ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৩ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিদায় ‘একাত্তরের জননী’

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার, ০৪:১৫ পিএম
বিদায় ‘একাত্তরের জননী’

১৯৭১ সাল। স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে বীর বাঙালি। আর বাঙালি নিধনের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে বর্বর পাক সেনারা। পুরুষদের তো বটেই, নির্যাতন করছে নারী ও শিশুদেরও। এমনই এক সময়ে ১৯৭১ সালের ১৩ মে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামের এক বাড়িতে হানা দেয় পাক সেনারা। ওই বাড়িতে তখন তিন শিশু সন্তান নিয়ে অবস্থান করছিলেন রমা চৌধুরী, স্বামী ছিলেন ভারতে। সেদিন পাক সেনারা বর্বরতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নিজের মা আর পাঁচ বছর ৯ মাস বয়সী ছেলে সাগর ও তিন বছর বয়সী টগরের সামনেই রমা চৌধুরীকে নির্যাতন করলো এক পাকিস্তানি সৈনিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বলিদান দেওয়া ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লক্ষ নারীর চোখের জলের সঙ্গে মিশে গেল রমা চৌধুরীর পবিত্র চোখের জল।

এক সাগর রক্ত পেরিয়ে অবশেষ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু রমা চৌধুরীর যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। বিজয়ের মাত্র ৪ দিন পর ২০ ডিসেম্বর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তাঁর বড় ছেলে সাগর। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের মিছিলগুলোতে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ বলে ছুটে বেড়িয়ে নিউমোনিয়া বাধিয়েছিল ওই ছোট্ট শিশুটি। এর দুই মাস যেতে না যেতেই মেজ ছেলে টগরও ছেড়ে চলে গেল তাঁকে।

বিভীষিকার এখানেই শেষ হয়নি রমা চৌধুরীর। একাত্তরের জননী খ্যাত এই সংগ্রামী নারী বীরাঙ্গনা পরিচয়ের কারণে সমাজের কাছ থেকে পেয়েছেন লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। সব হারানোর শোকে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ঘা করে ফেলেন তিনি। এক পর্যায়ে আত্মীয়-স্বজনদের অনুরোধে অনিয়মিত ভাবে জুতা পড়তে শুরু করেন। কিন্তু না! আবারও বিধি বাম। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় দিবসে তাঁর ছোট ছেলে ২১ বছর বয়সী টুনু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন। এরপর আর জুতা পড়েননি রমা চৌধুরী। এই প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, ‘ছেলেরা মাটিতে ঘুমিয়ে আছে, কীভাবে জুতা পায়ে হাঁটি।’

পেটের দায়ে নিজের লেখা সাহিত্যকর্ম রাস্তায় ফেরি করে বিক্রি করতেন রমা চৌধুরী। ছোট ছেলের মৃত্যুর অনেক বছর আগেই শুরু হয় তাঁর এই সংগ্রাম। খালি পায়ে হেঁটে হেঁটেই বই বিক্রি করেছেন আজীবন। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা রমা চৌধুরী লেখালেখির মাধ্যমে যে শুধু জীবিকাই অর্জন করেছেন তা নয়, মুক্তিযুদ্ধের অনেক অব্যক্ত ইতিহাসও তিনি বলতে শুরু করেন নিজের লেখায়। আলোচিত বই ‘একাত্তরের জননী’র মুখবন্ধে রমা চৌধুরী লিখেছেন, ‘পাক হানাদার বাহিনী আমাকে প্রাণে না মারলেও আমার আত্মার অপমৃত্যু ঘটিয়েছে, যার ফলে নেমে এসেছে জীবনে শোচনীয় পরিণতি। আমার দুটি মুক্তিপাগল অবোধ শিশুর সাধ স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা ভরা জীবন কেড়ে নিয়েছে বাংলার মুক্তিসংগ্রাম...।’ এই বইসহ মোট ১৮টি বই লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় বোয়ালখালী বিদুগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রমা চৌধুরী। রমা চৌধুরীর বই প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন তাঁর সঙ্গে আমৃত্যু ছায়াসঙ্গীর মতো থেকেছেন।

নিজের ওপর পাক বাহিনীর বর্বর নির্যাতন, এরপর একের পর এক সন্তানের মৃত্যু – এত দুঃখ-কষ্ট সয়েও আজীবন মাথা উঁচু করে বেঁচেছেন এই দুঃসাহসী নারী। শত দুঃখ-কষ্টেও কারো কাছে হাত পাতেননি তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন বিনয়ের সঙ্গে।

গত বছরের ডিসেম্বরে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর আহত হন রমা চৌধুরী। ওইদিনই তাঁকে বেসরকারি ক্লিনিক মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়। এরপর আর কখনোই সুস্থ হয়ে ওঠা হয়নি আজন্ম সংগ্রামী রমা চৌধুরীর। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সরকারের পক্ষ থেকে চতুর্থ তলার মুক্তিযোদ্ধা কেবিনে থাকারও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। কিন্তু দিন দিন ‘একাত্তরের জননী’র অবস্থা খারাপই হতে থাকে। ফলে দুদিন আগে আইসিউতে নিয়ে যাওয়া হয় রমা চৌধুরীকে। কিন্তু কোনো চেষ্টাই আর কাজে লাগেনি। জীবনযুদ্ধে হার না মানা রমা চৌধুরী হেরে গেলেন প্রকৃতির কাছে, রোগ-ব্যধির কাছে।

রমা চৌধুরীর শরীরের মৃত্যু হয়েছে সতি। কিন্তু যতদিন বাংলাদেশ থাকবে রমা চৌধুরীর সংগ্রাম, তাঁর আদর্শ, তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষার কখনোই মৃত্যু হবে না। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ও কান্নার যুগপৎ উদাহরণ হয়ে রমা চৌধুরী আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন যুগের পর যুগ।


বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ