ঢাকা, সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সংলাপ চমকের অপেক্ষায়

প্রণব সাহা
প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০১৮ মঙ্গলবার, ১০:৩০ পিএম
সংলাপ চমকের অপেক্ষায়

ভোটের ক্ষণ গণনার শুরু হতে না হতেই চমকের রাজনীতির সূচনা হলো। দেশে আবারো একটি সংলাপের হাওয়া বইতে শুরু করলেও, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় তা নিয়েও খানিকটা আশাবাদ দেখা দিলেও এই সংলাপের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে । ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ থেকে জানানো হয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেনের সংলাপের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। গণভবনেই হবে সেই সংলাপ।

মঙ্গলবার সকালেই প্রধানমন্ত্রী চিঠি পৌঁছে যায় ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে। ১৫ জনকে নিয়ে গণভবনের সংলাপে যোগদানের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও মেলে কামাল হোসেনের কাছ থেকে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সুপ্রিমকোর্টে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা দ্বিগুণের রায় ঘোষণা হয়। বিচারিক আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সেই আপিল নিষ্পত্তি করেন খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করার মাধ্যমে। এই রায়ের পর বিএনপির মহাসচিব তার প্রতিক্রিয়ায় আরও অনেক বক্তব্যের মধ্যে একথা বলেন ‘বিএনপি সংলাপে যাবে কি না সেটি আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ এরপর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বুধবার আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রথমত, এটা ঠিক যে ড. কামাল হোসেনের চিঠি পেয়ে একদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে সম্মত হওয়ার ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিতে চমক দিয়েছেন। দেশবাসী শুধু নয় আওয়ামী লীগের নেতারাও এমন ইতিবাচক সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছেন। কারণ আগেরদিনও বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা জোর গলায় বলেছিলেন যে ২১ আগস্টের মামলায় রায়ে বিএনপি দলীয়ভাবে একটি হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর কোনো আলোচনা সেদলের সঙ্গে হতে পারে না। কিন্তু স্বয়ং শেখ হাসিনা যে খোদ গণভবনেই ঐক্য ফ্রন্টের নেতাদের আমন্ত্রণ জানাবেন এবং সংলাপে আওয়ামী লীগের পক্ষে নিজে নেতৃত্ব দিবেন তা রাজনৈতিক মহলের কেউ আগাম ভাবতে পেরেছিলেন কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন সুবাতাস বইবে তা নিয়ে ভরসা থাকে না।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংলাপের কথা জানিয়ে আরও চমকের আভাস দিয়েছেন। কিন্তু দুর্নীতির একটি মামলায় সাজা দ্বিগুণ আর আরও একটি মামলায় সাত বছর সাজা হওয়ার পর বিএনপি কি সংলাপে বসবে?

১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হলেও সমঝোতা আর সহনশীলতার রাজনীতি যে সুদূর পরাহত হয়েছে তা নিয়ে দ্বিমত খুব কম। এর আগেও আমরা অনেক সংলাপ, ফোনালাপ, দেশী-বিদেশী দল-নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দূতিয়ালি তেমন উপকারে আসেনি। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের ব্যর্থ সংলাপের পর দুই পক্ষের সংসদে দেখা হয়েছিল। কিন্তু তারপর ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষদের তিক্ত অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আবারও আরেকটি সংলাপ অনেকটাই সোনার পাথর বাটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় খালেদা জিয়ার শাস্তি হওয়ার পর দুদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছিল। অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দ্বিগুণের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট বর্জনেরও ঘোষণা দিয়েছেন।

১ নভেম্বর গণভবনের সংলাপে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মঙ্গলবার সকালেই ইতিবাচক আভাষ দিয়েছেন ড. কামাল হোসেন। বিকেলে তিনি আলোচনায় বসেন ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলের নেতাদের সাথে। যদিও বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন ‘জনগণের মধ্যে প্রশ্ন আছে এই সংলাপ নিয়ে।’ সেই বৈঠক শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না জানিয়েছেন যে সংলাপে অংশ নেওয়ার পর ১৬ জনের তালিকা করা হয়েছে। কয়েকঘণ্টা চলার পর ড.কামাল হোসেনের চেম্বারে অনুষ্ঠিত  বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে জেএসডির নেতা আ. স. ম. আব্দুর রব জানিয়েছেন সাংবিধানিক বিষয়সহ সব বিষয়েই সংলাপে আলোচনা হবে। সংলাপের চিঠি, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান এবং ঐক্য প্রক্রিয়ার সম্মতিতে রাজনীতিতে সুবাতাস বলেই আপাতত মনে হচ্ছে। তবে ঐক্যপ্রক্রিয়ার যে ৭ দফা তা কতটা নির্বাচনে যোগদানের শর্ত আর কতটা সংলাপে দরকষাকষির ইস্যু সেটিই এখন দেখার বিষয়। আর একটি সংলাপের ইতিবাচক পরিণতিই আমাদের কাম্য। আর দুইপক্ষ সংলাপে যোগ দিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে অনঢ় না থেকে জাতির চাওয়াকেই গুরুত্ব দিবেন, সেটাই বড় বিবেচনার বিষয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংলাপের পক্ষে অবস্থান এবং গণভবনে বিএনপি নেতাদের নৈশভোজ, নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় চমক বলেই বিবেচিত হবে। সেই চমক দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে আগামী ১ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত।

লেখক: সাংবাদিক

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ