ঢাকা, সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ৭ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ১২:৫২ পিএম
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী

আজ বিশ্ব আদীবাসী দিবস। ২০১১ সালে আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৭টি আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে বলে জানা যায়। তবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সূত্রে, বাংলাদেশে ৫৫টির অধিক আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। এদের মোট সংখ্যা ৩০ লাখেরও অধিক। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্পর্কের নাম জানলেও তাদের বসবাস করে, জীবনযাপন করে, ভাষা ইত্যাদি নানা বিষয় সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই বললেই চলে। আজ আমরা বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্কে জানবো:

চাকমা

বাংলাদেশের প্রধান আাদিবাসী জাতি ‘চাকমা’। এরা চাংমা নামেও পরিচিত। চাকমারা মঙ্গোলীয় জাতির একটি শাখা। বর্তমান মিয়ানমারের আরাকানে বসবাসকারী ডাইংনেট জাতিগোষ্ঠীকে চাকমাদের একটি শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়। এরা প্রধানত থেরাবাদ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বুদ্ধপূর্ণিমা ছাড়া তাদের অন্যতম প্রধান আনন্দ উৎসব হচ্ছে বিজু। বাংলাদেশের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে এদের সংখ্যা বেশি। তবে বান্দরবানেও চাকমাদের উপস্থিতি রয়েছে। চাকমাদের ভাষার নামও চাকমা (চাংমা)। চাকমাদের নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। চাকমারা ৪৬টি গোজা ও বিভিন্ন গুত্তি বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের সংখ্যা ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৭৪৮ জন।

মারমা

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ আদিবাসী জাতিসত্ত্বা ‘মারমা’। তিন পার্বত্য জেলায় তাদের বসবাস দেখা গেলেও মূল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের বসবাস বান্দরবানে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমারা মিয়ানমার থেকে এসেছে বিধায় তাদের ‘ম্রাইমা’ নাম থেকে নিজেদের ‘মারমা’ নামে ভূষিত করে। মারমারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কথা বলার ক্ষেত্রে মারমাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও লেখার ক্ষেত্রে তারা বার্মিজ বর্ণমালা ব্যবহার করে। মারমা সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষদের মতো মেয়েরাও পৈতৃক সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকারী হয়। ভাত মারমাদের প্রধান খাদ্য। পাংখুং, জাইক, কাপ্যা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মারমা সমাজে জনপ্রিয়। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে মারমাদের সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজার ৯৭৪ জন।

সাঁওতাল

সাঁওতাল বা মান্দি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আদিবাসী নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সাঁওতাল বা মান্দি’। এরা দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে বাস করে। ভাষা এবং নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে সাঁওতালরা বাংলাদেশের অন্য অনেক নৃগোষ্ঠীর মত মঙ্গোলীয় গোত্রের নয়। এরা সাঁওতালী ভাষায় কথা বলে যে ভাষাটি অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। ভাত সাঁওতালদের প্রধান খাদ্য। মাছ, কাঁকড়া, শুকর, মোরগ, মুরগি, বন জঙ্গলের পশু, পাখি, খরগোশ, গুইসাপ, ইঁদুর, বেঁজির মাংস এদের খুবই প্রিয় খাবার। ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী এদর সংখ্যা ১ লাখ ৪৭ হাজার ১১২ জন।

ত্রিপুরা

বাংলাদেশের আরেকটি আদিবাসী সম্প্রদায় ‘ত্রিপুরা’। এদের জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯৮ জন। ত্রিপুরাদের সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। ছেলেরাই সম্পত্তির অধিকারী হয়৷ তারা মঙ্গোলীয় মহাজাতির অংশ। কাপড় তৈরিতে এদের বেশ দক্ষতা রয়েছে।

গারো

বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায় হলো ‘গারো’। ময়মনসিংহ ছাড়াও টাঙ্গাইল, সিলেট, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঢাকা ও গাজীপুর জেলায় গারোরা বাস করে। গারোরা ভাষা অনুযায়ী বোডো মঙ্গোলীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জাতিগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে অনেক গারোই নিজেদেরকে মান্দি বলে পরিচয় দেন। গারোদের সমাজে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রথা প্রচলিত।

হাজং

বাংলাদেশ উত্তর-পূর্বে বসবাসরত একটি আদিবাসী গোষ্ঠী হলো ‘হাজং’। বাংলাদেশে এদের বাস নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলায় এবং শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলা ও ঝিনাইগাতী উপজেলায়। হাজংরা প্রধানত ধান চাষী। গত শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে এরা খুব দাপটের সাথে বসবাস করেছে এবং ঐতিহাসিক হাজং বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, টঙ্ক আন্দোলন ইত্যাদির নেত্রিত্বের সারিতে এদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল।

খাসিয়া

বাংলাদেশের সিলেট জেলায় ‘খাসিয়া’ জনগোষ্ঠী বাস করে। সিলেটের খাসিয়ারা সিনতেং গোত্রভুক্ত জাতি। এরা কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ভাত ও মাছ তাদের প্রধান খাদ্য। তারা মাতৃপ্রধান পরিবারে বসবাস করে। তাদের মধ্যে কাচা সুপারি ও পান খাওয়ার প্রচলন খুব বেশি। খাসিয়াদের উৎপাদিত পান বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয়। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও এ সম্প্রদায়ের লোকজন শান্তিপ্রিয়।

মণিপুরী

বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ‘মণিপুরী’ সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে। এদের আদি নিবাস ভারতের মণিপুর রাজ্যে। মণিপুরীদের নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে।

তঞ্চঙ্গা

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী একটি উপজাতি ‘তঞ্চঙ্গা’। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যার দিক থেকে এদের স্থান পঞ্চম। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে এদের জনসংখ্যা ৪৪ হাজার ২৫৪ জন। নৃ-ত্বাত্বিক ব্যাখ্যায় তঞ্চঙ্গারা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। এরা পালি, প্রাকৃত, আদিবাংলা ভাষায় কথা বলে। এছাড়া এদের স্বভাব বেশ নম্র। এরা কিছুটা লাজুক স্বভাবেরও বটে।

বম

পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নাম ‘বম’। বম জাতি মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। ‘বম’ শব্দের অর্থ হলো বন্ধন। বান্দরবান জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও সদর থানা এবং রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি থানায় মোট ৭০টি গ্রামে বম জাতির বসবাস। বমদের সঙ্গে বাংলাদেশের মূলস্রোতের মানুষের যোগাযোগ ও জানাশোনা অতি সামান্যই। বান্দরবান পার্বত্য জেলার মারমা ও রাখাইনরা বমদের লাঙ্গি বা লাঙ্গে বলে অভিহিত করে।

চক

বাংলাদেশের বান্দরবান, চট্টগ্রামের চক পাহাড় ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ‘চক’ উপজাতির বসবাস। চকরা যে ভাষায় কথা বলে সেটি চাক ভাষা নামে পরিচিত। চকদের ভাষায় `চক` শব্দের অর্থ `দাঁড়ানো`। চকরা নিজেদের নামের শেষে চক লিখলেও আরাকানিরা চাকদের `সাক` এবং কখনো কখনো `মিঙচাক` বলে ডাকে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী বাংলাদেশে চকদের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮৩৫ জন।

খুমি

বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার রুমা, রৌয়াংছড়ি, এবং থানচি উপজেলাতে বসবাসরত একটি উপজাতি হলো ‘খুমি’। এরা খামি নামেও পরিচিত। ১৭ শতকের শেষভাগে খুমি উপজাতি আরাকান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে। গোষ্ঠীগত দাঙ্গার কারণে খুমীদের একটি অংশ মায়ানামার হতে পালিয়ে এসে বান্দরবানে বসবাস করতে শুরু করে। তারা সাধারণত প্রকৃতি পূজারী। জুম চাষই তাদের প্রধান জীবিকা। এদের মোট জনসংখ্যা ৩ হাজার ৩৬৯ জন।

লুসাই

তারা পূর্ব বাংলাদেশের পূর্বে বসবাসকারী একটি জাতি ‘লুসাই’। এরা নিজেদের মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর বংশধর বলে পরিচয় দেয়। তাদের অধিকাংশই পাহাড়ে জুম চাষ করে। লুসাই পাহাড়ের নামেই তাদের নামকরণ হয়েছে। লুসাইদের চাকমারা কুগী, মারমারা লাঙ্গী ও ত্রিপুরারা শিকাম নামে অভিহিত করে।

কোচ

বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যতম প্রাচীন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ‘কোচ’। বর্তমানে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী এবং শ্রীবর্দী উপজেলায় তাদের বসবাস। কোচ ও রাজবংশীদের প্রায় সময় একই জাতি মনে করা হয়। কোচদের প্রধান খাদ্য ভাত। কোচরা একদিকে যেমন দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজা, লক্ষ্মীপূজা সম্পন্ন করে তেমনি আদি ধর্মের দেবদেবীরও পূজা করে।

রাখাইন

বাংলাদেশের আরেকটি জনগোষ্ঠীর নাম ‘রাখাইন’। এরা মগ নামেও পরিচিত। আঠারো শতকের শেষে এরা আরাকান থেকে বাংলাদেশে এসে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাস মূলত কক্সবাজার, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলায়। এ ছাড়া রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায়ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু রখাইন বসতি দেখা যায়। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়ও রাখাইন সম্প্রদায়ের বসতি রয়েছে।

ওঁরাও

দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় উপজাতি ‘ওঁরাও’। বাংলাদেশেও এদের বসবাস রয়েছে। ওঁরাওরা কুরুখ ভাষায় কথা বলে। তাদেরকে কুরুখ জাতিও বলা হয়। এটি দ্রাবিড় ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত।

মুন্ডা

বাংলাদেশে বসবাসরত আরেকটি উপজাতি হলো ‘মুন্ডা’। মুন্ডা জনগোষ্ঠী যে ভাষায় কথা বলে, তার নাম মুন্ডারি। এরা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত। মুন্ডাদের বিশেষ পছন্দের খাদ্য হচ্ছে কাঁকড়া, ইদুর ও শামুক।

কন্দ

‘কন্দ’ হলো বাংলাদেশে বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে কন্দ জাতির বসবাস শুরু হয়। কন্দফারসি নামক ভাষাকে আদি ভাষা হিসেবে মনে করা হলেও বর্তমানে কন্দরা উড়িয়া ভাষায় কথা বলে।

পাংখো

বাংলাদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ‘পাংখো বা পাংখোয়া’। বাংলাদেশে চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটিতে এরা বসবাস করে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বাংলাদেশে পাংখো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজারের জন।

মুরং

বাংলদেশের একটি আদীবাসী জাতিগোষ্ঠি ‘মুরং’। মুরুং শব্দটি বহুবচন যার একবচন হল ‘ম্রো’। ‘ম্রো’ শব্দের অর্থ মানুষ। ম্রো ভাষায় মুরংরা নিজেদের ‘মারুচা’ বলে থাকে। মুরুংদের ভাষা মৌখিক। মুরংরা অত্যন্ত স্বল্পবসন পরিধান করে। মুরুং সম্প্রদায় মূলত প্রকৃতি পুজারী।

রাজবংশী

রাজবংশী বা কোচরাজবংশী বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে বসবাস করে। কিছু সংখ্যায় এই গোষ্ঠীর লোকেরা বগুরা ও ময়মনসিংহ জেলাতেও আছে। রাজবংশীরা খর্বকায়, লম্বা, চ্যাপ্টা ও তীক্ষ্ণ নাক, উঁচু চোয়ালবিশিষ্ট এক মিশ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ। এরা প্রধানত শিবভক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী এবং পিতৃপ্রধান পরিবার।

এছাড়াও বাংলাদেশে পাঙ্খুয়া, খেয়াং, ডালু, উসাই, মং, বর্ম্মন, পাহাড়ি, মালপাহাড়ি, কোল, পাংগোন, পাত্র, গণ্ড ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ রয়েছে।


বাংলা ইনসাইডার/বিপি