ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাকশালি আবু সাইয়িদও ধানের শীষে?

প্রণব সাহা
প্রকাশিত: ২৬ নভেম্বর ২০১৮ সোমবার, ১০:৩০ পিএম
বাকশালি আবু সাইয়িদও ধানের শীষে?

সাবেক আওয়ামী লীগারদের নির্বাচন কেন্দ্রিক পুনর্বাসনের জায়গা হলো বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করা গণফোরাম। যে দলের সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রতীক বিএনপির ধানের শীষ। আর সর্বশেষ গণফোরামে যোগ দিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটিরও একজন সদস্য। আর ১৯৭৫ সালে ছিলেন পাবনায় বাকশালের গভর্নর। আবু সাইয়িদের নির্বাচনী এলাকা পাবনা-২। এখানে ১৯৯৬ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমীর যুদ্ধাপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মতিউর রহমান নিজামীকে পরাজিত করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন। এর কিছুদিন পর তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে হাতে গোনা যে কজন রাজনীতিক এখনো বেঁচে আছেন, তাদের একজন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাবনা-১ আসন (সাথিয়া ও বেড়া উপজেলা) থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে বাকশালের পাবনা জেলার গভর্নর হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে বাকশাল থেকেই নির্বাচন করে মতিউর রহমান নিজামীর কাছে হেরে গিয়েছিলেন। তবে একই আসন থেকে আবারও নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে। ঐ নির্বাচনে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীকে পরাজিত করেছিলেন ১৪ হাজার ৬৮৩ ভোটে। কিন্তু হেরে গিয়েছিলেন ২০০১ সালে। এরপর ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের মধ্যে সংস্কারপন্থী হিসেবে চিন্থিত হওয়ায় ২০০৮ সালের দলের মনোনয়ন পাননি। এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন শামসুল হক টুকু। তখন থেকেই অনেকটা ছিটকে পড়েন গবেষক রাজনীতিক অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। এর আগে অবশ্য ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে বাকশাল গঠনেও মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন আবু সাইয়িদ। ওয়ান ইলেভেনের পর কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও বেশ কিছুদিন থেকেই তিনি আবারও আওয়ামী লীগের মূলধারায় ফিরে আসার চেষ্টা করছিলেন। সবশেষে আশা করেছিলেন এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন আওয়ামী লীগ থেকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুকে মনোনয়ন দেয়ায় তিনি চলে গেলেন গণফোরামে। তবে কি আবু সাইয়িদ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন?

পাবনা-১ আসনটি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন।  কারণ এটা মতিউর রহমান নিজামীর আসন। এখান থেকে সাংসদ হয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। আবার তাকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়ার পর তা কার্যকরও হয়েছে। সেই নিজামীর কবরও আছে এই আসনে। আর এবারের নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান। জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন নাই। তারপরও শুধু পাবনা জেলায় তারা তিনটি আসনে প্রার্থী দিতে চায়। তারা রীতিমত প্রেস রিলিজ দিয়েও জানিয়েছেন যে তাদের তিন নেতা ,পাবনা-১ এ নাজিবুর রহমান,,পাবনা-৪ এ পাবনা জেলা জামায়াতের আমির আবু তালেব মণ্ডল এবং পাবনা-৫ আসনে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হোসাইন নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। যদিও এই তিনটি আসনে এবার বিএনপি নিজেদের দলীয় প্রার্থী চান। পাবনা জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মাসুদ খন্দকার ,যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান একাধিক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তারা চান পাবনার সব আসনে বিএনপি থেকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক।

খোজ নিয়ে জানা গেছে আওয়ামী লগের মনোনয়ন না পাওয়ায় গণফোরামের সাথে যোগাযোগ করেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। আর স্থানীয়ভাবে বিএনপিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতা-কর্মীরা আবু সাইয়িদকে সমর্থন করবে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে। সে কারণেই সরাসরি বিএনপিতে যোগ না দিয়ে গণফোরামেই যোগ দেন আবু সাইয়িদ। 

অধ্যাপক আবু সাইয়িদ শুধু রাজনীতিকই নন,একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গবেষকও বটে। দেশের রাজনীতিকদের মধ্যে হাতে গোনা যে কজন মানুষ অতীতের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করেন,লেখালেখি করেন তাদের মধ্যে অন্যতম আবু সাইয়িদ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ওপর তার লেখা ‘ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্ট’ অন্যতম আলোচিত একটি বই। এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন, দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন নিজেই।  কিন্তু সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এখন ধানের শীষে ভোট করেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। অবশ্য আবু সাইয়িদ যোগ দিয়েছেন গণফোরামে। আর এই দলটির নির্বাচনী প্রতীক হচ্ছে উদীয়মান সূর্য। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে জোট বাধার পর গণফোরামের নেতারা যারা নির্বাচনে প্রার্থী হবেন, তারা কোন প্রতীকে ভোট করেন তা দেখার জন্য আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটা ঠিক যে জোট বেধে হলেও ড. কামাল হোসেনের মত একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ায় আওয়ামী বলয়ের অনেককেই সেখানে শরিক হতে দেখা যাচ্ছে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়া ছাড়া এই নির্বাচনী রাজনীতির পেছনে তেমন কোনো " রাজনৈতিক আদর্শ " দেখা যাচ্ছে না। প্রত্যক্ষ রাজনীতির মাঠ থেকে একটু দুরে থাকা কামাল হোসেন কিভাবে বিএনপির নেতৃত্বে দেশের রাজনীতির সংস্কার করবেন তা পরিষ্কার নয় । তবে তার সক্রিয় হওয়া এবং খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় আওয়ামীবিরোধী রাজনীতির প্রধান নেতা হওয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী ধারার জন্য একটু অস্বস্তিকর বৈকি!

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ

বিষয়: নির্বাচন