ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৭ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

একটি খেলা, একটি যুদ্ধ, একটি দেশ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রবিবার, ০৯:০৫ এএম
একটি খেলা, একটি যুদ্ধ, একটি দেশ

১৯৭১ সাল। অবরুদ্ধ ঢাকা নগরী। এই নগরীর কোনো এক এলাকায় পরম প্রতাপশালী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছে নাম না জানা এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। বুলেটে বুলেটে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে তার। কিন্তু হার মানেনি সে। কারণ এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা প্রতিজ্ঞা করেছে, যতক্ষণ শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকবে ততক্ষণ সে দেশ মাতৃকার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে। তাই নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও খতম করে চলেছে সে একটার পর একটা পাকসেনা।

২০১৮ সাল। মরুর দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। এশিয়া কাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী ম্যাচে খেলছে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা। ম্যাচের প্রথম দিকেই হাতে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়লেন বাংলাদেশের ওপেনিং ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল। জানা গেল, কব্জিতে চিড় ধরা পড়েছে, অন্তত সপ্তাহ ছয়েক মাঠের বাইরে থাকতে হবে। কিন্তু নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমান যখন আউট হলেন তখন বাংলাদেশের সংগ্রহটা নিতান্তই মামুলি, মাত্র ২২৯। এই পুঁজি নিয়ে ম্যাচ জেতার নিশ্চয়তা নেই আর টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে হারলে আশঙ্কা তৈরি হবে টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ পড়ে যাওয়ার। এই অবস্থায় কোনো দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি কি চুপচাপ বসে থাকতে পারে? না, পারে না। তামিম ইকবালও পারেননি। অদম্য দেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তামিম খুলে ফেললেন গলায় ঝোলানো আর্ম স্লিং, রাখলেন শুধু কব্জিতে রাখা ব্যান্ডেজ। দাঁতে দাঁত চেপে সব ব্যথা সহ্য করে নেমে পড়লেন মাঠে, এক হাতে সামলালেন সুরঙ্গা লাকমলের ঝড়ো গতির বল। যদিও দ্বিতীয়বার ব্যাট করতে নেমে কোনো রান করেননি, তবুও যে সময়টা তিনি সঙ্গ দিয়েছেন মুশফিকুর রহিমকে, সেই সময়টাতে বাংলাদেশের স্কোরকার্ডে যুক্ত হয়েছে মহামূল্যবান ৩২টি রান।

দেশপ্রেম কী? কাকে বলে দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ? কাল এই প্রশ্নগুলোরই যেন উত্তর দিলেন তামিম ইকবাল। একটা মানুষের হাত ভেঙে গেছে, তারপরও তিনি দেশের স্বার্থে মাঠে নামলেন, লড়াই করলেন বুক চিতিয়ে। তামিমের এই লড়াইটাও যেন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বীর শহীদরা যেমন মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, গতকাল তামিম ইকবালের মধ্যে দেখা গেল সেই হার না মানা মনোভাবের নিদর্শন। সেই থরো থরো দেশপ্রেম, সেই একই চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা। তামিম আমাদের মনে করিয়ে দিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, দেশের জন্য তাঁদের আত্মত্যাগের কথা।

এই দেশপ্রেমের জন্যই আসলে বাংলাদেশ আজকের জায়গায় এসেছে। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের দুঃসহ স্মৃতি পেছনে ফেলে বাংলাদেশ আজ পরিণত হয়েছে মধ্যম আয়ের দেশে, দেশ থেকে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে যাত্রা করছে বাংলাদেশ। এসব অর্জনের পেছনে মূল কারণই হচ্ছে দেশপ্রেম। এই দেশপ্রেমের জাদুশক্তিতেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। একাত্তরে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে না ছিল আধুনিক অস্ত্র, না ছিল প্রশিক্ষণ। তারপরও সামরিক পরাশক্তি পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ করেছিল বাংলাদেশ এই দেশপ্রেমের কারণেই। গতকাল ভাঙা হাতে দেশের জন্য খেলতে নেমে তামিম ইকবাল সেই নিখাঁদ দেশপ্রেমের পুনরাবৃত্তিই আমাদের করে দেখালেন।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ