ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আগামী নির্বাচনকে যেভাবে দেখি

মো. তৈমুর মল্লিক ভূঁইয়া
প্রকাশিত: ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার, ১১:২১ এএম
আগামী নির্বাচনকে যেভাবে দেখি

জাতীয় নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮কে আপনি কি ভাবে দেখেন জানিনা, তবে আমি আগামী জাতীয় নির্বাচনকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আর একটি স্বাধীনতা যুদ্ধের অবতারণা দেখতে পাচ্ছি। 

তবে, এই স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্রের কোনো ব্যবহার নেই।  সম্পূর্ণ স্নায়ুযুদ্ধের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে এই যুদ্ধ।  আগামী ৩০ ডিসেম্বর এই যুদ্ধের একটি সমীকরণ পরিষ্কার হয়ে যাবে।  তবে ৩০ পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নেবে কি না সেটা সম্পর্কে পূর্বে অনেক ভাবেই ইঙ্গিত দিয়েছি।

পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠেছে দ্বৈতচরিত্রের কিছু নীতিনির্ধারকের প্রতিচ্ছবি। যারা সামনে বলেন এক, পিছনে সম্পূর্ণরূপে আন্ডারগ্রাউন্ড এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রতিচ্ছবি। 

ডিজিটাল প্রথার সুবিধা নিয়ে, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যতটা না সাধারণ মানুষের নিকট ছুটছে, তারচেয়ে বেশি একে অন্যের কুৎসা রটাতে ব্যস্ত। যার ফলে প্রতিটি মানুষের মধ্যে স্নায়ুর চাপ প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়ে চলেছে। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সেই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠি ছিল, যারা তীব্রভাবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।  এই বক্তব্য বর্তমানে নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছে বা যারা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা কেউ অস্বীকার করবে না বা করতে পারবে না। 

পরিবর্তিত ইতিহাস কি বলে, সেটাও সকলেই জানে। কিন্তু এটা সঠিক যে, ৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রায় দেড় দশক স্বাধীনতাকে যারা বাধাগ্রস্ত করেছিলো, স্বাধীনতাকে যারা অধিকতর হিংস্র করে তুলেছিল তাদের উত্থানের জন্য চিহ্নিত সময় হিসাবে বিবেচিত। সবচেয়ে ভয়ংকর ভাবে যে বিষয় সামনে এসেছে সেটা হলো, সেই দেড় দশকে ঐ সময়ের যুব সমাজের হাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিকৃত ইতিহাসে তুলে দেয়া হয়েছে অত্যন্ত কার্যকর ভাবে।

সেই বিকৃত ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে সেই সময়ে যে উদীয় সমাজ বেড়ে উঠেছে আজ তারাই রাজনীতির মাঠে নেতার আসনে বসে আছে।

দেড় দশক অতিক্রান্ত হবার পরে যখন আবার সঠিক ইতিহাসের ধারক ও বাহকগণ সামনে এলো ততদিনে বাংলাদেশে আলাদা একটি বলয় গড়ে উঠেছে, যারা সেই বিকৃত ইতিহাসের পূজারী। 

যার ফলে সঠিক ইতিহাস প্রকাশ, প্রচার পড়ে যায় চরম বিরোধিতার মুখোমুখি। 

ইতিহাসের এই বিভাজন অটোমেটিক বাঙালি জাতিকে বিভাজিত করে ফেলে। 

কিন্তু বিগত ১০ বছরে যখন স্বাধীনতার বিরুদ্ধচারীগণ কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখনই সামনে চলে আসে স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি যারা বিরোধিতা করেছিলো। তারা বলতে শুরু করে, বাবার দোষে ছেলে কেন অপরাধী হবে? বাবা রাজাকার ছিল বলেই ছেলে কেন রাজাকার হিসাবে গণ্য হবে। 

এমন প্রচারণার উদ্দেশ্যই হলো, বিরুদ্ধাচরণ করা পরিবারের সেই সময়কার যুবসমাজকে অর্থাৎ বর্তমান সময়ের বিপরীত মুখী রাজনৈতিক নেতাদের জাগিয়ে রাখা, তাদের পরিবারের ২য় প্রজন্মকে দলে ভিড়িয়ে রাখা। 

হয়তো এমন যুক্তিকে খোঁড়াযুক্তি হিসাবে অনেকে ভাবতেই পারে, কিন্তু আমি ভাবিনা।  পৃথিবীতে অনেক যুদ্ধ হয়েছে, পরবর্তী সময়ে যুদ্ধটা করা ভুল ছিল এটা প্রমাণিত হবার সাথে সাথে আক্রমণীয় দেশ তাদের ভুলও স্বীকার করেছে। তারপরে তারা বন্ধু হিসাবে পথ চলতেও শুরু করেছে। 

কিন্তু যারা আপত্তি তুলবেন তারা বলবেন কি, পাকিস্তান বাংলাদেশের মানচিত্র রক্তাক্ত করে প্রায় অর্ধশত বছর পরেও কি তাদের ভুল স্বীকার করেছে?  করেনি।  বরং ভিতরে ভিতরে হিংস্রতা বেড়েছে।

বাংলাদেশ জামাত একমাত্র দল যারা পাকিস্তানের পেইড এজেন্ট। যুদ্ধাপরাধী বিচারে পাকিস্তানের সংসদ সবচেয়ে বেশি কেঁপে উঠেছিলো।

পাকিস্তান যেখানে ভুল স্বীকার করে আজও বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারেনি, বরং বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বাঁচিয়ে রেখেছে সেই দলকে। ক্রমান্বয়ে তার শক্তি বৃদ্ধির জন্য চেষ্টার অন্ত নেই। তখন রাজাকারের সন্তান কেন রাজাকার হবে, এই জাতীয় কথা বলা মানেই একটি শূন্য স্থানে তাদের অধিষ্ঠিত করা। হ্যাঁ, তবে ব্যতিক্রম নয় তেমন নয়। কিন্তু আসলেই কি কিছু করার আছে? কদাচিৎ ২/১ জন বেরিয়ে আসলেও যে, তারা একি ওজনে বিক্রি হবে। 

আজ যখন নির্বাচন সামনে নিয়ে সারাদেশ তাকিয়ে আছে নির্বাচনের দিকে, তখন সকলেই দেখছে সেই নির্বাচনে চিহ্নিত জামাতি নেতা, যার পূর্বসূরি রাজাকার বলে চিহ্নিত।  এই ক্ষেত্রে তাদের কোন দোষ আছে বলে মনে হয়না।  কারণ যারা রাজাকার হিসাবে বিবেচিত নয়, অথচ পৃষ্ঠপোষক তাদের মধ্যে থেকে অনেক প্রবীণ নেতা বলছেন, ‘মনোনয়ন প্রাপ্ত কেউ জামাত বা রাজাকার নয়।’ প্রমাণ হাজির করলেই বলে তার বাবার দোষে সে দোষী নয়।  অর্থাৎ জামাত যতটা না হিংস্র বলে প্রতীয়মান, পৃষ্ঠপোষক তার চেয়ে অধিকতর বলেই ধরে নেয়া যায়।  কারণ জামাতের চেয়ে পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যা অনেক বেশি। 

চিহ্নিত শত্রুর মোকাবেলা করা যায়, সেটা অনেকটাই সহজ, কিন্তু ছদ্মবেশী শত্রু একটি ওয়ারফিল্ডে অধিকতর বিপদজনক হয়। 

রণকৌশলে সবচেয়ে কার্যকর যোদ্ধা হলো, একজন গেরিলা। গেরিলা যোদ্ধার কাজই হলো ছদ্মবেশী হয়ে শত্রু পরাস্থ করা।

আমি আমার চোখে আগামী নির্বাচনকে স্নায়ুযুদ্ধের স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসাবেই দেখতে পাই। কারণ ৭১ সালে রক্তক্ষয়ী  স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হলেও, আগামী নির্বাচনে আবার মুখোমুখি সেই পূর্বপাকিস্তানের আওয়ামীলীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিস্থাপক এবং পৃষ্ঠপোষক। 

স্বাধীন দেশে আবার স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়তো সেই ভাবে নেই, কিন্তু আগামী নির্বাচন অবশ্যই স্নায়ুযুদ্ধ ২ পক্ষের মধ্যে।  সেই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ অবধি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নেবে কি না সেটা কিছুদিনের মধ্যেই পরিষ্কার হবে আশাকরি। 

কিন্তু বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যখন এক নেতার বলে, জয় পেলে দেখে নেবো। ভয় আরও বেড়ে যায়, জয় না পাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি হিংস্র না হয়ে ওঠে। 

লেখক: কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, দুর্জয় বাংলা সাহিত্য ও সামাজিক ফাউন্ডেশন 

বিষয়: নির্বাচন