ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘ডাক্তারও স্পর্শ করতে চায় না আমাদের’

রেজাউল করিম রাজা
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার, ০৮:০৬ এএম
‘ডাক্তারও স্পর্শ করতে চায় না আমাদের’

‘কোনো পশু অসুস্থ হলে, পশুকেও ডাক্তার বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঔষধ দেয়। সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয় মানুষকে। আমরাও তো মানুষ। আমরা অসুস্থ হলে ডাক্তারও আমাদেরকে স্পর্শ করতে চায় না। অনেক ডাক্তার দূর থেকে শুধু কথা শুনেই ঔষধ লিখে দেয়। আমাদের শরীর স্পর্শ করতে ডাক্তারদেরও অনীহা। আমাদেরকে সমাজের সবাই অবহেলার দৃষ্টিতে দেখে। একজন মানুষ হিসেবে এর থেকে বড় কষ্ট আর হতে পারে না।’ 

সমাজ-সংসার-ধর্ম এই তিন নীতির সমন্বয়ে মানব সভ্যতার যাত্রা। এই সমাজই আবার ধর্ম ও বর্ণের কারণে মানুষের মাঝে বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়। তখন মানুষ হয়, মানুষের কাছে অবহেলিত, নিষ্পেষিত এবং নির্যাতিত। আমাদের সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণী হচ্ছে দলিত সম্প্রদায়। যাদেরকে আমরা হরিজন বলি। হরিজন সম্প্রদায়ের দুঃখ-দুর্দশা-কষ্টের কথা বলতে বাংলা ইনসাইডারের মুখোমুখি হয়েছিল, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র দাস। নিজেদের অভাবনীয় দুঃখ ও কষ্টের কথা বলতে গিয়েই উল্লিখিত কথাগুলো বলেন তিনি। বাংলা ইনসাইডারের কাছে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারটি দেওয়া হলো:

আপনারা হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার সঙ্গে যুক্ত। আপনাদের এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইতিহাসটা জানতে চাই।

বৃটিশ আমলে ভারত থেকে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে রেলওয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা কাজের জন্য বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। আমাদের অনেকেই তখন এই কাজ করতে চায় নাই। তখন এই কাজ না করতে চাওয়ার কারণে মারধর ও অত্যাচার করা হত। তারপরেও হরিজনরা এই কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে। তখন তাঁরা কৌশল হিসেবে হরিজনদের ফ্রি মদ বিতরণ করত। ফ্রি মদ দিয়ে বলত এই নাও মদ খাও, আর কাজ কর, তোমাদের আর কিছু করতে হবে না। আমাদের পূর্বপুরুষরা এভাবেই ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। 

বর্তমানে আপনাদের কাজের ক্ষেত্রে কি কোনো সমস্যা হয়?

একটা সময় ছিল হরিজনরাই শুধু ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু এখন হরিজন ছাড়াও অনেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। এই কাজে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার কারণে আমরাই এখন কোণঠাসা হয়ে পরেছি। নো ওয়ার্ক, নো পে ভিত্তিতে আমাদের কাজ করতে হয়। পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনে আমাদেরকে স্থায়ী ভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় না। আমাদের নিয়োগের কোনো কাগজপত্রও দেওয়া হয় না। মৌখিক নির্দেশেই আমরা কাজ করি। আমাদের বেতনের পরিমাণ অনেক কম। 

আপনাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার করতে গিয়ে কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়?

একটা সময় ছিল আমাদের ছেলেমেয়েরা কেউ পড়াশুনা করতো না। এখন প্রায় সবাই লেখা পড়া করে। লেখা পড়ায় সমস্যা হচ্ছে যে, হরিজনদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অন্য ছেলেমেয়েরা মেশে না, খেলাধুলা করে না। ক্লাসেও তাদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে না। তাদেরকে সব সময় ক্লাসে পিছনের বেঞ্চেই বসতে হয়। আবার পড়াশুনা করার পর যোগ্যতা অনুযায়ী আমাদের কেউ চাকরিও পায় না। চাকরীর আবেদন করার পর যখনই ঠিকানা দেখে সুইপার কলোনি তখন সঙ্গে সঙ্গেই বাতিল করে দেয়। এই কারণে এখন অনেকেই আর পড়াশুনা করতে চায় না।  

আপনাদের আবাসন ব্যবস্থা সম্বন্ধে কিছু বলবেন?

আমার দাদাকে সরকারের পক্ষ থেকে আট বাই আট ফিটের একটা রুম দেওয়া হয়েছিল। এই রুমে আমার দাদা পরিবার নিয়ে থাকতেন। দাদার পর বাবাও এইখানে থাকতেন। এখন আমি থাকি পরিবার নিয়ে। কেউ বিয়ে করলে এই আট ফিটের রুমের মধ্যেই কাপড় বা পর্দা দিয়ে ভাগ করে থাকতে হয়। অনেক পরিবার আছে যেখানে, একই পরিবারে দুইজন বিবাহিত হলে, তখন তাঁরা পর্যায়ক্রমে ঘরের মধ্যে ঘুমায়। বাকি সময় বাবা-মা, ভাই-বোন শ্বশুর-শাশুড়ি সবাই এক সঙ্গে এক রুমের মধ্যেই থাকতে হয়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।  

দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে আপনাদেরকে কোন কোন ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার হতে হয়?

নিচু শ্রেণীর কাজ করার জন্য সবখানেই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হতে হয় আমাদের। নিজেদের টাকা দিয়ে খাবার কিনলেও হোটেলে বসে খেতে পারি না আমরা। বাইরে দাড়িয়ে খেতে হয়। চা বা পানি খেতে হলেও আমাদেরকে সঙ্গে করে পাত্র নিয়ে যেতে হয়। সবসময়তো আর পাত্র সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না।

যারা চুল কাটে, সবাই যাদেরকে নাপিত বলে। তাঁরা নিজেরাও কিন্তু দলিত সম্প্রদায়ের লোক। কিন্তু আমরা যখন তাদের কাছে চুল কাটতে যাই, তারাও আমাদের চুল কাটতে চায় না। বাধ্য হয়ে আমাদেরকে অন্য জায়গায়, যেখানে আমাদেরকে চিনবে না, সেইখানে গিয়ে চুল কাটতে হয়। আর আমাদের সঙ্গে কেউ মিশতে চায় না, একসঙ্গে বসতে চায় না এগুলোতো আছেই। 

এই সমাজে বসবাস করা মানুষ ও রাষ্ট্রের কাছে আপনাদের কি আবেদন? 

একটি সমাজে কামার, কুমার, চাষি, মুচি, নাপিত, সুইপার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ, সকল শ্রেণীর কাজের লোকের প্রয়োজন আছে। শুধুমাত্র কাজের কারণে আমাদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবেন না। আমরাও মানুষ এই সমাজেরই অংশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করার জন্যেই স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর সেই বঙ্গবন্ধুর দেশে আমাদের প্রতি কেন এত অবহেলা, কেন এত অবিচার?

বাংলা ইনসাইডার/আরকে/জেডএ