ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আমাদের গৌরব, অহংকার

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০১৮ বুধবার, ০৮:০০ এএম
আমাদের গৌরব, অহংকার

আজ ২১ নভেম্বর। বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনী দিবস। ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সমন্বয়ে গঠিত ‘বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী’ সম্মিলিতভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আক্রমণের সূচনা করে যার মাধ্যমে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ওই ঘটনার স্মরণে প্রতি বছর ২১ নভেম্বর ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ পালন করা হয়। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গৌরবের মশাল প্রজ্জ্বলিত করে আজ পালিত হচ্ছে ৪৭ তম ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার।

১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বরের আক্রমণের ফলে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী সারা বিশ্বের রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয়। তবে যুদ্ধের সূচণালগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুরো সময়টাতে বাংলাদেশের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। যদিও সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণই বাংলাদেশের বিজয় সম্ভব করেছে কিন্তু কার্যকরী এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পেশাদার সামরিক নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। একথা বুঝতে পেরে সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে (পরবর্তীতে জেনারেল) কেবিনেট মিনিস্টার মর্যাদাসহ বাংলাদেশ ফোর্সেসের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং কর্নেল (অব.) এম এ রবকে বাংলাদেশ ফোর্সেসের চিফ অব স্টাফ ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। কর্নেল ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সব বিচ্ছিন্ন সংগঠনকে কেন্দ্রীয় কমান্ডের আওতায় নিয়ে আসেন এবং ফোর্সেস সদর দপ্তর থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য অপারেশনাল নির্দেশনা প্রণয়ন শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ যে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত ছিল তার প্রতিটি সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় একেকজন জ্যেষ্ঠ সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণ হতে বাছাইকৃত ব্যক্তিরা মূলত গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতো যাদের বলা হত গণবাহিনী। নিয়মিত যুদ্ধের জন্য সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ইত্যাদি বাহিনীর লোকবল নিয়ে একটি নিয়মিত বাহিনী এবং জেড ফোর্স, এস ফোর্স ও কে ফোর্স নামে তিনটি ব্রিগেড গঠন করা হয় যার নেতৃত্বও দিয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর তিন মেজর। এছাড়া বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর), বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান (১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট), বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল (৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট), বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন (ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার, নৌবাহিনী), বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান (বিমানবাহিনী), বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ (ইপিআর, বর্তমানে বিজিবি) ও বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আবদুর রউফ (ইপিআর, বর্তমানে বিজিবি) প্রত্যেকেই ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বসূচক অবদানের পর বাংলাদেশের জনগণ আশা করেছিল, সদ্য স্বাধীন দেশ গঠনে সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ ভুমিকা পালন করবে। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। সেনাবাহিনীর একাংশের এই নৃশংসতায় আবার পথ হারায় বাংলাদেশ। এরপর প্রায় দেড় দশক বাংলাদেশ শাসন করেন সেনাবাহিনীর প্রধানরা যা বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। তবে ’৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত সশস্ত্র বাহিনী আবার যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করে। এরপর ২০০৭-০৮ সালে যদিও দেশের রাজনীতিতে পুনরায় সশস্ত্র বাহিনীর হস্তক্ষেপের একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় কিন্তু ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে তারা সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে সফল হয়। এরই ফলস্বরূপ বর্তমানে সেনাবাহিনীসহ বাংলাদেশের সকল সামরিক বাহিনী নিজেদের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করার কারণে দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে দেশ ও জনসেবার কাজে সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। নিজেদের সামরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো নির্মাণ, জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ নির্মূল ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আসছে। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ, আইলা, সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকার অবকাঠামো পুননির্মাণসহ বিভিন্ন দেশ ও জনগণের সেবায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করে চলেছে সশস্ত্র বাহিনী। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ পৃথিবীর একাধিক দেশে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা মিশনে শান্তিরক্ষী যোগানে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। বাংলাদেশের আন্ত:বাহিনী জন সংযোগ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি দেশে ৫৪টি মিশনে বাংলাদেশের প্রায় দেড় লাখ সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য অংশ নিয়েছে।

রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা মাথায় রেখেই আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামাদি সরবরাহের মাধ্যমে দক্ষ ও চৌকস সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে আন্তরিক মনোযোগের সঙ্গে কাজ করছে বর্তমান সরকার। দেশপ্রেমিক ও জনবান্ধব সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নে সর্বাধিক ভূমিকা রাখবে এমন প্রত্যাশা নিয়েই আজ উদযাপিত হবে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী দিবস।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ