই ও ভাবীকে হত্যা করা হলো, তার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মনে পড়ছে, নিজেরও বাঁচার কথা ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য, সকল নির্মম ঘটনা ও কালো অধ্যায়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হয়তো ইতিহাসের প্রযোজনেই অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। সৌভাগ্য বলুন বা দুর্ভাগ্য বলুন, আল্লাহ তা’ আলারই ইচ্ছায় মনি ভাই ও ভাবীর রক্তধারা গায়ে মেখে ঐদিনের প্রত্যক্ষ বিবরণের জন্য আমিও বেঁচে আছি।

দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আগস্টের সেই কালো রাতে মনি ভাই ও ভাবীকে হত্যার একটি চাক্ষুস বিবরণ জাতির কাছে পেশ করার জন্য ঐতিহাসিক দায়েই আজ আমি কলম ধরেছি। এই বিবরণ চোখে যা দেখেছি, তা-ই লিপিবদ্ধ করলাম।

১৩ নম্বর সড়কস্থ ধানমন্ডির একটি বাড়ি। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মনি ভাই এই বাড়িতেই ছিলেন। দোতলা বাড়ির সামনে এই চিলতে উঠোন। পনেরই আগস্টের আগের দিন ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকেই বাড়ি লোকে লোকারণ্য। বিভিন্ন জেলার নেতৃবৃন্দ জড়ো হয়েছিল মনি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য। মনি ভাই তখন বাকশাল সেক্রেটারি। আমি এইদিন বিভিন্ন কাজকর্ম শেষ করে রাত এগারটার দিকে বাড়িতে ফিরি। তখন মনি ভাই ছিলেন না। তাঁর জন্য অপেক্ষমান দূরদূরান্ত থেকে আগত নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছিলাম। মনি ভাই তখন অফিসেও ছিলেন না।

রাত সাড়ে এগারটায় মনি ভাইয়ের গাড়ি এল। কিন্তু উনি এলেন না। ড্রাইভার রহমান বলল, ‘মনি ভাই ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নিয়ে গেছেন, নিজে গাড়ি পাঠিয়ে। উনি তখনও ফেরেননি।

রাত সাড়ে বারোটা। মাকে নিয়ে মনি ভাই এলেন। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তাঁর বেডরুমে দু’জনে অনেকক্ষণ একসঙ্গে ছিলেন। তখন ওখানে অন্য কেউ ছিলেন না। রাত বেশি হয়ে যাচ্ছে বলে এবং মা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে আছেন বলে মামী (বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী) ডাইনিং রুমে গেলেন। বঙ্গবন্ধু মনি ভাইকে বললেন, ‘মনি, বুজিকে নিয়ে আমার সঙ্গে চারটে খেয়ে যাও।’

বাড়ি ফিরতে দেরি হবে বলে মা ও মনি ভাই না খেয়েই চলে গেলেন।

আজ ব্যথায় বুক মোচড় দেয়, মনি ভাইকে চারটে ভাত একসঙ্গে খেয়ে যাবার আমন্ত্রণেই ছিল দু’জনার মধ্যে শেষ কথা।

মনি ভাই মাকে সঙ্গে করে নিয়ে যখন বাড়িতে ফিরলেন তখন আমি লনে। গাড়ি থেকে নেমে মা দোতলায় আর মনি ভাই ড্রয়িং রুমে চলে গেলেন। মনি ভাই তখন সারাদিন পরিশ্রমে ক্লান্ত ও অবসন্ন। কিন্তু চোখে আত্মপ্রত্যয়ের দৃষ্টি। সমবেত ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আগামীকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। ওখানে আমাকেও যেতে হবে।’

এরপর সকলেই চলে গেলেন। পৌনে একটার দিকে মনি ভাই খেতে বসলেন মা ও ভাবীকে নিয়ে। খাওয়া-দাওয়ার পর আত্মজ পরশ-তাপসের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বেডরুমে ঘুমাতে গেলাম। মনি ভাই মিনিট তিনেক বাদে বেডরুম থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরি রুমে ঢুকে বইপত্র ঘাঁটলেন। ঘুমোতে যাবার আগে বই পড়া আর খুব সকালে উঠে জাতীয় দৈনিকগুলো পাঠ করা মনি ভাইয়ের নিত্যদিনের রুটিন। লাইব্রেরি রুম থেকে একটি বই বেছে নিয়ে বেগরুমে এলেন। বইটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপর লেখা একটি বিখ্যাত দলিল। নাম- লাস্ট ব্যাটল। বুকের উপর বই মেলে ধরে শুয়ে শুয়ে তিনি এটা পড়ছিলেন। মনি ভাই একা জেগে বিখ্যাত বইটি যখন পড়ে যাচ্ছিলেন, তখন বাড়ির সকলেই ঘুমে নিমগ্ন। রাত্রির শেষ প্রহরে ঢাকা মহানগরীও ঘুমন্ত।  

ভোর প্রায় ৫য়াটা। ঘুম থেকে উঠে পড়লেন মনি ভাই। পরনে লুঙ্গি ও গেঞ্জি। নিয়ে নেমে এলেন দৈনিকগুলোর উপর চোখ বুলানোর জন্য। হঠাৎ চোখ পড়ল বাইরের দিকে। গেইট থেকে ২০/২৫ গজ দূরে আর্মির ল্যান্সার ফোর্সের এই দলটিকে দেখামাত্রই মনি ভাই আবার ত্বড়িৎ গতিতে উপরে উঠে এলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় চিন্তিত তাঁর মুখাবয়ব। কিন্তু একেবারে বিচলিত হলেন না তিনি। ওই সময়ে আমার স্ত্রী ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য যায়। মনি ভাইয়ের চিন্তিত মুখাবয়ব দেখে ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মনি ভাই, কী হয়েছে?’

 

মনি ভাই কোনো কথা বললেন না। তার চোয়াল শক্ত হলো। বেডরুমে ঢুকে ফোন করলেন। আকাঙ্ক্ষিত নম্বরে ডায়াল করে এনগেইজড টোন পেলেন। খুব সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকেই ফোন করেছিলেন। এরপর ফের টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর নেই। এই সময় ফোন বেজে উঠল। মনি ভাই ধরলেন। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল, সেরনিয়াবত সাহেবের বাড়ি আক্রান্ত। ‘ফোন রাখো, আমি দেখছি’- মনি ভাই ফোন ছেড়ে দিলেন। ঠিক এ সময়ে সেনাবাহিনীর ৬/৭ জন লোক ভারী বুটের শব্দ সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলায় উঠতে উঠতে চিৎকার শুরু করল, ‘মনি সাহেব কোথায়, উনি আছেন?’

মনি ভাই দ্রুত বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে সামনের ছোট স্পেসে আগন্তুকদের মুখোমুখি হয়ে বললেন, ‘আমি; কী হয়েছে?” তেজী ও ভারী কণ্ঠের আওয়াজে আগান্তুকরা ইতস্তত। মনি ভাই আবার বললেন , ‘কী হয়েছে বলুন?’

ওদের ভিতর থেকে একজন বললেন, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।’

তখনি মনি ভাই বললেন, ‘হোয়াই, কী অন্যায় করেছি আমি?’

ক্ষিপ্ত একজন ঘাতক সঙ্গিন উঁচিয়ে মনি ভাই-এর মাথায় আঘাত করল, চুলের ঝুটি জাপটে ধরল। দৃশ্য দেখে ছুটে গিয়ে আমার স্ত্রী আমাকে ডাকল। বলল, ‘কী সাহস, কারা যেন মনি ভাইকে মারছে।’

চুলের ঝুটি ধরা হাতটা ঝাপটা দিয়ে ছাড়ালেন। ভাবীও তখন বেড রুম থেকে এসে মনি ভাই এর ডান পাশে দাঁড়াল। আমি মনি ভাই-এর পাশে, আমার পাশে আমার স্ত্রী। পরশ-তাপস দরজার সোজাসুজি ঘরে বিছানায় শায়িত। অনুজ মারুফ তখন নিচে গান-পয়েন্টের মুখে। মনি ভাইয়ের চুল, ছাড়িয়ে নেওয়ার পর ওদের একজন আবার বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে যেতে হবে, এগেইন রিপিট ইট, ইউ আর নাউ আন্ডার অ্যারেস্ট।’

মনি ভাই বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি আসছি।’-এ কথা বলে একটু ঘুরে ঠিক যে মুহূর্তে তিনি জামাকাপড় পাল্টানোর জন্য তার রুমের দিকে উদ্যত হয়েছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই দুইগজ দূর থেকে শুরু হলো ব্রাশ ফায়ার। সামনের আড়াই বাই তিন ফুট স্পেসের উপর আমরা সবাই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি। মনি ভাই ও ভাবীর গায়ে বুলেট বিদ্ধ হয়ে রক্তধারায় মেঝে লাল হয়ে যায়। আমার ও আমার স্ত্রীর গায়ে গুলি লাগে নি। মনি ভাই ও ভাবীর রক্তধারায় আমর জামা কাপড় রঞ্জিত হলো, ওরা আবার ফায়ার শুরু করল। এবারও গায়ে লাগল না। আমার স্ত্রী দরজার আড়ালে ছিল। এরপর তাড়াহুড়ো করে আগন্তুক খুনিরা নিচে নেমে যায়। গুলির শব্দে পরশ-তাপস চিৎকার করে ওঠে। আমার স্ত্রী দৌড়ে ওদের কাছে ছুটে যায়। ওদের জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বাবা, চিৎকার করোনা, লক্ষ্মীটি চিৎকার করো না।’

 

ওরাও তখন কিছু বলল না। চাচির বুকের উপর পড়ে ডুকরে চাপা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। একই সঙ্গে মাও চিৎকার করে তার রুম থকে বেরিয়ে আসেন। এরপর মা অজ্ঞান হয়ে ঐ রক্তধারার উপর লুটিয়ে পড়েন। এই চিৎকার শুনে খুনিরা আবার ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। এই গুলি কারো গায়ে লাগে নি। ঘাতকরা চলে যাবার সময় বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ছিল। আমরা তখন মৃত্যর মুখোমুখি হয়ে পরম করুণাময় আল্লাহতালার কাছে এই অবিচারের আরজি পেশ করলাম। ওদের গুলির ঝাঁঝে সারা বাড়ি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞের পরিণত হয়। খুনিরা অতঃপর চলে গেল।

মা’র সঙ্গে সঙ্গে আমার বৃদ্ধ পিতা শেখ নূরুল হক ঘর থকে বের হয়ে এসে এই করুণ অবস্থা দেখতে পেয়ে তার বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ তিনি নিথর নিস্তব্ধ হয়ে থাকেন। তারপর আমাকে জিজ্ঞেশ করলেন, ’মনিকে কারা মারল?’

আমি বললাম, ‘আর্মি।’

একথা শুনে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কেন?’

আমি বললাম, ‘জানি না।’

এরপর তিনি নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে একদৃষ্টিতে মনি ভাইয়ের লুটিয়ে পড়া দেহের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

এরপর রক্তাপ্লুত দেহ দিয়ে মেঝেতে উঠে মনি ভাই-এর দিকে ঝুঁকে তাকালাম। মনি ভাই নিথর, নিস্পন্দ। ভাবীর দিকে চোখ ফেরালাম। তাঁর ঠোট নড়ছে। যন্ত্রণার আর্তিতে বলে উঠলেন, ‘আমার পেট ছিড়ে-ফুড়ে গেছে। কোমরে শাড়ির বাধনটি একটু হালকা করে দিন।’

আমার স্ত্রী কোমরের বাধন হালকা করে দেওয়ার পর ভাবীর মুখ মেঝেতে এলিয়ে পড়ল। তিনি বললেন, ‘আমাকে বাঁচান। আমার দুটো বাচ্চা আছে।’

পরশ-তাপস তখন তাদের চাচির বুক থেকে মা-বাবার রক্তাপ্লুত দেহের কাছে ছুটে এল। ওরা করুণ আর্তিতে মা-বাবার মুখের কাছে মুখ রেখে ভেঙে পড়ল, ‘মা, কথা বলো, বাবা, কথা বলো।’

নিচে থেকে ছোট ভাই মারুফ উঠে এল। তার চোখ পাথরের মতো অনড়। আমি তাড়াতাড়ি ৩২ নম্বরে ফোন করলাম। কিন্তু লাইন পেলাম না। মারুফ চেষ্টা করে ফোনে শেখ জামালকে পেল। ওরা দু`জনে অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। মারুফ জামালকে জানাল, মনি ভাইকে মেরে ফেলেছে, ভাবী আহত। শোনার পরই জামালের উদ্ভ্রান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘দোস্ত রাখ। আমাদের বাড়িতেও গুলি হচ্ছে।’

এরপর মারুফ ফোন রেখে দেয়। তখনো বুঝতে পারছি না কী ঘটছে? আমি, মারুফ ও শাহাবুদ্দিন মনি ভাই ও ভাবীকে নিয়ে পিজিতে ছুটলাম। আমার গাড়িতে ছিল ভাবী। মারুফের গাড়িতে মনি ভাই। পথে মোস্তফা মহসীন মন্টুর দেখা পেলে মারুফ তাকে গাড়িতে নেয়। পিজির সামনেই দেখলাম, আর্মি পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। বাংলাদেশ বেতারের সামনেও আর্মি। ওদিকে যাওয়াই মুশকিল। গাড়ি ঘুরিয়ে মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে আসার সঙ্গে সঙ্গে পেছনে হর্নের শব্দ শুনলাম। ঐ গাড়িতে ছিল আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের লাশ। ঐ গাড়িতেই ছিল রমনা থানার ওসি মি. আনোয়ার। তিনিও জানতেন না কী ঘটছে।

মনি ভাইকে সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন দেওয়া হলো, ভাবীকে নিয়ে যাওয়া হল অন্য ওয়ার্ডে। ইমারজেন্সি বারান্দায় সেরনিয়াবাত সাহেবের ১১ বছরের গুলিবিদ্ধ কন্যা বেবী একটু একটু নড়ছে। ডাক্তারকে বলল, ‘একটু দেখুন।’

কিছু সময় পর সে আর বাঁচে নি। এই কিশোরীটিও আমার চোখের সামনে বলি হলো। মনি ভাইয়ার কাছে তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম। ডাক্তার বললেন, ‘উনি আপনার কে হন?’

‘আমার ভাই।’

‘দুঃখিত। অনেক চেষ্টা করেছি। বাঁচাতে পারলাম না।’

মনি ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে কয়েক মিনিট পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আবার ছুটে গেলাম । ভাবীর কী অবস্থা দেখতে। ধারণা ছিল ভাবী হয়তো বেঁচে যাবেন। কিন্তু তিনিও এই সুন্দর পৃথিবীতে অসুন্দরের হাতে বলি হয়ে পরপারে চলে গেলেন।

মনি ভাইয়ের বুকে, লাংসে ও থুতনিতে তিনটি গুলির চিহ্ন ছিল। আর ভাবীর পেট ঝাঝরা হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তখনই বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে মেডিকেল কলেজে বুলিটবিদ্ধ কয়েক জন আহত লোক এল। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাসার কাজের লোক আলতাফ ছিল। সে মারুফকে বলল, ‘ভাই সাহেবকে, কামাল ভাইকে, সবাইকে মেরে ফেলেছে।’

এ খবর মারুফ আমাকে বলার পর তখন আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারি। এর কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতাল আর্মি ঘেরাও করল। আমি বাসায় ফোন করে বললাম, ‘তোমরা বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ো। পাশের বাসায় চলে যাও।’

ফোন করেই আমি, মারুফ ও শাহাবুদ্দিন হাসপাতালের তিন তলায় চলে গেলাম। তখন বাইরে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত। এদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কোনো চেনামুখ দেখা গেল না। ওরা চিৎকার করে বলেছেন, ‘লাশ দিন, আমরা মিছিল করব।’

পরে অবশ্য অস্ত্রের দাপটে মুহূর্তের মধ্যে এলাকাটি জনশূন্য হয়ে যায়। এরপর হাসপাতালে থাকা আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। আমাদের গায়ের জামাকাপড়ে মনি ভাই ও ভাবীর রক্তের চিহ্ন। এভাবে বের হওয়া মুশকিল বিধায় চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. এস. এম. মনিরুল হক ও আরও কয়েকজন ডাক্তার খুব সতর্কতার সঙ্গে আমাদের বের করে দেন। রক্তাক্ত জামা-কাপড়গুলো খুলে ফেলে ওদের জামাকাপড় পরেই বের হয়েছিলাম।

বাড়িতে ফিরে দেখি বাড়ির লোকজন কেউ সরে যায়নি। আমরা তখন আরও উদ্বিগ্ন। আমাদের দেখেই পরশ ও তাপস কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওরা বললো, ‘চাচা, আমাদের মা-বাবা কোথায়? মা-বাবার কাছে আমাদের নিয়ে যাও।, মা-বাবাকে আমাদের কাছে এনে দাও।’

পরশের বয়স তখন পাঁচ। তাপসের বয়স সাড়ে তিন। এই অবোধ শিশু দুটির প্রশ্নের জবাব সেদিন দিতে পারিনি। বুক থেকে একটি ভারি বাতাস কণ্ঠ অবধি এসে আটকা পড়েছিল।

আবার শুনলাম, সেই একই চিৎকার- ‘মনি নাহেব আছেন?’

সামরিক উর্দিপরা একদল ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আমি জবাব দিলাম, ‘উনি নেই, হাসপাতালে।’

পুনরায় জিজ্ঞেস করল, ‘মারুফ আছে?’

বললাম, ‘বাইরে।’

ওরা বলল, ‘ছোটাছুটি করবেন না। আমরা দেখছি।’

আমরা সেই বাড়িটি ত্যাগ করে পাশের একটি বাড়িতে চলে গেলাম। দূর থেকে দেখলাম, আরেকটি সামরিক গাড়ি। কিন্তু আর্মি বাড়িতে ঢুকে কী যেন তল্লাশি করল এবং লুটপাট করতেও আর বাকি রাখলো না।

মনি ভাইয়ের সেই মৃত্যুকালীন জিজ্ঞাসা- ‘কী অন্যায় করেছি আমি?’- এখনো আমার কানে বাজে। কানে বাজে ভাবীর সেই শেষ আর্তনাদ- ‘আমাকে বাঁচান। আমার দুটো বাচ্চা আছে।’  

 [রহীম শাহ সম্পাদিত ‘পচাত্তরের সেই দিন’ বই থেকে নেওয়া। (পৃষ্ঠা- ২৯ থেকে ৩৪)]

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ/জেডএ