ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২০, ১৫ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সেই হাওয়া ভবন এখন যেমন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার, ০৯:৩১ এএম
সেই হাওয়া ভবন এখন যেমন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু বাড়ি আছে আলোচিত এবং প্রশংসিত। তেমনি কিছু বাড়ি আছে চরম সমালোচিত এবং বিতর্কিত। দেশের ইতিহাসে সব থেকে বেশি বিতর্কিত ভবনের নাম হচ্ছে হাওয়া ভবন। বিগত বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বিখ্যাত বনানীর সেই ১৩ নম্বর সড়কের ৫৩ নম্বর বাড়িটি এখন আর নেই। দোতলা সেই হাওয়া ভবন ভেঙে এখন তৈরি করা হয়েছে নয়তলা ভবন। শুধু ভবনটি নয়, নামটিও বদলে ফেলা হয়েছে। যার ফলে হাওয়া ভবন এখন হয়ে গেছে ‘অ্যাজোর’ নামের আবাসিক ভবন। 

এই ভবনটির মালিক ছিলেন বিএনপি নেতা আলী আসগর লবী। তার মায়ের নাম ছিল হাওয়া বিবি। হাওয়া বিবির নামানুসারেই এই ভবনের নাম রাখা হয়েছিল হাওয়া ভবন। পরবর্তীতে বিএনপি জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে আশেক আহমেদ নামের এক প্রবাসী এই ভবনটি কিনে নেন আলী আসগর লবীর কাছ থেকে। বর্তমানে ভবন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেড (বিটিআই) হাওয়া ভবন ভেঙে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নতুন ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। বিটিআই বর্তমানে এই ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে। 

১৯৯৯ সালের পর থেকেই হাওয়া ভবনে নিয়মিত বসতেন তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। তারেক জিয়াকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সরকারের পাশাপাশি সমান্তরাল একটি সরকার গড়ে উঠেছিল এই ভবনে। এই ভবনে নিয়মিত যাতায়াত করতো তারেক জিয়ার বন্ধু এবং নানা অবৈধ ব্যবসার সহযোগী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনসহ আরও বেশ কয়েকজন তরুণ।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভবন থেকে দেশ চলার কথা হলেও, দেশ চালান হত এই  কুখ্যাত ‘হাওয়া ভবন’ থেকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র এবং বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক জিয়া তখন সেই হাওয়া ভবনের প্রধান। তখন তারেক জিয়া ভাইয়া এবং যুবরাজ নামে খ্যাত। সেই সময়ে তার সঙ্গী ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক ছাত্রনেতা রকিবুল ইসলাম বকুল, ডা. ফিরোজ মাহমুদ ইকবাল, আশিক ইসলাম, মিয়া নুরুদ্দিন অপু, বগুড়ার সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুর ছেলে জয়, অমিতাভ সিরাজ, জহির উদ্দিন স্বপন, আব্দুস সালাম পিন্টু সহ আরও অনেকে।

২০০১ সালে দলীয় মনোনয়নসহ পরবর্তীতে বিএনপির সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই হাওয়া ভবন থেকেই পরিচালিত হয়। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারেক জিয়া এই ভবনে বসেই দল পরিচালনা করতেন। এরপর থেকেই নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় চলে আসে এই ‘হাওয়া ভবন’।  

এই হাওয়া ভবনে মাঝে মাঝে ডাক পড়তো অনেক ব্যবসায়ীর। আর ব্যবসায়ীদের ডাক পড়া মানেই বিশাল অংকের চাঁদা দাবি। চাঁদা না দিলে ভয় ভীতি প্রদর্শন করা হতো এখানে ডেকে। বিএনপি-জামাত সরকারের আমলে এই ভবনের কারণে ব্যবসায়ীরা সব সময় ভয়ে থাকতো এই ভেবে যে, কখন আবার হাওয়া ভবনে থেকে কার ডাক আসে। রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবী, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ এমন কেউ ছিলেন না, যাকে ওই সময় হাওয়া ভবনে হাজিরা দিতে হয়নি। 

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট হামলা মামলার রায়েও হাওয়া ভবনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতে জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান তাঁর বয়ানে বলেন, এই ভবনে বসেই ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা পরিকল্পনা করা হয়েছিল। হামলার তিন দিন আগে হাওয়া ভবনে তারেক জিয়া, সে সময়ের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ বেশ কয়েকজন জঙ্গি সদস্য বৈঠক করেন। আর সেই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় গ্রেনেড হামলার।  

ওয়ান ইলেভেনের ফখরুদ্দীন এবং মইনুদ্দিন সরকারের আমলে এই হাওয়া ভবনে অভিযান চালিয়েছিল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা কালে দেখা যায়, ভবনটির অনেক রুমে সিকিউরিটি লক অত্যন্ত উন্নত মানের ডিভাইস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অনেক রুমে সিকিউরিটি ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক করা। প্রায় তিন দিন চেষ্টা করেও তাঁরা এই সিকিউরিটি লক ভাঙতে পারেনি এবং অনেক রুমেও ঢুকতে পারে নাই। তিনদিন পর সিকিউরিটি এক্সপার্টদের এনে তারপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাওয়া ভবনের ভিতরে প্রবেশ করে কম্পিউটারসহ নানা সামগ্রী জব্দ করে। এরপর থেকেই মূলত হাওয়া ভবনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। 

হাওয়া ভবন সম্বন্ধে জানেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ‘বিটিআই’য়ের  নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বগুড়ার বাসিন্দা রানা জানান, আগে জানতাম না এই বাড়ির বিষয়ে এখন শুনেছি, এইখানে তারেক জিয়ার অফিস ছিল। তিনি আরও জানান, বাড়ির মালিক বিদেশে থাকেন, মাঝে মাঝে এইখানে বেড়াতে আসলে থাকেন। তিনি আরও জানান ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেয়া হয়েছে ব্যবসায়ী এবং চাকরিজীবীদের। এই ভবনে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে বাসা ভাড়াও দেওয়া হয় না বলেও তিনি জানান। এই ভবনের একাধিক বাসিন্দার কাছে হাওয়া ভবন সম্বন্ধে জানতে চাওয়া হলে তাঁরা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। 

দেশে-বিদেশে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের বাসভবন এবং তাঁদের কার্যালয় রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় ইতিহাসের অংশ হিসেবে। তেমনি বিতর্কিত নেতাদের বাসভবন এবং কার্যালয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। যেমন নিক্ষিপ্ত হয়েছে তারেক জিয়ার তুমুল সমালোচিত এই হাওয়া ভবন।

বাংলা ইনসাইডার/আরকে

বিষয়: হাওয়া-ভবন