ঢাকা, শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৩ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মোদির পাকিস্তান নীতি কী?

শশি থারুর
প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার, ০৮:০০ এএম
মোদির পাকিস্তান নীতি কী?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই পাকিস্তান বিষয়ে ভারতের আচরণ অধারাবাহিক এবং সামঞ্জস্যহীন অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে দেশ দু’টির তিক্ত সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে, পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করার জন্য মোদির সরকারের কোন যৌক্তিক নীতিমালাই নেই, যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের সম্মেলনে দেশ দু’টির মধ্যে যা ঘটেছে, তা ছিল যথেষ্ট নেতিবাচক এবং অসৌজন্যমূলক। ওই সম্মেলনে দেশ দু’টির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৈঠকে সম্মত হওয়ার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে ভারত এটা বাতিল করে। এর কারণ হিসেবে দু’টি বিষয় উল্লেখ করেছে দেশটি- সীমান্তে তিন ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা এবং কাশ্মিরি এক বিদ্রোহীকে সম্মান জানিয়ে পাকিস্তানের ডাক টিকেট প্রকাশ করা।

বৈঠক বাতিলের পর ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, ইমরান খানের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পেয়েছে। ভারত যে দু’টি বিষয়কে বৈঠক বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সেগুলো অবশ্যই নতুন কিছু নয়। অতীতে সীমান্তে বেশ কয়েকটি সহিংসতার পরেও দেশ দু’টির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া বিতর্কিত ডাক টিকেটটি প্রকাশের মাস খানেক পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। তাই এই ইস্যুতে ইমরানের প্রশাসনের একজন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক বাতিল করা যৌক্তিক কোন কারণ নয়। প্রকৃতপক্ষে, সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে এবং পাঁচটি রাজ্য নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের সঙ্গে কোন বৈঠক চাননি।

সীমান্তে হত্যাকাণ্ডসহ নানা বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে তিক্ততা থাকার পরও মোদির সরকার এর আগে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছে। এমনকি ২০১৫ সালে মোদি একবার আকস্মিকভাবে লাহোর সফরও করেছেন। ওই সফরে তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের জন্মদিনের পার্টিতে অংশ নেন তিনি। আবার এই মোদিই নেপালে সার্কের সম্মেলনে নওয়াজকে উপেক্ষা করেছিলেন। পাক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কুশল বিনিময় না করে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। যদিও কিছুদিন পরেই প্রকাশ পায়, মোদি-শরীফ একজন ভারতীয় ব্যবসায়ীর হোটেল স্যুটে একান্তে বৈঠক করেছিলেন।

মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আসন্ন নির্বাচনগুলোতে কট্টর হিন্দুত্ববাদকে পুঁজি করেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর হিন্দু চেতনাবাদের মতাদর্শ, ভারতীয় মুসলমানদের পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতিও বৈষম্য প্রদর্শন করে। সাম্প্রতিক জাতিসংঘের সভায় পাকিস্তানীদের সঙ্গে হাসি বিনিময় এবং করমর্দন নিশ্চিতভাবেই হিন্দুত্ববাদি চেতনার সঙ্গে বেমানান। একইসঙ্গে মোদির নির্বাচন কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও বটে। বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, মূলত এ কারণেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি বাতিল করা হয়েছে।

ভারত বাজে কূটনীতির আশ্রয় নিচ্ছে, এর মানে এই নয় যে পাকিস্তান আদর্শিক কূটনীতি অনুসরণ করছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশিও বিদ্বেষপূর্ণ ও ক্ষতিকর আচরণ করেছেন। ২০১৪ সালে পেশোয়ারের একটি সেনা স্কুলে হামলার জন্য তিনি সরাসরি ভারতকে দায়ী করেছেন। তেহরিক-ই-তালেবানের মতো নিজ দেশের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশকে দোষারোপ করাটা হাস্যকরই বটে।

প্রশ্ন হলো, পারমাণবিক শক্তিধর দেশ দু’টির সরকার কি তাদের অযৌক্তিক আচরণই অব্যাহত রাখবে যা দেশ দু’টির সম্পর্ককে তলানিতে ঠেকাবে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরটি সম্ভবত ‘হ্যাঁ’। সেনা নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান সরকার দেশটির সামরিক বাহিনীর নির্দেশনাই অনুসরণ করবে। অন্যদিকে মোদির সরকারও ভোটের রাজনীতিকেই সবার উপরে রাখবে। এজন্য দেশের বিভিন্ন ইস্যুকে বিপণন করতেও দ্বিধা করবে না তারা।

প্রকৃতপক্ষে মোদির কোন সুচিন্তিত পররাষ্ট্রনীতিই নেই। যেটা আছে তা হলো, খেয়ালিপনার নীতি। ভারতে নির্বাচনি জ্বর জেঁকে বসেছে। এ অবস্থায় একজন সাধারণ নাগরিক শুধু এটুকুই চাইতে পারে যে, এই নির্বাচন যেন প্রতিবেশী দেশ দু`টির মধ্যকার তিক্ততা আরও বাড়িয়ে না দেয়।

লেখক: জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক ভারতীয় মন্ত্রী।


বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি/জেডএ