ঢাকা, রোববার, ১৩ জুন ২০২১, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নির্বাচনে সেনাপ্রধানদের ভূমিকা

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০১৮ বুধবার, ০৯:০০ এএম
নির্বাচনে সেনাপ্রধানদের ভূমিকা (বাঁ থেকে) সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরুদ্দিন খান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম হারুন-অর-রশিদ, জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: বাংলাদেশ আর্মির ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত

দরজায় কড়া নাড়ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশে নির্বাচন আসলেই সেনাবাহিনীর কথা উচ্চারিত হয়। সেনা মোতায়েনের দাবি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনেও সেনা মোতায়েনের দাবি উঠেছে। এ প্রসঙ্গে গত সোমবার সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেছেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে যদি কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হবে। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশাও তাই।

আমাদের সেনাবাহিনী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক টানাপড়েনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সেনাবাহিনী। এর মধ্যে অনেক ভূমিকা বিতর্কিত, আবার অনেক ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং গণতন্ত্রের সুরক্ষায় সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ।

কোনো দেশের সেনাবাহিনীর যে ভূমিকা তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয় সেনাপ্রধানের কর্মকাণ্ড ও দর্শন দ্বারা। সেনাবাহিনী একটি পেশাদারি সামরিক সংগঠন হওয়ায় সেনাপ্রধান যেভাবে দায়িত্ব পালন করেন বা নেতৃত্ব দেন তার প্রভাব তাঁর পুরো বাহিনীর ওপর পড়ে। সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় সেনাপ্রধানের ব্যক্তিত্ব ও কারিশমা বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও জন্মলগ্ন থেকে তার সেনাপ্রধানের চিন্তাভাবনা, ব্যক্তিত্ব ও কর্মকাণ্ড দ্বারা বারবার প্রভাবিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর সামরিক জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৭২ সালের ১২ এপ্রিল তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে অবসর নেন এবং পুরোদস্তুর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন এম এ জি ওসমানী।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ বীর উত্তম ১৯৭২ এর ৬ এপ্রিল সেনাপ্রধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। জেনারেল শফিউল্লাহর সময়েই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তৎকালীন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৃতীয় প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট তিনি জেনারেল শফিউল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হন। জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর হাত ধরে সেনাবাহিনী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।

বাংলাদেশের চতুর্থ সেনাপ্রধান হিসেবে ১৯৭৮ সালের ২৯ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য, সেনাবাহিনীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্যই জিয়ার শাসনামলে তাঁকে সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। কিন্তু এরশাদও রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এছাড়া ১৯৮১ সালে সংঘটিত জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে এরশাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে প্রেসিডেন্টও হয়েছেন এরশাদ।

বাংলাদেশের একাধিক সেনাপ্রধান রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন অথবা সংশ্লিষ্ট হয়েছেন। তবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, শুধু সেনাপ্রধান হিসেবেই নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন এমন সেনাপ্রধানও রয়েছেন। এ তালিকায় প্রথমেই আসে পঞ্চম সেনাপ্রধান জেনারেল আতিকুর রহমানের নাম। ১৯৮৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এরশাদের আমলে নিযুক্ত এই সেনাপ্রধান ১৯৯০ সালের ৩০ আগস্ট দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন।

ষষ্ঠ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরুদ্দিন খানও এরশাদের সময় ১৯৯০       সালের ৩১ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পাবার পর তিনি এরশাদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরুদ্দিনের সমর্থন প্রত্যাহার পরবর্তীতে এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করে বলে অনেকেই মনে করেন।

এরপর সপ্তম সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৪ সালের ৩১ আগস্ট সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান। জেনারেল নাসিমের সময়টাতে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন উঠলে রাষ্ট্রপতি জেনারেল নাসিমকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব থেকে ১৯৯৬ সালের ১৯ মে অব্যাহতি প্রদান করেন। এ নিয়ে ’৯৬ এর নির্বাচনে জটিলতা হয়েছিল।

বাংলাদেশের অষ্টম সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ১৯৯৬ সালের ২০ মে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সময়ে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। জেনারেল মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ১৯৯৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের নবম সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি ১৯৯৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। জেনারেল মুস্তাফিজ দায়িত্ব পালনকালে কোনো নির্বাচন পাননি। তিন বছরের দায়িত্ব পালন করে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

এরপর ১০ম সেনাপ্রধান হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম হারুন-অর-রশিদ ২০০০ সালের ২৪ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারুনের সময় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল এবং নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষের মতো। সেনাপ্রধান থাকাকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারুন সেনাবাহিনীকে নিরপেক্ষ রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ২০০২ সালের ১৬ জুন তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

বাংলাদেশের ১১তম সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী। জেনারেল মশহুদ কোনো নির্বাচন পাননি। তিনি সবসময় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং রাজনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। জেনারেল মশহুদ ২০০২ সালের ১৬ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৫ সালের ১৫ জুন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন।

এরপর ১২তম সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ ২০০৫ সালে ১৫ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন।জেনারেল মঈন ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেন এবং তাঁর ছত্রছায়ায় ২০০৭-২০০৮ সাল সেনাসমর্থিত অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশ শাসন করে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ১৫ জুন তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

জেনারেল মঈন উদ্দিন আহমেদ যুগের পর থেকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে পেশাদারিত্ব যুগের উন্মেষ হয়। ১৩ তম সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীন, ১৪ তম সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া, ১৫ তম সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক এবং ১৬ তম ও সর্বশেষ সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী   এখন আন্তর্জাতিক পেশাদারি সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এই চার সেনাপ্রধানের মধ্যে জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া একটি নির্বাচন পেয়েছেন কিন্তু সেই নির্বাচনে সেনাবাহিনী রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে সফল হয়েছে।

শিগগিরই বাংলাদেশের জনগণ আবার একটি নির্বাচন প্রত্যক্ষ করবে। নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সময়কালে হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। মাত্র কদিন আগে ২০১৮ সালের ২৬ জুন দায়িত্ব নিয়েছেন জেনারেল আজিজ। নতুন এই সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সামনের নির্বাচনে কী ভূমিকা রাখে তা দেখার জন্য শুধু দেশবাসীই নয়, আন্তর্জাতিক মহলও আগ্রহ সহকারে প্রতীক্ষা করে আছে।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচটি/জেডএ