ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাতিলে ধরাশায়ী হেভিওয়েটরা

প্রণব সাহা
প্রকাশিত: ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ রবিবার, ১০:৩০ পিএম
বাতিলে ধরাশায়ী হেভিওয়েটরা

বিএনপির চেয়ারপারসন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি তিনটি দলের তিন প্রধান নেতার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। রোববার সারাদিন ধরে শুধু মনোনয়নপত্র বাতিলের খবর। বলা যায়, হেভিওয়েট রাজনীতিকরাই প্রথম ধাপে ধরাশায়ী হলেন মনোনয়নপত্র বাতিলের খড়গে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং ২০০১ সালের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া গণফোরামে যোগ দিয়ে আলোড়ন তুলেছিলেন। কথা ছিল, বিএনপির প্রতীক ধানের শীষে নির্বাচন করবেন তিনি। কিন্তু বাতিল হয়েছে তাঁর মনোনয়নপত্র। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে অনেকদিন পর গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তারও মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেছে।

নামের শেষে সরকার থাকলেও সরকার গঠনে কোনো ভূমিকা থাকার কথা ছিল না ইমরান এইচ সরকারের। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের এই নেতাও প্রার্থী হয়েছিলেন কুড়িগ্রাম-৪ আসনে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেও বিধি অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকার এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এমপি হওয়ার সাধ মিটে গেলো তাঁর। ফেসবুক আর ইউটিউবের তারকা হিরো আলম চেয়েও পাননি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন। লাঙ্গল মার্কায় দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি, কিন্তু দমে যাননি ফেসবুকের নায়ক আশরাফুল আলম , ওরফে হিরো আলম। জমা দিয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন, কিন্তু এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন দেখাতে পারেননি। তাই ভোটের মাঠ থেকে তাকে আবারো ফিরতে হলো ফেসবুক-ইউটিউবেই।

সারাদিন বার্তাকক্ষে বসে সারাদেশ থেকে মনোনয়নপত্র বাতিলের খবরে মনে হচ্ছিল এর আগের নির্বাচনগুলোতে কখনোই এত বেশি সংখ্যক বা এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতকদের মনোনয়ন বাতিলের খবর লিখতে হয়নি। দণ্ড ও সাজা থাকায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, সেটা আগে থেকেই আঁচ করা যাচ্ছিল। বগুড়ার একটি আসনে বিকল্প হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের মনোনয়ন দাখিলেই বোঝা যাচ্ছিল বিএনপির হাইকমান্ডও জানে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা টিকবে না। কিন্তু তারপরও মনোনয়নপত্র দাখিল করে এই তকমাই জুটল খালেদা জিয়ার ভাগ্যে ‘দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিল’।

আরও একটি বিষয় যে এবার মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাইয়ের দিনেই সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিল ‘দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবে না’। এই রায়ের কারণে চূড়ান্তভাবে বাদ পড়ে গেছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমানসহ বিএনপির পাঁচ কেন্দ্রীয় নেতা। চট্টগ্রামের বিএনপির তিন বড়  নেতা মোর্শেদ খান, মীর নাসির উদ্দিন এবং গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

বড় নেতাদের আত্মীয়রাও ধরা খেয়েছে এবার। ঢাকার সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকা দেশের বাইরে। ঢাকা-৬ আসনে তার ছেলে ইশরাক হোসেন বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক মেয়র মীর্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, যিনি একটি ব্যাংকেরও পরিচালক। তাঁর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে ঋণখেলাপির অভিযোগে। চট্টগ্রামের সাবেক মন্ত্রী মীর নাছিরের ছেলে হেলালউদ্দিনের মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। কয়েক ডজন দল নিয়ে জোট করেছিলেন বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। আদালতে দণ্ডিত হওয়ায় তার মনোনয়নও বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

সারাদেশে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দপ্তরের সূত্রগুলো বলছে এবার বেশি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ঋণখেলাপির দায়ে। আবার অনেক হেভিওয়েট রাজনীতিকের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে আদালতে দণ্ডিত হওয়ার কারণে। আর স্বতন্ত্রভাবে যাঁরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন তাদের একটি বড় অংশ বাদ পড়েছেন নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের এক শতাংশ সমর্থন না দেখাতে পারার জন্য।

বিগত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সংখ্যা ছিল ৩০৫৬ । যা অতীতের থেকে বেশি। হয়তো এবার মনোনয়নপত্র বাতিলেরও একটি রেকর্ড হতে যাচ্ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যারা আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন তারা কেন এতদিনেও আদালতে তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য যাননি? আর ঋণখেলাপিরা যে নির্বাচনে অযোগ্য এটাও নতুন কোনো বিধান নয় । তারপরও এসব অভিযোগে রাজনীতিকদের মনোনয়নপত্র বাতিল কি এ প্রশ্নকেই সামনে আনে না যে তাঁরা আইন-আদালতের ধার ধারেন না। আবার এ প্রশ্নও তোলা যায় যে এসব রাজনীতিক জানতেন যে তাদের মনোনয়ন টিকবে না। এবং তারা নিজেরাও নির্বাচন করতে চান না । শুধু দলের কাছে নিজের অবস্থান ধরে রাখতেই মনোনয়ন দাখিল করেছেন , আর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় নিজেরাই হাফ ছেড়ে বাঁচলেন? শুধু ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনেই ৫৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি বাতিল হয়েছে অভিজাত ঢাকা-১৭ আসনে,১১টি। 

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ