ঢাকা, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯, ৩ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পথশিশুরা আর কত অবহেলিত থাকবে?

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ জানুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার, ০৮:১৩ এএম
পথশিশুরা আর কত অবহেলিত থাকবে?

সকালে বাসে বসে ঝিমুতে ঝিমুতে অফিসে ছুটতে হয়। সেদিন হঠাৎ বাস সিগনালে দাঁড়ানো, চোখে পড়লো এক ছোট ছেলে পত্রিকা বিক্রি করছে। এই শীতের মধ্যে পাতলা একটা জামা, চোখেমুখে যেন ঘুমের রেশ কাটেনি। পেশা আর পেটের তাগিদে এই শীতের সকালে বেরিয়ে পড়েছে এই ব্যস্ত রাস্তায়। এটা দেখে নিজের চোখের ঘুম কেটে যায়, নড়েচড়ে বসতে হয়, নিজের মনে আসার কতো প্রশ্নকে দমিয়ে ফেলতে হয়। এই রাস্তা দিয়েই যখন বাড়ি ফিরতে হয়, তখন রাস্তায় আরও অনেক শিশু চোখে পড়ে। হয়তো তাদের ভিন্ন পেশা, উদ্দেশ্যও ভিন্ন। 

প্রতিটা দিন এই দৃশ্য দেখে অর্থাৎ রাস্তায় ফুলবিক্রেতা, হকার বা টোকা কোনো শিশুকে দেখলে আমাদের মনে একটা প্রশ্ন আসেই। ভবিষ্যতে এই শিশুগুলোর কি হবে? এই বয়সের শিশুদের কথা মাথায় আসলেই মনে হয় কাঁধে বইয়ের ব্যাগ থাকবে, বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভাইবোন বা অন্য অনেক শিশুদের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখি সেই স্বপ্নময় শিশু জীবিকার প্রয়োজনে রাস্তায় ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে।

আরেকটি প্রশ্নও আসে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়ে এই শিশুরা বড় হয়ে কি জীবিকা বেছে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ আসলে নেই।

রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তায় চলতে গিয়ে পথশিশুদের এই সংগ্রাম আমরা প্রতিনিয়তই দেখি। সারাবিশ্বেরই এই চিত্র রয়েছে। তবে আমাদের দেশে যেন সেটা বেশি। জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামা শিশুদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা কারো কাছে নেই। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে যে শিশু রাস্তায় দিনাতিপাত করে, যাদের নিজেদের কোনো স্থায়ী আবাসস্থল নেই তাদেরকেই পথশিশু বলা যেতে পারে।

এই শিশুদের বেশিরভাগেরই কোনো পরিবার নেই, আবার অনেকেই পরিবার থেকে পালিয়ে কিংবা পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য পথশিশুদের দলে যোগ দেয়। চরাঞ্চল, নদী ভাঙন, বন্যা কিংবা সাইক্লোন-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি হারানো মানুষদের একটি বড় অংশ শহরে এসে ঠাঁই নেয় শহরের বস্তিগুলোতে। এই পরিবারগুলো যে চরম দারিদ্র্যের শিকার, তা বলাই বাহুল্য। আর এই দারিদ্র্যের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই শিশুসন্তানদের একটি বড় অংশ পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্যই রাস্তায় নেমে আসে।

রাজধানীর বস্তি বা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে বেকারত্ব, শিক্ষার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে সামাজিক এবং পারিবারিক কলহ চলে। বাবা-মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ, পারিবারিক কলহের কারণে শিশুরা অনেক প্রভাবিত হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ছোট বয়সে পারিবারিক কলহ বা নির্যাতনের শিকার শিশুদের বড় অংশ ঘর ছেড়ে পথশিশুতে পরিণত হয়।

নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া যানবাহনে ফুল, আচার, রুমাল বিক্রি করে এরা দিন কাটায়। এই শিশুদের একটি বড় অংশের কোনো স্থায়ী বাসস্থান নেই। রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্টপ, লঞ্চ টার্মিনাল থেকে শুরু করে ওভারব্রিজ, ফুটপাথ, পার্কের বেঞ্চে তারা রাত কাটায়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাসমান এই শিশুদের থাকার জায়গা পরিবর্তন হয়, ভোগান্তি বাড়ে।

প্রায় অনাহারে দিন কাটানো এই শিশুদের বেশিরভাগই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ করে বাঁচে। সামান্য আয় থেকে কীভাবে সব চাহিদা মেটানো সম্ভব, সেই প্রশ্নের উত্তরই বা কে দেবে? নোংরা পরিবেশে থেকে এরা পেটের অসুখ, চর্মরোগে ভোগে। কিন্তু কোনো চিকিৎসা পায় না। তাদের নিয়ে সমাজ কিংবা সরকারের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও মাথাব্যথা নেই কারো। পরিবারও তাদের নিয়ে কোনো চিন্তা করে বলে মনে হয় না। পদে পদে সমাজের লাঞ্ছনা পেয়ে আসা এই শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করা সংগঠনও খুব কম।

শিক্ষাব্যবস্থা থেকে এরা বঞ্চিত। তাদের কখনোবা অক্ষরজ্ঞানও থাকেনা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে পরবর্তী সময়ে সমাজের মূলধারায় মিশে যেতে পারেনা এরা। এদের ভবিষ্যত হয় শ্রমিক, বাসের হেল্পার, ড্রাইভার সহ নানা অনিরাপদ পেশায়। মেয়ে পথশিশুরা কখনোবা লাঞ্ছনার শিকার হয়। এমনকি যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয় তারা।

এই শিশুদের পরবর্তীতে বিপথগামী হয়ে যেতে পারে। ভিক্ষাবৃত্তি, চুরি, ছিনতাইয়ে জড়িয়ে অনেক ছোটবেলাতেই একেবারে বখে যেতে থাকে। নেশার ছোবলও এদের ছাড়ে না।

তবে পথশিশুদেরকে নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানই কাজ করছে। ঢাকা আহসানিয়া মিশন তাদের প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বয়সের পথশিশুকে নিয়ে কাজ শুরু করেছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার কাজ শুরু হয়েছে। অনেক ছোট বড় এনজিও, সরকারি সংস্থার উদ্যোগে পথশিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও এগুলো সংখ্যায় অনেক কম।

সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষের একটু সহানুভূতি দরকার। সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতিরে আমার-আপনার দেখানো একটু সহানুভূতি হয়তো এই শিশুদেরকে সমাজের আর দশটা শিশুর মতো বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে। এদের দিয়ে গঠনমূলক কোনো কাজ করানো যেতেই পারে। পাশাপাশি এরা পড়াশুনা করলো, থাকা-খাওয়ার একটা সুব্যবস্থা পেলো, নিরাপত্তা পেলো। অন্তত ভবিষ্যত কিছুটা স্বচ্ছ থাকলো। একটা মজবুত ভবিষ্যত জাতি গঠনে এইটুকু চাওয়া আমাদের থাকতেই পারে।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ